জাতীয়জাতীয়

বেসরকারি আধিপত্যে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা অবহেলিত

বিটুমিন উৎপাদন থেকে শুরু করে জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ছে। নীতিগত পরিবর্তনের ফলে প্রতিযোগিতা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে নতুন প্রশ্ন।

অমিত হাসান রানা
অমিত হাসান রানা
 বেসরকারি আধিপত্যে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা অবহেলিত
ছবি -সংগৃহীত

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষ করে বিটুমিন উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিপণনে বড় কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অতিরিক্ত বেড়ে গেলে এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব কী হতে পারে—এ প্রশ্ন এখন সামনে আসছে।

২০১৬ সালের ১৫ জুন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (বিওজিসিএল) দেশের প্রথম বেসরকারি বিটুমিন প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমতি পায়। প্রায় চার বছর পর ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্ল্যান্টটির বাণিজ্যিক উদ্বোধন করা হয়।

দেশে উৎপাদনের পক্ষে তখন যুক্তি ছিল—বিদেশ থেকে আমদানি করা বিটুমিনের মান সব সময় বাংলাদেশের আবহাওয়া ও সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং সড়ক নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পাওয়া যাবে।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিটুমিনের বাজারে শুল্কনীতি ও আমদানি-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার যুক্তিতে আমদানিকৃত বিটুমিনের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ও কর আরোপ করা হয়। সংশ্লিষ্ট নীতিতে ড্রামজাত বিটুমিনের ক্ষেত্রে প্রায় ৪৭ শতাংশ এবং বাল্ক বিটুমিনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক ও করের কথা বলা হয়।

এর পাশাপাশি আমদানি করা প্রতিটি চালানের মান পরীক্ষা বুয়েট বা ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে করার বিধান যুক্ত হয়। আমদানিকারকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ব্যয় এবং পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিদেশি বিটুমিন আমদানি কঠিন হয়ে পড়ে।

বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেলে এর প্রভাব পড়ে দামের ওপরও। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি টন বিটুমিনের দাম প্রায় ৩৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫৬ হাজার থেকে ৫৯ হাজার টাকায় ওঠে। এতে নির্মাণ ব্যয় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার দাবি করা হয়।

ফলে দেশের বিটুমিনের বাজারে বসুন্ধরার অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিভিন্ন সময়ের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিটুমিন চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি তাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার দাবি রয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। বিটুমিন উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপজাত জ্বালানি। ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াজাত করার সময় ন্যাপথা, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যবস্থায় এসব জ্বালানি বিপণনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে ২০২১ সালে বসুন্ধরা তাদের উৎপাদিত উপজাত জ্বালানি সরাসরি বাজারে বিক্রির অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে আবেদন করে।

প্রথমদিকে এ বিষয়ে আপত্তিও জানানো হয়েছিল। ২০২১ সালের আগস্টে জ্বালানি বিভাগ থেকে জানানো হয়, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিপিসি ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় বাজারে জ্বালানি আমদানি বা সরাসরি বিতরণের সুযোগ নেই।

এরপর বিষয়টি রাজনৈতিক পর্যায়েও যায়। ২০২২ সালের ৩১ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর কাছে বসুন্ধরার পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়।

পরবর্তী সময়ে নীতিগত অবস্থানে পরিবর্তন আসে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সরকার সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় সংশোধন আনে। এরপর ২০২৪ সালের জুনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নতুন নীতিমালা জারি করে।

সেখানে বলা হয়, কোনো বেসরকারি রিফাইনারি বা প্ল্যান্ট তাদের উৎপাদিত জ্বালানির সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ প্রথম তিন বছর নিজস্ব ডিস্ট্রিবিউশন চেইনের মাধ্যমে সরাসরি বাজারে বিক্রি করতে পারবে। বাকি ৬০ শতাংশ বিপিসির কাছে বিক্রির বিধান রাখা হয়।

এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল সরাসরি পাম্প ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়।

এখন আলোচনার কেন্দ্রে আরও বড় প্রশ্ন—পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজারজাতকরণে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ানো হবে?

বাংলাদেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ টন। পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাত ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই বাজারে কোনো একটি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তার প্রভাব শুধু ব্যবসায়িক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বিশেষ করে সংকটের সময় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার বড় চাপের সময় বেসরকারি আমদানিকারকরা কীভাবে সরবরাহ অব্যাহত রাখবে—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

কারণ জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সবচেয়ে আগে চাপ পড়বে পরিবহন ও কৃষিতে। ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থা ব্যাহত হলে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। পরিবহন খাত স্থবির হলে সরবরাহব্যবস্থা ও নিত্যপণ্যের বাজারেও তার প্রভাব পড়বে।

এ কারণে জ্বালানি বাজারে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, মজুত সক্ষমতা এবং সংকটকালীন সরবরাহের নিশ্চয়তা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এখানে এলপিজি বাজারের অভিজ্ঞতাও আলোচনায় আসছে। গৃহস্থালি জ্বালানির এই বাজারে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর আধিপত্য বাড়ার পর দাম নির্ধারণ ও বাস্তব বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে নিয়মিত অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মূল্য নির্ধারণ করলেও নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি পাওয়া যায় না—এমন অভিযোগও রয়েছে।

এই অভিজ্ঞতার আলোকে ডিজেল, পেট্রোল ও অন্যান্য প্রধান জ্বালানি পণ্যের বাজার বেসরকারি খাতে আরও উন্মুক্ত করার আগে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—জ্বালানি নিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের সীমা কোথায় নির্ধারণ করা হবে?

বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর নামে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়, যাতে ভবিষ্যতে সরবরাহ, মূল্য বা আমদানির ক্ষেত্রে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়। একইভাবে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে প্রতিযোগিতা কমে গেলে ভোক্তা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর তার খরচও বিবেচনায় নিতে হবে।

তাই জ্বালানি খাতের নতুন নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি—বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার প্রতিযোগিতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে চূড়ান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র।

বিষয় : জ্বালানি নিরাপত্তা বসুন্ধরা গ্রুপ

কাল মহাকাল

রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬


বেসরকারি আধিপত্যে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা অবহেলিত

প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষ করে বিটুমিন উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিপণনে বড় কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অতিরিক্ত বেড়ে গেলে এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব কী হতে পারে—এ প্রশ্ন এখন সামনে আসছে।

২০১৬ সালের ১৫ জুন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (বিওজিসিএল) দেশের প্রথম বেসরকারি বিটুমিন প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমতি পায়। প্রায় চার বছর পর ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্ল্যান্টটির বাণিজ্যিক উদ্বোধন করা হয়।

দেশে উৎপাদনের পক্ষে তখন যুক্তি ছিল—বিদেশ থেকে আমদানি করা বিটুমিনের মান সব সময় বাংলাদেশের আবহাওয়া ও সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং সড়ক নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পাওয়া যাবে।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিটুমিনের বাজারে শুল্কনীতি ও আমদানি-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার যুক্তিতে আমদানিকৃত বিটুমিনের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ও কর আরোপ করা হয়। সংশ্লিষ্ট নীতিতে ড্রামজাত বিটুমিনের ক্ষেত্রে প্রায় ৪৭ শতাংশ এবং বাল্ক বিটুমিনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক ও করের কথা বলা হয়।

এর পাশাপাশি আমদানি করা প্রতিটি চালানের মান পরীক্ষা বুয়েট বা ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে করার বিধান যুক্ত হয়। আমদানিকারকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ব্যয় এবং পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিদেশি বিটুমিন আমদানি কঠিন হয়ে পড়ে।

বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেলে এর প্রভাব পড়ে দামের ওপরও। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি টন বিটুমিনের দাম প্রায় ৩৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫৬ হাজার থেকে ৫৯ হাজার টাকায় ওঠে। এতে নির্মাণ ব্যয় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার দাবি করা হয়।

ফলে দেশের বিটুমিনের বাজারে বসুন্ধরার অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিভিন্ন সময়ের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিটুমিন চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি তাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার দাবি রয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। বিটুমিন উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপজাত জ্বালানি। ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াজাত করার সময় ন্যাপথা, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যবস্থায় এসব জ্বালানি বিপণনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে ২০২১ সালে বসুন্ধরা তাদের উৎপাদিত উপজাত জ্বালানি সরাসরি বাজারে বিক্রির অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে আবেদন করে।

প্রথমদিকে এ বিষয়ে আপত্তিও জানানো হয়েছিল। ২০২১ সালের আগস্টে জ্বালানি বিভাগ থেকে জানানো হয়, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিপিসি ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় বাজারে জ্বালানি আমদানি বা সরাসরি বিতরণের সুযোগ নেই।

এরপর বিষয়টি রাজনৈতিক পর্যায়েও যায়। ২০২২ সালের ৩১ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর কাছে বসুন্ধরার পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়।

পরবর্তী সময়ে নীতিগত অবস্থানে পরিবর্তন আসে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সরকার সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় সংশোধন আনে। এরপর ২০২৪ সালের জুনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নতুন নীতিমালা জারি করে।

সেখানে বলা হয়, কোনো বেসরকারি রিফাইনারি বা প্ল্যান্ট তাদের উৎপাদিত জ্বালানির সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ প্রথম তিন বছর নিজস্ব ডিস্ট্রিবিউশন চেইনের মাধ্যমে সরাসরি বাজারে বিক্রি করতে পারবে। বাকি ৬০ শতাংশ বিপিসির কাছে বিক্রির বিধান রাখা হয়।

এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল সরাসরি পাম্প ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়।

এখন আলোচনার কেন্দ্রে আরও বড় প্রশ্ন—পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজারজাতকরণে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ানো হবে?

বাংলাদেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ টন। পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাত ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই বাজারে কোনো একটি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তার প্রভাব শুধু ব্যবসায়িক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বিশেষ করে সংকটের সময় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার বড় চাপের সময় বেসরকারি আমদানিকারকরা কীভাবে সরবরাহ অব্যাহত রাখবে—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

কারণ জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সবচেয়ে আগে চাপ পড়বে পরিবহন ও কৃষিতে। ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থা ব্যাহত হলে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। পরিবহন খাত স্থবির হলে সরবরাহব্যবস্থা ও নিত্যপণ্যের বাজারেও তার প্রভাব পড়বে।

এ কারণে জ্বালানি বাজারে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, মজুত সক্ষমতা এবং সংকটকালীন সরবরাহের নিশ্চয়তা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এখানে এলপিজি বাজারের অভিজ্ঞতাও আলোচনায় আসছে। গৃহস্থালি জ্বালানির এই বাজারে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর আধিপত্য বাড়ার পর দাম নির্ধারণ ও বাস্তব বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে নিয়মিত অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মূল্য নির্ধারণ করলেও নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি পাওয়া যায় না—এমন অভিযোগও রয়েছে।

এই অভিজ্ঞতার আলোকে ডিজেল, পেট্রোল ও অন্যান্য প্রধান জ্বালানি পণ্যের বাজার বেসরকারি খাতে আরও উন্মুক্ত করার আগে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—জ্বালানি নিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের সীমা কোথায় নির্ধারণ করা হবে?

বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর নামে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়, যাতে ভবিষ্যতে সরবরাহ, মূল্য বা আমদানির ক্ষেত্রে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়। একইভাবে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে প্রতিযোগিতা কমে গেলে ভোক্তা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর তার খরচও বিবেচনায় নিতে হবে।

তাই জ্বালানি খাতের নতুন নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি—বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার প্রতিযোগিতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে চূড়ান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত