রাজনীতিরাজনীতি

ক্ষমতার পতনের আগেই নিরাপদে সরে যান শেখ পরিবারের সদস্যরা -পর্ব ৩

শেখ সেলিম, শেখ হেলাল, সাদিক আবদুল্লাহ, নিক্সন চৌধুরীসহ অন্য স্বজনদের দেশত্যাগ, গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া।

ক্ষমতার পতনের আগেই নিরাপদে সরে যান শেখ পরিবারের সদস্যরা -পর্ব ৩
ছবি -সংগৃহীত

পর্ব-২ পড়তে ক্লিক করুন

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শুধু কেন্দ্রীয় নেতাদের নয়, তাঁর পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অবস্থান নিয়েও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে, সরকার পতনের পর শেখ পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য দ্রুত দেশ ছেড়ে চলে যান। অন্যদিকে দলের অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন, কেউ আত্মগোপনে যান, আবার অনেকে মামলার মুখে পড়েন। তাঁদের বড় একটি অংশের পক্ষে দেশ ছাড়া সম্ভব হয়নি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম সরকার পতনের সময় দেশে ছিলেন। পরে কয়েক সপ্তাহ আত্মগোপনে থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে যান বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে তিনি কলকাতায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

তাঁর ছেলে ও যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলে নাঈমও ভারতে চলে যান। যুবলীগের কয়েকজন নেতার দাবি, তিনি বিদেশে থাকলেও নিয়মিত নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। শেখ সেলিমের আরেক ছেলে, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম সরকার পতনের আগেই দেশ ছেড়েছিলেন বলে আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন।

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহও সরকার পতনের আগেই ভারতে চলে যান। দীর্ঘদিন তিনি বরিশালের রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভারতে তাঁর একটি মেয়ের পরিবার রয়েছে। সেখানে তাঁর ব্যবসা ও অন্যান্য সম্পদও আছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। তাঁর ছেলে আশিক আবদুল্লাহও বাবার সঙ্গে দেশ ছাড়েন।

আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর বড় ছেলে ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বরিশালে সক্রিয় ছিলেন। পরে তিনি ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। সরকার পতনের পর বিক্ষুব্ধ জনতা বরিশালে তাঁর বাড়িতে আগুন দেয়।

শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই আবুল খায়ের আবদুল্লাহ, যিনি তখন বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন, সরকার পরিবর্তনের পর তিনিও ভারতে চলে যান বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলও প্রথমে দেশে ছিলেন। পরে তাঁরা ভারতে চলে যান। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁরা কলকাতার নিউ টাউন এলাকায় বসবাস করছেন। শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময়ও ভারতে আছেন। শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের স্ত্রী শাহানা ইয়াসমিন শম্পাও তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁকে প্রায়ই গণভবনে শেখ হাসিনার পাশে দেখা যেত।

শেখ হেলালের আরেক ভাই শেখ সোহেল, যিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ছিলেন, সরকার পতনের পর আত্মগোপনে যান। তবে এখন তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী, যিনি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ছিলেন, এবং তাঁর ভাই সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী) সরকার পতনের পর আত্মগোপনে যান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁরাও বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শেখ পরিবারের অনেক সদস্য সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। কেউ আবার সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত ব্যবহার করে দেশ ছাড়েন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাঁদের দেশত্যাগ সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে শেখ পরিবারের সদস্যরা দেশ ছাড়তে পারলেও আওয়ামী লীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, দীপু মনি, কামরুল ইসলাম, আহমদ হোসেন ও আবদুস সোবহান গোলাপ। এ ছাড়া শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকসহ আরও অনেকে কারাগারে আছেন। কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী কারাগারে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

এসব ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেও অসন্তোষ রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। অনেক নেতা-কর্মীর অভিযোগ, ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বেশির ভাগই নিরাপদে দেশ ছাড়তে পেরেছেন। কিন্তু সাধারণ নেতা-কর্মীদের বড় অংশ গ্রেপ্তার, মামলা ও আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন।

রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে পারিবারিক প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর মতে, সেই সময় ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে থাকা স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন। সরকার পতনের পরও সেই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিরাপদে দেশ ছাড়লেও দলের সাধারণ নেতা-কর্মীদের অনেকেই সেই সুযোগ পাননি।

কাল মহাকাল

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬


ক্ষমতার পতনের আগেই নিরাপদে সরে যান শেখ পরিবারের সদস্যরা -পর্ব ৩

প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

পর্ব-২ পড়তে ক্লিক করুন

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শুধু কেন্দ্রীয় নেতাদের নয়, তাঁর পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অবস্থান নিয়েও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে, সরকার পতনের পর শেখ পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য দ্রুত দেশ ছেড়ে চলে যান। অন্যদিকে দলের অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন, কেউ আত্মগোপনে যান, আবার অনেকে মামলার মুখে পড়েন। তাঁদের বড় একটি অংশের পক্ষে দেশ ছাড়া সম্ভব হয়নি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম সরকার পতনের সময় দেশে ছিলেন। পরে কয়েক সপ্তাহ আত্মগোপনে থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে যান বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে তিনি কলকাতায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

তাঁর ছেলে ও যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলে নাঈমও ভারতে চলে যান। যুবলীগের কয়েকজন নেতার দাবি, তিনি বিদেশে থাকলেও নিয়মিত নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। শেখ সেলিমের আরেক ছেলে, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম সরকার পতনের আগেই দেশ ছেড়েছিলেন বলে আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন।

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহও সরকার পতনের আগেই ভারতে চলে যান। দীর্ঘদিন তিনি বরিশালের রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভারতে তাঁর একটি মেয়ের পরিবার রয়েছে। সেখানে তাঁর ব্যবসা ও অন্যান্য সম্পদও আছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। তাঁর ছেলে আশিক আবদুল্লাহও বাবার সঙ্গে দেশ ছাড়েন।

আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর বড় ছেলে ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বরিশালে সক্রিয় ছিলেন। পরে তিনি ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। সরকার পতনের পর বিক্ষুব্ধ জনতা বরিশালে তাঁর বাড়িতে আগুন দেয়।

শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই আবুল খায়ের আবদুল্লাহ, যিনি তখন বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন, সরকার পরিবর্তনের পর তিনিও ভারতে চলে যান বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলও প্রথমে দেশে ছিলেন। পরে তাঁরা ভারতে চলে যান। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁরা কলকাতার নিউ টাউন এলাকায় বসবাস করছেন। শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময়ও ভারতে আছেন। শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের স্ত্রী শাহানা ইয়াসমিন শম্পাও তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁকে প্রায়ই গণভবনে শেখ হাসিনার পাশে দেখা যেত।

শেখ হেলালের আরেক ভাই শেখ সোহেল, যিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ছিলেন, সরকার পতনের পর আত্মগোপনে যান। তবে এখন তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী, যিনি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ছিলেন, এবং তাঁর ভাই সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী) সরকার পতনের পর আত্মগোপনে যান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁরাও বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শেখ পরিবারের অনেক সদস্য সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। কেউ আবার সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত ব্যবহার করে দেশ ছাড়েন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাঁদের দেশত্যাগ সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে শেখ পরিবারের সদস্যরা দেশ ছাড়তে পারলেও আওয়ামী লীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, দীপু মনি, কামরুল ইসলাম, আহমদ হোসেন ও আবদুস সোবহান গোলাপ। এ ছাড়া শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকসহ আরও অনেকে কারাগারে আছেন। কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী কারাগারে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

এসব ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেও অসন্তোষ রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। অনেক নেতা-কর্মীর অভিযোগ, ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বেশির ভাগই নিরাপদে দেশ ছাড়তে পেরেছেন। কিন্তু সাধারণ নেতা-কর্মীদের বড় অংশ গ্রেপ্তার, মামলা ও আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন।

রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে পারিবারিক প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর মতে, সেই সময় ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে থাকা স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন। সরকার পতনের পরও সেই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিরাপদে দেশ ছাড়লেও দলের সাধারণ নেতা-কর্মীদের অনেকেই সেই সুযোগ পাননি।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত