অর্থনীতি
প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় দেশের টেক্সটাইল শিল্প ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, কেউ কেউ বিক্রির সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, আবার অসংখ্য মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে গ্যাস সরবরাহে সংকট, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় এবং নীতিগত সমস্যার কারণে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানিমুখী এই শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে।
একটি স্পিনিং মিলের মালিক খোরশেদ আলম জানান, তার কারখানার জন্য অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই হলেও গত সাড়ে চার বছর ধরে গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৫ পিএসআই গ্যাস পাচ্ছেন। অথচ শিল্পকারখানার গ্যাসচালিত ইঞ্জিন ও বয়লার সচল রাখতে অন্তত ৮ থেকে ১০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, অপর্যাপ্ত গ্যাসচাপের কারণে এ সময়ে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে ৪৪টি চিঠি দিয়েছেন। এসব চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলাতেও। কিন্তু এত উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
বিকল্প হিসেবে সম্প্রতি ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধাসহ একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রায় ৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি। তবে সেটি পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয় বলে জানান।
শুধু খোরশেদ আলম নন, একই ধরনের সংকটে পড়েছেন দেশের আরও বহু শিল্পোদ্যোক্তা। রেজা গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে এম শহীদ রেজা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকটের কারণে তিনি তার টেক্সটাইল কারখানা বিক্রির পথ খুঁজছেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য বলছে, ২০১৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৩৪টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১১৪টি স্পিনিং মিল এবং বাকিগুলো উইভিং, ডাইং ও অন্যান্য টেক্সটাইল কারখানা।
বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ১২০টি মিল বাংলাদেশ ব্যাংকের রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কর্মসূচির আওতায় আবার চালু করার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে অবশিষ্ট ১১৪টি কারখানার পুনরায় উৎপাদনে ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্পে গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধায় বিদেশি সুতা ও কাপড় সহজে আমদানি হওয়ায় দেশীয় উৎপাদকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন।
আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান হোসেন মেহমুদ বলেন, বর্তমানে তাদের কারখানায় মাত্র ১ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে যন্ত্রপাতি সচল রাখা সম্ভব নয়। ফলে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল সিএনজি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ে সাড়ে ৭ থেকে ৮ টাকা, সেখানে সিএনজি ব্যবহার করলে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৫ টাকা। তবু সিএনজির সরবরাহও নিয়মিত নয় এবং এলপিজি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বিকল্প নয়।
তার মতে, গ্যাস সংকটের কারণে ডাইং ও প্রসেসিং কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের অস্থিতিশীলতার কারণে অধিকাংশ কারখানাই নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গ্যাস না থাকায় সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ভোল্টেজের ওঠানামায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি হচ্ছে।
হোসেন মেহমুদের ভাষ্য, চীন ও ভারতে শিল্পকারখানাগুলোকে জ্বালানি নিয়ে ভাবতে হয় না। সরকার সেখানে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানে টেক্সটাইল শিল্পকে নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে কোথায় পিছিয়ে পড়ছে, তা সরকারকে খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তিনি।
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু টেক্সটাইল শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। সিরামিক, টায়ার, ফুটওয়্যারসহ আরও অনেক শিল্প একই সমস্যায় ভুগছে।
রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান ফার সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইরফান উদ্দিন বলেন, দিনের বেলায় তাদের কারখানায় অনেক সময় গ্যাসের চাপ ১ পিএসআইয়েরও নিচে নেমে যায়। রাতে কিছুটা বাড়লেও উৎপাদন সচল রাখতে বাধ্য হয়ে এলপিজি কিংবা সিএনজি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
মেঘনা গ্রুপের টায়ার বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফুল বারী জানান, শ্রীপুর কারখানার গ্যাস লোড বাড়ানোর আবেদন এক দশকেরও বেশি আগে করা হয়েছিল। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) অনুমোদনের সুপারিশ করলেও তিতাস এখন পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করেনি।
তিনি আরও জানান, সিলেট অঞ্চলে তাদের আরেকটি টায়ার কারখানায় দিনে মাত্র ১৬ ঘণ্টা এবং মাসে ২৪ দিন গ্যাস পাওয়া যায়। এতে ধারাবাহিক উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না এবং উৎপাদনশীলতা কমে লোকসান বাড়ছে।
অন্যদিকে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান জেনিস শুজ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল না হলেও অস্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ তাদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির খান বলেন, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মেশিনের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তার মতে, বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগেই বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এদিকে তিতাস গ্যাস তাদের ওয়েবসাইটে স্বীকার করেছে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি করা এলএনজির ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
তিতাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট গ্রাহক ছিল ২৭ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে শিল্প গ্রাহক ৫ হাজার ৬৭৩টি।
প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে শিল্প গ্রাহকদের মাসিক গ্যাস সরবরাহ ছিল ৪ হাজার ৩৩০ এমএমসি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৩৭ এমএমসি। একই সময়ে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মাসিক সরবরাহও ৪ হাজার ৬৭২ এমএমসি থেকে কমে ৩ হাজার ৯৮৯ এমএমসিতে নেমে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিতাসের এক কর্মকর্তা জানান, এরপর থেকে শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে মাসে আরও প্রায় ৩০০ এমএমসি গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে, ফলে সংকট আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজের সঙ্গে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পকারখানার গ্যাসচালিত ইঞ্জিন ও বয়লার নির্ভরযোগ্যভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ৮ থেকে ১০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে দরকার ১২ থেকে ১৫ পিএসআই। চাপ ৭ থেকে ৮ পিএসআইয়ের নিচে নেমে গেলে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং বয়লার প্রয়োজনীয় বাষ্প তৈরি করতে পারে না।
আর ২ থেকে ৫ পিএসআই গ্যাসচাপে বড় শিল্পকারখানাগুলো কার্যত সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে। এতে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়, ডাইং ও প্রসেসিং কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় বাষ্পের ঘাটতি দেখা দেয়, স্পিন্ডলের গতি কমে যায় এবং উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। শেষ পর্যন্ত অনেক কারখানাকে ব্যয়বহুল ডিজেল বা সিএনজিচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
খোরশেদ আলমের কথায়, ‘আমাদের ভর্তুকির গ্যাস দরকার নেই। আমরা যে গ্যাসের বিল দিচ্ছি, সেটি ব্যবহারের জন্য শুধু প্রয়োজন পর্যাপ্ত চাপ।’
বিষয় : গ্যাস সংকট
2.png)
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬
প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় দেশের টেক্সটাইল শিল্প ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, কেউ কেউ বিক্রির সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, আবার অসংখ্য মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে গ্যাস সরবরাহে সংকট, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় এবং নীতিগত সমস্যার কারণে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানিমুখী এই শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে।
একটি স্পিনিং মিলের মালিক খোরশেদ আলম জানান, তার কারখানার জন্য অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই হলেও গত সাড়ে চার বছর ধরে গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৫ পিএসআই গ্যাস পাচ্ছেন। অথচ শিল্পকারখানার গ্যাসচালিত ইঞ্জিন ও বয়লার সচল রাখতে অন্তত ৮ থেকে ১০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, অপর্যাপ্ত গ্যাসচাপের কারণে এ সময়ে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে ৪৪টি চিঠি দিয়েছেন। এসব চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলাতেও। কিন্তু এত উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
বিকল্প হিসেবে সম্প্রতি ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধাসহ একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রায় ৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি। তবে সেটি পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয় বলে জানান।
শুধু খোরশেদ আলম নন, একই ধরনের সংকটে পড়েছেন দেশের আরও বহু শিল্পোদ্যোক্তা। রেজা গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে এম শহীদ রেজা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকটের কারণে তিনি তার টেক্সটাইল কারখানা বিক্রির পথ খুঁজছেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য বলছে, ২০১৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৩৪টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১১৪টি স্পিনিং মিল এবং বাকিগুলো উইভিং, ডাইং ও অন্যান্য টেক্সটাইল কারখানা।
বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ১২০টি মিল বাংলাদেশ ব্যাংকের রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন কর্মসূচির আওতায় আবার চালু করার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে অবশিষ্ট ১১৪টি কারখানার পুনরায় উৎপাদনে ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্পে গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধায় বিদেশি সুতা ও কাপড় সহজে আমদানি হওয়ায় দেশীয় উৎপাদকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন।
আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান হোসেন মেহমুদ বলেন, বর্তমানে তাদের কারখানায় মাত্র ১ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে যন্ত্রপাতি সচল রাখা সম্ভব নয়। ফলে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল সিএনজি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ে সাড়ে ৭ থেকে ৮ টাকা, সেখানে সিএনজি ব্যবহার করলে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৫ টাকা। তবু সিএনজির সরবরাহও নিয়মিত নয় এবং এলপিজি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বিকল্প নয়।
তার মতে, গ্যাস সংকটের কারণে ডাইং ও প্রসেসিং কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের অস্থিতিশীলতার কারণে অধিকাংশ কারখানাই নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গ্যাস না থাকায় সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ভোল্টেজের ওঠানামায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি হচ্ছে।
হোসেন মেহমুদের ভাষ্য, চীন ও ভারতে শিল্পকারখানাগুলোকে জ্বালানি নিয়ে ভাবতে হয় না। সরকার সেখানে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানে টেক্সটাইল শিল্পকে নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে কোথায় পিছিয়ে পড়ছে, তা সরকারকে খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তিনি।
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু টেক্সটাইল শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। সিরামিক, টায়ার, ফুটওয়্যারসহ আরও অনেক শিল্প একই সমস্যায় ভুগছে।
রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান ফার সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইরফান উদ্দিন বলেন, দিনের বেলায় তাদের কারখানায় অনেক সময় গ্যাসের চাপ ১ পিএসআইয়েরও নিচে নেমে যায়। রাতে কিছুটা বাড়লেও উৎপাদন সচল রাখতে বাধ্য হয়ে এলপিজি কিংবা সিএনজি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
মেঘনা গ্রুপের টায়ার বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফুল বারী জানান, শ্রীপুর কারখানার গ্যাস লোড বাড়ানোর আবেদন এক দশকেরও বেশি আগে করা হয়েছিল। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) অনুমোদনের সুপারিশ করলেও তিতাস এখন পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করেনি।
তিনি আরও জানান, সিলেট অঞ্চলে তাদের আরেকটি টায়ার কারখানায় দিনে মাত্র ১৬ ঘণ্টা এবং মাসে ২৪ দিন গ্যাস পাওয়া যায়। এতে ধারাবাহিক উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না এবং উৎপাদনশীলতা কমে লোকসান বাড়ছে।
অন্যদিকে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান জেনিস শুজ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল না হলেও অস্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ তাদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির খান বলেন, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মেশিনের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তার মতে, বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগেই বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এদিকে তিতাস গ্যাস তাদের ওয়েবসাইটে স্বীকার করেছে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি করা এলএনজির ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
তিতাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট গ্রাহক ছিল ২৭ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে শিল্প গ্রাহক ৫ হাজার ৬৭৩টি।
প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে শিল্প গ্রাহকদের মাসিক গ্যাস সরবরাহ ছিল ৪ হাজার ৩৩০ এমএমসি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৩৭ এমএমসি। একই সময়ে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মাসিক সরবরাহও ৪ হাজার ৬৭২ এমএমসি থেকে কমে ৩ হাজার ৯৮৯ এমএমসিতে নেমে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিতাসের এক কর্মকর্তা জানান, এরপর থেকে শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে মাসে আরও প্রায় ৩০০ এমএমসি গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে, ফলে সংকট আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজের সঙ্গে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পকারখানার গ্যাসচালিত ইঞ্জিন ও বয়লার নির্ভরযোগ্যভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ৮ থেকে ১০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে দরকার ১২ থেকে ১৫ পিএসআই। চাপ ৭ থেকে ৮ পিএসআইয়ের নিচে নেমে গেলে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং বয়লার প্রয়োজনীয় বাষ্প তৈরি করতে পারে না।
আর ২ থেকে ৫ পিএসআই গ্যাসচাপে বড় শিল্পকারখানাগুলো কার্যত সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে। এতে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়, ডাইং ও প্রসেসিং কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় বাষ্পের ঘাটতি দেখা দেয়, স্পিন্ডলের গতি কমে যায় এবং উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। শেষ পর্যন্ত অনেক কারখানাকে ব্যয়বহুল ডিজেল বা সিএনজিচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
খোরশেদ আলমের কথায়, ‘আমাদের ভর্তুকির গ্যাস দরকার নেই। আমরা যে গ্যাসের বিল দিচ্ছি, সেটি ব্যবহারের জন্য শুধু প্রয়োজন পর্যাপ্ত চাপ।’
2.png)