জাতীয়
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা শেষ হওয়ার আগেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পারফরম্যান্সের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বেশ কয়েকজনের কাজে অসন্তোষের তথ্য পাওয়া গেছে। এর ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন ও দপ্তর পুনর্বণ্টনের প্রস্তুতি নেওয়া হতে পারে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ২৫ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। নির্বাচনী ইশতেহার ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিয়ে ওই পরিকল্পনা করা হয়। একই সঙ্গে ছয় মাস পর প্রত্যেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কাজ মূল্যায়নের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
১৮০ দিনের সময়সীমা শেষ হতে এখন প্রায় এক সপ্তাহ বাকি। এরই মধ্যে বিভিন্ন উৎস থেকে মন্ত্রীদের কাজের তথ্য সংগ্রহ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোও নিজেদের অগ্রগতি ও কর্মকাণ্ডের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এসব তথ্য এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই কিছু ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন। তিনি নিয়মিত সকাল ৯টায় সচিবালয়ে অফিস করছেন। ভিভিআইপি প্রটোকল কমিয়ে সাধারণ মানুষের মতো সীমিত নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করছেন। নিজের জন্য বিশেষ সুবিধা না নেওয়ার পাশাপাশি নিজের বাসায় থাকছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং বেতনের ১০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এসব উদ্যোগের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি সরকারের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রী এমন বড় অর্জন দেখাতে পারেননি, যা সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে আলাদাভাবে তুলে ধরা যায়। অবশ্য দু-একজন প্রতিমন্ত্রীর কাজ তুলনামূলক সন্তোষজনক বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
কৃষক ও ফ্যামিলি কার্ডে অগ্রগতি
সরকারের প্রথম ছয় মাসের অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যে ছিল কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল পুনঃখনন, কৃষিঋণ মওকুফ, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, নগর পরিবেশ ও যানজট নিরসন, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী, হেলথ কার্ড, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষা সংস্কার।
কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সরকারি সুবিধা সরাসরি পৌঁছানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। কৃষিঋণ মওকুফ এবং সার-বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কৃষি মন্ত্রণালয় সক্রিয় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতেও কিছু অগ্রগতি রয়েছে। জাতীয় গ্রিডে রুফটপ সোলার ও সৌরবিদ্যুতের সংযোজন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়। তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি সংকট এবং সাম্প্রতিক লোডশেডিং নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা ও দ্রব্যমূল্যে অসন্তোষ
সরকারের ছয় মাসে সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাগুলোর একটি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দেখা হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের আসামিদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে সীমান্তে ভারতের পুশব্যাকের চেষ্টা ঠেকাতে বিজিবির ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ওই পরিস্থিতিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী শক্ত অবস্থান নেওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তিও কিছুটা ইতিবাচক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নদী-খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগও সরকারের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের তালিকায় রয়েছে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টাও চলছে।
ইমাম-মোয়াজ্জিন ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রধানদের সম্মানী দেওয়ার কর্মসূচি শুরু হয়েছে। চলতি বছরের হজ ব্যবস্থাপনাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পকারখানা সচল করা, কর্মসংস্থান তৈরি এবং কর্মমুখী শিক্ষা চালুর ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে। তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের উপকরণ ও ট্যাব দেওয়া এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখা যায়নি।
যেসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিয়ে প্রশ্ন
গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রথম ১৮০ দিনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কিছু মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে—এটি সামনে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতাও সরকারের ওপর জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ছয় মাস পরও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে আগের সরকারের সুবিধাভোগীদের অনেককে সরানো সম্ভব হয়নি। উল্টো কয়েকজনকে নতুন করে পদায়ন করা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মন্ত্রী অতিরিক্ত চাপ সামলাতে পারছেন না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীদের কারও কারও হাতে একটি মন্ত্রণালয় রেখে অন্য দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শেখ রবিউল আলম বর্তমানে সড়ক পরিবহন, সেতু, রেল ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এসব দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিক নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নাম আলোচনায় এসেছে। সে ক্ষেত্রে শেখ রবিউল আলমকে রেল ও নৌ পরিবহনের দায়িত্বে রাখা হতে পারে।
বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিবেদনে দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ফলে এসব মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তন অনেকটা নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিনের সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হলে বর্তমান মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি দায়িত্ব নিতে না চাইলে আ ন ম এহছানুল হক মিলনই দায়িত্বে থাকতে পারেন।
এ ছাড়া সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, পানিসম্পদ, ভূমি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পাট ও বস্ত্র, তথ্য ও সম্প্রচার এবং বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। কারও দায়িত্ব বাড়তে পারে, আবার কারও দপ্তর বদল হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগে, এরপর মন্ত্রিসভা
তবে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আগে সরকারের প্রধান মনোযোগ এখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে। নির্বাচন কমিশন আগামী ২০ আগস্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দলের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলের একাধিক স্থায়ী কমিটির সদস্যের কাছে তারেক রহমান পরামর্শ চাইলে তাঁরা বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম প্রস্তাব করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সদস্যরা জানিয়েছেন। ফলে প্রেসিডেন্ট পদে মির্জা ফখরুলের নামই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।
মির্জা ফখরুল প্রেসিডেন্ট হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব পদেও নতুন ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দলের কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। আর মহাসচিবের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর হাতে যেতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নতুন করে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার আলোচনায় রয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, সেলিমা রহমান, রুহুল কবির রিজভী, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গিয়াসউদ্দীন রিমন, রকিবুল ইসলাম বকুল, মাহমুদুর রহমান মান্না, ড. মাহ্দী আমিন, রেহান আসিফ আসাদ ও হুমায়ুন কবির।
মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দিয়েছিলেন। সময়সীমা শেষ হলে কাজের মূল্যায়ন হবে। কারা সফল হয়েছেন এবং কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটি প্রধানমন্ত্রীই বিবেচনা করবেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা ছিল। ওই সময় পর্যন্ত সরকার কাজ করবে এবং পরে সার্বিক মূল্যায়ন হবে। সবকিছু যথাসময়ে তুলে ধরা হবে।
বিষয় : তারেক রহমান মন্ত্রীসভা পরিবর্তন
2.png)
রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা শেষ হওয়ার আগেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পারফরম্যান্সের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বেশ কয়েকজনের কাজে অসন্তোষের তথ্য পাওয়া গেছে। এর ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন ও দপ্তর পুনর্বণ্টনের প্রস্তুতি নেওয়া হতে পারে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ২৫ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। নির্বাচনী ইশতেহার ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিয়ে ওই পরিকল্পনা করা হয়। একই সঙ্গে ছয় মাস পর প্রত্যেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কাজ মূল্যায়নের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
১৮০ দিনের সময়সীমা শেষ হতে এখন প্রায় এক সপ্তাহ বাকি। এরই মধ্যে বিভিন্ন উৎস থেকে মন্ত্রীদের কাজের তথ্য সংগ্রহ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোও নিজেদের অগ্রগতি ও কর্মকাণ্ডের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এসব তথ্য এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই কিছু ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন। তিনি নিয়মিত সকাল ৯টায় সচিবালয়ে অফিস করছেন। ভিভিআইপি প্রটোকল কমিয়ে সাধারণ মানুষের মতো সীমিত নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করছেন। নিজের জন্য বিশেষ সুবিধা না নেওয়ার পাশাপাশি নিজের বাসায় থাকছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং বেতনের ১০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এসব উদ্যোগের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি সরকারের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রী এমন বড় অর্জন দেখাতে পারেননি, যা সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে আলাদাভাবে তুলে ধরা যায়। অবশ্য দু-একজন প্রতিমন্ত্রীর কাজ তুলনামূলক সন্তোষজনক বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
কৃষক ও ফ্যামিলি কার্ডে অগ্রগতি
সরকারের প্রথম ছয় মাসের অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যে ছিল কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল পুনঃখনন, কৃষিঋণ মওকুফ, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, নগর পরিবেশ ও যানজট নিরসন, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী, হেলথ কার্ড, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষা সংস্কার।
কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সরকারি সুবিধা সরাসরি পৌঁছানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। কৃষিঋণ মওকুফ এবং সার-বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কৃষি মন্ত্রণালয় সক্রিয় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতেও কিছু অগ্রগতি রয়েছে। জাতীয় গ্রিডে রুফটপ সোলার ও সৌরবিদ্যুতের সংযোজন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়। তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি সংকট এবং সাম্প্রতিক লোডশেডিং নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা ও দ্রব্যমূল্যে অসন্তোষ
সরকারের ছয় মাসে সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাগুলোর একটি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দেখা হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের আসামিদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে সীমান্তে ভারতের পুশব্যাকের চেষ্টা ঠেকাতে বিজিবির ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ওই পরিস্থিতিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী শক্ত অবস্থান নেওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তিও কিছুটা ইতিবাচক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নদী-খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগও সরকারের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের তালিকায় রয়েছে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টাও চলছে।
ইমাম-মোয়াজ্জিন ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রধানদের সম্মানী দেওয়ার কর্মসূচি শুরু হয়েছে। চলতি বছরের হজ ব্যবস্থাপনাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পকারখানা সচল করা, কর্মসংস্থান তৈরি এবং কর্মমুখী শিক্ষা চালুর ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে। তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের উপকরণ ও ট্যাব দেওয়া এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখা যায়নি।
যেসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিয়ে প্রশ্ন
গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রথম ১৮০ দিনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কিছু মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে—এটি সামনে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতাও সরকারের ওপর জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ছয় মাস পরও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে আগের সরকারের সুবিধাভোগীদের অনেককে সরানো সম্ভব হয়নি। উল্টো কয়েকজনকে নতুন করে পদায়ন করা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মন্ত্রী অতিরিক্ত চাপ সামলাতে পারছেন না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীদের কারও কারও হাতে একটি মন্ত্রণালয় রেখে অন্য দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শেখ রবিউল আলম বর্তমানে সড়ক পরিবহন, সেতু, রেল ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এসব দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিক নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নাম আলোচনায় এসেছে। সে ক্ষেত্রে শেখ রবিউল আলমকে রেল ও নৌ পরিবহনের দায়িত্বে রাখা হতে পারে।
বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিবেদনে দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ফলে এসব মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তন অনেকটা নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিনের সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হলে বর্তমান মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি দায়িত্ব নিতে না চাইলে আ ন ম এহছানুল হক মিলনই দায়িত্বে থাকতে পারেন।
এ ছাড়া সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, পানিসম্পদ, ভূমি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পাট ও বস্ত্র, তথ্য ও সম্প্রচার এবং বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। কারও দায়িত্ব বাড়তে পারে, আবার কারও দপ্তর বদল হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগে, এরপর মন্ত্রিসভা
তবে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আগে সরকারের প্রধান মনোযোগ এখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে। নির্বাচন কমিশন আগামী ২০ আগস্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দলের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলের একাধিক স্থায়ী কমিটির সদস্যের কাছে তারেক রহমান পরামর্শ চাইলে তাঁরা বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম প্রস্তাব করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সদস্যরা জানিয়েছেন। ফলে প্রেসিডেন্ট পদে মির্জা ফখরুলের নামই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।
মির্জা ফখরুল প্রেসিডেন্ট হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব পদেও নতুন ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দলের কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। আর মহাসচিবের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর হাতে যেতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নতুন করে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার আলোচনায় রয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, সেলিমা রহমান, রুহুল কবির রিজভী, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গিয়াসউদ্দীন রিমন, রকিবুল ইসলাম বকুল, মাহমুদুর রহমান মান্না, ড. মাহ্দী আমিন, রেহান আসিফ আসাদ ও হুমায়ুন কবির।
মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দিয়েছিলেন। সময়সীমা শেষ হলে কাজের মূল্যায়ন হবে। কারা সফল হয়েছেন এবং কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটি প্রধানমন্ত্রীই বিবেচনা করবেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা ছিল। ওই সময় পর্যন্ত সরকার কাজ করবে এবং পরে সার্বিক মূল্যায়ন হবে। সবকিছু যথাসময়ে তুলে ধরা হবে।
2.png)