মতামত
হকিস্টিক হাতে আব্দুল মালেকের লাশের পাশে তৎকালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ
১৯৬৯ সালের অগাস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্মৃতিচারণ ও দলীয় বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে আব্দুল মালেক ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার সমন্বয়ে একটি একীভূত শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য রাখেন বলে তাঁর অনুসারীরা দাবি করেন।
সেই সময়ের কিছু বর্ণনায় বলা হয়, তাঁর বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। সমর্থকদের মতে, তিনি প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে এমন একটি শিক্ষানীতির প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
তবে পরবর্তীকালে ঘটে যাওয়া এক সহিংস ঘটনার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র ও স্মৃতিকথায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, সেমিনার-পরবর্তী সময়ে তাঁকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়। এসব বর্ণনায় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতাদের নামও উঠে আসে। যদিও এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক বিবরণ আজও বিতর্কমুক্ত নয়।
যা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আব্দুল মালেক পরবর্তীতে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং একই বছরের আগস্ট মাসে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর অনুসারীরা এই ঘটনাকে রাজনৈতিক সহিংসতার ফল বলে মনে করেন, অন্যদিকে ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন ঘটনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
আজও আব্দুল মালেকের মৃত্যু বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে একটি আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রথম দিককার রাজনৈতিক ইতিহাসে ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ভোলা অঞ্চলে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক এবং তিনি পাকিস্তান আমল থেকেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তাঁর নাম নতুন করে আলোচনায় আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বর্ণনায় দাবি করা হয়, তিনি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একজন সম্ভাবনাময় প্রার্থী ছিলেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ক্ষমতাসীনদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারত।
সমালোচকদের একটি অংশের অভিযোগ, নির্বাচনের প্রাক্কালে তাঁর রহস্যজনক অন্তর্ধান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম অমীমাংসিত ঘটনা। তাঁদের মতে, এটি কেবল একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ছিল না; বরং নবজাত রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চর্চার সীমাবদ্ধতার একটি প্রতীকী উদাহরণ।
তবে এই ঘটনার পেছনে কারা জড়িত ছিলেন বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি সরাসরি দায়ী ছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো ঐতিহাসিক ও আইনগতভাবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিষয়টি আজও গবেষণা ও রাজনৈতিক বিতর্কের পরিসরে অবস্থান করছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ব্যালটের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু ইতিহাসের বহু অধ্যায়ে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে প্রশাসনিক বা শক্তির ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। ডা. আজহার উদ্দিনের ঘটনা সেই বৃহত্তর প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসে।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনায় যে বিষয়টি প্রায়ই উঠে আসে, তা হলো স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রশাসনিক কাঠামোর রাজনৈতিককরণ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতার ওপর। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের পেশাদার কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
সমালোচকদের দাবি, স্বাধীনতার পর যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল, সেখানে মেধা ও যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে প্রশাসনের ভেতরে এমন একটি সংস্কৃতি জন্ম নেয়, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্য অনেক সময় বেশি মূল্য পেতে শুরু করে।
অবশ্য এই সমস্যাকে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন। বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রায় সব বড় দলই কোনো না কোনো মাত্রায় একই প্রবণতার জন্য সমালোচিত হয়েছে।
তবু ইতিহাসের বিচারে প্রশ্নটি থেকে যায়: স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠনের সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যারা নেতৃত্বের আসনে ছিলেন, তারা কি একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের আলো ও ছায়া একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায়।
2.png)
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬
হকিস্টিক হাতে আব্দুল মালেকের লাশের পাশে তৎকালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ
১৯৬৯ সালের অগাস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্মৃতিচারণ ও দলীয় বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে আব্দুল মালেক ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার সমন্বয়ে একটি একীভূত শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য রাখেন বলে তাঁর অনুসারীরা দাবি করেন।
সেই সময়ের কিছু বর্ণনায় বলা হয়, তাঁর বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। সমর্থকদের মতে, তিনি প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে এমন একটি শিক্ষানীতির প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
তবে পরবর্তীকালে ঘটে যাওয়া এক সহিংস ঘটনার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র ও স্মৃতিকথায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, সেমিনার-পরবর্তী সময়ে তাঁকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়। এসব বর্ণনায় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতাদের নামও উঠে আসে। যদিও এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক বিবরণ আজও বিতর্কমুক্ত নয়।
যা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আব্দুল মালেক পরবর্তীতে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং একই বছরের আগস্ট মাসে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর অনুসারীরা এই ঘটনাকে রাজনৈতিক সহিংসতার ফল বলে মনে করেন, অন্যদিকে ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন ঘটনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
আজও আব্দুল মালেকের মৃত্যু বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে একটি আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রথম দিককার রাজনৈতিক ইতিহাসে ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ভোলা অঞ্চলে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক এবং তিনি পাকিস্তান আমল থেকেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তাঁর নাম নতুন করে আলোচনায় আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বর্ণনায় দাবি করা হয়, তিনি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একজন সম্ভাবনাময় প্রার্থী ছিলেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ক্ষমতাসীনদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারত।
সমালোচকদের একটি অংশের অভিযোগ, নির্বাচনের প্রাক্কালে তাঁর রহস্যজনক অন্তর্ধান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম অমীমাংসিত ঘটনা। তাঁদের মতে, এটি কেবল একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ছিল না; বরং নবজাত রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চর্চার সীমাবদ্ধতার একটি প্রতীকী উদাহরণ।
তবে এই ঘটনার পেছনে কারা জড়িত ছিলেন বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি সরাসরি দায়ী ছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো ঐতিহাসিক ও আইনগতভাবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিষয়টি আজও গবেষণা ও রাজনৈতিক বিতর্কের পরিসরে অবস্থান করছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ব্যালটের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু ইতিহাসের বহু অধ্যায়ে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে প্রশাসনিক বা শক্তির ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। ডা. আজহার উদ্দিনের ঘটনা সেই বৃহত্তর প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসে।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনায় যে বিষয়টি প্রায়ই উঠে আসে, তা হলো স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রশাসনিক কাঠামোর রাজনৈতিককরণ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতার ওপর। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের পেশাদার কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
সমালোচকদের দাবি, স্বাধীনতার পর যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল, সেখানে মেধা ও যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে প্রশাসনের ভেতরে এমন একটি সংস্কৃতি জন্ম নেয়, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্য অনেক সময় বেশি মূল্য পেতে শুরু করে।
অবশ্য এই সমস্যাকে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন। বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রায় সব বড় দলই কোনো না কোনো মাত্রায় একই প্রবণতার জন্য সমালোচিত হয়েছে।
তবু ইতিহাসের বিচারে প্রশ্নটি থেকে যায়: স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠনের সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যারা নেতৃত্বের আসনে ছিলেন, তারা কি একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের আলো ও ছায়া একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায়।
2.png)