বিশ্বকাপ দামামা
বাংলাদেশের ফুটবলাঙ্গনে লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা দলের প্রতি যে আবেগ, তা কোনো সাধারণ ভালোবাসা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা অন্ধ অনুরাগের পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা, বিশেষ করে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে আর্জেন্টিনার বর্তমান সরকারের অবস্থান ফুটবলপ্রেমীদের এক বড় অংশের মনে নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে। খেলা আর রাজনীতি কি সত্যিই আলাদা, নাকি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একে অপরের সাথে জড়িয়ে গেছে অবিচ্ছেদ্যভাবে—এমন প্রশ্ন এখন অনেক ভক্তের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতায় বসার পর থেকেই দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ইসরায়েলের বিষয়ে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। মিলেই কেবল সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে পরিচয় দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। নিউ ইয়র্কের ইয়েশিভা ইউনিভার্সিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। মিলেইর মতে, পশ্চিমা সভ্যতার শেকড় ইহুদি দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, আর তাই ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত মিত্রতা বজায় রাখা আর্জেন্টিনার বর্তমান সরকারের বড় অগ্রাধিকার।
ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা দল যখন নামে, তখন তারা কেবল খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং একটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে মাঠে খেলে। এই ব্র্যান্ডিংয়ের কারণেই রাষ্ট্রপ্রধানের রাজনৈতিক অবস্থান ফুটবলের ওপর ছায়া ফেলছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। অতীতে ২০১৮ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, জেরুজালেমে আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। মেসি কিংবা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) হয়তো সরাসরি কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে না, কিন্তু তাদের বিভিন্ন ব্যবসায়িক বা প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড যখন ইসরায়েলের সাথে যুক্ত হয়, তখন তা সমর্থকদের এক বড় অংশকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়।
বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বড় একটি অংশ মানসিকভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে থাকেন। এখন তাদেরই প্রিয় দলের কর্ণধার যখন ফিলিস্তিনের বিষয়ে ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের ঘোষণা দেন, তখন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সংকটে পড়েন সমর্থকরা। এটি কি কেবলই একটি খেলা? নাকি রাজনীতির দাবার বোর্ডে দর্শক হওয়ার মানেই পরোক্ষ সমর্থন দেওয়া? তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে খবরের প্রতিটি স্তর এখন ভক্তদের হাতের মুঠোয়, ফলে প্রিয় দলের দেশের নেতার কর্মকাণ্ডকে উপেক্ষা করা আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের বিশ্বে খেলাধুলা আর আগের মতো আবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। বিশ্বনেতারা যখন জাতীয় স্বার্থে খেলাকে কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, তখন সাধারণ সমর্থকদের পক্ষে আবেগ আর বিবেকের এই টানাপোড়েন এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। আবেগি সমর্থন আর নৈতিক অবস্থান—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রতিটি সমর্থককেই এখন নিজস্ব বিচার-বিবেচনায় যাচাই করতে হচ্ছে, তারা ঠিক কোন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ, ফুটবলের সৌন্দর্যের আড়ালে বৈশ্বিক রাজনীতির কঠিন সত্যগুলোকে অস্বীকার করার পথ এখন আর খোলা নেই।
বিষয় : মেসি হাভিয়ের মিলেই
2.png)
সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের ফুটবলাঙ্গনে লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা দলের প্রতি যে আবেগ, তা কোনো সাধারণ ভালোবাসা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা অন্ধ অনুরাগের পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা, বিশেষ করে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে আর্জেন্টিনার বর্তমান সরকারের অবস্থান ফুটবলপ্রেমীদের এক বড় অংশের মনে নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে। খেলা আর রাজনীতি কি সত্যিই আলাদা, নাকি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একে অপরের সাথে জড়িয়ে গেছে অবিচ্ছেদ্যভাবে—এমন প্রশ্ন এখন অনেক ভক্তের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতায় বসার পর থেকেই দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ইসরায়েলের বিষয়ে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। মিলেই কেবল সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে পরিচয় দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। নিউ ইয়র্কের ইয়েশিভা ইউনিভার্সিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। মিলেইর মতে, পশ্চিমা সভ্যতার শেকড় ইহুদি দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, আর তাই ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত মিত্রতা বজায় রাখা আর্জেন্টিনার বর্তমান সরকারের বড় অগ্রাধিকার।
ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা দল যখন নামে, তখন তারা কেবল খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং একটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে মাঠে খেলে। এই ব্র্যান্ডিংয়ের কারণেই রাষ্ট্রপ্রধানের রাজনৈতিক অবস্থান ফুটবলের ওপর ছায়া ফেলছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। অতীতে ২০১৮ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, জেরুজালেমে আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। মেসি কিংবা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) হয়তো সরাসরি কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে না, কিন্তু তাদের বিভিন্ন ব্যবসায়িক বা প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড যখন ইসরায়েলের সাথে যুক্ত হয়, তখন তা সমর্থকদের এক বড় অংশকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়।
বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বড় একটি অংশ মানসিকভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে থাকেন। এখন তাদেরই প্রিয় দলের কর্ণধার যখন ফিলিস্তিনের বিষয়ে ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের ঘোষণা দেন, তখন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সংকটে পড়েন সমর্থকরা। এটি কি কেবলই একটি খেলা? নাকি রাজনীতির দাবার বোর্ডে দর্শক হওয়ার মানেই পরোক্ষ সমর্থন দেওয়া? তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে খবরের প্রতিটি স্তর এখন ভক্তদের হাতের মুঠোয়, ফলে প্রিয় দলের দেশের নেতার কর্মকাণ্ডকে উপেক্ষা করা আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের বিশ্বে খেলাধুলা আর আগের মতো আবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। বিশ্বনেতারা যখন জাতীয় স্বার্থে খেলাকে কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, তখন সাধারণ সমর্থকদের পক্ষে আবেগ আর বিবেকের এই টানাপোড়েন এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। আবেগি সমর্থন আর নৈতিক অবস্থান—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রতিটি সমর্থককেই এখন নিজস্ব বিচার-বিবেচনায় যাচাই করতে হচ্ছে, তারা ঠিক কোন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ, ফুটবলের সৌন্দর্যের আড়ালে বৈশ্বিক রাজনীতির কঠিন সত্যগুলোকে অস্বীকার করার পথ এখন আর খোলা নেই।
2.png)