আবহমান বঞ্চনা
১৯৪৭ সালের দেশভাগ শুধু দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি, বদলে দিয়েছিল গোটা উপমহাদেশের মানচিত্র। সেই উত্তাল সময়ে এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যেগুলোর প্রভাব আজও টের পাওয়া যায়। কিন্তু ইতিহাসের ভাঁজে চাপা পড়ে থাকা একটি সত্য হলো—এক সময় আসামও পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে পারত। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। আর তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল একজন মানুষের দৃঢ় অবস্থানের।
সেই মানুষটি গোপীনাথ বর্দলৈ।
গোপীনাথ বর্দলৈ(ছবি- উইকিপিডিয়া)
স্বাধীনতার ঠিক আগে, যখন ভারতজুড়ে বিভাজনের রাজনীতি তুঙ্গে, তখন মুসলিম লিগের পরিকল্পনায় আসাম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগ মনে করত, পূর্ব পাকিস্তানকে টেকসই ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করতে হলে আসামকে সঙ্গে রাখা জরুরি। বিশেষ করে সিলেট ও গোয়ালপাড়ার মতো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে সামনে এনে তারা পুরো আসামের ওপর দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল।
শুধু ধর্মীয় হিসাব নয়, ভৌগোলিক কারণেও আসাম ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আসাম যুক্ত হলে পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা আরও বিস্তৃত হতো এবং তা বার্মা সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যেত। উপরন্তু, বিশ শতকের প্রথম ভাগে পূর্ব বাংলা থেকে বিপুল সংখ্যক মুসলিম কৃষকের আসামে বসতি স্থাপন মুসলিম লিগকে রাজনৈতিকভাবে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ১৯১১ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়াকে তারা তাদের দাবির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছিল।
এই প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে সিলেটের ইতিহাসও জানা জরুরি।
১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার জন্য সিলেটকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে। অথচ ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিচয়ে সিলেট ছিল সম্পূর্ণ বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই সিলেটের মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি কাজ করছিল। তারা নিজেদের বাঙালি মনে করলেও প্রশাসনিকভাবে ছিল অসমিয়া-শাসিত প্রদেশের অংশ।
দেশভাগের আলোচনা শুরু হলে তাই সিলেট প্রশ্নটি দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের পাঠানো ক্যাবিনেট মিশন ভারত বিভাজনের একটি প্রস্তাব দেয়। সেই পরিকল্পনায় বাংলা ও আসামকে একসঙ্গে ‘গ্রুপ সি’-তে রাখা হয়। মুসলিম লিগ এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানায়, কারণ এর মাধ্যমে বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব ব্যবহার করে আসামকেও পাকিস্তানের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল—আসামের নিজস্ব প্রতিনিধিরা সংখ্যায় কম হয়ে পড়তেন। বাংলার বিশাল প্রতিনিধিদলের সামনে আসামের মতামত কার্যত গুরুত্ব হারাত। অনেকেই মনে করছিলেন, এভাবে চলতে থাকলে একসময় পুরো আসামই পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে পারে।
ঠিক তখনই দৃঢ় অবস্থান নেন গোপীনাথ বর্দলৈ।
তিনি ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী এবং কংগ্রেসের নেতা। কিন্তু এই প্রশ্নে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গেও আপস করেননি। স্বাধীনতার স্বার্থে কংগ্রেসের কিছু শীর্ষ নেতা যেখানে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার কথা ভাবছিলেন, সেখানে বর্দলৈ মনে করতেন—আসামকে বাংলার সঙ্গে জোর করে যুক্ত করা মানে প্রদেশটির স্বাতন্ত্র্য ও মানুষের অধিকার বিসর্জন দেওয়া।
জওহরলাল নেহরু পর্যন্ত বর্দলৈর অবস্থানে বিরক্ত হয়েছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। কিন্তু বর্দলৈ পিছু হটেননি। তিনি সরদার বল্লভভাই পটেলের সমর্থন পান এবং আসামজুড়ে গণমত গড়ে তুলতে শুরু করেন। আসাম প্রদেশ কংগ্রেস গ্রুপিং পরিকল্পনার বিরোধিতা করে কঠোর অবস্থান নেয়। বর্দলৈ উপজাতীয় নেতা, অসমিয়া জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী এবং অ-মুসলিম রাজনীতিকদের এক প্ল্যাটফর্মে আনেন।
তার লক্ষ্য ছিল একটাই—আসামকে বাংলার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে রাখা।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ১৯৪৭ সালে। ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন নতুন বিভাজন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সেখানে বলা হয়, সমগ্র আসাম ভারতেই থাকবে; শুধু সিলেট জেলার ভাগ্য নির্ধারণ হবে গণভোটের মাধ্যমে।
৬ ও ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত সেই গণভোটে অধিকাংশ ভোটার পূর্ব বাংলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে মত দেন। ফলাফল হিসেবে সিলেটের বেশিরভাগ অংশ পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। শুধু করিমগঞ্জ মহকুমা ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যায়।
মজার বিষয় হলো, আসামের অনেক কংগ্রেস নেতা সিলেট হারানোকে বড় ক্ষতি হিসেবে দেখেননি। কারণ সিলেট থাকলে আসামে বাংলাভাষীর সংখ্যা আরও বেশি থাকত এবং অসমিয়ারা নিজেদের প্রদেশেই ভাষাগতভাবে সংখ্যালঘু হয়ে পড়তেন। এমনকি তৎকালীন দৈনিক আসাম ট্রিবিউন সিলেটের বিদায়কে এক ধরনের স্বস্তির খবর হিসেবেই প্রকাশ করেছিল।
তবে মুসলিম লিগের মূল লক্ষ্য ছিল পুরো আসাম। সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় মূলত দুটি কারণে—ক্যাবিনেট মিশনের গ্রুপিং পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়া এবং গোপীনাথ বর্দলৈর অনমনীয় অবস্থান।
এই গল্পে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম সৈয়দ সাদউল্লাহ। তিনি মুসলিম লিগের নেতা এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর আমলে পূর্ব বাংলা থেকে আসা বহু মুসলিম কৃষককে আসামে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এই নীতির পেছনেও ছিল দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাব—আসামে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়িয়ে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের দাবিকে শক্তিশালী করা।
বর্দলৈ ক্ষমতায় এসে সেই নীতিতে পরিবর্তন আনেন। তিনি ভূমি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেন।
তবু দেশভাগ আসামের জন্য সহজ ছিল না। সিলেট হারানোর পাশাপাশি আসাম হারায় চট্টগ্রাম বন্দরের সরাসরি যোগাযোগ। ব্রিটিশ আমল থেকে চট্টগ্রামই ছিল আসামের সমুদ্রপথের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশভাগের পর আসাম কার্যত একটি ভূবেষ্টিত অঞ্চলে পরিণত হয়। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তার সংযোগ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে মাত্র একটি সরু করিডরে—যেটি পরে ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত হয়। অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতি হয় ব্যাপক। চা শিল্প, চুনাপাথর এবং সিমেন্ট ব্যবসার একটি বড় অংশ সিলেটের সঙ্গে হারিয়ে যায়।
তারপরও ইতিহাসের বিচারে সবচেয়ে বড় সত্য হলো—আসাম ভারতের অংশ হিসেবেই থেকে যায়। আর সেই সিদ্ধান্তের পেছনে একজন মানুষের রাজনৈতিক সাহস ছিল নির্ণায়ক শক্তি।
পরবর্তীকালে সরদার পটেল বলেছিলেন, “গোপীনাথ বর্দলৈ না থাকলে আজ আসাম ভারতের অংশ থাকত না।”
১৯৯৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর ভারতরত্ন প্রদান করে। গুয়াহাটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামও রাখা হয় তাঁর নামে।
ইতিহাসে অনেক বড় পরিবর্তন যুদ্ধ বা চুক্তি দিয়ে আসে। আবার কখনো কখনো একজন মানুষের অটল অবস্থানই মানচিত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। গোপীনাথ বর্দলৈর গল্প সেই বিরল ইতিহাসগুলোরই একটি।
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
১৯৪৭ সালের দেশভাগ শুধু দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি, বদলে দিয়েছিল গোটা উপমহাদেশের মানচিত্র। সেই উত্তাল সময়ে এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যেগুলোর প্রভাব আজও টের পাওয়া যায়। কিন্তু ইতিহাসের ভাঁজে চাপা পড়ে থাকা একটি সত্য হলো—এক সময় আসামও পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে পারত। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। আর তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল একজন মানুষের দৃঢ় অবস্থানের।
সেই মানুষটি গোপীনাথ বর্দলৈ।
গোপীনাথ বর্দলৈ(ছবি- উইকিপিডিয়া)
স্বাধীনতার ঠিক আগে, যখন ভারতজুড়ে বিভাজনের রাজনীতি তুঙ্গে, তখন মুসলিম লিগের পরিকল্পনায় আসাম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগ মনে করত, পূর্ব পাকিস্তানকে টেকসই ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করতে হলে আসামকে সঙ্গে রাখা জরুরি। বিশেষ করে সিলেট ও গোয়ালপাড়ার মতো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে সামনে এনে তারা পুরো আসামের ওপর দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল।
শুধু ধর্মীয় হিসাব নয়, ভৌগোলিক কারণেও আসাম ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আসাম যুক্ত হলে পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা আরও বিস্তৃত হতো এবং তা বার্মা সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যেত। উপরন্তু, বিশ শতকের প্রথম ভাগে পূর্ব বাংলা থেকে বিপুল সংখ্যক মুসলিম কৃষকের আসামে বসতি স্থাপন মুসলিম লিগকে রাজনৈতিকভাবে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ১৯১১ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়াকে তারা তাদের দাবির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছিল।
এই প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে সিলেটের ইতিহাসও জানা জরুরি।
১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার জন্য সিলেটকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে। অথচ ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিচয়ে সিলেট ছিল সম্পূর্ণ বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই সিলেটের মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি কাজ করছিল। তারা নিজেদের বাঙালি মনে করলেও প্রশাসনিকভাবে ছিল অসমিয়া-শাসিত প্রদেশের অংশ।
দেশভাগের আলোচনা শুরু হলে তাই সিলেট প্রশ্নটি দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের পাঠানো ক্যাবিনেট মিশন ভারত বিভাজনের একটি প্রস্তাব দেয়। সেই পরিকল্পনায় বাংলা ও আসামকে একসঙ্গে ‘গ্রুপ সি’-তে রাখা হয়। মুসলিম লিগ এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানায়, কারণ এর মাধ্যমে বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব ব্যবহার করে আসামকেও পাকিস্তানের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল—আসামের নিজস্ব প্রতিনিধিরা সংখ্যায় কম হয়ে পড়তেন। বাংলার বিশাল প্রতিনিধিদলের সামনে আসামের মতামত কার্যত গুরুত্ব হারাত। অনেকেই মনে করছিলেন, এভাবে চলতে থাকলে একসময় পুরো আসামই পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে পারে।
ঠিক তখনই দৃঢ় অবস্থান নেন গোপীনাথ বর্দলৈ।
তিনি ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী এবং কংগ্রেসের নেতা। কিন্তু এই প্রশ্নে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গেও আপস করেননি। স্বাধীনতার স্বার্থে কংগ্রেসের কিছু শীর্ষ নেতা যেখানে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার কথা ভাবছিলেন, সেখানে বর্দলৈ মনে করতেন—আসামকে বাংলার সঙ্গে জোর করে যুক্ত করা মানে প্রদেশটির স্বাতন্ত্র্য ও মানুষের অধিকার বিসর্জন দেওয়া।
জওহরলাল নেহরু পর্যন্ত বর্দলৈর অবস্থানে বিরক্ত হয়েছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। কিন্তু বর্দলৈ পিছু হটেননি। তিনি সরদার বল্লভভাই পটেলের সমর্থন পান এবং আসামজুড়ে গণমত গড়ে তুলতে শুরু করেন। আসাম প্রদেশ কংগ্রেস গ্রুপিং পরিকল্পনার বিরোধিতা করে কঠোর অবস্থান নেয়। বর্দলৈ উপজাতীয় নেতা, অসমিয়া জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী এবং অ-মুসলিম রাজনীতিকদের এক প্ল্যাটফর্মে আনেন।
তার লক্ষ্য ছিল একটাই—আসামকে বাংলার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে রাখা।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ১৯৪৭ সালে। ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন নতুন বিভাজন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সেখানে বলা হয়, সমগ্র আসাম ভারতেই থাকবে; শুধু সিলেট জেলার ভাগ্য নির্ধারণ হবে গণভোটের মাধ্যমে।
৬ ও ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত সেই গণভোটে অধিকাংশ ভোটার পূর্ব বাংলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে মত দেন। ফলাফল হিসেবে সিলেটের বেশিরভাগ অংশ পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। শুধু করিমগঞ্জ মহকুমা ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যায়।
মজার বিষয় হলো, আসামের অনেক কংগ্রেস নেতা সিলেট হারানোকে বড় ক্ষতি হিসেবে দেখেননি। কারণ সিলেট থাকলে আসামে বাংলাভাষীর সংখ্যা আরও বেশি থাকত এবং অসমিয়ারা নিজেদের প্রদেশেই ভাষাগতভাবে সংখ্যালঘু হয়ে পড়তেন। এমনকি তৎকালীন দৈনিক আসাম ট্রিবিউন সিলেটের বিদায়কে এক ধরনের স্বস্তির খবর হিসেবেই প্রকাশ করেছিল।
তবে মুসলিম লিগের মূল লক্ষ্য ছিল পুরো আসাম। সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় মূলত দুটি কারণে—ক্যাবিনেট মিশনের গ্রুপিং পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়া এবং গোপীনাথ বর্দলৈর অনমনীয় অবস্থান।
এই গল্পে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম সৈয়দ সাদউল্লাহ। তিনি মুসলিম লিগের নেতা এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর আমলে পূর্ব বাংলা থেকে আসা বহু মুসলিম কৃষককে আসামে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এই নীতির পেছনেও ছিল দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাব—আসামে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়িয়ে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের দাবিকে শক্তিশালী করা।
বর্দলৈ ক্ষমতায় এসে সেই নীতিতে পরিবর্তন আনেন। তিনি ভূমি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেন।
তবু দেশভাগ আসামের জন্য সহজ ছিল না। সিলেট হারানোর পাশাপাশি আসাম হারায় চট্টগ্রাম বন্দরের সরাসরি যোগাযোগ। ব্রিটিশ আমল থেকে চট্টগ্রামই ছিল আসামের সমুদ্রপথের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশভাগের পর আসাম কার্যত একটি ভূবেষ্টিত অঞ্চলে পরিণত হয়। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তার সংযোগ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে মাত্র একটি সরু করিডরে—যেটি পরে ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত হয়। অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতি হয় ব্যাপক। চা শিল্প, চুনাপাথর এবং সিমেন্ট ব্যবসার একটি বড় অংশ সিলেটের সঙ্গে হারিয়ে যায়।
তারপরও ইতিহাসের বিচারে সবচেয়ে বড় সত্য হলো—আসাম ভারতের অংশ হিসেবেই থেকে যায়। আর সেই সিদ্ধান্তের পেছনে একজন মানুষের রাজনৈতিক সাহস ছিল নির্ণায়ক শক্তি।
পরবর্তীকালে সরদার পটেল বলেছিলেন, “গোপীনাথ বর্দলৈ না থাকলে আজ আসাম ভারতের অংশ থাকত না।”
১৯৯৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর ভারতরত্ন প্রদান করে। গুয়াহাটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামও রাখা হয় তাঁর নামে।
ইতিহাসে অনেক বড় পরিবর্তন যুদ্ধ বা চুক্তি দিয়ে আসে। আবার কখনো কখনো একজন মানুষের অটল অবস্থানই মানচিত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। গোপীনাথ বর্দলৈর গল্প সেই বিরল ইতিহাসগুলোরই একটি।
2.png)