গল্পগল্প

অপেক্ষার শেষ প্রহর

এফ আই রাজীব
এফ আই রাজীব
অপেক্ষার শেষ প্রহর

মরিয়মের কোল আলো করে যখন প্রথম সন্তানটি এলো, কার্তিক মাসের সেই শিশিরভেজা ভোরে পুরো বাড়িতে যেন খুশির বান ডেকেছিল। বড় আদুরে এক কন্যা। গোলগাল মুখ, আয়ত দু’টি চোখ— ঠিক যেন পটে আঁকা ছবি। স্বামী মনসুর আলী দিনমজুরের কাজ ফেলে সারাটা দিন মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিল। মেয়ের নাম রাখা হলো ‘জান্নাত’। বাড়ির উঠোনে হাসনাহেনার গন্ধ আর জান্নাতের খিলখিল হাসিতে মরিয়মের মনে হতো, সাত আসমান বুঝি তার এই ছোট্ট কুঁড়েঘরেই নেমে এসেছে।

দিন যায়, ঋতু বদলায়। দুই বছরের মাথায় মরিয়মের ঘর আবার নতুন অতিথির আগমনে চঞ্চল হয়ে ওঠে। এবার মনসুরের চোখেমুখে একটা গোপন প্রত্যাশা ছিল— এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত, যে হাত তার বার্ধক্যে লাঠি হবে। কিন্তু ধাত্রী মা যখন রক্তাভ এক দলা মাংসের পিণ্ড হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘আবারও লক্ষ্মী এসেছে গো মনসুর’, তখন মনসুরের হাসিতে যেন শরতের মেঘের ছায়া পড়ল। খুশির ঝিলিকটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে এক বিষণ্ণ গাম্ভীর্য ভর করল সেখানে। পাড়া-প্রতিবেশীরা দেখতে এসে যখন টিপ্পনী কেটে বলল, ‘আহা! এবার একটা খোকা হলে ঘরটা পূর্ণ হতো’, তখন মরিয়মের বুকের ভেতরটা এক অজানা অপরাধবোধে টনটন করে উঠল। মনে হলো, এই কন্যা-জন্মের দায় যেন এককভাবে তারই।

আট মাস পর, মরিয়ম যখন বুঝতে পারল তার শরীরের ভেতর আবারও এক নতুন প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়েছে, তখন আনন্দ নয়— এক তীব্র আতঙ্ক তাকে গ্রাস করল। রান্নাঘরের কোণে বসে চাল ধুতে ধুতে সে ভাবত, ‘এবারও কি তবে খোকা আসবে না?’ মনসুর তাকে মুখে কিছুই বলত না ঠিকই, কিন্তু রাতে ঘুমানোর সময় তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ মরিয়মের কানে তলোয়ারের মতো বিঁধত। ভালো-মন্দ খাওয়ার রুচি চলে গেল তার। সারাদিন তসবিহ হাতে মনে মনে প্রার্থনা করত— ‘খোদা, মুখ রেখো। একটা ছেলে অন্তত দিও, নইলে এ মুখ আমি কোথায় লুকাব?’

দশ মাস পূর্ণ হলো। চৈত্র সংক্রান্তির তপ্ত দুপুরে মরিয়মের পেটে কালবৈশাখীর মতো যন্ত্রণা শুরু হলো। ব্যথায় কুঁকড়ে যেতে যেতেও তার মনে কেবল একটা দুশ্চিন্তাই পাক খাচ্ছিল— ‘ছেলে হবে তো?’ ধাত্রী মায়ের হুকুম-ডাক, গরম জলের বালতি, পুরোনো কাপড়ের স্তূপ— সবকিছুর ভিড়ে মরিয়ম যেন এক অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল। যন্ত্রণার এক চরম মুহূর্তে তার মনে হলো, সারা দুনিয়া নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। সে আর কিছু শুনতে পেল না, দেখতে পেল না। এক গভীর অবশতায় সে জ্ঞান হারাল।

কতক্ষণ কেটেছে জানা নেই। যখন চোখ মেলল, তখন জানলার ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের এক চিলতে সোনালি রোদ তার কপালে এসে পড়েছে। বাইরে তখন বুনো পাখির ডাক। মরিয়মের শরীরটা বড্ড হালকা লাগছে, কিন্তু মনটা পাথরের মতো ভারী। সে কি জানতে চাইবে? নাকি ভয় পাবে?

ঠিক তখনই উঠোন থেকে এক গম্ভীর অথচ সুমধুর কণ্ঠ ভেসে এল। মনসুর আজান দিচ্ছে। তার সেই উদাত্ত সুরের ঝংকারে বাড়ির বাতাস পবিত্র হয়ে উঠছে। সাধারণত ছেলে হলে বাবারা যে আনন্দ নিয়ে আজান দেয়, মনসুরের কণ্ঠে আজ তার চেয়েও বেশি মায়া। মরিয়ম বুঝতে পারল না ছেলে হয়েছে নাকি মেয়ে। কিন্তু এই প্রশান্ত সুরের মাঝে সে এক অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পেল। তার মনে হলো, যে সন্তান এই পৃথিবীতে বাবার মুখে এমন মধুর ধ্বনি ধ্বনিত করতে পারে, সে ছেলে হোক বা মেয়ে— সে তো স্রষ্টার এক পরম আশীর্বাদ। সব দুশ্চিন্তা ছাপিয়ে মরিয়মের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল; সে যেন জীবনের নতুন এক অর্থ খুঁজে পেল।

বিষয় : গল্প ছোট গল্প

কাল মহাকাল

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬


অপেক্ষার শেষ প্রহর

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মরিয়মের কোল আলো করে যখন প্রথম সন্তানটি এলো, কার্তিক মাসের সেই শিশিরভেজা ভোরে পুরো বাড়িতে যেন খুশির বান ডেকেছিল। বড় আদুরে এক কন্যা। গোলগাল মুখ, আয়ত দু’টি চোখ— ঠিক যেন পটে আঁকা ছবি। স্বামী মনসুর আলী দিনমজুরের কাজ ফেলে সারাটা দিন মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিল। মেয়ের নাম রাখা হলো ‘জান্নাত’। বাড়ির উঠোনে হাসনাহেনার গন্ধ আর জান্নাতের খিলখিল হাসিতে মরিয়মের মনে হতো, সাত আসমান বুঝি তার এই ছোট্ট কুঁড়েঘরেই নেমে এসেছে।

দিন যায়, ঋতু বদলায়। দুই বছরের মাথায় মরিয়মের ঘর আবার নতুন অতিথির আগমনে চঞ্চল হয়ে ওঠে। এবার মনসুরের চোখেমুখে একটা গোপন প্রত্যাশা ছিল— এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত, যে হাত তার বার্ধক্যে লাঠি হবে। কিন্তু ধাত্রী মা যখন রক্তাভ এক দলা মাংসের পিণ্ড হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘আবারও লক্ষ্মী এসেছে গো মনসুর’, তখন মনসুরের হাসিতে যেন শরতের মেঘের ছায়া পড়ল। খুশির ঝিলিকটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে এক বিষণ্ণ গাম্ভীর্য ভর করল সেখানে। পাড়া-প্রতিবেশীরা দেখতে এসে যখন টিপ্পনী কেটে বলল, ‘আহা! এবার একটা খোকা হলে ঘরটা পূর্ণ হতো’, তখন মরিয়মের বুকের ভেতরটা এক অজানা অপরাধবোধে টনটন করে উঠল। মনে হলো, এই কন্যা-জন্মের দায় যেন এককভাবে তারই।

আট মাস পর, মরিয়ম যখন বুঝতে পারল তার শরীরের ভেতর আবারও এক নতুন প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়েছে, তখন আনন্দ নয়— এক তীব্র আতঙ্ক তাকে গ্রাস করল। রান্নাঘরের কোণে বসে চাল ধুতে ধুতে সে ভাবত, ‘এবারও কি তবে খোকা আসবে না?’ মনসুর তাকে মুখে কিছুই বলত না ঠিকই, কিন্তু রাতে ঘুমানোর সময় তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ মরিয়মের কানে তলোয়ারের মতো বিঁধত। ভালো-মন্দ খাওয়ার রুচি চলে গেল তার। সারাদিন তসবিহ হাতে মনে মনে প্রার্থনা করত— ‘খোদা, মুখ রেখো। একটা ছেলে অন্তত দিও, নইলে এ মুখ আমি কোথায় লুকাব?’

দশ মাস পূর্ণ হলো। চৈত্র সংক্রান্তির তপ্ত দুপুরে মরিয়মের পেটে কালবৈশাখীর মতো যন্ত্রণা শুরু হলো। ব্যথায় কুঁকড়ে যেতে যেতেও তার মনে কেবল একটা দুশ্চিন্তাই পাক খাচ্ছিল— ‘ছেলে হবে তো?’ ধাত্রী মায়ের হুকুম-ডাক, গরম জলের বালতি, পুরোনো কাপড়ের স্তূপ— সবকিছুর ভিড়ে মরিয়ম যেন এক অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল। যন্ত্রণার এক চরম মুহূর্তে তার মনে হলো, সারা দুনিয়া নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। সে আর কিছু শুনতে পেল না, দেখতে পেল না। এক গভীর অবশতায় সে জ্ঞান হারাল।

কতক্ষণ কেটেছে জানা নেই। যখন চোখ মেলল, তখন জানলার ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের এক চিলতে সোনালি রোদ তার কপালে এসে পড়েছে। বাইরে তখন বুনো পাখির ডাক। মরিয়মের শরীরটা বড্ড হালকা লাগছে, কিন্তু মনটা পাথরের মতো ভারী। সে কি জানতে চাইবে? নাকি ভয় পাবে?

ঠিক তখনই উঠোন থেকে এক গম্ভীর অথচ সুমধুর কণ্ঠ ভেসে এল। মনসুর আজান দিচ্ছে। তার সেই উদাত্ত সুরের ঝংকারে বাড়ির বাতাস পবিত্র হয়ে উঠছে। সাধারণত ছেলে হলে বাবারা যে আনন্দ নিয়ে আজান দেয়, মনসুরের কণ্ঠে আজ তার চেয়েও বেশি মায়া। মরিয়ম বুঝতে পারল না ছেলে হয়েছে নাকি মেয়ে। কিন্তু এই প্রশান্ত সুরের মাঝে সে এক অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পেল। তার মনে হলো, যে সন্তান এই পৃথিবীতে বাবার মুখে এমন মধুর ধ্বনি ধ্বনিত করতে পারে, সে ছেলে হোক বা মেয়ে— সে তো স্রষ্টার এক পরম আশীর্বাদ। সব দুশ্চিন্তা ছাপিয়ে মরিয়মের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল; সে যেন জীবনের নতুন এক অর্থ খুঁজে পেল।


কাল মহাকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ সম্পাদক আলী
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত