অর্থনীতি
গত সাড়ে চার বছর ধরে নিত্যপণ্যের বাজারে যে উত্তাপ, তাতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার দশা। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতি মাসেই মূল্যস্ফীতি যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় শ্রমিকের মজুরি বাড়েনি। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, কমেছে জিনিসপত্র কেনার সক্ষমতা। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগের মাস মে মাসে তা ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। অথচ এই সময়ে আয় বাড়ার হার সেই তুলনায় অনেক নিচে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আজ পর্যন্ত টানা ৫৩ মাস ধরে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। বিবিএসের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, আর জাতীয় মজুরি হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপর আর কোনো মাসেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে স্পর্শ করতে পারেনি। জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ হলেও মজুরি হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।
চলতি জুলাই মাস থেকে ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়বে। সরকারি চাকুরেদের জন্য এটি সুখবর হলেও বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বেতন বাড়ার পর বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আবারও বাড়তে পারে। আর এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন বেসরকারি খাতে কর্মরত সীমিত আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাকির হোসেনের জীবনের গল্পটা যেন এই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। রাজধানীর কাওলা এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকা জাকির জানান, গত তিন বছরে তাঁর বেতন বেড়েছে সামান্যই, কিন্তু সংসার চালাতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। জাকির বলেন, ‘বাসাভাড়া থেকে শুরু করে সব কিছুর দাম বেড়েছে। তিন-চার বছর আগেও কিছু টাকা জমাতে পারতাম, এখন মাসের শেষ দিকে ধারদেনা করতে হয়।’
মূল্যস্ফীতিকে একধরনের নীরব কর হিসেবে উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আয়ের সবটুকু যখন সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়, তখন জিনিসের দাম বাড়লে মানুষ কেবল ধারদেনা কিংবা কাটছাঁট করেই টিকে থাকতে পারে। দেশের ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় মূল্যস্ফীতির এই চাপ সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি সহসা কমার লক্ষণ দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘দীর্ঘদিন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মানুষ বিনোদন বা পর্যটনের মতো শৌখিন খরচগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যে।’
এই সংকট থেকে উত্তরণে তিনি তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন:
১.বেসরকারি খাতে মজুরি বৃদ্ধির চাপ: সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতের ওপরও চাপ তৈরি হয়। তাই সরকারের উচিত বেসরকারি খাতের মজুরি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা বা চাপ সৃষ্টি করা।
২. সুরক্ষা কর্মসূচি:নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কার্ডের ব্যবহার অব্যাহত রাখা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সেই সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা।
৩. বাজার তদারকি: বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং সার্বিক বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি জোরদার করা।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে অস্থিরতা শুরু হলে দেশের বাজারেও তার বড় প্রভাব পড়ে। তখন থেকেই মূল্যস্ফীতির চাকা আর থামানো যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। আর এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন জাকির হোসেনের মতো কোটি সাধারণ মানুষ।
বিষয় : মূল্যস্ফীতি
2.png)
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
গত সাড়ে চার বছর ধরে নিত্যপণ্যের বাজারে যে উত্তাপ, তাতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার দশা। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতি মাসেই মূল্যস্ফীতি যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় শ্রমিকের মজুরি বাড়েনি। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, কমেছে জিনিসপত্র কেনার সক্ষমতা। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগের মাস মে মাসে তা ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। অথচ এই সময়ে আয় বাড়ার হার সেই তুলনায় অনেক নিচে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আজ পর্যন্ত টানা ৫৩ মাস ধরে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। বিবিএসের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ, আর জাতীয় মজুরি হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপর আর কোনো মাসেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে স্পর্শ করতে পারেনি। জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ হলেও মজুরি হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।
চলতি জুলাই মাস থেকে ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়বে। সরকারি চাকুরেদের জন্য এটি সুখবর হলেও বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বেতন বাড়ার পর বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আবারও বাড়তে পারে। আর এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন বেসরকারি খাতে কর্মরত সীমিত আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাকির হোসেনের জীবনের গল্পটা যেন এই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। রাজধানীর কাওলা এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকা জাকির জানান, গত তিন বছরে তাঁর বেতন বেড়েছে সামান্যই, কিন্তু সংসার চালাতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। জাকির বলেন, ‘বাসাভাড়া থেকে শুরু করে সব কিছুর দাম বেড়েছে। তিন-চার বছর আগেও কিছু টাকা জমাতে পারতাম, এখন মাসের শেষ দিকে ধারদেনা করতে হয়।’
মূল্যস্ফীতিকে একধরনের নীরব কর হিসেবে উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আয়ের সবটুকু যখন সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়, তখন জিনিসের দাম বাড়লে মানুষ কেবল ধারদেনা কিংবা কাটছাঁট করেই টিকে থাকতে পারে। দেশের ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় মূল্যস্ফীতির এই চাপ সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি সহসা কমার লক্ষণ দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘দীর্ঘদিন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মানুষ বিনোদন বা পর্যটনের মতো শৌখিন খরচগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যে।’
এই সংকট থেকে উত্তরণে তিনি তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন:
১.বেসরকারি খাতে মজুরি বৃদ্ধির চাপ: সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতের ওপরও চাপ তৈরি হয়। তাই সরকারের উচিত বেসরকারি খাতের মজুরি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা বা চাপ সৃষ্টি করা।
২. সুরক্ষা কর্মসূচি:নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কার্ডের ব্যবহার অব্যাহত রাখা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সেই সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা।
৩. বাজার তদারকি: বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং সার্বিক বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি জোরদার করা।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে অস্থিরতা শুরু হলে দেশের বাজারেও তার বড় প্রভাব পড়ে। তখন থেকেই মূল্যস্ফীতির চাকা আর থামানো যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। আর এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন জাকির হোসেনের মতো কোটি সাধারণ মানুষ।
2.png)