সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 জাতীয়জাতীয়

বিচারহীনতার দীর্ঘ কলঙ্কে রাষ্ট্রঃ দুই দশকে দেড় লক্ষ ধর্ষণ মামলা ঝুলে আছে

দশ বছরেও শেষ হয়নি তনু হত্যা মামলা, ঝুলে আছে আছিয়া থেকে সুবর্ণচরের বিচারও; শাস্তির ভয় হারালে কীভাবে থামবে নৃশংসতা?

বিচারহীনতার  দীর্ঘ কলঙ্কে রাষ্ট্রঃ  দুই দশকে দেড় লক্ষ ধর্ষণ মামলা ঝুলে আছে
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)


২০১৬ সালের ২০ মার্চ। কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাস এলাকার একটি ঝোপ থেকে উদ্ধার করা হয় সোহাগী জাহান তনু-র রক্তাক্ত মরদেহ। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের এই শিক্ষার্থীর মৃত্যু ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার এক গভীর সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়। ডিএনএ পরীক্ষায় গণধর্ষণের আলামত মিললেও, তদন্তের পর তদন্ত গড়িয়েছে, পাল্টেছে সংস্থা, বদলেছে তদন্ত কর্মকর্তা—কিন্তু এক দশক পেরিয়েও আদালতে জমা পড়েনি চূড়ান্ত অভিযোগপত্র।

দেশজুড়ে শিক্ষার্থী আন্দোলন হয়েছিল। স্লোগানে কেঁপেছিল রাজপথ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—সবখানেই প্রশ্ন উঠেছিল, “তনুর হত্যাকারী কে?” কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্ন আজও ঝুলে আছে অমীমাংসিত অবস্থায়।

তনু একা নন। গত এক দশকে ধর্ষণ, গণধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের পর হত্যার বহু আলোচিত ঘটনায় একই চিত্র দেখা গেছে—মামলা আছে, গ্রেপ্তার আছে, আদালতের তারিখ আছে; কিন্তু নেই দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার। কোথাও তদন্ত শেষ হতে বছর কেটে গেছে, কোথাও রায় ঝুলে আছে উচ্চ আদালতে, কোথাও আবার সাক্ষীর অভাব কিংবা আইনি জটিলতায় বিচারই শুরু হয়নি।

২০২০ সালে রংপুরের পীরগঞ্জে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। পরিবারের অভিযোগ, মামলার খরচ চালাতে গিয়ে জমিজমা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। ছয় বছর পার হলেও বিচার প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে শুরু হয়নি। একইভাবে ২০২১ সালে মিঠাপুকুরে এক তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাও বছরের পর বছর আদালতে পড়ে আছে।

২০২৫ সালের মার্চে কক্সবাজারের উখিয়ায় সাহরি খেতে ওঠার সময় দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যান এক গৃহবধূ। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও বিচারিক অগ্রগতি এখনো ধীর। তদন্ত শেষ হয়েছে, মামলা আদালতে আছে—কিন্তু রায় কবে হবে, কেউ জানে না।

নরসিংদীর একটি ঘটনাও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার নির্মম উদাহরণ হয়ে আছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর পরিবারটি প্রথমে স্থানীয়ভাবে বিচার চেয়েছিল। কিন্তু প্রভাবশালীদের চাপে বিচার তো দূরের কথা, শেষ পর্যন্ত ওই নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরে ধর্ষণ ও হত্যা মামলা হলেও আদালতে তা এখনো ঝুলে আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে আটকে রেখে বহিরাগত এক নারীকে গণধর্ষণের ঘটনায়ও একই ধীরগতি। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হলেও বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।

অথচ কিছু কিছু ঘটনায় নিম্ন আদালত রায় দিয়েছে। যেমন ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ভোটকে কেন্দ্র করে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ২০২৪ সালে ট্রাইব্যুনাল ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু সেই রায়ও এখন উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায়।

একই অবস্থা মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যা মামলায়ও। ২০২৫ সালে আলোচিত এই ঘটনায় বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেও এক বছর পেরিয়ে গেছে, এখনো উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি আপিল। পরিবারটি আজও অপেক্ষা করছে কার্যকর বিচারের জন্য।

এই দীর্ঘসূত্রতা এখন শুধু বিচারের বিলম্ব নয়; এটি ধীরে ধীরে এক ধরনের সামাজিক বার্তায় পরিণত হয়েছে—অপরাধ করেও শেষ পর্যন্ত পার পাওয়া যায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০০৯ সালের পর থেকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অথচ একই অপরাধে প্রায় দেড়শ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি দেশের বিভিন্ন কারাগারে রয়েছে, যাদের রায় কার্যকর হয়নি নানা আইনি জটিলতায়।

এর মধ্যেই গত বছর মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের মুখে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে। নতুন আইনে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যুর ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান আরও কঠোর করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শাস্তি বাড়ালেই অপরাধ কমে না, যদি বিচার নিশ্চিত না হয়।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাক পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় দণ্ডের হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। বর্তমানে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দেড় লাখের বেশি। এর মধ্যে হাজার হাজার মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।

আইনজীবী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল তদন্ত, অসম্পূর্ণ চার্জশিট, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা না হওয়া এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া ভেঙে পড়ছে। দেশে এখনো কার্যকর কোনো ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ নেই। ফলে অনেক সাক্ষী ভয়ভীতি বা রাজনৈতিক চাপে আদালতে সাক্ষ্য দিতে চান না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, দ্রুত বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, অপরাধের পরও যদি মানুষ দেখে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, তাহলে অপরাধীদের মধ্যেও দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়।

একই কথা বলছেন নারী অধিকারকর্মীরাও। জাতীয় নারী শক্তি-র আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, “আমরা ভুক্তভোগীদের নাম মনে রাখি, কিন্তু অপরাধীদের নাম বা শাস্তির খবর জানি না। এটাই বিচারহীনতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।”

বাংলাদেশের এই সংকটের বিপরীতে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তান ধর্ষণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালত, ভুক্তভোগীবান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যবস্থা ও বিশেষ তদন্ত সেল গঠন করেছে। ভারতে ফাস্ট ট্র্যাক স্পেশাল কোর্ট চালুর পর কয়েক লাখ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় যৌন অপরাধ আদালতগুলোতে বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানও অ্যান্টি-রেপ ক্রাইসিস সেল গঠন করেছে।

বাংলাদেশেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন সংশোধন নয়—প্রয়োজন পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে সময়সীমার মধ্যে এনে জবাবদিহির আওতায় আনা। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো, বিচারক নিয়োগ, দ্রুত ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষী সুরক্ষা আইন এবং উচ্চ আদালতে দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি ছাড়া পরিস্থিতির বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব নয়।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এস.এম ইউনুস আলী রবি জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার মামলার জট কমাতে বিচারিক কাঠামোতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে। তদন্ত দ্রুত শেষ করা, সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্ব কমানো এবং প্রসিকিউশনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এই দেশে বিচারহীনতার ইতিহাস শুধু আদালতের ফাইলে আটকে নেই; সেটি ধীরে ধীরে মানুষের বিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধ এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ধারণাকেও ক্ষতবিক্ষত করেছে।

আজও তাই তনুর প্রশ্নটি ফিরে আসে—একটি রাষ্ট্র কত বছর ধরে একটি হত্যার বিচারহীনতা বহন করতে পারে?

বিষয় : তনু হত্যা মামলা ধর্ষণ মামলার বিচারহীনতা বাংলাদেশ ধর্ষণ মামলা রামিসা হত্যা ধর্ষণ ও হত্যা মামলা

বিচারহীনতার দীর্ঘ কলঙ্কে রাষ্ট্রঃ দুই দশকে দেড় লক্ষ ধর্ষণ মামলা ঝুলে আছে
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


বিচারহীনতার দীর্ঘ কলঙ্কে রাষ্ট্রঃ দুই দশকে দেড় লক্ষ ধর্ষণ মামলা ঝুলে আছে

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image


২০১৬ সালের ২০ মার্চ। কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাস এলাকার একটি ঝোপ থেকে উদ্ধার করা হয় সোহাগী জাহান তনু-র রক্তাক্ত মরদেহ। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের এই শিক্ষার্থীর মৃত্যু ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার এক গভীর সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়। ডিএনএ পরীক্ষায় গণধর্ষণের আলামত মিললেও, তদন্তের পর তদন্ত গড়িয়েছে, পাল্টেছে সংস্থা, বদলেছে তদন্ত কর্মকর্তা—কিন্তু এক দশক পেরিয়েও আদালতে জমা পড়েনি চূড়ান্ত অভিযোগপত্র।

দেশজুড়ে শিক্ষার্থী আন্দোলন হয়েছিল। স্লোগানে কেঁপেছিল রাজপথ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—সবখানেই প্রশ্ন উঠেছিল, “তনুর হত্যাকারী কে?” কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্ন আজও ঝুলে আছে অমীমাংসিত অবস্থায়।

তনু একা নন। গত এক দশকে ধর্ষণ, গণধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের পর হত্যার বহু আলোচিত ঘটনায় একই চিত্র দেখা গেছে—মামলা আছে, গ্রেপ্তার আছে, আদালতের তারিখ আছে; কিন্তু নেই দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার। কোথাও তদন্ত শেষ হতে বছর কেটে গেছে, কোথাও রায় ঝুলে আছে উচ্চ আদালতে, কোথাও আবার সাক্ষীর অভাব কিংবা আইনি জটিলতায় বিচারই শুরু হয়নি।

২০২০ সালে রংপুরের পীরগঞ্জে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। পরিবারের অভিযোগ, মামলার খরচ চালাতে গিয়ে জমিজমা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। ছয় বছর পার হলেও বিচার প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে শুরু হয়নি। একইভাবে ২০২১ সালে মিঠাপুকুরে এক তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাও বছরের পর বছর আদালতে পড়ে আছে।

২০২৫ সালের মার্চে কক্সবাজারের উখিয়ায় সাহরি খেতে ওঠার সময় দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যান এক গৃহবধূ। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও বিচারিক অগ্রগতি এখনো ধীর। তদন্ত শেষ হয়েছে, মামলা আদালতে আছে—কিন্তু রায় কবে হবে, কেউ জানে না।

নরসিংদীর একটি ঘটনাও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার নির্মম উদাহরণ হয়ে আছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর পরিবারটি প্রথমে স্থানীয়ভাবে বিচার চেয়েছিল। কিন্তু প্রভাবশালীদের চাপে বিচার তো দূরের কথা, শেষ পর্যন্ত ওই নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরে ধর্ষণ ও হত্যা মামলা হলেও আদালতে তা এখনো ঝুলে আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে আটকে রেখে বহিরাগত এক নারীকে গণধর্ষণের ঘটনায়ও একই ধীরগতি। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হলেও বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।

অথচ কিছু কিছু ঘটনায় নিম্ন আদালত রায় দিয়েছে। যেমন ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ভোটকে কেন্দ্র করে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ২০২৪ সালে ট্রাইব্যুনাল ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু সেই রায়ও এখন উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায়।

একই অবস্থা মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যা মামলায়ও। ২০২৫ সালে আলোচিত এই ঘটনায় বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেও এক বছর পেরিয়ে গেছে, এখনো উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি আপিল। পরিবারটি আজও অপেক্ষা করছে কার্যকর বিচারের জন্য।

এই দীর্ঘসূত্রতা এখন শুধু বিচারের বিলম্ব নয়; এটি ধীরে ধীরে এক ধরনের সামাজিক বার্তায় পরিণত হয়েছে—অপরাধ করেও শেষ পর্যন্ত পার পাওয়া যায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০০৯ সালের পর থেকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অথচ একই অপরাধে প্রায় দেড়শ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি দেশের বিভিন্ন কারাগারে রয়েছে, যাদের রায় কার্যকর হয়নি নানা আইনি জটিলতায়।

এর মধ্যেই গত বছর মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের মুখে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে। নতুন আইনে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যুর ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান আরও কঠোর করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শাস্তি বাড়ালেই অপরাধ কমে না, যদি বিচার নিশ্চিত না হয়।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাক পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় দণ্ডের হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। বর্তমানে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দেড় লাখের বেশি। এর মধ্যে হাজার হাজার মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।

আইনজীবী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল তদন্ত, অসম্পূর্ণ চার্জশিট, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা না হওয়া এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া ভেঙে পড়ছে। দেশে এখনো কার্যকর কোনো ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ নেই। ফলে অনেক সাক্ষী ভয়ভীতি বা রাজনৈতিক চাপে আদালতে সাক্ষ্য দিতে চান না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, দ্রুত বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, অপরাধের পরও যদি মানুষ দেখে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, তাহলে অপরাধীদের মধ্যেও দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়।

একই কথা বলছেন নারী অধিকারকর্মীরাও। জাতীয় নারী শক্তি-র আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, “আমরা ভুক্তভোগীদের নাম মনে রাখি, কিন্তু অপরাধীদের নাম বা শাস্তির খবর জানি না। এটাই বিচারহীনতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।”

বাংলাদেশের এই সংকটের বিপরীতে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তান ধর্ষণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালত, ভুক্তভোগীবান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যবস্থা ও বিশেষ তদন্ত সেল গঠন করেছে। ভারতে ফাস্ট ট্র্যাক স্পেশাল কোর্ট চালুর পর কয়েক লাখ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় যৌন অপরাধ আদালতগুলোতে বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানও অ্যান্টি-রেপ ক্রাইসিস সেল গঠন করেছে।

বাংলাদেশেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন সংশোধন নয়—প্রয়োজন পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে সময়সীমার মধ্যে এনে জবাবদিহির আওতায় আনা। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো, বিচারক নিয়োগ, দ্রুত ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষী সুরক্ষা আইন এবং উচ্চ আদালতে দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি ছাড়া পরিস্থিতির বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব নয়।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এস.এম ইউনুস আলী রবি জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার মামলার জট কমাতে বিচারিক কাঠামোতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে। তদন্ত দ্রুত শেষ করা, সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্ব কমানো এবং প্রসিকিউশনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এই দেশে বিচারহীনতার ইতিহাস শুধু আদালতের ফাইলে আটকে নেই; সেটি ধীরে ধীরে মানুষের বিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধ এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ধারণাকেও ক্ষতবিক্ষত করেছে।

আজও তাই তনুর প্রশ্নটি ফিরে আসে—একটি রাষ্ট্র কত বছর ধরে একটি হত্যার বিচারহীনতা বহন করতে পারে?



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত