রাজনীতি
প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত। তবু জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করায় নির্বাচনটি এবার কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষের অবস্থান ও রাজনৈতিক বার্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তৎকালীন স্পিকার আবদুর রহমান বিশ্বাস। তাঁর বিপরীতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে। ৮ অক্টোবর সংসদকক্ষে অনুষ্ঠিত ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৯২ ভোট।
এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। প্রতিবার ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রার্থীই মনোনয়ন পেয়েছেন। বিরোধী দল প্রার্থী না দেওয়ায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে একক প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।
এবার সেই ধারায় ছেদ পড়তে যাচ্ছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ সাধারণ আসনের মধ্যে ১৪০টি পেয়েছিল। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১ আসন থেকে ১১টি কম ছিল তাদের। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮৮, জাতীয় পার্টি ৩৫ এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন। পরে জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করে বিএনপি। খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
এর পর সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিও সংসদকেন্দ্রিক হয়। ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ছিলেন দলের দীর্ঘদিনের রাজনীতিক। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী এবং পরে বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার বিরোধিতা করেছিল আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি বিরোধী দল। তাদের আপত্তির একটি কারণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা। পাশাপাশি তারা রাষ্ট্রপতি পদে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিকের বদলে নিরপেক্ষ কাউকে চেয়েছিল।
বিএনপি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করায় আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করে। সংসদে বিএনপির শক্ত অবস্থান থাকায় তাঁর জয়ের সম্ভাবনা কম ছিল। তবু এই প্রার্থিতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দুটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছিল—রাষ্ট্রপতি পদে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বসানোর দাবি এবং বিএনপির ভেতরে থাকা সম্ভাব্য অসন্তুষ্ট সদস্যদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা।
১৯৯১ সালের ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাসের জয় নিশ্চিত হলেও সেটি ছিল না ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্যের ফল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে প্রয়োজন ছিল ১৬৬ ভোট। তিনি পান ১৭২টি—প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে মাত্র ছয়টি বেশি। তাঁর নিজের দল বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট সদস্য ছিল ১৬৮ জন। অন্যদিকে বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
সংসদে মোট ৩৩০ সদস্যের ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ভোট দেন ২৬৪ জন। অর্থাৎ ৬৬ জন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন।
সেই নির্বাচনে বিভিন্ন দলের ভোট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। আওয়ামী লীগের প্রার্থী জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আযমের সঙ্গে দেখা করে ভোট চেয়েছিলেন বলে আলোচনা ছিল। আবদুর রহমান বিশ্বাসও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়।
জামায়াত সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন করলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলটির সব সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বিশ্বাসকে ভোট দিয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। কারণ, জামায়াতের সব ভোট তাঁর পক্ষে গেলে তাঁর ভোটের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার কথা।
১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। বিএনপি তখন কোনো প্রার্থী দেয়নি। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রীতিই কার্যত হারিয়ে যায়।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করে। তবে মাত্র আট মাসের মধ্যে তাঁর সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তিনি পদত্যাগ করেন।
এরপর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি হন। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও নেন। পরে এক-এগারোর রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি হন জিল্লুর রহমান। তাঁর মৃত্যুর পর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং পরে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হন আবদুল হামিদ। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি দায়িত্ব শেষ করেন। এরপর ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন। গত ২৪ জুলাই তাঁর পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদের মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হবে। যাচাই-বাছাইয়ের পর ১৮ আগস্ট মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময়। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদে ভোট হবে।
বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। তবে দলটি এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতিমধ্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে।
ফলে ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে ভোটের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ থেকে শুরু করে অধিকাংশ সাংবিধানিক কাজেই রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণ করতে হয়।
তবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব একেবারে আনুষ্ঠানিক নয়। তিনি আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের সাংবিধানিক প্রধান। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কও রাষ্ট্রপতি। দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা স্থগিত, কমানো বা ক্ষমা করার সাংবিধানিক ক্ষমতাও তাঁর রয়েছে।
সংসদের অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। সংসদে পাস হওয়া বিল তাঁর সম্মতির পর আইনে পরিণত হয়।
সংবিধান অনুযায়ী, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য কোনো বাংলাদেশি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারেন। মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসেবে দুজন সংসদ সদস্যের স্বাক্ষর প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন শুধু সংসদ সদস্যরা। প্রত্যেক সদস্যের একটি করে ভোট। নির্বাচন হবে সংসদকক্ষে নির্ধারিত ব্যালটে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। দুই প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল। পরে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ভোট চালু হয়। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান, ১৯৮১ সালে বিচারপতি আবদুস সাত্তার এবং ১৯৮৬ সালে এইচ এম এরশাদ জনগণের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষমতাও আবার সংসদ সদস্যদের হাতে যায়। ৩৫ বছর পর অলি আহমদের প্রার্থিতা সেই পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। এবার ভোটের ফল কতটা নিশ্চিত, সেটি এক বিষয়; কিন্তু সংসদে ভোট হওয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্যই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিষয় : রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
2.png)
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত। তবু জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করায় নির্বাচনটি এবার কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষের অবস্থান ও রাজনৈতিক বার্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তৎকালীন স্পিকার আবদুর রহমান বিশ্বাস। তাঁর বিপরীতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে। ৮ অক্টোবর সংসদকক্ষে অনুষ্ঠিত ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৯২ ভোট।
এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। প্রতিবার ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রার্থীই মনোনয়ন পেয়েছেন। বিরোধী দল প্রার্থী না দেওয়ায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে একক প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।
এবার সেই ধারায় ছেদ পড়তে যাচ্ছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ সাধারণ আসনের মধ্যে ১৪০টি পেয়েছিল। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১ আসন থেকে ১১টি কম ছিল তাদের। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮৮, জাতীয় পার্টি ৩৫ এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন। পরে জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করে বিএনপি। খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
এর পর সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিও সংসদকেন্দ্রিক হয়। ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ছিলেন দলের দীর্ঘদিনের রাজনীতিক। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী এবং পরে বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার বিরোধিতা করেছিল আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি বিরোধী দল। তাদের আপত্তির একটি কারণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা। পাশাপাশি তারা রাষ্ট্রপতি পদে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিকের বদলে নিরপেক্ষ কাউকে চেয়েছিল।
বিএনপি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করায় আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করে। সংসদে বিএনপির শক্ত অবস্থান থাকায় তাঁর জয়ের সম্ভাবনা কম ছিল। তবু এই প্রার্থিতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দুটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছিল—রাষ্ট্রপতি পদে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বসানোর দাবি এবং বিএনপির ভেতরে থাকা সম্ভাব্য অসন্তুষ্ট সদস্যদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা।
১৯৯১ সালের ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাসের জয় নিশ্চিত হলেও সেটি ছিল না ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্যের ফল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে প্রয়োজন ছিল ১৬৬ ভোট। তিনি পান ১৭২টি—প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে মাত্র ছয়টি বেশি। তাঁর নিজের দল বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট সদস্য ছিল ১৬৮ জন। অন্যদিকে বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
সংসদে মোট ৩৩০ সদস্যের ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ভোট দেন ২৬৪ জন। অর্থাৎ ৬৬ জন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন।
সেই নির্বাচনে বিভিন্ন দলের ভোট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। আওয়ামী লীগের প্রার্থী জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আযমের সঙ্গে দেখা করে ভোট চেয়েছিলেন বলে আলোচনা ছিল। আবদুর রহমান বিশ্বাসও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়।
জামায়াত সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন করলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলটির সব সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বিশ্বাসকে ভোট দিয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। কারণ, জামায়াতের সব ভোট তাঁর পক্ষে গেলে তাঁর ভোটের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার কথা।
১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। বিএনপি তখন কোনো প্রার্থী দেয়নি। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রীতিই কার্যত হারিয়ে যায়।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করে। তবে মাত্র আট মাসের মধ্যে তাঁর সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তিনি পদত্যাগ করেন।
এরপর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি হন। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও নেন। পরে এক-এগারোর রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি হন জিল্লুর রহমান। তাঁর মৃত্যুর পর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং পরে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হন আবদুল হামিদ। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি দায়িত্ব শেষ করেন। এরপর ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন। গত ২৪ জুলাই তাঁর পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদের মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হবে। যাচাই-বাছাইয়ের পর ১৮ আগস্ট মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময়। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদে ভোট হবে।
বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। তবে দলটি এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতিমধ্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে।
ফলে ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে ভোটের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ থেকে শুরু করে অধিকাংশ সাংবিধানিক কাজেই রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণ করতে হয়।
তবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব একেবারে আনুষ্ঠানিক নয়। তিনি আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের সাংবিধানিক প্রধান। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কও রাষ্ট্রপতি। দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা স্থগিত, কমানো বা ক্ষমা করার সাংবিধানিক ক্ষমতাও তাঁর রয়েছে।
সংসদের অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। সংসদে পাস হওয়া বিল তাঁর সম্মতির পর আইনে পরিণত হয়।
সংবিধান অনুযায়ী, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য কোনো বাংলাদেশি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারেন। মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসেবে দুজন সংসদ সদস্যের স্বাক্ষর প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন শুধু সংসদ সদস্যরা। প্রত্যেক সদস্যের একটি করে ভোট। নির্বাচন হবে সংসদকক্ষে নির্ধারিত ব্যালটে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। দুই প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল। পরে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ভোট চালু হয়। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান, ১৯৮১ সালে বিচারপতি আবদুস সাত্তার এবং ১৯৮৬ সালে এইচ এম এরশাদ জনগণের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষমতাও আবার সংসদ সদস্যদের হাতে যায়। ৩৫ বছর পর অলি আহমদের প্রার্থিতা সেই পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। এবার ভোটের ফল কতটা নিশ্চিত, সেটি এক বিষয়; কিন্তু সংসদে ভোট হওয়ার রাজনৈতিক তাৎপর্যই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
2.png)