মতামত
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক গুঞ্জন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, সাংবিধানিক শাসন, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আবেগের নয়, বরং আইন, রাজনীতি এবং কূটনৈতিক সমীকরণের আলোকে বিশ্লেষণ করাই জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলেই মনে হয়। কারণ দেশে ফিরলে তাকে শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হবে না; তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ারও সম্মুখীন হতে হবে। আইনের শাসন যদি সমভাবে কার্যকর হয়, তাহলে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় তাকে বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না। এ কারণেই দেশে ফেরার প্রশ্নটি রাজনৈতিক ইচ্ছার চেয়ে অনেক বেশি আইনি বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসও এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ২০১৮ সালের পর যদি একটি প্রতিযোগিতামূলক, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর হতো, তাহলে পরিস্থিতি আজ ভিন্ন হতে পারত। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রাষ্ট্র ও শাসক—উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ক্ষমতা থেকে সম্মানজনক প্রস্থানও ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বরাজনীতির অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। যেসব দেশে দীর্ঘদিন একক নেতৃত্বের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ক্ষমতার পরিবর্তন প্রায়ই সংঘাত, বিচারিক জটিলতা কিংবা নির্বাসনের মধ্য দিয়ে ঘটেছে। ফলে বাংলাদেশের ঘটনাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই; এটি ক্ষমতার রাজনীতির একটি পরিচিত বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দেশে ফেরার আলোচনা কি বাস্তব কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত, নাকি এটি একটি কৌশলগত রাজনৈতিক বার্তা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দিকেও তাকাতে হবে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার এমন এক ভূকৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে ভারত, চীন এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর স্বার্থ একাধিক ক্ষেত্রে মিলিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অনেক সময় আঞ্চলিক কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশেরও অংশ হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে আলোচনাও সেই বৃহত্তর বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নয়।
অন্যদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে যে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস দেখা যাচ্ছে, সেটিও বর্তমান সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এই বাস্তবতায় কোনো বহিরাগত শক্তি যদি নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তাহলে সেটি প্রত্যাশিত ফলের বদলে আরও বড় রাজনৈতিক প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে।
আরও একটি বাস্তবতা লক্ষণীয়। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন এবং সাংগঠনিক কাঠামো ভিন্ন হলেও আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভূমিকা এবং ভারতের প্রভাব নিয়ে তাদের বক্তব্যে উল্লেখযোগ্য মিল দেখা যায়। নেতৃত্ব ও কৌশলে পার্থক্য থাকলেও এই নির্দিষ্ট প্রশ্নে তাদের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই কাছাকাছি। ফলে জাতীয় স্বার্থ বা সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে এলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাময়িকভাবে পেছনে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব নিয়ে আলোচনা অবশ্যই তথ্য, প্রমাণ ও বাস্তব কূটনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। আবেগনির্ভর বা অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা জনমতকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং রাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বার্থেরও ক্ষতি করতে পারে। শক্তিশালী গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো—রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত দেশের জনগণের ভোট ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই নির্ধারিত হবে।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ফিরবেন কি ফিরবেন না—এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে ক্ষমতাসীন কিংবা সাবেক শাসক—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন না এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন হবে শান্তিপূর্ণ, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়? কারণ ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রই স্থায়ী। আর রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর।
বিষয় : শেখ হাসিনা ফেরা
2.png)
রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক গুঞ্জন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, সাংবিধানিক শাসন, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আবেগের নয়, বরং আইন, রাজনীতি এবং কূটনৈতিক সমীকরণের আলোকে বিশ্লেষণ করাই জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলেই মনে হয়। কারণ দেশে ফিরলে তাকে শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হবে না; তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ারও সম্মুখীন হতে হবে। আইনের শাসন যদি সমভাবে কার্যকর হয়, তাহলে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় তাকে বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না। এ কারণেই দেশে ফেরার প্রশ্নটি রাজনৈতিক ইচ্ছার চেয়ে অনেক বেশি আইনি বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসও এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ২০১৮ সালের পর যদি একটি প্রতিযোগিতামূলক, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর হতো, তাহলে পরিস্থিতি আজ ভিন্ন হতে পারত। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রাষ্ট্র ও শাসক—উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ক্ষমতা থেকে সম্মানজনক প্রস্থানও ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বরাজনীতির অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। যেসব দেশে দীর্ঘদিন একক নেতৃত্বের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ক্ষমতার পরিবর্তন প্রায়ই সংঘাত, বিচারিক জটিলতা কিংবা নির্বাসনের মধ্য দিয়ে ঘটেছে। ফলে বাংলাদেশের ঘটনাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই; এটি ক্ষমতার রাজনীতির একটি পরিচিত বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দেশে ফেরার আলোচনা কি বাস্তব কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত, নাকি এটি একটি কৌশলগত রাজনৈতিক বার্তা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দিকেও তাকাতে হবে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার এমন এক ভূকৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে ভারত, চীন এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর স্বার্থ একাধিক ক্ষেত্রে মিলিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অনেক সময় আঞ্চলিক কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশেরও অংশ হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে আলোচনাও সেই বৃহত্তর বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নয়।
অন্যদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে যে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস দেখা যাচ্ছে, সেটিও বর্তমান সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এই বাস্তবতায় কোনো বহিরাগত শক্তি যদি নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তাহলে সেটি প্রত্যাশিত ফলের বদলে আরও বড় রাজনৈতিক প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে।
আরও একটি বাস্তবতা লক্ষণীয়। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন এবং সাংগঠনিক কাঠামো ভিন্ন হলেও আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভূমিকা এবং ভারতের প্রভাব নিয়ে তাদের বক্তব্যে উল্লেখযোগ্য মিল দেখা যায়। নেতৃত্ব ও কৌশলে পার্থক্য থাকলেও এই নির্দিষ্ট প্রশ্নে তাদের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই কাছাকাছি। ফলে জাতীয় স্বার্থ বা সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে এলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাময়িকভাবে পেছনে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব নিয়ে আলোচনা অবশ্যই তথ্য, প্রমাণ ও বাস্তব কূটনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। আবেগনির্ভর বা অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা জনমতকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং রাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বার্থেরও ক্ষতি করতে পারে। শক্তিশালী গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো—রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত দেশের জনগণের ভোট ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই নির্ধারিত হবে।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ফিরবেন কি ফিরবেন না—এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে ক্ষমতাসীন কিংবা সাবেক শাসক—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন না এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন হবে শান্তিপূর্ণ, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়? কারণ ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রই স্থায়ী। আর রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর।
2.png)