সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 মহাকালের আয়নামহাকালের আয়না

অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ও আমাদের জেগে ওঠার দায়

ভারতের রাজনীতির নেপথ্যে থাকা আরএসএস কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং আমাদের সামনে এর চ্যালেঞ্জগুলো কী, তা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ও আমাদের জেগে ওঠার দায়
ছবি -সংগৃহীত

আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তারা প্রায়ই রাজনীতির বাইরের চাকচিক্য দেখে মুগ্ধ হই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বদলালে মনে হয় সব কিছু বদলে যাবে, কিংবা ভারতের কোনো রাজ্যে সরকার পাল্টালে মনে হয় নতুন কোনো সূর্য উদয় হলো। কিন্তু সত্যি বলতে, এসবই কি পুরো সত্য? আপনি যদি একটু গভীর নজর দেন, দেখবেন পর্দার সামনে থাকা নেতারা কেবলই পুতুল। তাদের সুতো ধরে আছে অন্য কেউ। আমেরিকার ক্ষেত্রে যাকে আমরা 'ডিপ স্টেট' বলি, ভারতের ক্ষেত্রে সেই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক শক্তিটি হলো আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ।

ভাবুন তো একবার, নির্বাচনের সময় আমরা দেখি বড় বড় র‍্যালি, আকাশচুম্বী প্রতিশ্রুতি আর মিডিয়ার মাতামাতি। কিন্তু দিনশেষে ভারতের আসল নীতি কি বদলে যায়? না, বদলায় না। কারণ ভারতের আসল রাজধানী এখন আর নয়াদিল্লিতে নেই, সেটি চলে গেছে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে। আরএসএস কোনো রাজনৈতিক দল নয় যে তাকে নির্বাচনে জিততে হবে। তারা বরং এমন এক মাদারবোর্ড, যার তৈরি করা সফটওয়্যারেই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র চলে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আমলা—সবাইকে এই নাগপুরের এজেন্ডা মেনেই চলতে হয়। তাদের লক্ষ্য কেবল ক্ষমতা দখল নয়, বরং ভারত নামক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটিকে ভেতরে থেকে বদলে দিয়ে একটি কট্টর হিন্দু রাষ্ট্র কায়েম করা।

এই উগ্র দর্শনের পেছনের কারিগর বিনায়ক দামোদর সাভারকর। তার ইতিহাস যদি আপনি একটু ঘেঁটে দেখেন, তবে চমকে উঠবেন। ব্রিটিশদের জেলে থাকাকালীন যে হীনম্মন্যতা তার ভেতর তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকেই জন্ম হয়েছিল এক গভীর বিদ্বেষের। তিনি একটি কাল্পনিক শত্রু বানিয়ে নিলেন—মুসলমানদের। তার সেই বিতর্কিত ‘হিন্দুত্ব’ বইটি আজও এই মতাদর্শের অনুসারীদের কাছে বাইবেল। তিনি বিশ্বাস করতেন, যারা এই মাটির সন্তান কিন্তু যাদের তীর্থস্থান মক্কা বা জেরুজালেমে, তারা প্রকৃত ভারতীয় হতে পারে না। এই জঘন্য ফর্মুলা দিয়ে তিনি কোটি কোটি মানুষকে রাতারাতি বহিরাগত বানিয়ে দিলেন। আর অবাক করা বিষয় হলো, এই মানুষটাকেই আজকের ভারতে ‘বীর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ভারতের এই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আমাদের মতো প্রতিবেশী দেশের জন্য কেন চিন্তার বিষয়? কারণ এদের লক্ষ্য কেবল ভারতের সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। এদের মূল মাস্টারপ্ল্যানটি হলো ‘অখণ্ড ভারত’। নাগপুরের সদর দপ্তরে টাঙানো মানচিত্রে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল—সবই তাদের সাম্রাজ্যের অংশ। তারা মনে করে, এই দেশগুলো ভুলবশত তাদের হাতছাড়া হয়েছে এবং যেকোনো মূল্যে তা ফিরিয়ে আনতে হবে। ভারতের নতুন সংসদ ভবনের ম্যাপে যখন আমরা আমাদের দেশের সীমানা দেখি, তখন তা কেবল পাথরের কারুকার্য থাকে না, বরং তা এক সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

তবে তারা কি এখন আমাদের ওপর সরাসরি সামরিক আক্রমণ করছে? না। তারা বেছে নিয়েছে ‘স্লো পয়জনিং’ বা ধীরগতির আগ্রাসনের পথ। আপনি যদি খেয়াল করেন, আমাদের তরুণ প্রজন্মের মগজ এখন বলিউড, স্টার জলসা আর মেকি সাংস্কৃতিক আভিজাত্যের নেশায় বুঁদ। আমাদের ভাষা, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আর অর্থনীতির মেরুদণ্ড—সবই যেন তাদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। আমাদের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, আমাদের বাজারগুলো তাদের নিম্নমানের পণ্যে ভরে যাচ্ছে, আর আমরা বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে সবকিছু মাথা পেতে নিচ্ছি। এটি কোনো সাধারণ কূটনীতি নয়, এটি হলো এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবরুদ্ধকরণ।

এখন সময় হয়েছে নিজেকে প্রশ্ন করার—আমরা কি সত্যিই স্বাধীন, নাকি আমরা ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য কলোনিতে পরিণত হচ্ছি? ভারতের সাধারণ মানুষের সাথে আমাদের লড়াই নেই, লড়াইটা ওই উগ্র মতাদর্শের সাথে, যারা আমাদের অস্তিত্বকে মানচিত্রের একটি অংশ হিসেবে দেখে।

আমাদের বাঁচার পথ একটাই—জেগে ওঠা। আমাদের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করতে হবে, কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নিজস্ব আত্মপরিচয় ও দেশপ্রেমের পাঠ নতুন করে পড়াতে হবে, যাতে কোনো বাইরের মতাদর্শ সহজেই আমাদের মগজ ধোলাই করতে না পারে। ভারতের ওই গেরুয়া অক্টোপাস আমাদের বন্ধু নয়, এটি একটি আগ্রাসী পরিকল্পনা। বন্ধু হিসেবে সম্পর্ক চাই, কিন্তু দাসত্ব মেনে নিয়ে নয়।

আমরা যদি আজ আমাদের শিকড়কে শক্ত না করি, তবে অদূর ভবিষ্যতে আরএসএস-এর ওই মানচিত্রের স্বপ্নই হয়তো আমাদের বাস্তব হয়ে ধরা দেবে। দানব এখন আর বইয়ের পাতায় বা ইতিহাসের ধূসর অধ্যায়ে নেই, সে আমাদের জাতীয় সীমান্তের দরজায় কড়া নাড়ছে। তাই সময় থাকতেই আমাদের সজাগ হতে হবে। সচেতনতা আর স্বনির্ভরতাই এখন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র কবজ।

বিষয় : অখণ্ড ভারত আরএসএস

অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ও আমাদের জেগে ওঠার দায়
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬


অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ও আমাদের জেগে ওঠার দায়

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬

featured Image

আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তারা প্রায়ই রাজনীতির বাইরের চাকচিক্য দেখে মুগ্ধ হই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বদলালে মনে হয় সব কিছু বদলে যাবে, কিংবা ভারতের কোনো রাজ্যে সরকার পাল্টালে মনে হয় নতুন কোনো সূর্য উদয় হলো। কিন্তু সত্যি বলতে, এসবই কি পুরো সত্য? আপনি যদি একটু গভীর নজর দেন, দেখবেন পর্দার সামনে থাকা নেতারা কেবলই পুতুল। তাদের সুতো ধরে আছে অন্য কেউ। আমেরিকার ক্ষেত্রে যাকে আমরা 'ডিপ স্টেট' বলি, ভারতের ক্ষেত্রে সেই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক শক্তিটি হলো আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ।

ভাবুন তো একবার, নির্বাচনের সময় আমরা দেখি বড় বড় র‍্যালি, আকাশচুম্বী প্রতিশ্রুতি আর মিডিয়ার মাতামাতি। কিন্তু দিনশেষে ভারতের আসল নীতি কি বদলে যায়? না, বদলায় না। কারণ ভারতের আসল রাজধানী এখন আর নয়াদিল্লিতে নেই, সেটি চলে গেছে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে। আরএসএস কোনো রাজনৈতিক দল নয় যে তাকে নির্বাচনে জিততে হবে। তারা বরং এমন এক মাদারবোর্ড, যার তৈরি করা সফটওয়্যারেই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র চলে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আমলা—সবাইকে এই নাগপুরের এজেন্ডা মেনেই চলতে হয়। তাদের লক্ষ্য কেবল ক্ষমতা দখল নয়, বরং ভারত নামক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটিকে ভেতরে থেকে বদলে দিয়ে একটি কট্টর হিন্দু রাষ্ট্র কায়েম করা।

এই উগ্র দর্শনের পেছনের কারিগর বিনায়ক দামোদর সাভারকর। তার ইতিহাস যদি আপনি একটু ঘেঁটে দেখেন, তবে চমকে উঠবেন। ব্রিটিশদের জেলে থাকাকালীন যে হীনম্মন্যতা তার ভেতর তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকেই জন্ম হয়েছিল এক গভীর বিদ্বেষের। তিনি একটি কাল্পনিক শত্রু বানিয়ে নিলেন—মুসলমানদের। তার সেই বিতর্কিত ‘হিন্দুত্ব’ বইটি আজও এই মতাদর্শের অনুসারীদের কাছে বাইবেল। তিনি বিশ্বাস করতেন, যারা এই মাটির সন্তান কিন্তু যাদের তীর্থস্থান মক্কা বা জেরুজালেমে, তারা প্রকৃত ভারতীয় হতে পারে না। এই জঘন্য ফর্মুলা দিয়ে তিনি কোটি কোটি মানুষকে রাতারাতি বহিরাগত বানিয়ে দিলেন। আর অবাক করা বিষয় হলো, এই মানুষটাকেই আজকের ভারতে ‘বীর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ভারতের এই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আমাদের মতো প্রতিবেশী দেশের জন্য কেন চিন্তার বিষয়? কারণ এদের লক্ষ্য কেবল ভারতের সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। এদের মূল মাস্টারপ্ল্যানটি হলো ‘অখণ্ড ভারত’। নাগপুরের সদর দপ্তরে টাঙানো মানচিত্রে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল—সবই তাদের সাম্রাজ্যের অংশ। তারা মনে করে, এই দেশগুলো ভুলবশত তাদের হাতছাড়া হয়েছে এবং যেকোনো মূল্যে তা ফিরিয়ে আনতে হবে। ভারতের নতুন সংসদ ভবনের ম্যাপে যখন আমরা আমাদের দেশের সীমানা দেখি, তখন তা কেবল পাথরের কারুকার্য থাকে না, বরং তা এক সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

তবে তারা কি এখন আমাদের ওপর সরাসরি সামরিক আক্রমণ করছে? না। তারা বেছে নিয়েছে ‘স্লো পয়জনিং’ বা ধীরগতির আগ্রাসনের পথ। আপনি যদি খেয়াল করেন, আমাদের তরুণ প্রজন্মের মগজ এখন বলিউড, স্টার জলসা আর মেকি সাংস্কৃতিক আভিজাত্যের নেশায় বুঁদ। আমাদের ভাষা, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আর অর্থনীতির মেরুদণ্ড—সবই যেন তাদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। আমাদের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, আমাদের বাজারগুলো তাদের নিম্নমানের পণ্যে ভরে যাচ্ছে, আর আমরা বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে সবকিছু মাথা পেতে নিচ্ছি। এটি কোনো সাধারণ কূটনীতি নয়, এটি হলো এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবরুদ্ধকরণ।

এখন সময় হয়েছে নিজেকে প্রশ্ন করার—আমরা কি সত্যিই স্বাধীন, নাকি আমরা ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য কলোনিতে পরিণত হচ্ছি? ভারতের সাধারণ মানুষের সাথে আমাদের লড়াই নেই, লড়াইটা ওই উগ্র মতাদর্শের সাথে, যারা আমাদের অস্তিত্বকে মানচিত্রের একটি অংশ হিসেবে দেখে।

আমাদের বাঁচার পথ একটাই—জেগে ওঠা। আমাদের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করতে হবে, কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নিজস্ব আত্মপরিচয় ও দেশপ্রেমের পাঠ নতুন করে পড়াতে হবে, যাতে কোনো বাইরের মতাদর্শ সহজেই আমাদের মগজ ধোলাই করতে না পারে। ভারতের ওই গেরুয়া অক্টোপাস আমাদের বন্ধু নয়, এটি একটি আগ্রাসী পরিকল্পনা। বন্ধু হিসেবে সম্পর্ক চাই, কিন্তু দাসত্ব মেনে নিয়ে নয়।

আমরা যদি আজ আমাদের শিকড়কে শক্ত না করি, তবে অদূর ভবিষ্যতে আরএসএস-এর ওই মানচিত্রের স্বপ্নই হয়তো আমাদের বাস্তব হয়ে ধরা দেবে। দানব এখন আর বইয়ের পাতায় বা ইতিহাসের ধূসর অধ্যায়ে নেই, সে আমাদের জাতীয় সীমান্তের দরজায় কড়া নাড়ছে। তাই সময় থাকতেই আমাদের সজাগ হতে হবে। সচেতনতা আর স্বনির্ভরতাই এখন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র কবজ।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত