আন্তর্জাতিক
মধ্যপ্রাচ্যের বদলে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন এক সমীকরণের সূচনা করল সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। শুক্রবার মক্কায় তিন দেশ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, অংশীদার তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তিতে সই করেন। কয়েক মাসের আলোচনার পর স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে ইতিমধ্যে অনেকে ন্যাটোর ধাঁচের একটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ এবং সামরিক প্রতিক্রিয়ার ধরন এখনো পরিষ্কার নয়।
ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা যৌথ প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসে। মক্কা চুক্তিতে তিন দেশের ওপর হামলাকে অভিন্ন হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হলেও আক্রান্ত কোনো দেশের পক্ষে অন্য দুই দেশ বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক অভিযান চালাবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি এখনো সামনে আসেনি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি
চুক্তিটির গুরুত্ব শুধু তিন দেশের সামরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত বদলে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়েছে, মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করেও আঞ্চলিক হামলা ঠেকানো সব সময় সম্ভব হচ্ছে না।
এই বাস্তবতায় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিকল্প অংশীদার খুঁজছে আরব দেশগুলো। মক্কা চুক্তিকে সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টারই একটি অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগেরের মতে, তিন দেশের এই কাঠামো তাদের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির পথও কিছুটা প্রশস্ত হতে পারে।
তিন দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সমন্বয়ও চুক্তিটিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ এবং বিপুল আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে।
অর্থাৎ তিন দেশের হাতে রয়েছে তিন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি—পারমাণবিক সক্ষমতা, সামরিক ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ।
‘ইসলামিক ন্যাটো’ কতটা বাস্তব
চুক্তির পরপরই এটিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলার আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এখনই এমন সিদ্ধান্তে যেতে রাজি নন।
নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ মুদাসসির কামারের মতে, এই চুক্তিকে এখনই নতুন কোনো নিরাপত্তা ব্লক বা বড় ধরনের সামরিক মেরুকরণের সূচনা হিসেবে দেখার কারণ নেই।
তাঁর যুক্তি, এর আগেও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবে তিন দেশ কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর।
চুক্তির পেছনে সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্ক
মক্কা চুক্তি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি এবং পাকিস্তান-তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের ওপর।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। পাকিস্তানের কয়েক হাজার সেনা বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছে। দেশটিতে পাকিস্তানের ১৬টি যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং চীনে তৈরি একটি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও মোতায়েন রয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে তুরস্কের তৈরি ড্রোনসহ বিভিন্ন অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে। গত বছর ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সংঘর্ষের সময় এসব ব্যবস্থার কিছু অংশ ব্যবহারের কথাও সামনে আসে।
ফলে নতুন চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যমান সামরিক সম্পর্ককে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামোয় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে নতুন উদ্বেগ
মক্কা চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরান। উপসাগরীয় নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা তেহরান এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজাই চুক্তিটিকে ‘কাগজের চুক্তি’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়েও কটাক্ষ ছিল।
তবে ইরানের উদ্বেগের জায়গাটি শুধু সৌদি আরব নয়। তুরস্কও ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশল নিয়ে সতর্ক। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আঙ্কারার উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানও মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূমিকা তৈরির চেষ্টা করছে। ফলে তিন দেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ এক জায়গায় মিলেছে।
ভারতের নজরও মক্কার দিকে
মক্কা চুক্তির দিকে সতর্ক নজর রাখছে ভারত। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং তুরস্কের ইসলামাবাদপন্থী অবস্থানের কারণে নয়াদিল্লির জন্য এই নতুন সামরিক সমীকরণ গুরুত্বহীন নয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, নয়াদিল্লি বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে মুহাম্মদ মুদাসসির কামারের মতে, এই চুক্তি আপাতত ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সম্পর্ক বা প্রতিরক্ষা সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে না। কিন্তু আগামী কয়েক বছরে আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব আরও জটিল হতে পারে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক এই পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্য তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক জোটের জন্ম দিয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আঞ্চলিক নিরাপত্তায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মধ্যে নতুন অংশীদারত্ব গড়ার প্রবণতা জোরালো হচ্ছে। আর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই সমঝোতা সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বিষয় : মক্কা চুক্তি ইসলামিক ন্যাটো
2.png)
রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের বদলে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন এক সমীকরণের সূচনা করল সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। শুক্রবার মক্কায় তিন দেশ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, অংশীদার তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তিতে সই করেন। কয়েক মাসের আলোচনার পর স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে ইতিমধ্যে অনেকে ন্যাটোর ধাঁচের একটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ এবং সামরিক প্রতিক্রিয়ার ধরন এখনো পরিষ্কার নয়।
ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা যৌথ প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসে। মক্কা চুক্তিতে তিন দেশের ওপর হামলাকে অভিন্ন হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হলেও আক্রান্ত কোনো দেশের পক্ষে অন্য দুই দেশ বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক অভিযান চালাবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি এখনো সামনে আসেনি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি
চুক্তিটির গুরুত্ব শুধু তিন দেশের সামরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত বদলে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়েছে, মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করেও আঞ্চলিক হামলা ঠেকানো সব সময় সম্ভব হচ্ছে না।
এই বাস্তবতায় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিকল্প অংশীদার খুঁজছে আরব দেশগুলো। মক্কা চুক্তিকে সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টারই একটি অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগেরের মতে, তিন দেশের এই কাঠামো তাদের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির পথও কিছুটা প্রশস্ত হতে পারে।
তিন দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সমন্বয়ও চুক্তিটিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ এবং বিপুল আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে।
অর্থাৎ তিন দেশের হাতে রয়েছে তিন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি—পারমাণবিক সক্ষমতা, সামরিক ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ।
‘ইসলামিক ন্যাটো’ কতটা বাস্তব
চুক্তির পরপরই এটিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলার আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এখনই এমন সিদ্ধান্তে যেতে রাজি নন।
নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ মুদাসসির কামারের মতে, এই চুক্তিকে এখনই নতুন কোনো নিরাপত্তা ব্লক বা বড় ধরনের সামরিক মেরুকরণের সূচনা হিসেবে দেখার কারণ নেই।
তাঁর যুক্তি, এর আগেও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবে তিন দেশ কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর।
চুক্তির পেছনে সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্ক
মক্কা চুক্তি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি এবং পাকিস্তান-তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের ওপর।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। পাকিস্তানের কয়েক হাজার সেনা বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছে। দেশটিতে পাকিস্তানের ১৬টি যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং চীনে তৈরি একটি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও মোতায়েন রয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে তুরস্কের তৈরি ড্রোনসহ বিভিন্ন অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে। গত বছর ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সংঘর্ষের সময় এসব ব্যবস্থার কিছু অংশ ব্যবহারের কথাও সামনে আসে।
ফলে নতুন চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যমান সামরিক সম্পর্ককে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামোয় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে নতুন উদ্বেগ
মক্কা চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরান। উপসাগরীয় নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা তেহরান এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজাই চুক্তিটিকে ‘কাগজের চুক্তি’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়েও কটাক্ষ ছিল।
তবে ইরানের উদ্বেগের জায়গাটি শুধু সৌদি আরব নয়। তুরস্কও ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশল নিয়ে সতর্ক। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আঙ্কারার উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানও মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূমিকা তৈরির চেষ্টা করছে। ফলে তিন দেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ এক জায়গায় মিলেছে।
ভারতের নজরও মক্কার দিকে
মক্কা চুক্তির দিকে সতর্ক নজর রাখছে ভারত। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং তুরস্কের ইসলামাবাদপন্থী অবস্থানের কারণে নয়াদিল্লির জন্য এই নতুন সামরিক সমীকরণ গুরুত্বহীন নয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, নয়াদিল্লি বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে মুহাম্মদ মুদাসসির কামারের মতে, এই চুক্তি আপাতত ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সম্পর্ক বা প্রতিরক্ষা সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে না। কিন্তু আগামী কয়েক বছরে আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব আরও জটিল হতে পারে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক এই পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্য তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক জোটের জন্ম দিয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আঞ্চলিক নিরাপত্তায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মধ্যে নতুন অংশীদারত্ব গড়ার প্রবণতা জোরালো হচ্ছে। আর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই সমঝোতা সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
2.png)