ক্লান্ত বিকেলের হেলেপড়া সুর্যের রোদ তখন ইছাপুরের জরাজীর্ণ রেলওয়ে স্টেশনের টিনের চাল ফুঁড়ে নামছে। বাতাসে পোড়া তেলের গন্ধ আর মানুষের ঘামের গুমোট গন্ধ। এই স্টেশনটা যেন থমকে যাওয়া সময়ের এক টুকরো দলিল। স্টেশনের মাস্টার রতন বাবু অনেকবার বলেছেন চালটা মেরামত করতে, কিন্তু রেলওয়ের খাতায় ইছাপুর সবসময়ই এক অবহেলিত নাম। সেই বিকেলেই প্ল্যাটফর্মের চার নম্বর বেঞ্চিতে বসে ছিলেন মতি মিয়া। পরনে ইস্ত্রি করা সামান্য তালি দেওয়া পাঞ্জাবি, লুঙ্গিটা হাঁটুর ওপর তোলা। কোলের ওপর তার দুই বছরের প্রাণভোমরা— ছোট্ট জাহিদ।
জাহিদ তখন তার ছোট্ট আঙুল দিয়ে বাবার হাতের মোটা রগগুলো নিয়ে খেলছে। মতি মিয়ার হাত দুটো রুক্ষ, পাথরের মতো শক্ত। হবেই না কেন? কুড়ি বছর ধরে এই হাতেই তো তিনি করাত চালিয়েছেন, কাঠ চিরেছেন। সেই কাঠের গুঁড়ো তার ফুসফুসে জমেছে, চুলে ধরেছে অকাল পাক, কিন্তু জাহিদের নরম গালের স্পর্শ পেলে মতি মিয়া সব ক্লান্তি ভুলে যান। মতি মিয়ার বড় মেয়ে রত্নার বিয়ে সামনের মাসে। সামান্য কাঠমিস্ত্রির সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। শ্বশুরবাড়ির দাবি মেটাতে আজই শহরের মহাজনের কাছ থেকে শেষ সম্বল ভিটেটুকু বন্ধক রেখে বিশ হাজার টাকা নিয়ে ফিরছেন তিনি। টাকাগুলো বুকের ভেতরের পকেটে সযত্নে রাখা, যেন ওটা কেবল টাকা নয়, রত্নার ভবিষ্যৎ।
দূরে ঝমঝম শব্দ শোনা গেল। ডাউনের লোকাল আসছে। ইছাপুরে এই ট্রেনটা থামে মাত্র দুই মিনিটের জন্য। হুড়মুড় করে ভিড় বাড়ল প্ল্যাটফর্মে। মাছের ঝুড়িওয়ালা থেকে শুরু করে অফিস ফেরত কর্তাদের ধাক্কাধাক্কি। মতি মিয়া জাহিদকে কোলে তুলে নিলেন। "বাজান, শক্ত কইরা ধরো," জাহিদের কানে কানে বললেন তিনি। ট্রেনটা যখন স্টেশনে ঢুকছে, তখন ধুলোবালির এক বিশাল ঝড় উঠল। ইঞ্জিনের গরম ভাপ আর চাকার আর্তনাদ মিলেমিশে এক বিভীষিকা তৈরি করল যেন।
মতি মিয়া সাবধানে পা বাড়ালেন। কামরার দরজার সামনে এক বিশাল জটলা। নামার লোকের সংখ্যা ওঠার লোকের চেয়ে বেশি। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল অঘটনটা। পেছন থেকে এক বেপরোয়া ফেরিওয়ালার ধাক্কায় ভারসাম্য হারালেন মতি মিয়া। জাহিদ তখন তার কোলের মধ্যে একটু আলগা ছিল। ধাক্কার চোটে জাহিদের হাতটা ফসকে গেল। "বাজান!" বলে একটা আর্তনাদ করে উঠলেন মতি মিয়া। কিন্তু মহাকালের নিষ্ঠুরতায় জাহিদ তখন প্ল্যাটফর্ম আর ট্রেনের মাঝখানের সেই অন্ধকার গহ্বরে পড়ে গেছে। ইছাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আর লাইনের মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা।
দুই বছরের শিশুটি সেই মরণ-ফাঁদে হারিয়ে গেল চোখের পলকে। চারপাশে এক মুহূর্তের স্তব্ধতা। তারপরই শোরগোল উঠল— "বাচ্চা পড়ে গেছে! বাচ্চা পড়ে গেছে!" ততক্ষণে ট্রেনের চাকাগুলো ধীর হয়ে আসছে, কিন্তু থামেনি। রেলওয়ের গার্ডের বাঁশি বেজে উঠল। সিগন্যাল হয়ে গেছে। ট্রেনটা একটু কেঁপে উঠল, তারপরই সেই দানবীয় লোহার চাকাগুলো ঘুরতে শুরু করল। মতি মিয়ার চোখের সামনে পৃথিবীটা লাল হয়ে এল। তিনি দেখলেন না তার পকেটের বিশ হাজার টাকা মাটিতে পড়ে গেল কি না, তিনি দেখলেন না তার বয়স কত। নিজের প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে তিনি সেই সরু অন্ধকার গর্তে ঝাঁপ দিলেন। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন চিৎকার করে উঠল, "না! ঝাঁপ দিয়েন না! আপনিও মরবেন!" কিন্তু মতি মিয়া তখন অন্য কোনো জগতের বাসিন্দা। তিনি লাফিয়ে পড়লেন রেললাইনের সেই পাথুরে জমিতে। জাহিদ সেখানে উপুড় হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
মতি মিয়া বিদ্যুতের গতিতে জাহিদকে নিজের বুকের তলায় টেনে নিলেন। মাথার ওপর তখন চলন্ত ট্রেনের নিচেকার যান্ত্রিক কলকবজা গর্জন করছে। চাকাগুলো যখন লোহার পাতের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সেখান থেকে আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছিল। মতি মিয়া রেললাইনের মাঝখানের নিচু জায়গাটুকুতে নিজের শরীরটাকে যতটা সম্ভব ছোট করে শুয়ে পড়লেন। জাহিদকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সঙ্গে লেপ্টে রাখলেন। "ভয় নাই বাজান, আমি আছি। ভয় নাই।" মতি মিয়ার কানে তখন নিজের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ আর ট্রেনের ঘরঘর শব্দ একাকার হয়ে গেছে। এক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হলেই লোহার চাকা তার শরীরকে কুচি কুচি করে কেটে ফেলবে। কিন্তু তিনি নড়লেন না। জাহিদের মাথাটা নিজের থুতনির নিচে চেপে ধরে তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
ওপরে প্ল্যাটফর্মে তখন কয়েক শ মানুষ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ চোখ ঢেকে ফেলেছে, কেউ ডুকরে কেঁদে উঠছে। মহিলারা শাড়ির আঁচল কামড়ে ধরে প্রার্থনা করছেন। স্টেশন মাস্টার রতন বাবু দৌড়ে এসে চিৎকার করছেন চালককে ট্রেন থামাতে, কিন্তু ইঞ্জিনের গর্জনে তা পৌঁছাচ্ছে না। দশটি কামরা। প্রতিটি কামরা যাওয়ার সময় মতি মিয়ার পিঠের ওপর দিয়ে যমদূত যেন হেঁটে যাচ্ছিল। বাতাসের প্রচণ্ড চাপে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। গরম গ্রিজ আর ধোঁয়ায় তার চোখ জ্বলে যাচ্ছিল। কিন্তু তার দুই হাত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বর্ম হয়ে জাহিদকে আগলে রেখেছে। জাহিদ নিথর হয়ে বাবার বুকে পড়ে আছে। সে হয়তো জানেও না, তার ওপর দিয়ে এখন যমদূত চলে যাচ্ছে। শেষ কামরাটি যখন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেল, তখন চারপাশ একদম শান্ত। ধুলোর আস্তরণ নিচে নামছে। কেউ কথা বলছে না। সবাই ধরে নিয়েছে— রেললাইনের ওপর এখন শুধু মাংস আর রক্ত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিছুক্ষণ পর রেললাইনের সেই অন্ধকার ফোকর থেকে একটা হাত দেখা গেল। তেল আর কালিতে মাখা একটা হাত প্ল্যাটফর্মের প্রান্ত আঁকড়ে ধরল। ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন চিৎকার করল, "বেঁচে আছে! ওরা বেঁচে আছে!" মতি মিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তার পাঞ্জাবিটা ছিন্নভিন্ন, কপালে আর কাঁধে কালশিটে দাগ। কিন্তু তার কোলে থাকা জাহিদের একটা পশম ও ছোঁয়ার সাহস করেনি সেই যমদূত। শিশুটি তখনো ভয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে হিক্কা তুলছে। মতি মিয়া যখন লাইনের ওপর থেকে প্ল্যাটফর্মে উঠে এলেন, পুরো স্টেশন যেন একযোগে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরের মুহূর্তেই শুরু হলো কান্নার রোল। এই কান্না শোকের নয়, এই কান্না বিস্ময়ের, এই কান্না মানুষের অপরাজিত ভালোবাসার। স্টেশন মাস্টার রতন বাবু এগিয়ে এসে মতি মিয়ার হাতটা ধরলেন।
তিনি কথা বলতে পারছিলেন না, তার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। স্টেশনের কুলিরা, যারা প্রতিদিন পয়সার জন্য কাড়াকাড়ি করে, তারাও আজ নির্বাক। এক বৃদ্ধা দৌড়ে এসে মতি মিয়ার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে লাগলেন। মতি মিয়া কোনো কথা বলছিলেন না। তার শরীর কাঁপছিল। তিনি কেবল জাহিদের কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেলেন। সেই মুহূর্তে যেন একটা নতুন জনম পেলেন। হঠাৎ মতি মিয়ার মনে পড়ল টাকার কথা। রত্নার বিয়ের টাকা! তিনি পাগলের মতো এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগলেন। প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের চাপে কোথায় যে সেই টাকার বান্ডিল পড়ে গেছে, তার হদিস নেই। মতি মিয়ার চোখ দিয়ে এবার জল বেরোল। জাহিদ বেঁচে আছে ঠিকই, কিন্তু রত্নার বিয়ের কী হবে? ওই টাকাটা তো তার কাছে রত্নার সম্মান ছিল। "আমার টাকাটা... মহাজনের বিশ হাজার টাকা... আমি যে ভিটে বন্ধক দিছিলাম..." মতি মিয়ার কণ্ঠস্বর ভেঙে আসছিল।
ভিড়ের মধ্য থেকে এক যুবক এগিয়ে এল। তার হাতে একটা নোংরা গামছায় মোড়ানো সেই টাকার বান্ডিল। সে নিচে কুড়িয়ে পেয়েছিল। যুবকটি মতি মিয়ার পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকাল এবং টাকাটা তার হাতে তুলে দিল। সে বলল, "চাচা, আজ আপনার টাকা কেউ সরাবে না। ইছাপুর স্টেশনের বাতাসও আজ বেইমানি করবে না আপনার সাথে। আপনি আমাদের দেখাইয়া দিছেন বাবা মানে কী।" চারপাশে জমা হওয়া মানুষগুলো যেন এক নতুন পৃথিবী দেখছিল। সেই মহাজন, যার হৃদয় পাথরের মতো শক্ত বলে পরিচিত, তিনিও সেই ভিড়ে ছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে মতি মিয়ার কাঁধে হাত রাখলেন। মহাজন গলা পরিষ্কার করে বললেন, "মতি, তুই ভিটে বন্ধক দিয়ে টাকা নিছিলি না? যা, তোর কাগজ আমি কাল ছিঁড়ে ফেলব। রত্না আমারও মেয়ে। ওর বিয়েতে আমি নিজে উপস্থিত থাকব। তোর মতো বাপের ভিটে কেড়ে নেওয়ার সাধ্য আমার নাই।" সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল ইছাপুর স্টেশনে। জাহিদ এখন বাবার কাঁধে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। মতি মিয়া যখন বাড়ির পথে হাঁটা দিলেন, তখন স্টেশনের প্রতিটি মানুষ তাকে দেখছিল।
তিনি কোনো মহামানব নন, তিনি অতি সাধারণ এক কাঠমিস্ত্রি। কিন্তু সেই বিকেলে তিনি ছিলেন এক অজেয় বর্ম। ট্রেনের সেই ভয়ংকর লোহা আর আগুনের সামনে তিনি কেবল এক পিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন— যিনি মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন তার সন্তানের একটি নিশ্বাসের জন্য। ইছাপুরের রেললাইনটা পড়ে রইল আগের মতোই। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের প্রতিটি পাথরের গায়ে যেন সেই অমর বীরত্বের কথা লেখা হয়ে গেল।
বাবা মানেই পাহাড়ের মতো অটল আশ্রয়, বাবা মানেই সেই বুক— যা পৃথিবীর সমস্ত বিপদ থেকে সন্তানকে আগলে রাখতে লোহার চেয়েও শক্ত হয়ে উঠতে পারে। মতি মিয়া যখন গ্রামের মেঠো পথে পা রাখলেন, তখন আকাশের এক কোণে উদিত হওয়া প্রথম তারাটি যেন তাকেই অভিবাদন জানাচ্ছিল। আজ স্টেশনের সেই কান্নার মাঝে লুকানো ছিল এক গভীর প্রশান্তি— মানবতার জয়গানের প্রশান্তি।

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
ক্লান্ত বিকেলের হেলেপড়া সুর্যের রোদ তখন ইছাপুরের জরাজীর্ণ রেলওয়ে স্টেশনের টিনের চাল ফুঁড়ে নামছে। বাতাসে পোড়া তেলের গন্ধ আর মানুষের ঘামের গুমোট গন্ধ। এই স্টেশনটা যেন থমকে যাওয়া সময়ের এক টুকরো দলিল। স্টেশনের মাস্টার রতন বাবু অনেকবার বলেছেন চালটা মেরামত করতে, কিন্তু রেলওয়ের খাতায় ইছাপুর সবসময়ই এক অবহেলিত নাম। সেই বিকেলেই প্ল্যাটফর্মের চার নম্বর বেঞ্চিতে বসে ছিলেন মতি মিয়া। পরনে ইস্ত্রি করা সামান্য তালি দেওয়া পাঞ্জাবি, লুঙ্গিটা হাঁটুর ওপর তোলা। কোলের ওপর তার দুই বছরের প্রাণভোমরা— ছোট্ট জাহিদ।
জাহিদ তখন তার ছোট্ট আঙুল দিয়ে বাবার হাতের মোটা রগগুলো নিয়ে খেলছে। মতি মিয়ার হাত দুটো রুক্ষ, পাথরের মতো শক্ত। হবেই না কেন? কুড়ি বছর ধরে এই হাতেই তো তিনি করাত চালিয়েছেন, কাঠ চিরেছেন। সেই কাঠের গুঁড়ো তার ফুসফুসে জমেছে, চুলে ধরেছে অকাল পাক, কিন্তু জাহিদের নরম গালের স্পর্শ পেলে মতি মিয়া সব ক্লান্তি ভুলে যান। মতি মিয়ার বড় মেয়ে রত্নার বিয়ে সামনের মাসে। সামান্য কাঠমিস্ত্রির সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। শ্বশুরবাড়ির দাবি মেটাতে আজই শহরের মহাজনের কাছ থেকে শেষ সম্বল ভিটেটুকু বন্ধক রেখে বিশ হাজার টাকা নিয়ে ফিরছেন তিনি। টাকাগুলো বুকের ভেতরের পকেটে সযত্নে রাখা, যেন ওটা কেবল টাকা নয়, রত্নার ভবিষ্যৎ।
দূরে ঝমঝম শব্দ শোনা গেল। ডাউনের লোকাল আসছে। ইছাপুরে এই ট্রেনটা থামে মাত্র দুই মিনিটের জন্য। হুড়মুড় করে ভিড় বাড়ল প্ল্যাটফর্মে। মাছের ঝুড়িওয়ালা থেকে শুরু করে অফিস ফেরত কর্তাদের ধাক্কাধাক্কি। মতি মিয়া জাহিদকে কোলে তুলে নিলেন। "বাজান, শক্ত কইরা ধরো," জাহিদের কানে কানে বললেন তিনি। ট্রেনটা যখন স্টেশনে ঢুকছে, তখন ধুলোবালির এক বিশাল ঝড় উঠল। ইঞ্জিনের গরম ভাপ আর চাকার আর্তনাদ মিলেমিশে এক বিভীষিকা তৈরি করল যেন।
মতি মিয়া সাবধানে পা বাড়ালেন। কামরার দরজার সামনে এক বিশাল জটলা। নামার লোকের সংখ্যা ওঠার লোকের চেয়ে বেশি। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল অঘটনটা। পেছন থেকে এক বেপরোয়া ফেরিওয়ালার ধাক্কায় ভারসাম্য হারালেন মতি মিয়া। জাহিদ তখন তার কোলের মধ্যে একটু আলগা ছিল। ধাক্কার চোটে জাহিদের হাতটা ফসকে গেল। "বাজান!" বলে একটা আর্তনাদ করে উঠলেন মতি মিয়া। কিন্তু মহাকালের নিষ্ঠুরতায় জাহিদ তখন প্ল্যাটফর্ম আর ট্রেনের মাঝখানের সেই অন্ধকার গহ্বরে পড়ে গেছে। ইছাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আর লাইনের মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা।
দুই বছরের শিশুটি সেই মরণ-ফাঁদে হারিয়ে গেল চোখের পলকে। চারপাশে এক মুহূর্তের স্তব্ধতা। তারপরই শোরগোল উঠল— "বাচ্চা পড়ে গেছে! বাচ্চা পড়ে গেছে!" ততক্ষণে ট্রেনের চাকাগুলো ধীর হয়ে আসছে, কিন্তু থামেনি। রেলওয়ের গার্ডের বাঁশি বেজে উঠল। সিগন্যাল হয়ে গেছে। ট্রেনটা একটু কেঁপে উঠল, তারপরই সেই দানবীয় লোহার চাকাগুলো ঘুরতে শুরু করল। মতি মিয়ার চোখের সামনে পৃথিবীটা লাল হয়ে এল। তিনি দেখলেন না তার পকেটের বিশ হাজার টাকা মাটিতে পড়ে গেল কি না, তিনি দেখলেন না তার বয়স কত। নিজের প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে তিনি সেই সরু অন্ধকার গর্তে ঝাঁপ দিলেন। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন চিৎকার করে উঠল, "না! ঝাঁপ দিয়েন না! আপনিও মরবেন!" কিন্তু মতি মিয়া তখন অন্য কোনো জগতের বাসিন্দা। তিনি লাফিয়ে পড়লেন রেললাইনের সেই পাথুরে জমিতে। জাহিদ সেখানে উপুড় হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
মতি মিয়া বিদ্যুতের গতিতে জাহিদকে নিজের বুকের তলায় টেনে নিলেন। মাথার ওপর তখন চলন্ত ট্রেনের নিচেকার যান্ত্রিক কলকবজা গর্জন করছে। চাকাগুলো যখন লোহার পাতের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সেখান থেকে আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছিল। মতি মিয়া রেললাইনের মাঝখানের নিচু জায়গাটুকুতে নিজের শরীরটাকে যতটা সম্ভব ছোট করে শুয়ে পড়লেন। জাহিদকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সঙ্গে লেপ্টে রাখলেন। "ভয় নাই বাজান, আমি আছি। ভয় নাই।" মতি মিয়ার কানে তখন নিজের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ আর ট্রেনের ঘরঘর শব্দ একাকার হয়ে গেছে। এক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হলেই লোহার চাকা তার শরীরকে কুচি কুচি করে কেটে ফেলবে। কিন্তু তিনি নড়লেন না। জাহিদের মাথাটা নিজের থুতনির নিচে চেপে ধরে তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
ওপরে প্ল্যাটফর্মে তখন কয়েক শ মানুষ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ চোখ ঢেকে ফেলেছে, কেউ ডুকরে কেঁদে উঠছে। মহিলারা শাড়ির আঁচল কামড়ে ধরে প্রার্থনা করছেন। স্টেশন মাস্টার রতন বাবু দৌড়ে এসে চিৎকার করছেন চালককে ট্রেন থামাতে, কিন্তু ইঞ্জিনের গর্জনে তা পৌঁছাচ্ছে না। দশটি কামরা। প্রতিটি কামরা যাওয়ার সময় মতি মিয়ার পিঠের ওপর দিয়ে যমদূত যেন হেঁটে যাচ্ছিল। বাতাসের প্রচণ্ড চাপে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। গরম গ্রিজ আর ধোঁয়ায় তার চোখ জ্বলে যাচ্ছিল। কিন্তু তার দুই হাত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বর্ম হয়ে জাহিদকে আগলে রেখেছে। জাহিদ নিথর হয়ে বাবার বুকে পড়ে আছে। সে হয়তো জানেও না, তার ওপর দিয়ে এখন যমদূত চলে যাচ্ছে। শেষ কামরাটি যখন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেল, তখন চারপাশ একদম শান্ত। ধুলোর আস্তরণ নিচে নামছে। কেউ কথা বলছে না। সবাই ধরে নিয়েছে— রেললাইনের ওপর এখন শুধু মাংস আর রক্ত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিছুক্ষণ পর রেললাইনের সেই অন্ধকার ফোকর থেকে একটা হাত দেখা গেল। তেল আর কালিতে মাখা একটা হাত প্ল্যাটফর্মের প্রান্ত আঁকড়ে ধরল। ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন চিৎকার করল, "বেঁচে আছে! ওরা বেঁচে আছে!" মতি মিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তার পাঞ্জাবিটা ছিন্নভিন্ন, কপালে আর কাঁধে কালশিটে দাগ। কিন্তু তার কোলে থাকা জাহিদের একটা পশম ও ছোঁয়ার সাহস করেনি সেই যমদূত। শিশুটি তখনো ভয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে হিক্কা তুলছে। মতি মিয়া যখন লাইনের ওপর থেকে প্ল্যাটফর্মে উঠে এলেন, পুরো স্টেশন যেন একযোগে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরের মুহূর্তেই শুরু হলো কান্নার রোল। এই কান্না শোকের নয়, এই কান্না বিস্ময়ের, এই কান্না মানুষের অপরাজিত ভালোবাসার। স্টেশন মাস্টার রতন বাবু এগিয়ে এসে মতি মিয়ার হাতটা ধরলেন।
তিনি কথা বলতে পারছিলেন না, তার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। স্টেশনের কুলিরা, যারা প্রতিদিন পয়সার জন্য কাড়াকাড়ি করে, তারাও আজ নির্বাক। এক বৃদ্ধা দৌড়ে এসে মতি মিয়ার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে লাগলেন। মতি মিয়া কোনো কথা বলছিলেন না। তার শরীর কাঁপছিল। তিনি কেবল জাহিদের কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেলেন। সেই মুহূর্তে যেন একটা নতুন জনম পেলেন। হঠাৎ মতি মিয়ার মনে পড়ল টাকার কথা। রত্নার বিয়ের টাকা! তিনি পাগলের মতো এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগলেন। প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের চাপে কোথায় যে সেই টাকার বান্ডিল পড়ে গেছে, তার হদিস নেই। মতি মিয়ার চোখ দিয়ে এবার জল বেরোল। জাহিদ বেঁচে আছে ঠিকই, কিন্তু রত্নার বিয়ের কী হবে? ওই টাকাটা তো তার কাছে রত্নার সম্মান ছিল। "আমার টাকাটা... মহাজনের বিশ হাজার টাকা... আমি যে ভিটে বন্ধক দিছিলাম..." মতি মিয়ার কণ্ঠস্বর ভেঙে আসছিল।
ভিড়ের মধ্য থেকে এক যুবক এগিয়ে এল। তার হাতে একটা নোংরা গামছায় মোড়ানো সেই টাকার বান্ডিল। সে নিচে কুড়িয়ে পেয়েছিল। যুবকটি মতি মিয়ার পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকাল এবং টাকাটা তার হাতে তুলে দিল। সে বলল, "চাচা, আজ আপনার টাকা কেউ সরাবে না। ইছাপুর স্টেশনের বাতাসও আজ বেইমানি করবে না আপনার সাথে। আপনি আমাদের দেখাইয়া দিছেন বাবা মানে কী।" চারপাশে জমা হওয়া মানুষগুলো যেন এক নতুন পৃথিবী দেখছিল। সেই মহাজন, যার হৃদয় পাথরের মতো শক্ত বলে পরিচিত, তিনিও সেই ভিড়ে ছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে মতি মিয়ার কাঁধে হাত রাখলেন। মহাজন গলা পরিষ্কার করে বললেন, "মতি, তুই ভিটে বন্ধক দিয়ে টাকা নিছিলি না? যা, তোর কাগজ আমি কাল ছিঁড়ে ফেলব। রত্না আমারও মেয়ে। ওর বিয়েতে আমি নিজে উপস্থিত থাকব। তোর মতো বাপের ভিটে কেড়ে নেওয়ার সাধ্য আমার নাই।" সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল ইছাপুর স্টেশনে। জাহিদ এখন বাবার কাঁধে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। মতি মিয়া যখন বাড়ির পথে হাঁটা দিলেন, তখন স্টেশনের প্রতিটি মানুষ তাকে দেখছিল।
তিনি কোনো মহামানব নন, তিনি অতি সাধারণ এক কাঠমিস্ত্রি। কিন্তু সেই বিকেলে তিনি ছিলেন এক অজেয় বর্ম। ট্রেনের সেই ভয়ংকর লোহা আর আগুনের সামনে তিনি কেবল এক পিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন— যিনি মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন তার সন্তানের একটি নিশ্বাসের জন্য। ইছাপুরের রেললাইনটা পড়ে রইল আগের মতোই। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের প্রতিটি পাথরের গায়ে যেন সেই অমর বীরত্বের কথা লেখা হয়ে গেল।
বাবা মানেই পাহাড়ের মতো অটল আশ্রয়, বাবা মানেই সেই বুক— যা পৃথিবীর সমস্ত বিপদ থেকে সন্তানকে আগলে রাখতে লোহার চেয়েও শক্ত হয়ে উঠতে পারে। মতি মিয়া যখন গ্রামের মেঠো পথে পা রাখলেন, তখন আকাশের এক কোণে উদিত হওয়া প্রথম তারাটি যেন তাকেই অভিবাদন জানাচ্ছিল। আজ স্টেশনের সেই কান্নার মাঝে লুকানো ছিল এক গভীর প্রশান্তি— মানবতার জয়গানের প্রশান্তি।
