আন্তর্জাতিক
তেহরানের আকাশ-বাতাস তখন শোকের চাদরে ঢাকা। লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায় আর বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত হয়েছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা। কিন্তু এই বিশাল আয়োজনের প্রতিটি কোণে কেবল একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরছিল—কোথায় মোজতবা খামেনি? বাবার শেষ বিদায় বেলায় যে ছেলের থাকার কথা ছিল সবার সামনে, সেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা কেন চোখের আড়ালে?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনায় ওলটপালট হয়ে গেছে ইরানের চিত্র। সেই একই হামলায় মারাত্মক আহত হয়েছিলেন মোজতবা খামেনি। এরপর থেকেই তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে। যদিও জানাজায় তাঁর তিন ভাই—মোস্তফা, মাইসাম ও মাসুদ উপস্থিত ছিলেন, তবুও নতুন সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বরাবরই বলে আসছেন, মোজতবা খামেনির জীবনের ওপর এখনো বড় ধরনের হুমকি রয়েছে। তবে নিরাপত্তার এই অজুহাত সাধারণ মানুষের মনে কতটা ভরসা জোগাচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
তেহরানে জানাজায় অংশ নেওয়া ২৬ বছর বয়সী মাসুমেহ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার দেশ আর আগের সেই ইরান নেই, যেখানে নেতাকে জনসমক্ষে দেখা যেত। মোজতবার অনুপস্থিতি শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি আমাদের নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাই ছিলেন ইরানের শক্তির মূল ভিত্তি, আজ তাঁকে হারিয়ে আমরা যেন অভিভাবকহীন।’
এই শোকের আবহেই আবার শুরু হয়েছে নতুন অস্থিরতা। গত সোমবার যখন খামেনির কফিন তেহরান অতিক্রম করছিল, তখন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের বিবৃতি আগুনে ঘি ঢেলেছে। কাৎজ খোলাখুলিই স্বীকার করেছেন, ইসরায়েলই খামেনিকে হত্যা করেছে এবং মোজতবা খামেনিও তাদের নিশানায় আছেন। এই হুমকি ইরানি জনগণের ক্ষোভ ও ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কেউ কেউ অবশ্য নিরাপত্তার খাতিরেই মোজতবার নীরবতাকে সমর্থন করছেন। ৩৫ বছর বয়সী ফায়েজেহ মনে করেন, ‘শত্রু যখন সাবেক নেতাকেও ছাড়েনি, তখন মোজতবাকেও তারা রেহাই দেবে না। তাই নিরাপত্তার স্বার্থেই তাঁর জনসমক্ষে না আসাটা যুক্তিযুক্ত।’
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অনেকের মতেই, নেতার দীর্ঘ অনুপস্থিতি রাষ্ট্রক্ষমতায় কোনো অশুভ শক্তির প্রভাবকে উসকে দিচ্ছে। তেহরানের বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সী সোমায়েহ মনে করেন, সরকার জনগণের সঙ্গে স্বচ্ছ নয়। তিনি বলেন, ‘নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যদি সরকারের কাজ হয়, তবে কেন তারা কয়েক মিনিটের জন্য জনসমক্ষে আসার ব্যবস্থা করতে পারছে না? আমার মনে হচ্ছে, এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে। হয়তো সরকারের ভেতরের কেউ কেউ এই সুযোগে নিজেদের সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।’
মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়েও নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় তাঁর মুখমণ্ডল ও দুই পায়ে গুরুতর আঘাত লেগেছে। নিয়মিত জনসমক্ষে দেখা পাওয়া ইরানের বিগত দিনের নেতাদের তুলনায় নতুন সর্বোচ্চ নেতার এই দীর্ঘ নীরবতা অস্বাভাবিক ঠেকছে অনেকের কাছেই।
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভি মনে করেন, ইরানি যেকোনো নেতার পক্ষেই জনসমক্ষে আসাটা এক ধরনের স্বাভাবিক রীতি। সেই তুলনায় মোজতবার এমন গোপনীয়তা পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করছে। তবে তিনি এও যোগ করেন, জীবনের ওপর সরাসরি হুমকি থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সব মিলিয়ে, শোক আর বিষাদের পাশাপাশি এক অজানা আতঙ্কে দিন কাটছে তেহরানবাসীর। মোজতবা খামেনি কি দ্রুত সুস্থ হয়ে জাতির সামনে ফিরবেন, নাকি এই অন্তরালই হয়ে উঠবে ইরানের নতুন রাজনীতির অলিখিত নিয়ম—সেই উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় এখন পুরো ইরান।
2.png)
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
তেহরানের আকাশ-বাতাস তখন শোকের চাদরে ঢাকা। লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায় আর বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত হয়েছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা। কিন্তু এই বিশাল আয়োজনের প্রতিটি কোণে কেবল একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরছিল—কোথায় মোজতবা খামেনি? বাবার শেষ বিদায় বেলায় যে ছেলের থাকার কথা ছিল সবার সামনে, সেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা কেন চোখের আড়ালে?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনায় ওলটপালট হয়ে গেছে ইরানের চিত্র। সেই একই হামলায় মারাত্মক আহত হয়েছিলেন মোজতবা খামেনি। এরপর থেকেই তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে। যদিও জানাজায় তাঁর তিন ভাই—মোস্তফা, মাইসাম ও মাসুদ উপস্থিত ছিলেন, তবুও নতুন সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বরাবরই বলে আসছেন, মোজতবা খামেনির জীবনের ওপর এখনো বড় ধরনের হুমকি রয়েছে। তবে নিরাপত্তার এই অজুহাত সাধারণ মানুষের মনে কতটা ভরসা জোগাচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
তেহরানে জানাজায় অংশ নেওয়া ২৬ বছর বয়সী মাসুমেহ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার দেশ আর আগের সেই ইরান নেই, যেখানে নেতাকে জনসমক্ষে দেখা যেত। মোজতবার অনুপস্থিতি শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি আমাদের নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাই ছিলেন ইরানের শক্তির মূল ভিত্তি, আজ তাঁকে হারিয়ে আমরা যেন অভিভাবকহীন।’
এই শোকের আবহেই আবার শুরু হয়েছে নতুন অস্থিরতা। গত সোমবার যখন খামেনির কফিন তেহরান অতিক্রম করছিল, তখন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের বিবৃতি আগুনে ঘি ঢেলেছে। কাৎজ খোলাখুলিই স্বীকার করেছেন, ইসরায়েলই খামেনিকে হত্যা করেছে এবং মোজতবা খামেনিও তাদের নিশানায় আছেন। এই হুমকি ইরানি জনগণের ক্ষোভ ও ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কেউ কেউ অবশ্য নিরাপত্তার খাতিরেই মোজতবার নীরবতাকে সমর্থন করছেন। ৩৫ বছর বয়সী ফায়েজেহ মনে করেন, ‘শত্রু যখন সাবেক নেতাকেও ছাড়েনি, তখন মোজতবাকেও তারা রেহাই দেবে না। তাই নিরাপত্তার স্বার্থেই তাঁর জনসমক্ষে না আসাটা যুক্তিযুক্ত।’
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অনেকের মতেই, নেতার দীর্ঘ অনুপস্থিতি রাষ্ট্রক্ষমতায় কোনো অশুভ শক্তির প্রভাবকে উসকে দিচ্ছে। তেহরানের বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সী সোমায়েহ মনে করেন, সরকার জনগণের সঙ্গে স্বচ্ছ নয়। তিনি বলেন, ‘নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যদি সরকারের কাজ হয়, তবে কেন তারা কয়েক মিনিটের জন্য জনসমক্ষে আসার ব্যবস্থা করতে পারছে না? আমার মনে হচ্ছে, এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে। হয়তো সরকারের ভেতরের কেউ কেউ এই সুযোগে নিজেদের সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।’
মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়েও নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় তাঁর মুখমণ্ডল ও দুই পায়ে গুরুতর আঘাত লেগেছে। নিয়মিত জনসমক্ষে দেখা পাওয়া ইরানের বিগত দিনের নেতাদের তুলনায় নতুন সর্বোচ্চ নেতার এই দীর্ঘ নীরবতা অস্বাভাবিক ঠেকছে অনেকের কাছেই।
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভি মনে করেন, ইরানি যেকোনো নেতার পক্ষেই জনসমক্ষে আসাটা এক ধরনের স্বাভাবিক রীতি। সেই তুলনায় মোজতবার এমন গোপনীয়তা পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করছে। তবে তিনি এও যোগ করেন, জীবনের ওপর সরাসরি হুমকি থাকলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সব মিলিয়ে, শোক আর বিষাদের পাশাপাশি এক অজানা আতঙ্কে দিন কাটছে তেহরানবাসীর। মোজতবা খামেনি কি দ্রুত সুস্থ হয়ে জাতির সামনে ফিরবেন, নাকি এই অন্তরালই হয়ে উঠবে ইরানের নতুন রাজনীতির অলিখিত নিয়ম—সেই উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় এখন পুরো ইরান।
2.png)