সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 ইরান যুদ্ধইরান যুদ্ধ

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের বড় শিক্ষা: জীবাশ্ম নির্ভরতার মূল্য

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আবারও দেখিয়ে দিল, জ্বালানি শুধু অর্থনীতির নয়, ভূরাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তারও কেন্দ্রবিন্দু। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরশীল বিশ্বে একটি আঞ্চলিক সংঘাত মুহূর্তেই বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের বড় শিক্ষা: জীবাশ্ম নির্ভরতার মূল্য
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর বিশ্বের দৃষ্টি আবারও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। যুদ্ধের তাৎক্ষণিক মানবিক বিপর্যয়ই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। বোমা হামলা, বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং সাধারণ মানুষের অনিশ্চিত জীবন—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আবারও এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।

তবে এই সংঘাতের গুরুত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভেতরেও। কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থা এখনো কতটা ভঙ্গুর এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির সঙ্গে বৈশ্বিক বাজার কত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল দিক হলো, এখনো অধিকাংশ দেশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে উৎপাদনকারী অঞ্চলে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলেই তার অভিঘাত পৌঁছে যায় হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও। তেলের দাম বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, বিদ্যুতের খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়।

এই বাস্তবতাই অর্থনীতিবিদরা 'ফসিলফ্লেশন' বা জীবাশ্ম-নির্ভর মূল্যস্ফীতি নামে অভিহিত করছেন। অর্থাৎ, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট এ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্বের সামুদ্রিক তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে চলাচল করে। সেখানে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে প্রথম আঘাত আসে এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে মূল্যস্ফীতি ও শিল্প উৎপাদনে।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে আফ্রিকার বহু দেশ এবং লাতিন আমেরিকার অর্থনীতিতেও। সেখানে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে খাদ্য, পরিবহন ও কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করছে। সংস্থাটির মতে, বিশ্বের অন্তত ৪৬টি দেশ জনগণকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে রক্ষা করতে জরুরি সহায়তা বা ভর্তুকিমূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, তেল, গ্যাস ও রাসায়নিক সারের উচ্চমূল্য বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ডব্লিউএফপির হিসাব অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হতে পারে।

অন্যদিকে, ইতিহাস বলছে, প্রতিটি বড় জ্বালানি সংকটের সময় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সরবরাহ সংকটের সময় বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তাদের মুনাফাও দ্রুত বেড়ে যায়। রিস্টাড এনার্জির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রথম মাসেই বিশ্বের বৃহৎ তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে প্রতি ঘণ্টায় কয়েক কোটি ডলার অতিরিক্ত মুনাফা করেছে।

এরপরও সংকটের সমাধান হিসেবে প্রায়ই আরও বেশি তেল উত্তোলন, নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, পরিবেশগত নিয়ম শিথিল করা কিংবা সরকারি ভর্তুকি বাড়ানোর দাবি তোলা হয়। অর্থাৎ যে কাঠামোগত নির্ভরশীলতা সংকট তৈরি করে, সেই নির্ভরশীলতাকেই আরও গভীর করার চেষ্টা চলে। ফলে সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং মুনাফার একটি পুনরাবৃত্ত চক্র তৈরি হয়, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করে সাধারণ মানুষ।

এই বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতারও অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উঠে এসেছে।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক গণপরিবহন এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী অবকাঠামো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমায়। এসব উৎস কোনো প্রণালি অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা যুদ্ধের কারণে সহজে বিঘ্নিত হয় না। ফলে বৈশ্বিক অস্থিরতার সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সংযোগও তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন, কৃষি এবং খাদ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য করা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়নকে কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত হয়তো একসময় থেমে যাবে। হরমুজ প্রণালিও আবার স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু এই সংকট বিশ্বকে আবার মনে করিয়ে দিল, যত দিন বৈশ্বিক অর্থনীতি জীবাশ্ম জ্বালানির অস্থির বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, তত দিন একটি আঞ্চলিক যুদ্ধও মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, খাদ্য সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠবে। তাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তিতে নয়, বরং টেকসই, বিকেন্দ্রীভূত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।

বিষয় : ইরান–যুক্তরাষ্ট্র জীবাশ্ম নির্ভরতার মূল্য

কাল মহাকাল

রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬


ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের বড় শিক্ষা: জীবাশ্ম নির্ভরতার মূল্য

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর বিশ্বের দৃষ্টি আবারও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। যুদ্ধের তাৎক্ষণিক মানবিক বিপর্যয়ই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। বোমা হামলা, বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং সাধারণ মানুষের অনিশ্চিত জীবন—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আবারও এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।

তবে এই সংঘাতের গুরুত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভেতরেও। কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থা এখনো কতটা ভঙ্গুর এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির সঙ্গে বৈশ্বিক বাজার কত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল দিক হলো, এখনো অধিকাংশ দেশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে উৎপাদনকারী অঞ্চলে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলেই তার অভিঘাত পৌঁছে যায় হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও। তেলের দাম বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, বিদ্যুতের খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়।

এই বাস্তবতাই অর্থনীতিবিদরা 'ফসিলফ্লেশন' বা জীবাশ্ম-নির্ভর মূল্যস্ফীতি নামে অভিহিত করছেন। অর্থাৎ, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট এ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্বের সামুদ্রিক তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে চলাচল করে। সেখানে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে প্রথম আঘাত আসে এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে মূল্যস্ফীতি ও শিল্প উৎপাদনে।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে আফ্রিকার বহু দেশ এবং লাতিন আমেরিকার অর্থনীতিতেও। সেখানে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে খাদ্য, পরিবহন ও কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করছে। সংস্থাটির মতে, বিশ্বের অন্তত ৪৬টি দেশ জনগণকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে রক্ষা করতে জরুরি সহায়তা বা ভর্তুকিমূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, তেল, গ্যাস ও রাসায়নিক সারের উচ্চমূল্য বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ডব্লিউএফপির হিসাব অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হতে পারে।

অন্যদিকে, ইতিহাস বলছে, প্রতিটি বড় জ্বালানি সংকটের সময় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সরবরাহ সংকটের সময় বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তাদের মুনাফাও দ্রুত বেড়ে যায়। রিস্টাড এনার্জির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রথম মাসেই বিশ্বের বৃহৎ তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে প্রতি ঘণ্টায় কয়েক কোটি ডলার অতিরিক্ত মুনাফা করেছে।

এরপরও সংকটের সমাধান হিসেবে প্রায়ই আরও বেশি তেল উত্তোলন, নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, পরিবেশগত নিয়ম শিথিল করা কিংবা সরকারি ভর্তুকি বাড়ানোর দাবি তোলা হয়। অর্থাৎ যে কাঠামোগত নির্ভরশীলতা সংকট তৈরি করে, সেই নির্ভরশীলতাকেই আরও গভীর করার চেষ্টা চলে। ফলে সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং মুনাফার একটি পুনরাবৃত্ত চক্র তৈরি হয়, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করে সাধারণ মানুষ।

এই বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতারও অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উঠে এসেছে।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক গণপরিবহন এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী অবকাঠামো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমায়। এসব উৎস কোনো প্রণালি অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা যুদ্ধের কারণে সহজে বিঘ্নিত হয় না। ফলে বৈশ্বিক অস্থিরতার সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সংযোগও তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন, কৃষি এবং খাদ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য করা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়নকে কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত হয়তো একসময় থেমে যাবে। হরমুজ প্রণালিও আবার স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু এই সংকট বিশ্বকে আবার মনে করিয়ে দিল, যত দিন বৈশ্বিক অর্থনীতি জীবাশ্ম জ্বালানির অস্থির বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, তত দিন একটি আঞ্চলিক যুদ্ধও মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, খাদ্য সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠবে। তাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তিতে নয়, বরং টেকসই, বিকেন্দ্রীভূত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত