বাংলাদেশ
বাংলাদেশে বর্ষাকালের স্বাভাবিক চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগের তুলনায় মৌসুমি বায়ু দেরিতে আসছে, বর্ষার মধ্যে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি থাকছে না, আবার অল্প সময়ের মধ্যেই হচ্ছে অতিভারী বর্ষণ। আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অস্বাভাবিক আবহাওয়া এখন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩১ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৭৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অথচ বর্ষা শুরুর মাস জুনে বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। ১৫ জুলাইয়ের মধ্যেই দেশের স্বাভাবিক মাসিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, যা বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
এই অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মার্চ মাসের ভারী বৃষ্টিতে সারা দেশে প্রায় ২ হাজার ১৩১ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের ৯১৬ হেক্টর আলুর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত টানা ভারী বৃষ্টিতে সাতটি হাওর জেলায় প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
সর্বশেষ ৬ থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রামের পাঁচটি এবং সিলেটের দুটি জেলার ২৭ হাজার ১১ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার কৃষক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ বলেন, এ বছরের বর্ষা শুরু হয়েছে একেবারেই ব্যতিক্রমীভাবে। শীত মৌসুমে প্রায় বৃষ্টিই হয়নি। কিন্তু মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে পশ্চিমা লঘুচাপ সক্রিয় থাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে জুনে বর্ষার সময় বৃষ্টির পরিবর্তে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে।
তার ভাষায়, "যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা, তখন তীব্র গরম পড়েছে। আবার যে সময়ে সাধারণত এত গরম থাকে, সেই সময়েই অতিবৃষ্টি হয়েছে।"
২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ‘চেঞ্জিং ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে মোট মৌসুমি বৃষ্টিপাত খুব বেশি পরিবর্তন না হলেও বৃষ্টির ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা ও রাজশাহীতে প্রতি দশকে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৭ দিন করে বৃষ্টির দিন কমেছে। একই সময়ে শুষ্ক দিনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৭ দিন।
ড. বজলুর রশিদ জানান, গত এক দশকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ দিন দেরিতে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আগে মৌসুমি বায়ু প্রবেশের পর টানা চার থেকে পাঁচ দিন বৃষ্টি হতো। এখন বর্ষা দুর্বলভাবে শুরু হয়, এরপর হঠাৎ স্বল্প সময়ের মধ্যে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটছে।
তার মতে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও নিম্নচাপের গতিপথ পরিবর্তনের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে এসব সিস্টেমের আর্দ্রতা প্রথমে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকায় বেশি বৃষ্টি ঘটাচ্ছে, পরে দেশের অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
এ ছাড়া এল নিনোর প্রভাবেও সামগ্রিকভাবে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কিছুটা কমছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে অতিভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
বিষয় : বর্ষা কৃষক ও কৃষি
2.png)
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশে বর্ষাকালের স্বাভাবিক চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগের তুলনায় মৌসুমি বায়ু দেরিতে আসছে, বর্ষার মধ্যে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি থাকছে না, আবার অল্প সময়ের মধ্যেই হচ্ছে অতিভারী বর্ষণ। আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অস্বাভাবিক আবহাওয়া এখন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩১ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৭৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অথচ বর্ষা শুরুর মাস জুনে বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। ১৫ জুলাইয়ের মধ্যেই দেশের স্বাভাবিক মাসিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, যা বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
এই অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মার্চ মাসের ভারী বৃষ্টিতে সারা দেশে প্রায় ২ হাজার ১৩১ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের ৯১৬ হেক্টর আলুর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত টানা ভারী বৃষ্টিতে সাতটি হাওর জেলায় প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
সর্বশেষ ৬ থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রামের পাঁচটি এবং সিলেটের দুটি জেলার ২৭ হাজার ১১ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার কৃষক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ বলেন, এ বছরের বর্ষা শুরু হয়েছে একেবারেই ব্যতিক্রমীভাবে। শীত মৌসুমে প্রায় বৃষ্টিই হয়নি। কিন্তু মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে পশ্চিমা লঘুচাপ সক্রিয় থাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে জুনে বর্ষার সময় বৃষ্টির পরিবর্তে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে।
তার ভাষায়, "যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা, তখন তীব্র গরম পড়েছে। আবার যে সময়ে সাধারণত এত গরম থাকে, সেই সময়েই অতিবৃষ্টি হয়েছে।"
২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ‘চেঞ্জিং ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে মোট মৌসুমি বৃষ্টিপাত খুব বেশি পরিবর্তন না হলেও বৃষ্টির ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা ও রাজশাহীতে প্রতি দশকে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৭ দিন করে বৃষ্টির দিন কমেছে। একই সময়ে শুষ্ক দিনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৭ দিন।
ড. বজলুর রশিদ জানান, গত এক দশকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ দিন দেরিতে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আগে মৌসুমি বায়ু প্রবেশের পর টানা চার থেকে পাঁচ দিন বৃষ্টি হতো। এখন বর্ষা দুর্বলভাবে শুরু হয়, এরপর হঠাৎ স্বল্প সময়ের মধ্যে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটছে।
তার মতে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও নিম্নচাপের গতিপথ পরিবর্তনের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে এসব সিস্টেমের আর্দ্রতা প্রথমে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকায় বেশি বৃষ্টি ঘটাচ্ছে, পরে দেশের অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
এ ছাড়া এল নিনোর প্রভাবেও সামগ্রিকভাবে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কিছুটা কমছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে অতিভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
2.png)