সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 লোকাল ফোকাসলোকাল ফোকাস

বনাঞ্চল উজাড় ও অবৈধ শিকারে মনপুরায় বিলুপ্তির পথে হরিণ

একসময় বন ও লোকালয়ে চিত্রা হরিণের অবাধ বিচরণে মুখরিত ছিল এই জনপদ। কিন্তু অবৈধ শিকার আর বনাঞ্চল ধ্বংসের থাবায় আজ বিপন্ন দ্বীপের এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।

 বনাঞ্চল উজাড় ও অবৈধ শিকারে মনপুরায় বিলুপ্তির পথে হরিণ
ছবি -সংগৃহীত

মেঘনার বুক চিরে জেগে ওঠা ভোলা জেলার মনপুরা দ্বীপ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আর বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে একসময় সারা দেশের পর্যটকদের কাছে ছিল এক অন্যরকম আকর্ষণ। বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো চিত্রা হরিণ ছিল এই দ্বীপের প্রাণ। অথচ সেই চেনা ছবি এখন শুধুই অতীত। অসাধু শিকারি আর বনখেকোদের দৌরাত্ম্যে আজ প্রায় হরিণশূন্য হতে বসেছে একসময়ের রূপসী এই দ্বীপ।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১২২৬ সালে মেঘনার মোহনায় জেগে ওঠা এই দ্বীপটির নামকরণ করা হয় ‘মনপুরা’। কালের পরিক্রমায় এর আয়তন ও ভৌগোলিক সীমায় পরিবর্তন এলেও ঐতিহ্যের ধারক ছিল এর বনাঞ্চল। উপজেলা বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দ্বীপটির তিনটি গেজেটভুক্ত বনাঞ্চলে প্রায় ১১ হাজার ৭৯১ হেক্টর জমি রয়েছে। একটা সময় এই পুরো বনাঞ্চল জুড়ে ছিল চিত্রা হরিণের অভয়ারণ্য। জোয়ারে ভেসে আসা এক জোড়া হরিণ থেকেই এই দ্বীপে বংশবিস্তার শুরু হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। একসময় শুধু বনাঞ্চল নয়, দ্বীপের লোকালয়েও হরিণের অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু সেই সমৃদ্ধ দিন এখন আর নেই।

কেন বিলুপ্তির পথে হরিণ?

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একসময় প্রতিদিন সকালে বনের কিনারে বা চরাঞ্চলে হরিণের পাল চোখে পড়ত। কিন্তু এখন বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও একটি হরিণের দেখা পাওয়া ভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরিণ বিলুপ্তির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে অসাধু শিকারিদের ব্যাপক দৌরাত্ম্য। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে হরিণ নিধন চললেও তা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে বন উজাড়ও এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে, মনপুরার চারপাশে রিং বাঁধ নির্মাণের সময় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বনায়ন নিধন করা হয়েছে, যা হরিণের প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আবাসস্থল হারিয়ে দিশেহারা হরিণগুলো তাই আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

এখন পরিস্থিতি যেমন

বর্তমানে মনপুরার বিশাল বনাঞ্চলের মধ্যে কেবল চর পাতালিয়া ও বদনার চরের মতো বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায় খুব সীমিত সংখ্যক হরিণের অস্তিত্ব টিকে আছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে দায়ের করা ৩৬টি মামলা এখনো বিচারাধীন। এর থেকেই বোঝা যায়, বন্যপ্রাণী রক্ষায় লড়াইটা কতটা কঠিন।

বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতি ও পর্যটনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই হরিণ। অচিরেই যদি বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার, কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে শিকারিদের দমন করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে মনপুরা থেকে চিত্রা হরিণ চিরতরে হারিয়ে যাবে। কেবল আশ্বাস আর কাগজ-কলমের পরিকল্পনা নয়, এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর বন ব্যবস্থাপনা। রূপসী মনপুরা কি তার হারানো হরিণের পালকে আবার ফিরে পাবে? নাকি বিলুপ্তির খাতায় নাম লেখাবে দ্বীপের এই প্রাণ? সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে।

বিষয় : মনপুরা হরিণ

বনাঞ্চল উজাড় ও অবৈধ শিকারে মনপুরায় বিলুপ্তির পথে হরিণ
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬


বনাঞ্চল উজাড় ও অবৈধ শিকারে মনপুরায় বিলুপ্তির পথে হরিণ

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬

featured Image

মেঘনার বুক চিরে জেগে ওঠা ভোলা জেলার মনপুরা দ্বীপ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আর বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে একসময় সারা দেশের পর্যটকদের কাছে ছিল এক অন্যরকম আকর্ষণ। বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো চিত্রা হরিণ ছিল এই দ্বীপের প্রাণ। অথচ সেই চেনা ছবি এখন শুধুই অতীত। অসাধু শিকারি আর বনখেকোদের দৌরাত্ম্যে আজ প্রায় হরিণশূন্য হতে বসেছে একসময়ের রূপসী এই দ্বীপ।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১২২৬ সালে মেঘনার মোহনায় জেগে ওঠা এই দ্বীপটির নামকরণ করা হয় ‘মনপুরা’। কালের পরিক্রমায় এর আয়তন ও ভৌগোলিক সীমায় পরিবর্তন এলেও ঐতিহ্যের ধারক ছিল এর বনাঞ্চল। উপজেলা বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দ্বীপটির তিনটি গেজেটভুক্ত বনাঞ্চলে প্রায় ১১ হাজার ৭৯১ হেক্টর জমি রয়েছে। একটা সময় এই পুরো বনাঞ্চল জুড়ে ছিল চিত্রা হরিণের অভয়ারণ্য। জোয়ারে ভেসে আসা এক জোড়া হরিণ থেকেই এই দ্বীপে বংশবিস্তার শুরু হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। একসময় শুধু বনাঞ্চল নয়, দ্বীপের লোকালয়েও হরিণের অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু সেই সমৃদ্ধ দিন এখন আর নেই।

কেন বিলুপ্তির পথে হরিণ?

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একসময় প্রতিদিন সকালে বনের কিনারে বা চরাঞ্চলে হরিণের পাল চোখে পড়ত। কিন্তু এখন বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও একটি হরিণের দেখা পাওয়া ভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরিণ বিলুপ্তির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে অসাধু শিকারিদের ব্যাপক দৌরাত্ম্য। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে হরিণ নিধন চললেও তা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে বন উজাড়ও এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে, মনপুরার চারপাশে রিং বাঁধ নির্মাণের সময় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বনায়ন নিধন করা হয়েছে, যা হরিণের প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আবাসস্থল হারিয়ে দিশেহারা হরিণগুলো তাই আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

এখন পরিস্থিতি যেমন

বর্তমানে মনপুরার বিশাল বনাঞ্চলের মধ্যে কেবল চর পাতালিয়া ও বদনার চরের মতো বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায় খুব সীমিত সংখ্যক হরিণের অস্তিত্ব টিকে আছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে দায়ের করা ৩৬টি মামলা এখনো বিচারাধীন। এর থেকেই বোঝা যায়, বন্যপ্রাণী রক্ষায় লড়াইটা কতটা কঠিন।

বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতি ও পর্যটনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই হরিণ। অচিরেই যদি বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার, কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে শিকারিদের দমন করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে মনপুরা থেকে চিত্রা হরিণ চিরতরে হারিয়ে যাবে। কেবল আশ্বাস আর কাগজ-কলমের পরিকল্পনা নয়, এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর বন ব্যবস্থাপনা। রূপসী মনপুরা কি তার হারানো হরিণের পালকে আবার ফিরে পাবে? নাকি বিলুপ্তির খাতায় নাম লেখাবে দ্বীপের এই প্রাণ? সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত