আন্তর্জাতিক
গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের সঙ্গে ইসরাইলের অবস্থানের দূরত্ব এখন প্রকাশ্য। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গাজা-সংক্রান্ত চুক্তি প্রত্যাখ্যানকে শুধু একটি কূটনৈতিক মতবিরোধ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত ৩১ জুলাই গাজা নিয়ে একটি চুক্তির প্রস্তাব সামনে আনে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছিল। কিন্তু ইসরাইলি সরকারের আপত্তিতে সেই উদ্যোগ কার্যত থমকে যায়। এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের নীতিগত দূরত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সম্পর্ক যে সব সময় মসৃণ ছিল, এমন নয়। চলতি বছরের শুরুতেই দুই নেতার মধ্যে উত্তপ্ত এক ফোনালাপের খবর সামনে আসে। ওই কথোপকথনে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে গাজা ইস্যুতে সাম্প্রতিক মতবিরোধকে সেই পুরোনো উত্তেজনার ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
এখানে ট্রাম্পের রাজনৈতিক চরিত্রটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রকাশ্যে নিজের কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা সহজভাবে নেন না। কোনো মিত্র যদি তার সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে আলাদা পথে হাঁটে, সেটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই তার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। তাই নেতানিয়াহুর বর্তমান অবস্থান শেষ পর্যন্ত কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।
তবে নেতানিয়াহুর হিসাবের পেছনে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বাস্তবতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থক হিসেবে কাজ করেছে রিপাবলিকান পার্টি। এই সমীকরণই হয়তো নেতানিয়াহুকে মনে করাচ্ছে, ট্রাম্প চাইলেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অবস্থান নেওয়া তার জন্য সহজ হবে না।
কিন্তু সেই হিসাবও এখন আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে জনমত ও দলীয় অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির সাম্প্রতিক প্রাইমারিগুলোতে এমন কয়েকজন প্রার্থী সাফল্য পেয়েছেন, যারা ইসরাইলকে মার্কিন সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। ইসরাইলপন্থী শক্তিশালী লবিং সংগঠন এআইপ্যাক বিপুল অর্থ ব্যয় করেও সব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল পায়নি।
এর অর্থ, মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলকে ঘিরে পুরোনো ঐকমত্যে ফাটল তৈরি হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকার, গাজায় বেসামরিক হতাহত এবং ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তার বিষয়গুলো এখন আগের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ।
অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে ভবিষ্যতে তিনি যদি ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন বদলানোর প্রয়োজন অনুভব করেন, সেটিকে দলীয় ইস্যুতে পরিণত করার ক্ষমতা তার রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রিপাবলিকান রাজনীতির একটি বড় অংশও তার অবস্থানের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে।
এই বাস্তবতায় নেতানিয়াহুর বর্তমান কৌশল মূলত একটি রাজনৈতিক বাজির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ধরে নিচ্ছেন, ট্রাম্প ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সমীকরণের কারণে কঠোর অবস্থানে যাবেন না।
কিন্তু সেই বাজি ভুল প্রমাণিত হলে ইসরাইলের জন্য পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, মার্কিন সামরিক সহায়তা এবং ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ইসরাইলের অবস্থান—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে বদলে যাওয়া মার্কিন জনমত ও দলীয় রাজনীতিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
2.png)
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬
গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের সঙ্গে ইসরাইলের অবস্থানের দূরত্ব এখন প্রকাশ্য। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গাজা-সংক্রান্ত চুক্তি প্রত্যাখ্যানকে শুধু একটি কূটনৈতিক মতবিরোধ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত ৩১ জুলাই গাজা নিয়ে একটি চুক্তির প্রস্তাব সামনে আনে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছিল। কিন্তু ইসরাইলি সরকারের আপত্তিতে সেই উদ্যোগ কার্যত থমকে যায়। এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের নীতিগত দূরত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সম্পর্ক যে সব সময় মসৃণ ছিল, এমন নয়। চলতি বছরের শুরুতেই দুই নেতার মধ্যে উত্তপ্ত এক ফোনালাপের খবর সামনে আসে। ওই কথোপকথনে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে গাজা ইস্যুতে সাম্প্রতিক মতবিরোধকে সেই পুরোনো উত্তেজনার ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
এখানে ট্রাম্পের রাজনৈতিক চরিত্রটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রকাশ্যে নিজের কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা সহজভাবে নেন না। কোনো মিত্র যদি তার সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে আলাদা পথে হাঁটে, সেটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই তার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। তাই নেতানিয়াহুর বর্তমান অবস্থান শেষ পর্যন্ত কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।
তবে নেতানিয়াহুর হিসাবের পেছনে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বাস্তবতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থক হিসেবে কাজ করেছে রিপাবলিকান পার্টি। এই সমীকরণই হয়তো নেতানিয়াহুকে মনে করাচ্ছে, ট্রাম্প চাইলেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অবস্থান নেওয়া তার জন্য সহজ হবে না।
কিন্তু সেই হিসাবও এখন আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে জনমত ও দলীয় অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির সাম্প্রতিক প্রাইমারিগুলোতে এমন কয়েকজন প্রার্থী সাফল্য পেয়েছেন, যারা ইসরাইলকে মার্কিন সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। ইসরাইলপন্থী শক্তিশালী লবিং সংগঠন এআইপ্যাক বিপুল অর্থ ব্যয় করেও সব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল পায়নি।
এর অর্থ, মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলকে ঘিরে পুরোনো ঐকমত্যে ফাটল তৈরি হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকার, গাজায় বেসামরিক হতাহত এবং ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তার বিষয়গুলো এখন আগের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ।
অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে ভবিষ্যতে তিনি যদি ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন বদলানোর প্রয়োজন অনুভব করেন, সেটিকে দলীয় ইস্যুতে পরিণত করার ক্ষমতা তার রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রিপাবলিকান রাজনীতির একটি বড় অংশও তার অবস্থানের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে।
এই বাস্তবতায় নেতানিয়াহুর বর্তমান কৌশল মূলত একটি রাজনৈতিক বাজির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ধরে নিচ্ছেন, ট্রাম্প ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সমীকরণের কারণে কঠোর অবস্থানে যাবেন না।
কিন্তু সেই বাজি ভুল প্রমাণিত হলে ইসরাইলের জন্য পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, মার্কিন সামরিক সহায়তা এবং ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ইসরাইলের অবস্থান—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে বদলে যাওয়া মার্কিন জনমত ও দলীয় রাজনীতিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
2.png)