রাজনীতিরাজনীতি

রাষ্ট্রপতি ভোটের অসম লড়াইয়ে কেন লড়ছে জামায়াত

সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ফল প্রায় নিশ্চিত। তবু জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সাবেক সহচর ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করে ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য।

আবিদ আমান
আবিদ আমান
রাষ্ট্রপতি ভোটের অসম লড়াইয়ে কেন লড়ছে জামায়াত
ছবি -সংগৃহীত

প্রায় ৩৫ বছর পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। সংসদের সংখ্যার হিসাবে বিএনপির প্রার্থীকে হারানো কঠিন—বরং জয় প্রায় নিশ্চিত। এরপরও সেই লড়াইয়ে নামছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য। তাদের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম।

রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১–দলীয় ঐক্যের বৈঠক থেকে অলি আহমদের প্রার্থিতার ঘোষণা আসে। জোটের নেতাদের ভাষ্য, এটি শুধু একটি নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর পেছনে রয়েছে জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা, রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টা এবং দীর্ঘদিনের কিছু হিসাব।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমান সংসদে বিএনপির রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। বিপরীতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য ৯০ জন। ফলে ভোটের ফলাফল নিয়ে বিরোধী জোটের নেতারাও খুব বেশি আশাবাদী নন।

বাংলাদেশে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি সংসদীয় ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়ী হন। এবারের সংসদে বিএনপির আসনসংখ্যা তখনকার তুলনায় আরও বেশি। ফলে দলটির মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি হবেন—এমন হিসাবই রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে জোরালো।

জয়ের চেয়ে বড় হিসাব

প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে অলি আহমদকে প্রার্থী করার প্রয়োজন কেন?

১১–দলীয় ঐক্যের নেতাদের বক্তব্যে এর কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে। জোটের সূত্র বলছে, অলি আহমদকে প্রার্থী করার বিষয়ে জামায়াতের আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। অলি আহমদও এতে সম্মতি দিয়েছেন। এনসিপিসহ অন্য শরিকদের পক্ষ থেকেও তাঁর প্রার্থিতায় বড় কোনো আপত্তি ওঠেনি।

জামায়াতের সঙ্গে অলি আহমদের রাজনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান সমীকরণও এ সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিপরীতে অলি আহমাদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা।

জামায়াতের নেতৃত্বে কোনো রাজনৈতিক জোটে এমন একজন মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি দলটির জন্য আলাদা রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ১৯৭১ সালে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে বিএনপির সমালোচনার মুখে অলি আহমাদকে সামনে আনা দলটির জন্য একটি পাল্টা রাজনৈতিক বার্তা তৈরির সুযোগ করে দেয়।

এই কৌশলের প্রকাশ্য উদাহরণ দেখা গিয়েছিল গত ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় ১১–দলীয় ঐক্যের নির্বাচনী সমাবেশে। সেখানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান অলি আহমাদকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

এর পরই বিএনপির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। দলটির নেতা ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জামায়াতের ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলেছিলেন।

অর্থাৎ অলি আহমাদকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক বয়ানের সংঘাত নতুন নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করা সেই পুরোনো দ্বন্দ্বকে নতুন মঞ্চে নিয়ে এসেছে।

পুরোনো প্রতিশ্রুতিরও হিসাব

জামায়াত ও এনসিপির কয়েকটি সূত্রের দাবি, ১১–দলীয় ঐক্য সরকার গঠন করতে পারলে অলি আহমাদকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে এলডিপির পক্ষ থেকে প্রত্যাশা ছিল। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জামায়াতও তখন ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন। জোট সরকার গঠন করতে পারেনি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির সংখ্যাগত শক্তিও অনেক বেশি। ফলে অলি আহমাদকে প্রার্থী করা হচ্ছে এমন একটি নির্বাচনে, যেখানে পরাজয়ের সম্ভাবনাই প্রবল।

তবু জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পুরোনো প্রতিশ্রুতির রাজনৈতিক মূল্য ধরে রাখতে চাইছে বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা মনে করছেন। একই সঙ্গে সংসদীয় রাজনীতির ভেতরে বিরোধী জোট সক্রিয়—এমন একটি বার্তাও দিতে চায় তারা।

‘কর্নেল অলি কার্ড’ কেন গুরুত্বপূর্ণ

অলি আহমাদকে ঘিরে জামায়াতের রাজনৈতিক আগ্রহ নির্বাচনের আগেই স্পষ্ট হয়েছিল। তাঁকে ১১–দলীয় ঐক্যে রাখার বিষয়ে জামায়াতের আগ্রহ ছিল। এর পেছনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হিসাবও ছিল বলে জোটের একাধিক নেতা মনে করেন।

নির্বাচনের পরও অলি আহমাদ বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। গত ২৫ জুলাই সিলেটের এক সমাবেশে তিনি জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের রাজনৈতিক ঐক্যের সম্ভাবনার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই তিন নেতা এক হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে।

এ ধরনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, অলি আহমাদ এখন শুধু এলডিপির নেতা নন; বিরোধী জোটের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিএনপির ঘর থেকে বিরোধী শিবিরে

অলি আহমাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি তাঁর বিএনপি-অতীত।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা অলি আহমাদ। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বীরবিক্রম খেতাব পান।

জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। একই বছর উপনির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

১৯৯৬ সালের দুটি নির্বাচনেও বিএনপির হয়ে সংসদ সদস্য হন অলি আহমাদ। ওই বছরের প্রথম নির্বাচনের পর বিএনপির স্বল্পস্থায়ী সরকারে তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে তিনি মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।

এর কয়েক বছরের মধ্যেই বিএনপির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে।

২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় দল ছাড়েন অলি আহমাদ। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন নেতা বিএনপি থেকে বেরিয়ে এসে এলডিপি গঠন করেন। পরে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারাও এলডিপির সঙ্গে একীভূত হয়েছিল। তবে সেই ঐক্য স্থায়ী হয়নি। দুই নেতা আবার আলাদা রাজনৈতিক পথে হাঁটেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে অলি আহমাদ নিজের দল এলডিপির ‘ছাতা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন। ২০১২ সালে বিএনপির নেতৃত্বে ২০–দলীয় জোট গঠিত হলে এলডিপিও সেখানে যোগ দেয়।

২০১৮ সালের নির্বাচনেও অলি আহমাদ এলডিপির প্রতীকে নির্বাচন করেন। তবে তাঁর আসনে বিএনপিরও প্রার্থী ছিল। ২০২২ সালের শেষ দিকে বিএনপি ২০–দলীয় জোট ভেঙে দিলে অলি আহমাদের দল পরে বিএনপির সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়।

বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব, জামায়াতের সঙ্গে নতুন সমীকরণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এলডিপি বিএনপির কাছে ১৪টি আসন চেয়েছিল। প্রত্যাশিত সাড়া না পেয়ে অলি আহমাদ ২৪ ডিসেম্বর এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন। চার দিন পর, ২৮ ডিসেম্বর, তিনি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসে এর একটি পুরোনো প্রেক্ষাপটও রয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোট গঠনের বিষয়ে অলি আহমাদ অসন্তুষ্ট ছিলেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। দলীয় ফোরামেও তিনি এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে তাঁর সমর্থকেরা দাবি করতেন। সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বড় জয় পেলেও মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি অলি আহমাদ। জামায়াতের তৎকালীন দুই শীর্ষ নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন।

সময়ের সঙ্গে সেই রাজনৈতিক সমীকরণই উল্টে গেছে। একসময় যে জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন অলি আহমাদ, বহু বছর পর সেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হয়েই তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাঠে নামছেন।

এ কারণেই অলি আহমাদের প্রার্থিতা শুধু একটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট, পুরোনো সম্পর্ক, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিবর্তিত ক্ষমতার সমীকরণ—সবকিছুর একসঙ্গে প্রতিফলন। সংখ্যার বিচারে লড়াই অসম হলেও, রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

বিষয় : জামায়াতে ইসলামী কর্ণেল অলিআহমেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এলডিপি

কাল মহাকাল

সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬


রাষ্ট্রপতি ভোটের অসম লড়াইয়ে কেন লড়ছে জামায়াত

প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

প্রায় ৩৫ বছর পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। সংসদের সংখ্যার হিসাবে বিএনপির প্রার্থীকে হারানো কঠিন—বরং জয় প্রায় নিশ্চিত। এরপরও সেই লড়াইয়ে নামছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য। তাদের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম।

রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১–দলীয় ঐক্যের বৈঠক থেকে অলি আহমদের প্রার্থিতার ঘোষণা আসে। জোটের নেতাদের ভাষ্য, এটি শুধু একটি নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর পেছনে রয়েছে জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা, রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টা এবং দীর্ঘদিনের কিছু হিসাব।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমান সংসদে বিএনপির রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। বিপরীতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য ৯০ জন। ফলে ভোটের ফলাফল নিয়ে বিরোধী জোটের নেতারাও খুব বেশি আশাবাদী নন।

বাংলাদেশে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি সংসদীয় ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়ী হন। এবারের সংসদে বিএনপির আসনসংখ্যা তখনকার তুলনায় আরও বেশি। ফলে দলটির মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি হবেন—এমন হিসাবই রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে জোরালো।

জয়ের চেয়ে বড় হিসাব

প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে অলি আহমদকে প্রার্থী করার প্রয়োজন কেন?

১১–দলীয় ঐক্যের নেতাদের বক্তব্যে এর কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে। জোটের সূত্র বলছে, অলি আহমদকে প্রার্থী করার বিষয়ে জামায়াতের আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। অলি আহমদও এতে সম্মতি দিয়েছেন। এনসিপিসহ অন্য শরিকদের পক্ষ থেকেও তাঁর প্রার্থিতায় বড় কোনো আপত্তি ওঠেনি।

জামায়াতের সঙ্গে অলি আহমদের রাজনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান সমীকরণও এ সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিপরীতে অলি আহমাদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা।

জামায়াতের নেতৃত্বে কোনো রাজনৈতিক জোটে এমন একজন মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি দলটির জন্য আলাদা রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ১৯৭১ সালে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে বিএনপির সমালোচনার মুখে অলি আহমাদকে সামনে আনা দলটির জন্য একটি পাল্টা রাজনৈতিক বার্তা তৈরির সুযোগ করে দেয়।

এই কৌশলের প্রকাশ্য উদাহরণ দেখা গিয়েছিল গত ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় ১১–দলীয় ঐক্যের নির্বাচনী সমাবেশে। সেখানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান অলি আহমাদকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

এর পরই বিএনপির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। দলটির নেতা ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জামায়াতের ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলেছিলেন।

অর্থাৎ অলি আহমাদকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক বয়ানের সংঘাত নতুন নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করা সেই পুরোনো দ্বন্দ্বকে নতুন মঞ্চে নিয়ে এসেছে।

পুরোনো প্রতিশ্রুতিরও হিসাব

জামায়াত ও এনসিপির কয়েকটি সূত্রের দাবি, ১১–দলীয় ঐক্য সরকার গঠন করতে পারলে অলি আহমাদকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে এলডিপির পক্ষ থেকে প্রত্যাশা ছিল। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জামায়াতও তখন ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন। জোট সরকার গঠন করতে পারেনি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির সংখ্যাগত শক্তিও অনেক বেশি। ফলে অলি আহমাদকে প্রার্থী করা হচ্ছে এমন একটি নির্বাচনে, যেখানে পরাজয়ের সম্ভাবনাই প্রবল।

তবু জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পুরোনো প্রতিশ্রুতির রাজনৈতিক মূল্য ধরে রাখতে চাইছে বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা মনে করছেন। একই সঙ্গে সংসদীয় রাজনীতির ভেতরে বিরোধী জোট সক্রিয়—এমন একটি বার্তাও দিতে চায় তারা।

‘কর্নেল অলি কার্ড’ কেন গুরুত্বপূর্ণ

অলি আহমাদকে ঘিরে জামায়াতের রাজনৈতিক আগ্রহ নির্বাচনের আগেই স্পষ্ট হয়েছিল। তাঁকে ১১–দলীয় ঐক্যে রাখার বিষয়ে জামায়াতের আগ্রহ ছিল। এর পেছনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হিসাবও ছিল বলে জোটের একাধিক নেতা মনে করেন।

নির্বাচনের পরও অলি আহমাদ বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। গত ২৫ জুলাই সিলেটের এক সমাবেশে তিনি জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের রাজনৈতিক ঐক্যের সম্ভাবনার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই তিন নেতা এক হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে।

এ ধরনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, অলি আহমাদ এখন শুধু এলডিপির নেতা নন; বিরোধী জোটের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিএনপির ঘর থেকে বিরোধী শিবিরে

অলি আহমাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি তাঁর বিএনপি-অতীত।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা অলি আহমাদ। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বীরবিক্রম খেতাব পান।

জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। একই বছর উপনির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

১৯৯৬ সালের দুটি নির্বাচনেও বিএনপির হয়ে সংসদ সদস্য হন অলি আহমাদ। ওই বছরের প্রথম নির্বাচনের পর বিএনপির স্বল্পস্থায়ী সরকারে তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে তিনি মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।

এর কয়েক বছরের মধ্যেই বিএনপির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে।

২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় দল ছাড়েন অলি আহমাদ। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন নেতা বিএনপি থেকে বেরিয়ে এসে এলডিপি গঠন করেন। পরে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারাও এলডিপির সঙ্গে একীভূত হয়েছিল। তবে সেই ঐক্য স্থায়ী হয়নি। দুই নেতা আবার আলাদা রাজনৈতিক পথে হাঁটেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে অলি আহমাদ নিজের দল এলডিপির ‘ছাতা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন। ২০১২ সালে বিএনপির নেতৃত্বে ২০–দলীয় জোট গঠিত হলে এলডিপিও সেখানে যোগ দেয়।

২০১৮ সালের নির্বাচনেও অলি আহমাদ এলডিপির প্রতীকে নির্বাচন করেন। তবে তাঁর আসনে বিএনপিরও প্রার্থী ছিল। ২০২২ সালের শেষ দিকে বিএনপি ২০–দলীয় জোট ভেঙে দিলে অলি আহমাদের দল পরে বিএনপির সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়।

বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব, জামায়াতের সঙ্গে নতুন সমীকরণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এলডিপি বিএনপির কাছে ১৪টি আসন চেয়েছিল। প্রত্যাশিত সাড়া না পেয়ে অলি আহমাদ ২৪ ডিসেম্বর এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন। চার দিন পর, ২৮ ডিসেম্বর, তিনি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসে এর একটি পুরোনো প্রেক্ষাপটও রয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোট গঠনের বিষয়ে অলি আহমাদ অসন্তুষ্ট ছিলেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। দলীয় ফোরামেও তিনি এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে তাঁর সমর্থকেরা দাবি করতেন। সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বড় জয় পেলেও মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি অলি আহমাদ। জামায়াতের তৎকালীন দুই শীর্ষ নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন।

সময়ের সঙ্গে সেই রাজনৈতিক সমীকরণই উল্টে গেছে। একসময় যে জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন অলি আহমাদ, বহু বছর পর সেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হয়েই তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাঠে নামছেন।

এ কারণেই অলি আহমাদের প্রার্থিতা শুধু একটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট, পুরোনো সম্পর্ক, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিবর্তিত ক্ষমতার সমীকরণ—সবকিছুর একসঙ্গে প্রতিফলন। সংখ্যার বিচারে লড়াই অসম হলেও, রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত