জাপানকে আমরা সাধারণত প্রযুক্তি, শৃঙ্খলা ও উদ্ভাবনের দেশ হিসেবে চিনি। তবে এই দেশের প্রকৃত শক্তি সম্ভবত আরেকটি জায়গায়—মানুষ গড়ে তোলার সংস্কৃতিতে। সেই সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তোশিনোবু টোকুমোতো।
সম্প্রতি তাঁর গবেষণাগারে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর সুযোগ হয়। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষার্থী তৈরি করেন না, তিনি একটি দেশের বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে পারেন।
টোকুমোতো ল্যাবরেটরিতে প্রবেশ করতেই দেয়ালে চোখে পড়ে একটি বাক্য—"Research is my religion." মাত্র চারটি শব্দ, কিন্তু পুরো গবেষণাগারের দর্শন যেন এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে। এখানে গবেষণা পেশা নয়, এক ধরনের সাধনা।
অধ্যাপক টোকুমোতোর সঙ্গে সময় কাটিয়ে আমার মনে হয়েছে, তাঁর জীবনের আরেকটি অঘোষিত দর্শন হতে পারে—"Students are my legacy." কথাটি কোথাও লেখা নেই, কিন্তু তাঁর কাজ, শিক্ষার্থীদের প্রতি নিবেদন এবং তাঁদের সাফল্যই যেন সেই কথার বাস্তব প্রমাণ।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী হওয়া কঠিন, কিন্তু খ্যাতির শিখরে থেকেও বিনয়ী থাকা আরও কঠিন। অধ্যাপক টোকুমোতোর মধ্যে সেই বিরল গুণটি স্পষ্টভাবে দেখেছি।
বাংলাদেশের মৎস্য ও জীববিজ্ঞান গবেষণার ইতিহাসে তাঁর অবদান অনেকটাই নীরব, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ২৫ জনের বেশি বাংলাদেশি গবেষক পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে আরও প্রায় ১০ জন বাংলাদেশি গবেষক তাঁর গবেষণাগারে উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত আছেন।
আজ এই গবেষকেরা বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও গবেষণা নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার কাজের ভেতরও কোথাও না কোথাও জড়িয়ে আছে এই জাপানি শিক্ষকের প্রভাব।
আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে তাঁর আন্তরিকতা। ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যেও তিনি নিজেই পুরো গবেষণাগার ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। প্রতিটি গবেষণা কক্ষ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জেব্রাফিশ গবেষণা ব্যবস্থা এবং চলমান গবেষণার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। কোথাও কোনো আনুষ্ঠানিক দূরত্ব ছিল না; বরং মনে হয়েছে, একজন শিক্ষক তাঁর জ্ঞান অকৃপণভাবে ভাগ করে নিচ্ছেন।
এই সফর আমাকে আরেকটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করিয়েছে—গবেষণার উৎকর্ষ শুধু আধুনিক প্রযুক্তি বা ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না। প্রকৃত গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস, কঠোর পরিশ্রম এবং একজন দূরদর্শী মেন্টরের নেতৃত্বে।
টোকুমোতো ল্যাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা একসঙ্গে কাজ করছেন। সেখানে জাতীয়তার চেয়ে বড় পরিচয় হলো—তাঁরা সবাই গবেষক।
বাংলাদেশ আজ মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। তবে এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে গবেষণার সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা, যৌথ প্রকল্প, বিজ্ঞানী বিনিময় এবং তরুণ গবেষকদের বিশ্বমানের গবেষণাগারে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এই সফরে অধ্যাপক টোকুমোতোর সঙ্গে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জলজ প্রাণিস্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা সহযোগিতা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আশা করা যায়, বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার (স্যাক) এবং শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর গবেষণা অংশীদারত্ব গড়ে উঠবে।
শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় একটি উপলব্ধি আরও দৃঢ় হয়েছে—একটি গবেষণাগার শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ করে না, মানুষও তৈরি করে। আর সেই মানুষরাই একটি দেশের জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।
অধ্যাপক ড. তোশিনোবু টোকুমোতোর নাম হয়তো প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে না। কিন্তু বাংলাদেশের অসংখ্য গবেষকের সাফল্যের ভেতর তাঁর অবদান নীরবে বেঁচে থাকবে। কারণ একজন সত্যিকারের শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি স্বপ্ন দেখান, আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলেন এবং একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন।
বাংলাদেশ ও জাপানের জ্ঞানভিত্তিক এই সহযোগিতা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হোক। আরও বেশি বাংলাদেশি তরুণ বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ পাক। কারণ একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; তার জ্ঞান, গবেষণা এবং সেই আলো ছড়িয়ে দেওয়া মানুষগুলো। অধ্যাপক ড. তোশিনোবু টোকুমোতো নিঃসন্দেহে তাঁদেরই একজন।
2.png)
রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬
জাপানকে আমরা সাধারণত প্রযুক্তি, শৃঙ্খলা ও উদ্ভাবনের দেশ হিসেবে চিনি। তবে এই দেশের প্রকৃত শক্তি সম্ভবত আরেকটি জায়গায়—মানুষ গড়ে তোলার সংস্কৃতিতে। সেই সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তোশিনোবু টোকুমোতো।
সম্প্রতি তাঁর গবেষণাগারে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর সুযোগ হয়। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষার্থী তৈরি করেন না, তিনি একটি দেশের বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে পারেন।
টোকুমোতো ল্যাবরেটরিতে প্রবেশ করতেই দেয়ালে চোখে পড়ে একটি বাক্য—"Research is my religion." মাত্র চারটি শব্দ, কিন্তু পুরো গবেষণাগারের দর্শন যেন এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে। এখানে গবেষণা পেশা নয়, এক ধরনের সাধনা।
অধ্যাপক টোকুমোতোর সঙ্গে সময় কাটিয়ে আমার মনে হয়েছে, তাঁর জীবনের আরেকটি অঘোষিত দর্শন হতে পারে—"Students are my legacy." কথাটি কোথাও লেখা নেই, কিন্তু তাঁর কাজ, শিক্ষার্থীদের প্রতি নিবেদন এবং তাঁদের সাফল্যই যেন সেই কথার বাস্তব প্রমাণ।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী হওয়া কঠিন, কিন্তু খ্যাতির শিখরে থেকেও বিনয়ী থাকা আরও কঠিন। অধ্যাপক টোকুমোতোর মধ্যে সেই বিরল গুণটি স্পষ্টভাবে দেখেছি।
বাংলাদেশের মৎস্য ও জীববিজ্ঞান গবেষণার ইতিহাসে তাঁর অবদান অনেকটাই নীরব, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ২৫ জনের বেশি বাংলাদেশি গবেষক পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে আরও প্রায় ১০ জন বাংলাদেশি গবেষক তাঁর গবেষণাগারে উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত আছেন।
আজ এই গবেষকেরা বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও গবেষণা নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার কাজের ভেতরও কোথাও না কোথাও জড়িয়ে আছে এই জাপানি শিক্ষকের প্রভাব।
আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে তাঁর আন্তরিকতা। ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যেও তিনি নিজেই পুরো গবেষণাগার ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। প্রতিটি গবেষণা কক্ষ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জেব্রাফিশ গবেষণা ব্যবস্থা এবং চলমান গবেষণার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। কোথাও কোনো আনুষ্ঠানিক দূরত্ব ছিল না; বরং মনে হয়েছে, একজন শিক্ষক তাঁর জ্ঞান অকৃপণভাবে ভাগ করে নিচ্ছেন।
এই সফর আমাকে আরেকটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করিয়েছে—গবেষণার উৎকর্ষ শুধু আধুনিক প্রযুক্তি বা ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না। প্রকৃত গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস, কঠোর পরিশ্রম এবং একজন দূরদর্শী মেন্টরের নেতৃত্বে।
টোকুমোতো ল্যাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা একসঙ্গে কাজ করছেন। সেখানে জাতীয়তার চেয়ে বড় পরিচয় হলো—তাঁরা সবাই গবেষক।
বাংলাদেশ আজ মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। তবে এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে গবেষণার সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা, যৌথ প্রকল্প, বিজ্ঞানী বিনিময় এবং তরুণ গবেষকদের বিশ্বমানের গবেষণাগারে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এই সফরে অধ্যাপক টোকুমোতোর সঙ্গে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জলজ প্রাণিস্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা সহযোগিতা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আশা করা যায়, বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার (স্যাক) এবং শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর গবেষণা অংশীদারত্ব গড়ে উঠবে।
শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় একটি উপলব্ধি আরও দৃঢ় হয়েছে—একটি গবেষণাগার শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ করে না, মানুষও তৈরি করে। আর সেই মানুষরাই একটি দেশের জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।
অধ্যাপক ড. তোশিনোবু টোকুমোতোর নাম হয়তো প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে না। কিন্তু বাংলাদেশের অসংখ্য গবেষকের সাফল্যের ভেতর তাঁর অবদান নীরবে বেঁচে থাকবে। কারণ একজন সত্যিকারের শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি স্বপ্ন দেখান, আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলেন এবং একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন।
বাংলাদেশ ও জাপানের জ্ঞানভিত্তিক এই সহযোগিতা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হোক। আরও বেশি বাংলাদেশি তরুণ বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ পাক। কারণ একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; তার জ্ঞান, গবেষণা এবং সেই আলো ছড়িয়ে দেওয়া মানুষগুলো। অধ্যাপক ড. তোশিনোবু টোকুমোতো নিঃসন্দেহে তাঁদেরই একজন।
2.png)