খেলাখেলা

বিশ্বকাপে মেসিকে বোমায় উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি

ফাঁস হওয়া এফবিআইয়ের নিরাপত্তা নথিতে মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে ও রেফারিদের ঘিরে একের পর এক হুমকির তথ্য উঠে এসেছে। মিসরের বিপক্ষে ম্যাচে স্টেডিয়ামে বোমা থাকার খবরও পেয়েছিল পুলিশ।

সামি জামান
সামি জামান
বিশ্বকাপে মেসিকে বোমায় উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি
ছবি -সংগৃহীত

বিশ্বকাপের মাঠে তখন ফুটবলের উত্তেজনা তুঙ্গে। গ্যালারিতে লাখো দর্শকের উল্লাস, তারকাদের লড়াই আর একের পর এক নাটকীয় ম্যাচে মেতে ছিল ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু সেই উৎসবের আড়ালে টুর্নামেন্টজুড়ে চলেছে গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি। ফাঁস হওয়া নিরাপত্তা নথি বলছে, আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে বোমা মেরে হত্যার হুমকি থেকে শুরু করে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে অনুসরণ—তারকাদের ঘিরে ছিল নানা ধরনের হুমকি ও হয়রানি।

যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্র (আইপিসিসি) প্রতিদিন নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। স্পেনের অনুসন্ধানী অপরাধবিষয়ক সংবাদমাধ্যম প্রেনসা ইবেরিকার প্রকাশ করা সেই গোপন নথির একটি অংশেই উঠে এসেছে এসব তথ্য।

নথি অনুযায়ী, পুরো টুর্নামেন্টে ফুটবলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে ছিলেন মেসি। আর্জেন্টিনা–জর্ডান ম্যাচের দিন টেক্সাসের ডালাস বিমানবন্দরে পুলিশকে ফোন করেন এক ব্যক্তি। তাঁর দাবি ছিল, তিনি ও তাঁর দুই সহযোগী হাতে তৈরি বোমা এবং এআর-১৫ সেমিঅটোমেটিক রাইফেল নিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছেন। পুলিশি নথিতে বলা হয়েছে, তাঁদের কথিত হামলার লক্ষ্য ছিল পুলিশ ও দুই দলের খেলোয়াড়েরা। তবে মূল নিশানা ছিলেন মেসি।

মেসিকে ঘিরে নিরাপত্তাশঙ্কা তৈরি হয় আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচেও। ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি আটলান্টার স্টেডিয়ামে ঢুকে শরীরে বাঁধা চারটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মেসিকে হত্যা করবেন। ম্যাচ চলাকালে আবার পুলিশ সদর দপ্তরে খবর আসে, স্টেডিয়ামের তিনটি ডাস্টবিনে বোমা রাখা হয়েছে। পরে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে পুরো স্টেডিয়ামে তল্লাশি চালানো হয়।

মেসির পাশাপাশি রোনালদোকেও বিশ্বকাপজুড়ে নিরাপত্তার বাড়তি চাপ সামলাতে হয়েছে। ১৪ জুন ফিফার এক কর্মী পুলিশকে জানান, এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি রোনালদোর থাকার জায়গা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন। দুই দিন পর হিউস্টনে পর্তুগাল দলের হোটেল থেকে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়।

টরন্টোতেও এক ভক্ত রোনালদোর সঙ্গে একই লিফটে ওঠার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে আটকে দেন। ওই ব্যক্তি পরে জানান, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শুধু রোনালদোর সঙ্গে সেলফি তোলা। মায়ামিতেও রোনালদোর কাছে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে। পর্তুগাল–ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে তাঁর জার্সি পরা এক দর্শক মাঠে ঢুকে পড়েন।

মাঠের ভুলও তারকাদের জন্য ডেকে এনেছে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে মাঠে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে জড়ানোর পর কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে প্যারাগুয়েতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এমনকি দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও তাঁকে নিয়ে কটূক্তি করা হয়। ৫ ও ৬ জুলাই প্যারাগুয়ের বিভিন্ন স্থানে এমবাপ্পের প্রতিকৃতি পোড়ানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

গোলের সুযোগ নষ্ট করাও রেহাই দেয়নি খেলোয়াড়দের। আতলেতিকো মাদ্রিদের নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ সহজ সুযোগ নষ্ট করার পর তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। কলম্বিয়ার জামিনটন ক্যাম্পাজ পেনাল্টি মিস করার পর বিশ্বকাপ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে দেশে ফিরতে পারেননি। আবার স্পেন–ফ্রান্স ম্যাচে লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করে পেনাল্টি দেওয়ার ঘটনায় ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়েও প্রাণনাশের হুমকি পান।

সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া দল। প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ের পর কোচ হং মাইওং-বোসহ দলের সদস্যদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁদের বিমানবন্দর পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়েছিল।

তবে হুমকির সংখ্যায় সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ারের। আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচ পরিচালনার পর তাঁর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রায় ছয় হাজার হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়। এসব বার্তার বড় অংশ এসেছিল মিসরীয় নাগরিকদের কাছ থেকে।

ওই ম্যাচের ভিএআর রেফারি উইলি দেলাজোদও বাদ যাননি। তাঁকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে ফ্রান্সে লেতেক্সিয়ার ও দেলাজোদের বাড়ি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তায় পৃথক পুলিশি ব্যবস্থা করতে হয়।

বিষয় : লিওনেল মেসি বোমা

কাল মহাকাল

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬


বিশ্বকাপে মেসিকে বোমায় উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি

প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বিশ্বকাপের মাঠে তখন ফুটবলের উত্তেজনা তুঙ্গে। গ্যালারিতে লাখো দর্শকের উল্লাস, তারকাদের লড়াই আর একের পর এক নাটকীয় ম্যাচে মেতে ছিল ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু সেই উৎসবের আড়ালে টুর্নামেন্টজুড়ে চলেছে গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি। ফাঁস হওয়া নিরাপত্তা নথি বলছে, আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে বোমা মেরে হত্যার হুমকি থেকে শুরু করে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে অনুসরণ—তারকাদের ঘিরে ছিল নানা ধরনের হুমকি ও হয়রানি।

যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্র (আইপিসিসি) প্রতিদিন নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। স্পেনের অনুসন্ধানী অপরাধবিষয়ক সংবাদমাধ্যম প্রেনসা ইবেরিকার প্রকাশ করা সেই গোপন নথির একটি অংশেই উঠে এসেছে এসব তথ্য।

নথি অনুযায়ী, পুরো টুর্নামেন্টে ফুটবলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে ছিলেন মেসি। আর্জেন্টিনা–জর্ডান ম্যাচের দিন টেক্সাসের ডালাস বিমানবন্দরে পুলিশকে ফোন করেন এক ব্যক্তি। তাঁর দাবি ছিল, তিনি ও তাঁর দুই সহযোগী হাতে তৈরি বোমা এবং এআর-১৫ সেমিঅটোমেটিক রাইফেল নিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছেন। পুলিশি নথিতে বলা হয়েছে, তাঁদের কথিত হামলার লক্ষ্য ছিল পুলিশ ও দুই দলের খেলোয়াড়েরা। তবে মূল নিশানা ছিলেন মেসি।

মেসিকে ঘিরে নিরাপত্তাশঙ্কা তৈরি হয় আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচেও। ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি আটলান্টার স্টেডিয়ামে ঢুকে শরীরে বাঁধা চারটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মেসিকে হত্যা করবেন। ম্যাচ চলাকালে আবার পুলিশ সদর দপ্তরে খবর আসে, স্টেডিয়ামের তিনটি ডাস্টবিনে বোমা রাখা হয়েছে। পরে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে পুরো স্টেডিয়ামে তল্লাশি চালানো হয়।

মেসির পাশাপাশি রোনালদোকেও বিশ্বকাপজুড়ে নিরাপত্তার বাড়তি চাপ সামলাতে হয়েছে। ১৪ জুন ফিফার এক কর্মী পুলিশকে জানান, এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি রোনালদোর থাকার জায়গা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন। দুই দিন পর হিউস্টনে পর্তুগাল দলের হোটেল থেকে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়।

টরন্টোতেও এক ভক্ত রোনালদোর সঙ্গে একই লিফটে ওঠার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে আটকে দেন। ওই ব্যক্তি পরে জানান, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শুধু রোনালদোর সঙ্গে সেলফি তোলা। মায়ামিতেও রোনালদোর কাছে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে। পর্তুগাল–ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে তাঁর জার্সি পরা এক দর্শক মাঠে ঢুকে পড়েন।

মাঠের ভুলও তারকাদের জন্য ডেকে এনেছে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে মাঠে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে জড়ানোর পর কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে প্যারাগুয়েতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এমনকি দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও তাঁকে নিয়ে কটূক্তি করা হয়। ৫ ও ৬ জুলাই প্যারাগুয়ের বিভিন্ন স্থানে এমবাপ্পের প্রতিকৃতি পোড়ানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

গোলের সুযোগ নষ্ট করাও রেহাই দেয়নি খেলোয়াড়দের। আতলেতিকো মাদ্রিদের নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ সহজ সুযোগ নষ্ট করার পর তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। কলম্বিয়ার জামিনটন ক্যাম্পাজ পেনাল্টি মিস করার পর বিশ্বকাপ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে দেশে ফিরতে পারেননি। আবার স্পেন–ফ্রান্স ম্যাচে লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করে পেনাল্টি দেওয়ার ঘটনায় ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়েও প্রাণনাশের হুমকি পান।

সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া দল। প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ের পর কোচ হং মাইওং-বোসহ দলের সদস্যদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁদের বিমানবন্দর পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়েছিল।

তবে হুমকির সংখ্যায় সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ারের। আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচ পরিচালনার পর তাঁর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রায় ছয় হাজার হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়। এসব বার্তার বড় অংশ এসেছিল মিসরীয় নাগরিকদের কাছ থেকে।

ওই ম্যাচের ভিএআর রেফারি উইলি দেলাজোদও বাদ যাননি। তাঁকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে ফ্রান্সে লেতেক্সিয়ার ও দেলাজোদের বাড়ি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তায় পৃথক পুলিশি ব্যবস্থা করতে হয়।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত