আবহমান বঞ্চনা
সাত বছরের শিশু রামিসা। তার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল, বিকেলে খেলার মাঠে দৌড়ঝাঁপ করার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে সে ফিরল নিথর দেহ হয়ে। পল্লবীর এই ঘটনাটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক ভয়াবহ ব্যর্থতার দলিল। যখন একজন বাবা বলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনাদের বিচার করার রেকর্ড নেই’, তখন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের মাথা নত হয়ে আসার কথা। একজন সন্তানহারা শোকার্ত পিতার এই আর্তনাদ কোনো সস্তা আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস আর বহু বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ।
কেন এমনটা ঘটছে? সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘অশনি সংকেত’। যখন অপরাধীর মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, অপরাধ করলেও পার পাওয়া সম্ভব—তখন সে দানব হয়ে ওঠে। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় যখন বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকে। সিস্টেমের ফাঁক ফোকরের আশ্রয়, অর্থ কিংবা প্রভাবশালীদের বিচার ম্যানুপুলেশনে অপরাধীরা সদর্পে বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাংগুলি প্রদর্শন করে ফুলের মালা পড়ে হাস্যজ্জল মুখে বেরিয়ে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম হয় যে, বিচার পাওয়ার আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করা আসলে সময়, শ্রম আর অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। রামিসার ঘাতক দম্পতি জানত তারা কী করছে, কারণ তারা সমাজ ও রাষ্ট্রকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে যে, এখানে অপরাধ করলে তার সাজা হয়না। বড়জোর কিছুদিন হাজতবাস।
রাষ্ট্রের উদাসীনতা এখানে স্পষ্ট। আমরা বারবার দেখি, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। গ্রেপ্তার হয়, সংবাদ সম্মেলন হয়, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার গতি যখন মন্থর হয়ে যায়, তখন মানুষ আবার সবকিছু ভুলে যায়। এই যে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’—এটিই আসলে অপরাধীর প্রধান সাহস। আর সমাজের অংশ হিসেবে আমরাও কি দায় এড়াতে পারি? আমরা প্রতিবেশীদের চিনি না, কে কোথায় উঠছে আর নামছে তার খবর রাখি না। আমাদের এই যে বিচ্ছিন্নতা, তা অপরাধীদের জন্য এক ধরনের অভয়ারণ্য তৈরি করে দেয়।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি কেবল শোক পালন করব? না, আমাদের পরিবর্তনের জন্য চাপ তৈরি করতে হবে। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিচারের কালক্ষেপণ বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকবে না। দ্বিতীয়ত, পুলিশ প্রশাসনকে কেবল গ্রেপ্তারের ভূমিকায় নয়, বরং অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততায় আরও সক্রিয় হতে হবে।
আর সমাজ হিসেবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আমাদের প্রতিটি পাড়ায় ‘কমিউনিটি ওয়াচ’ বা সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে। কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে তা যেন পুলিশকে জানানোর সাহস বা নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। সেই সাথে, অপরাধীর কঠোরতম শাস্তির বিধান নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, যাতে পরবর্তী কেউ আর এমন পাশবিক কাজ করার আগে হাজারবার চিন্তা করে।
রামিসার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিল যে, রাষ্ট্র কেবল রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মানুষের জানমালের নিরাপত্তাই হলো তার প্রধান কাজ। যদি রাষ্ট্র এই কাজে ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়নের সব গালভরা বুলি কেবল অন্তঃসারশূন্য শ্লোগান হিসেবেই রয়ে যাবে। আমরা কি পারব এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যেখানে রামিসার বাবার মতো আর কাউকে বলতে হবে না যে, ‘আপনারা বিচার করতে পারবেন না’? সময় এখনই, পরিবর্তনের অঙ্গীকার করার।আমাদের রাষ্ট্রের সেই বোধ কবে আসবে?
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
সাত বছরের শিশু রামিসা। তার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল, বিকেলে খেলার মাঠে দৌড়ঝাঁপ করার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে সে ফিরল নিথর দেহ হয়ে। পল্লবীর এই ঘটনাটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক ভয়াবহ ব্যর্থতার দলিল। যখন একজন বাবা বলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনাদের বিচার করার রেকর্ড নেই’, তখন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের মাথা নত হয়ে আসার কথা। একজন সন্তানহারা শোকার্ত পিতার এই আর্তনাদ কোনো সস্তা আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস আর বহু বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ।
কেন এমনটা ঘটছে? সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘অশনি সংকেত’। যখন অপরাধীর মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, অপরাধ করলেও পার পাওয়া সম্ভব—তখন সে দানব হয়ে ওঠে। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় যখন বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকে। সিস্টেমের ফাঁক ফোকরের আশ্রয়, অর্থ কিংবা প্রভাবশালীদের বিচার ম্যানুপুলেশনে অপরাধীরা সদর্পে বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাংগুলি প্রদর্শন করে ফুলের মালা পড়ে হাস্যজ্জল মুখে বেরিয়ে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম হয় যে, বিচার পাওয়ার আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করা আসলে সময়, শ্রম আর অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। রামিসার ঘাতক দম্পতি জানত তারা কী করছে, কারণ তারা সমাজ ও রাষ্ট্রকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে যে, এখানে অপরাধ করলে তার সাজা হয়না। বড়জোর কিছুদিন হাজতবাস।
রাষ্ট্রের উদাসীনতা এখানে স্পষ্ট। আমরা বারবার দেখি, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। গ্রেপ্তার হয়, সংবাদ সম্মেলন হয়, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার গতি যখন মন্থর হয়ে যায়, তখন মানুষ আবার সবকিছু ভুলে যায়। এই যে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’—এটিই আসলে অপরাধীর প্রধান সাহস। আর সমাজের অংশ হিসেবে আমরাও কি দায় এড়াতে পারি? আমরা প্রতিবেশীদের চিনি না, কে কোথায় উঠছে আর নামছে তার খবর রাখি না। আমাদের এই যে বিচ্ছিন্নতা, তা অপরাধীদের জন্য এক ধরনের অভয়ারণ্য তৈরি করে দেয়।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি কেবল শোক পালন করব? না, আমাদের পরিবর্তনের জন্য চাপ তৈরি করতে হবে। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিচারের কালক্ষেপণ বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকবে না। দ্বিতীয়ত, পুলিশ প্রশাসনকে কেবল গ্রেপ্তারের ভূমিকায় নয়, বরং অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততায় আরও সক্রিয় হতে হবে।
আর সমাজ হিসেবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আমাদের প্রতিটি পাড়ায় ‘কমিউনিটি ওয়াচ’ বা সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে। কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে তা যেন পুলিশকে জানানোর সাহস বা নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। সেই সাথে, অপরাধীর কঠোরতম শাস্তির বিধান নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, যাতে পরবর্তী কেউ আর এমন পাশবিক কাজ করার আগে হাজারবার চিন্তা করে।
রামিসার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিল যে, রাষ্ট্র কেবল রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মানুষের জানমালের নিরাপত্তাই হলো তার প্রধান কাজ। যদি রাষ্ট্র এই কাজে ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়নের সব গালভরা বুলি কেবল অন্তঃসারশূন্য শ্লোগান হিসেবেই রয়ে যাবে। আমরা কি পারব এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যেখানে রামিসার বাবার মতো আর কাউকে বলতে হবে না যে, ‘আপনারা বিচার করতে পারবেন না’? সময় এখনই, পরিবর্তনের অঙ্গীকার করার।আমাদের রাষ্ট্রের সেই বোধ কবে আসবে?
2.png)