রাজনীতিরাজনীতি

‘বিমস্টেক চেয়ার’ হয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন কি ?

সেপ্টেম্বরের দিল্লি সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে আমন্ত্রণ পেলেও ‘বিমস্টেক চেয়ার’ হিসেবে সম্বোধন নিয়ে আপত্তি ঢাকার। শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন উত্তেজনায় প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

আদিল আজাদ
আদিল আজাদ
‘বিমস্টেক চেয়ার’ হয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন কি ?
ছবি -সংগৃহীত

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও আমন্ত্রণপত্রের ভাষা ও সম্বোধন নিয়ে সরকারি পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কূটনৈতিক সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, কেবল বিমস্টেকের চেয়ার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের আমন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রচলিত রীতির সঙ্গে এ সম্বোধনের পার্থক্য নিয়েই মূলত আপত্তি তৈরি হয়েছে।

ঢাকার দৃষ্টিতে, বিমস্টেকের চেয়ার হওয়া প্রধানমন্ত্রীর একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। কিন্তু তাঁর রাষ্ট্রীয় পদবি এর চেয়ে আলাদা ও মৌলিক পরিচয়। ফলে শুধু বিমস্টেকের চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি নিছক আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এর পেছনে কূটনৈতিক বার্তা রয়েছে—এ নিয়ে আলোচনা চলছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই দেশের সাম্প্রতিক সম্পর্কের উত্তাপ। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশের পর শুক্রবার ভারত সরকার জানায়, শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে তারা একমত বা সমর্থন করে না।

তবে এতে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে—এমনটা মনে করছেন না কূটনীতিকেরা। বরং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, দিল্লি বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে কোন মাত্রায় অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর বৈঠককে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্ভাব্য সৌজন্য সাক্ষাতের আগে এ বৈঠকটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক প্রস্তুতি।

ভারতের নতুন হাই কমিশনারের নিয়োগ নিয়েও আলাদা তাৎপর্য দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, দিনেশ ত্রিবেদীর পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় থেকে আসা একজন প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়া দিল্লির পক্ষ থেকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বিশেষ বার্তা হতে পারে। তবে সেই বার্তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়গুলো কীভাবে সামলানো হয় তার ওপর।

ঢাকার অবস্থানও এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট। একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলা এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্য কোনো পক্ষকে ব্যবহার করে কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া—দুটি বিষয় একই সঙ্গে চলতে পারে না। সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে সরাসরি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ অবশ্য নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ এ ধরনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে আসছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনেও বাংলাদেশ আমন্ত্রিত ছিল। ২০২৫ সালের শুরুতে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

তাই এবারের মূল বিষয় আমন্ত্রণ পাওয়া নয়; বরং কীভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলো এবং কোন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা দেওয়া হলো—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরে দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সরকারি পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো না হলেও, বর্তমান কূটনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর সফর অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে না গেলেও ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বা ভবিষ্যতে সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে—এমন আশঙ্কা কূটনৈতিক মহলে নেই। বাংলাদেশের জন্য বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে দিল্লির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার বাইরে নিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন করে সাজানো।

বিষয় : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলন

কাল মহাকাল

রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬


‘বিমস্টেক চেয়ার’ হয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন কি ?

প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও আমন্ত্রণপত্রের ভাষা ও সম্বোধন নিয়ে সরকারি পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কূটনৈতিক সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, কেবল বিমস্টেকের চেয়ার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের আমন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রচলিত রীতির সঙ্গে এ সম্বোধনের পার্থক্য নিয়েই মূলত আপত্তি তৈরি হয়েছে।

ঢাকার দৃষ্টিতে, বিমস্টেকের চেয়ার হওয়া প্রধানমন্ত্রীর একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। কিন্তু তাঁর রাষ্ট্রীয় পদবি এর চেয়ে আলাদা ও মৌলিক পরিচয়। ফলে শুধু বিমস্টেকের চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি নিছক আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এর পেছনে কূটনৈতিক বার্তা রয়েছে—এ নিয়ে আলোচনা চলছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই দেশের সাম্প্রতিক সম্পর্কের উত্তাপ। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশের পর শুক্রবার ভারত সরকার জানায়, শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে তারা একমত বা সমর্থন করে না।

তবে এতে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে—এমনটা মনে করছেন না কূটনীতিকেরা। বরং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, দিল্লি বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে কোন মাত্রায় অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর বৈঠককে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্ভাব্য সৌজন্য সাক্ষাতের আগে এ বৈঠকটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক প্রস্তুতি।

ভারতের নতুন হাই কমিশনারের নিয়োগ নিয়েও আলাদা তাৎপর্য দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, দিনেশ ত্রিবেদীর পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় থেকে আসা একজন প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়া দিল্লির পক্ষ থেকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বিশেষ বার্তা হতে পারে। তবে সেই বার্তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়গুলো কীভাবে সামলানো হয় তার ওপর।

ঢাকার অবস্থানও এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট। একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলা এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্য কোনো পক্ষকে ব্যবহার করে কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া—দুটি বিষয় একই সঙ্গে চলতে পারে না। সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে সরাসরি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ অবশ্য নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ এ ধরনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে আসছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনেও বাংলাদেশ আমন্ত্রিত ছিল। ২০২৫ সালের শুরুতে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

তাই এবারের মূল বিষয় আমন্ত্রণ পাওয়া নয়; বরং কীভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলো এবং কোন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা দেওয়া হলো—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরে দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সরকারি পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো না হলেও, বর্তমান কূটনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর সফর অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে না গেলেও ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বা ভবিষ্যতে সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে—এমন আশঙ্কা কূটনৈতিক মহলে নেই। বাংলাদেশের জন্য বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে দিল্লির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার বাইরে নিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন করে সাজানো।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত