সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 সাহিত্যসাহিত্য

হিমঘর ও এক টুকরো রোদ

হিমঘর ও এক টুকরো রোদ


মানুষের মস্তিষ্ক বড় অদ্ভুত এক যন্ত্র। সেখানে যুক্তির চেয়ে স্বার্থ যখন জেঁকে বসে, তখন হৃদস্পন্দন আর বিবেকের শব্দের চেয়ে খালি ফ্রিজের কম্পন বেশি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। শারমিনের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হয়েছে। শারমিন আমার স্ত্রী, অত্যন্ত হিসেবী এবং যাকে বলে 'পারফেক্ট হোমমেকার'। তবে তার পারফেকশনের মাপকাঠি হলো—নিজের ঘর, নিজের সন্তান এবং নিজের আরাম।

কোরবানি ঈদের সাত দিন বাকি। ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছি। শারমিন এসে পাশে বসলো। তার হাতে একটা ডায়েরি। সে ডায়েরি খুলে ফর্দ করতে বসেছে।

আমি বললাম, “মা তো কাল ফোন করেছিলেন। বলছিলেন, এবার যেন একটু আগেভাগে যাই। বড় আপা আর দুলাভাইও নাকি আসবেন।”

শারমিন ডায়েরি থেকে মাথা না তুলে নিস্পৃহ গলায় বললো, “গ্রামে গিয়ে লাভটা কী আরিফ? তার চেয়ে এবার ঢাকাতেই কোরবানি দাও।”

আমি একটু অবাক হয়ে তাকালাম। “গ্রামে কোরবানি দেওয়া তো আমাদের বহু বছরের নিয়ম। আব্বার কবরটা সেখানে, মা একা থাকেন। আর ওখানে দিলে গ্রামের গরিব মানুষগুলোও একটু খেতে পায়।” 

শারমিন এবার কলম থামিয়ে আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালো। তার চোখে এক ধরনের ঠান্ডা যুক্তি। সে বললো, “দেখো আরিফ, ইমোশন দিয়ে দুনিয়া চলে না। গতবার গ্রামে গিয়েছিলে, মনে আছে? দুই লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনলে। অথচ ঢাকা ফেরার সময় সাথে আনতে পারলে মাত্র পাঁচ কেজি মাংস। তোমার মা সব বিলিয়ে দিলেন। বাকিটা ওখানে মেহমানদারিতেই শেষ। অথচ সারা বছর এক কেজি গরুর মাংসের দাম কত জানো? সাত-আটশ টাকা। ঢাকাতে দিলে আমরা অন্তত তিন ভাগের দুই ভাগ ফ্রিজে রাখতে পারবো। বাচ্চারাই তো খাবে, অন্য কেউ তো না।”

আমি চুপ করে রইলাম। আমাদের খাবার ঘরে একটা বিশাল সাইজের ডিপ ফ্রিজ আছে। ওটাকে শারমিন ডাকে 'ব্লু  আইল্যান্ড' বলে। কোরবানি ঈদ আসলে সেই আইল্যান্ডের দখল নিয়ে তার যুদ্ধ শুরু হয়। গ্রামের আত্মীয়স্বজন বা অনাহারী মানুষের চেয়ে তার কাছে ওই নীল ফ্রিজের শূন্যস্থান পূরণ করাটা অনেক বেশি জরুরি।

সেবার শেষ পর্যন্ত মায়ের আকুতি ছাপিয়ে শারমিনের জেদই জিতলো। ঢাকার এক কোরবানি হাটে ধুলোবালি মেখে   ঘুরলাম। চার লাখ টাকা দিয়ে এক বিশাল গরু কেনা হলো। ঈদের দিন গলির মোড়ে মাংস কাটাকাটি হলো। শারমিন খুব কায়দা করে এক ভাগ গরিবের জন্য আলাদা করলো—যেটাতে হাড় আর চর্বির পরিমাণই বেশি। বাকি দুই ভাগ যত্ন করে প্যাকেট করে নীল ফ্রিজে ঢোকানো হলো। ঈদের বিকেলে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছি, শারমিন তখন তৃপ্তির হাসি হেসে বললো, “দেখেছ আরিফ? অন্তত আট-দশ মাস আর মাংস কিনতে হবে না। কী নিশ্চিন্ত!”

আমি শারমিনের দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি মাকে সেদিন যখন বললাম এবার গ্রামে যেতে  পারছি না, তখন  ওপ্রান্ত থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো। মা শুধু বললেন, “আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। তোরা ভালো থাকিস। আমি  মোতালেবকে বলেছি ছোট একটা খাসি দিয়ে কোরবানিটা দিয়ে দিতে।” মোতালেব পাশের বাড়ীর দুরসম্পর্কের এক আত্মীয়। মার দুঃসময়ের সবচেয়ে আপনজন,হাতের লাঠি। কার্যত সন্তানের চেয়ে আপন।  

মার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না। কিন্তু ওই না থাকাটাই আমাকে কষ্ট দিচ্ছিলো। ঢাকার ফ্ল্যাটবাড়ির এসি আর ফ্রিজের ঠাণ্ডায় সেই কষ্টের বিঁধুনী বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।  

ছয় মাস কেটে গেছে। ডিসেম্বর মাস। বাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ। শারমিন এবার নিজেই গ্রামের বাড়ি যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে।

আমি হাসলাম। “কী ব্যাপার? কোরবানিতে তো গ্রামে যেতে অনীহা ছিল, এবার কেন?”

শারমিন গোছাতে গোছাতে বললো, “আরে পাগল! এখন ডিসেম্বর না? গ্রামে টাটকা খেজুরের রস পাওয়া যাবে, মার হাতের ভাপা পিঠা, আর হাঁসের মাংস। তাছাড়া তোমার মার ওখানে থাকলে হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়া যায়। আমাকে মা কিচ্ছু করতে দেয় না। কোনো রান্নার ঝামেলা নেই, বাজারের চিন্তা নেই। বাচ্চাদেরও একটু ফ্রেশ বাতাস খাওয়ানো হবে।”

আমি বুঝলাম। এবার গ্রামের বাড়িটা শারমিনের কাছে কোনো পারিবারিক টান নয়, বরং একটা 'লাক্সারি রিসোর্ট'। যেখানে গেলে নিজের বাজেট থেকে টাকা খরচ করতে হয় না, বরং শাশুড়ি সেই মাসে মাসে পাঠানো সংসার খরচের থেকে জমানো টাকায় রাজকীয় আতিথেয়তা পাওয়া যায়।  

আমরা গ্রামে গেলাম। মা আমাদের দেখে কী যে খুশি! তাঁর জীর্ণ শরীরটা যেন আনন্দে নেচে উঠলো। প্রথম দিনেই তিনি হাঁস জবাই করলেন। টাটকা দুধ, চালের আটা দিয়ে পাতলা চিতই তার সাথে হাঁসের মাংসের ঝোল, নারিকেল, গুড় দিয়ে এলাহি কারবার। শারমিন খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে আর ফেসবুকে ছবি দিচ্ছে— 'Enjoying winter at village home with Mother-in-law's magic hand'.

কিন্তু আমার কেন জানি অস্বস্তি হচ্ছিল। রান্নাঘরের এক কোণে মার সেই পুরনো আমলের ছোট ফ্রিজটা পড়ে আছে। সেটার দরজায় জং ধরেছে। একদিন তৃপ্তি করে ভাপা পিঠা খাওয়ার পর আমি চুপিচুপি রান্নাঘরে গেলাম পানি খেতে। মার সেই ফ্রিজটা খোলা ছিল। আমি ভেতরে তাকিয়ে থমকে গেলাম।

ফ্রিজের ভেতরটা একদম ফাঁকা। শুধু একটা ছোট প্লাস্টিকের কৌটা। কৌটার গায়ে মার হাতের কাঁপাকাঁপা অক্ষরে লেখা— 'আরিফ'।

আমি কৌটাটা খুললাম। ভেতরে মাত্র কয়েক টুকরো কোরবানির মাংস। একেবারে শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এমন সময় মা পেছনে এসে দাঁড়ালেন।

আমি ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “মা, এই মাংস এখানে কেন? তুমি খাওনি?”

মা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই। মা বললেন, “না রে বাবা। কোরবানির সময় তোরা আসলি না। মোতালেবকে দিয়ে ছোট একটা খাসিটা জবাই করিয়েছিলাম। তোদের কথা খুব মনে  পড়ছিল। ভাবলাম, আমার আরিফ খাসির পায়া খুব পছন্দ করে। তোরা যখন শীতে আসবি, তখন তোকে রান্না করে দেব। তাই এই কয় টুকরো সরিয়ে রেখেছিলাম।”

আমি মার দিকে তাকালাম। এই বৃদ্ধা মহিলা সারা বছর একবেলা ভালো মাংস খান না। অথচ তিনি ছয় মাস ধরে কয়েক টুকরো মাংস আগলে রেখেছেন তাঁর বড়লোক ছেলের জন্য, যে ছেলে ঢাকায় চার লাখ টাকার গরুর মাংস ফ্রিজে বন্দি করে রেখেছে।

আমি রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসলাম। ড্রয়িংরুমে শারমিন তখন বাচ্চাদের বলছে, “কাল আসার সময় তোমাদের দাদিকে বলবে কিছু চালের গুঁড়ো আর গুড় প্যাকেট করে দিতে। ঢাকায় এসব খাঁটি জিনিস পাওয়া যায় না।”

আমার ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠলো। আমাদের ফ্রিজগুলো মাংসে ঠাসা, কিন্তু আমাদের কলিজাগুলো বরফের চেয়েও ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমরা মা-বাবার কাছে গ্রামে যাই শুধু যখন আমাদের পাওয়ার কিছু থাকে—হয় শীতের পিঠা, না হয় রসের হাঁড়ি। কিন্তু যখন তাঁদের পাশে থাকার কথা, যখন ত্যাগ করার কথা, তখন আমাদের হিসেবি মনটা ফ্রিজের আয়তন মাপতে বসে।

সেদিন রাতে আমার আর ঘুম হলো না। মাঝরাতে চুপিচুপি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কুয়াশাচ্ছন্ন গ্রামের রাত বড় নিঝুম। আমি ভাবছিলাম, আমাদের সন্তানরা বড় হয়ে কী শিখছে? তারা দেখছে তাদের মা-বাবা দাদির বাড়িতে যায় শুধু 'ছুটি কাটাতে' আর 'জিনিসপত্র নিয়ে আসতে'। তারা দেখছে কোরবানি মানে উৎসব নয়, কোরবানি মানে ফ্রিজ ভর্তি করা।

পরদিন সকালে আমরা ঢাকার দিকে রওনা হলাম। গাড়ির ডিকি ভর্তি করে মা আমাদের চাল, গুড়, পিঠা আর শীতের সবজি তুলে দিয়েছেন। শারমিন খুব খুশি। সে বারবার বলছে, “এবার অন্তত এক মাস বাজারের চিন্তা নেই।”

আমি গাড়ি চালাতে চালাতে রিয়ার ভিউ মিররে মার দিকে তাকালাম। মা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন। তাঁর পরনে সেই পুরনো ধোঁয়া শাড়ি। তাঁর ফ্রিজটা এখন পুরোপুরি খালি, কিন্তু তাঁর মনটা এখনো ভালোবাসায় ঠাসা।

বাসায় ফিরে শারমিন যখন খুব উৎসাহ নিয়ে ফ্রিজের দরজা খুললো নতুন জিনিসগুলো রাখার জন্য, আমি তখন পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম। নীল ফ্রিজটা থেকে ভকভক করে ঠান্ডা বাতাস বের হচ্ছে। সেখানে আগের কোরবানির মাংস এখনো স্তূপ হয়ে আছে।

শারমিন হাত বাড়িয়ে এক প্যাকেট বের করে বললো, “উফ! এটা তো গত জুনের মাংস। এখনো শেষ হয়নি। ফ্রিজটা একদম জ্যাম হয়ে আছে।”

আমি শান্ত গলায় বললাম, “শারমিন, ওই মাংসগুলো ফেলে দাও।”

শারমিন অবাক হয়ে তাকালো। “ফেলে দেব কেন? এগুলো তো ভালো আছে।”

আমি বললাম, “না, ভালো নেই। ওগুলোতে পচন ধরেছে। ওগুলো স্বার্থপরতার মাংস। ওগুলো খেলে আমাদের বিবেক মরে যাবে। তার চেয়ে বরং কাল মা যে কয়েক টুকরো মাংস দিয়েছেন, ওটাই রান্না কোরো। ওটাতে ছয় মাসের একটা অপেক্ষা আর ভালোবাসা লেগে আছে।”

শারমিন আমার কথা ঠিক বুঝলো কি না জানি না। সে অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলো। আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আকাশটা মেঘলা,আবহাওয়া কুয়াশাচ্ছন্ন। আমার মনটা তার চেয়ে বেশি।

শহরের এই যান্ত্রিক জীবনে আমাদের ফ্রিজগুলো হয়তো সারা বছর পূর্ণ থাকে, কিন্তু আমাদের আত্মাগুলো ক্রমশ এক একটা হিমঘর হয়ে যাচ্ছে। যেখানে রক্ত আছে, মাংস আছে, শুধু প্রাণের সেই স্পন্দনটুকু নেই। আমরা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে মাংসের ওজনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখে গেছি। আর এটাই হয়তো এই যুগের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা।

হিমঘর ও এক টুকরো রোদ
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


হিমঘর ও এক টুকরো রোদ

প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬

featured Image


মানুষের মস্তিষ্ক বড় অদ্ভুত এক যন্ত্র। সেখানে যুক্তির চেয়ে স্বার্থ যখন জেঁকে বসে, তখন হৃদস্পন্দন আর বিবেকের শব্দের চেয়ে খালি ফ্রিজের কম্পন বেশি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। শারমিনের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হয়েছে। শারমিন আমার স্ত্রী, অত্যন্ত হিসেবী এবং যাকে বলে 'পারফেক্ট হোমমেকার'। তবে তার পারফেকশনের মাপকাঠি হলো—নিজের ঘর, নিজের সন্তান এবং নিজের আরাম।

কোরবানি ঈদের সাত দিন বাকি। ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছি। শারমিন এসে পাশে বসলো। তার হাতে একটা ডায়েরি। সে ডায়েরি খুলে ফর্দ করতে বসেছে।

আমি বললাম, “মা তো কাল ফোন করেছিলেন। বলছিলেন, এবার যেন একটু আগেভাগে যাই। বড় আপা আর দুলাভাইও নাকি আসবেন।”

শারমিন ডায়েরি থেকে মাথা না তুলে নিস্পৃহ গলায় বললো, “গ্রামে গিয়ে লাভটা কী আরিফ? তার চেয়ে এবার ঢাকাতেই কোরবানি দাও।”

আমি একটু অবাক হয়ে তাকালাম। “গ্রামে কোরবানি দেওয়া তো আমাদের বহু বছরের নিয়ম। আব্বার কবরটা সেখানে, মা একা থাকেন। আর ওখানে দিলে গ্রামের গরিব মানুষগুলোও একটু খেতে পায়।” 

শারমিন এবার কলম থামিয়ে আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালো। তার চোখে এক ধরনের ঠান্ডা যুক্তি। সে বললো, “দেখো আরিফ, ইমোশন দিয়ে দুনিয়া চলে না। গতবার গ্রামে গিয়েছিলে, মনে আছে? দুই লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনলে। অথচ ঢাকা ফেরার সময় সাথে আনতে পারলে মাত্র পাঁচ কেজি মাংস। তোমার মা সব বিলিয়ে দিলেন। বাকিটা ওখানে মেহমানদারিতেই শেষ। অথচ সারা বছর এক কেজি গরুর মাংসের দাম কত জানো? সাত-আটশ টাকা। ঢাকাতে দিলে আমরা অন্তত তিন ভাগের দুই ভাগ ফ্রিজে রাখতে পারবো। বাচ্চারাই তো খাবে, অন্য কেউ তো না।”

আমি চুপ করে রইলাম। আমাদের খাবার ঘরে একটা বিশাল সাইজের ডিপ ফ্রিজ আছে। ওটাকে শারমিন ডাকে 'ব্লু  আইল্যান্ড' বলে। কোরবানি ঈদ আসলে সেই আইল্যান্ডের দখল নিয়ে তার যুদ্ধ শুরু হয়। গ্রামের আত্মীয়স্বজন বা অনাহারী মানুষের চেয়ে তার কাছে ওই নীল ফ্রিজের শূন্যস্থান পূরণ করাটা অনেক বেশি জরুরি।

সেবার শেষ পর্যন্ত মায়ের আকুতি ছাপিয়ে শারমিনের জেদই জিতলো। ঢাকার এক কোরবানি হাটে ধুলোবালি মেখে   ঘুরলাম। চার লাখ টাকা দিয়ে এক বিশাল গরু কেনা হলো। ঈদের দিন গলির মোড়ে মাংস কাটাকাটি হলো। শারমিন খুব কায়দা করে এক ভাগ গরিবের জন্য আলাদা করলো—যেটাতে হাড় আর চর্বির পরিমাণই বেশি। বাকি দুই ভাগ যত্ন করে প্যাকেট করে নীল ফ্রিজে ঢোকানো হলো। ঈদের বিকেলে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছি, শারমিন তখন তৃপ্তির হাসি হেসে বললো, “দেখেছ আরিফ? অন্তত আট-দশ মাস আর মাংস কিনতে হবে না। কী নিশ্চিন্ত!”

আমি শারমিনের দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি মাকে সেদিন যখন বললাম এবার গ্রামে যেতে  পারছি না, তখন  ওপ্রান্ত থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো। মা শুধু বললেন, “আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। তোরা ভালো থাকিস। আমি  মোতালেবকে বলেছি ছোট একটা খাসি দিয়ে কোরবানিটা দিয়ে দিতে।” মোতালেব পাশের বাড়ীর দুরসম্পর্কের এক আত্মীয়। মার দুঃসময়ের সবচেয়ে আপনজন,হাতের লাঠি। কার্যত সন্তানের চেয়ে আপন।  

মার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না। কিন্তু ওই না থাকাটাই আমাকে কষ্ট দিচ্ছিলো। ঢাকার ফ্ল্যাটবাড়ির এসি আর ফ্রিজের ঠাণ্ডায় সেই কষ্টের বিঁধুনী বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।  

ছয় মাস কেটে গেছে। ডিসেম্বর মাস। বাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ। শারমিন এবার নিজেই গ্রামের বাড়ি যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে।

আমি হাসলাম। “কী ব্যাপার? কোরবানিতে তো গ্রামে যেতে অনীহা ছিল, এবার কেন?”

শারমিন গোছাতে গোছাতে বললো, “আরে পাগল! এখন ডিসেম্বর না? গ্রামে টাটকা খেজুরের রস পাওয়া যাবে, মার হাতের ভাপা পিঠা, আর হাঁসের মাংস। তাছাড়া তোমার মার ওখানে থাকলে হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়া যায়। আমাকে মা কিচ্ছু করতে দেয় না। কোনো রান্নার ঝামেলা নেই, বাজারের চিন্তা নেই। বাচ্চাদেরও একটু ফ্রেশ বাতাস খাওয়ানো হবে।”

আমি বুঝলাম। এবার গ্রামের বাড়িটা শারমিনের কাছে কোনো পারিবারিক টান নয়, বরং একটা 'লাক্সারি রিসোর্ট'। যেখানে গেলে নিজের বাজেট থেকে টাকা খরচ করতে হয় না, বরং শাশুড়ি সেই মাসে মাসে পাঠানো সংসার খরচের থেকে জমানো টাকায় রাজকীয় আতিথেয়তা পাওয়া যায়।  

আমরা গ্রামে গেলাম। মা আমাদের দেখে কী যে খুশি! তাঁর জীর্ণ শরীরটা যেন আনন্দে নেচে উঠলো। প্রথম দিনেই তিনি হাঁস জবাই করলেন। টাটকা দুধ, চালের আটা দিয়ে পাতলা চিতই তার সাথে হাঁসের মাংসের ঝোল, নারিকেল, গুড় দিয়ে এলাহি কারবার। শারমিন খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে আর ফেসবুকে ছবি দিচ্ছে— 'Enjoying winter at village home with Mother-in-law's magic hand'.

কিন্তু আমার কেন জানি অস্বস্তি হচ্ছিল। রান্নাঘরের এক কোণে মার সেই পুরনো আমলের ছোট ফ্রিজটা পড়ে আছে। সেটার দরজায় জং ধরেছে। একদিন তৃপ্তি করে ভাপা পিঠা খাওয়ার পর আমি চুপিচুপি রান্নাঘরে গেলাম পানি খেতে। মার সেই ফ্রিজটা খোলা ছিল। আমি ভেতরে তাকিয়ে থমকে গেলাম।

ফ্রিজের ভেতরটা একদম ফাঁকা। শুধু একটা ছোট প্লাস্টিকের কৌটা। কৌটার গায়ে মার হাতের কাঁপাকাঁপা অক্ষরে লেখা— 'আরিফ'।

আমি কৌটাটা খুললাম। ভেতরে মাত্র কয়েক টুকরো কোরবানির মাংস। একেবারে শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এমন সময় মা পেছনে এসে দাঁড়ালেন।

আমি ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “মা, এই মাংস এখানে কেন? তুমি খাওনি?”

মা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই। মা বললেন, “না রে বাবা। কোরবানির সময় তোরা আসলি না। মোতালেবকে দিয়ে ছোট একটা খাসিটা জবাই করিয়েছিলাম। তোদের কথা খুব মনে  পড়ছিল। ভাবলাম, আমার আরিফ খাসির পায়া খুব পছন্দ করে। তোরা যখন শীতে আসবি, তখন তোকে রান্না করে দেব। তাই এই কয় টুকরো সরিয়ে রেখেছিলাম।”

আমি মার দিকে তাকালাম। এই বৃদ্ধা মহিলা সারা বছর একবেলা ভালো মাংস খান না। অথচ তিনি ছয় মাস ধরে কয়েক টুকরো মাংস আগলে রেখেছেন তাঁর বড়লোক ছেলের জন্য, যে ছেলে ঢাকায় চার লাখ টাকার গরুর মাংস ফ্রিজে বন্দি করে রেখেছে।

আমি রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসলাম। ড্রয়িংরুমে শারমিন তখন বাচ্চাদের বলছে, “কাল আসার সময় তোমাদের দাদিকে বলবে কিছু চালের গুঁড়ো আর গুড় প্যাকেট করে দিতে। ঢাকায় এসব খাঁটি জিনিস পাওয়া যায় না।”

আমার ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠলো। আমাদের ফ্রিজগুলো মাংসে ঠাসা, কিন্তু আমাদের কলিজাগুলো বরফের চেয়েও ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমরা মা-বাবার কাছে গ্রামে যাই শুধু যখন আমাদের পাওয়ার কিছু থাকে—হয় শীতের পিঠা, না হয় রসের হাঁড়ি। কিন্তু যখন তাঁদের পাশে থাকার কথা, যখন ত্যাগ করার কথা, তখন আমাদের হিসেবি মনটা ফ্রিজের আয়তন মাপতে বসে।

সেদিন রাতে আমার আর ঘুম হলো না। মাঝরাতে চুপিচুপি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কুয়াশাচ্ছন্ন গ্রামের রাত বড় নিঝুম। আমি ভাবছিলাম, আমাদের সন্তানরা বড় হয়ে কী শিখছে? তারা দেখছে তাদের মা-বাবা দাদির বাড়িতে যায় শুধু 'ছুটি কাটাতে' আর 'জিনিসপত্র নিয়ে আসতে'। তারা দেখছে কোরবানি মানে উৎসব নয়, কোরবানি মানে ফ্রিজ ভর্তি করা।

পরদিন সকালে আমরা ঢাকার দিকে রওনা হলাম। গাড়ির ডিকি ভর্তি করে মা আমাদের চাল, গুড়, পিঠা আর শীতের সবজি তুলে দিয়েছেন। শারমিন খুব খুশি। সে বারবার বলছে, “এবার অন্তত এক মাস বাজারের চিন্তা নেই।”

আমি গাড়ি চালাতে চালাতে রিয়ার ভিউ মিররে মার দিকে তাকালাম। মা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন। তাঁর পরনে সেই পুরনো ধোঁয়া শাড়ি। তাঁর ফ্রিজটা এখন পুরোপুরি খালি, কিন্তু তাঁর মনটা এখনো ভালোবাসায় ঠাসা।

বাসায় ফিরে শারমিন যখন খুব উৎসাহ নিয়ে ফ্রিজের দরজা খুললো নতুন জিনিসগুলো রাখার জন্য, আমি তখন পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম। নীল ফ্রিজটা থেকে ভকভক করে ঠান্ডা বাতাস বের হচ্ছে। সেখানে আগের কোরবানির মাংস এখনো স্তূপ হয়ে আছে।

শারমিন হাত বাড়িয়ে এক প্যাকেট বের করে বললো, “উফ! এটা তো গত জুনের মাংস। এখনো শেষ হয়নি। ফ্রিজটা একদম জ্যাম হয়ে আছে।”

আমি শান্ত গলায় বললাম, “শারমিন, ওই মাংসগুলো ফেলে দাও।”

শারমিন অবাক হয়ে তাকালো। “ফেলে দেব কেন? এগুলো তো ভালো আছে।”

আমি বললাম, “না, ভালো নেই। ওগুলোতে পচন ধরেছে। ওগুলো স্বার্থপরতার মাংস। ওগুলো খেলে আমাদের বিবেক মরে যাবে। তার চেয়ে বরং কাল মা যে কয়েক টুকরো মাংস দিয়েছেন, ওটাই রান্না কোরো। ওটাতে ছয় মাসের একটা অপেক্ষা আর ভালোবাসা লেগে আছে।”

শারমিন আমার কথা ঠিক বুঝলো কি না জানি না। সে অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলো। আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আকাশটা মেঘলা,আবহাওয়া কুয়াশাচ্ছন্ন। আমার মনটা তার চেয়ে বেশি।

শহরের এই যান্ত্রিক জীবনে আমাদের ফ্রিজগুলো হয়তো সারা বছর পূর্ণ থাকে, কিন্তু আমাদের আত্মাগুলো ক্রমশ এক একটা হিমঘর হয়ে যাচ্ছে। যেখানে রক্ত আছে, মাংস আছে, শুধু প্রাণের সেই স্পন্দনটুকু নেই। আমরা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে মাংসের ওজনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখে গেছি। আর এটাই হয়তো এই যুগের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত