সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 জাতীয়জাতীয়

সীমান্তে ‘পুশইন’ ও ভারতের দ্বিচারিতা: প্রশ্নের মুখে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

একদিকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বার্তা, অন্যদিকে সীমান্তে অমানবিক পুশইন ও হত্যাকাণ্ড—ভারতের এমন বৈপরীত্যে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের সচেতন মহল ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সীমান্তে ‘পুশইন’ ও ভারতের দ্বিচারিতা: প্রশ্নের মুখে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক
ছবি -সংগৃহীত

ভারতের ‘দ্বিচারি’ আচরণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের চিরাচরিত সমীকরণ নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলা হলেও, বাস্তবে সীমান্তে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অবৈধ অভিবাসীর অজুহাতে প্রতিদিনই বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশি নাগরিকদের পুশইন করার অপচেষ্টা ও সীমান্তে বাংলাদেশিদের প্রাণহানি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছে। সম্প্রতি বিজিবি সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর অবস্থানে যাওয়ায় বিভিন্ন পয়েন্টে মুখোমুখি পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, যা জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

এই অস্থিরতার পেছনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ভারতের ‘মিশ্র বার্তার’ ইঙ্গিত পাচ্ছেন। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, ভারত একদিকে যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিএসএফের পুশইন প্রচেষ্টা সেই বার্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সীমান্তে যখন বিজিবির সঙ্গে সাধারণ জনগণও সম্পৃক্ত হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো সীমান্ত এলাকায় জনগণের আবেগ উত্তাল হয়ে উঠলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আবেগ বা উত্তেজনার পথ পরিহার করে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করা জরুরি।

ভারতের এই আচরণের পেছনে স্বার্থান্বেষী এজেন্ডা দেখছেন রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল এইচআরএম রোকন উদ্দিন (অব.)। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরেই সমতার চেয়ে স্বার্থের ওপর বেশি দাঁড়িয়ে আছে। গঙ্গা বা তিস্তার পানি বণ্টনের মতো দীর্ঘদিনের ইস্যুগুলোতে ভারতের গড়িমসি তার প্রমাণ। তিনি বলেন, ভারত মুখে বন্ধুত্বের কথা বললেও নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নেই তারা বেশি তৎপর। বাংলাদেশ এতদিন আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সৌজন্যের কারণে জোরালো প্রতিবাদ না করায় ভারত সীমান্তে বলপ্রয়োগে অনেকটা সাহসী হয়ে উঠেছিল। এখন সময় এসেছে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক কাঠামোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার।

সীমান্তে পুশইনের এই অমানবিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিষয়টি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত সরকার যদি অবৈধ অভিবাসীদের ফেরানোর বিষয়ে এতই সোচ্চার হয়, তবে ভারতে পালিয়ে থাকা বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে তাদের নীরবতা বড় ধরনের বৈপরীত্যের ইঙ্গিত দেয়। এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহর স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, পুশইনের শিকার হচ্ছে মূলত হতদরিদ্র মানুষ, আর প্রভাবশালী রাজনৈতিকরা পাচ্ছেন বিশেষ সুবিধা। যারা রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন তারা হয়তো বিজেপির ‘মেহমান’, কিন্তু হতদরিদ্র সাধারণ মানুষই এখন সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে অমানবিক জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।

অবশ্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দাবি করছেন, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে আগ্রহী। কিন্তু সীমান্তে বিএসএফের অব্যাহত অপেশাদার কর্মকাণ্ড ও পুশইনের ঘটনা সেই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতাকে ম্লান করে দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার যেকোনো অবৈধ পুশব্যাকের বিরোধী এবং সীমান্ত রক্ষায় বিজিবি এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে, ভারত যদি সত্যিই বন্ধুত্বের সম্পর্ক রক্ষা করতে চায়, তবে মুখের কথার চেয়ে সীমান্তে অমানবিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করাই হবে প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ।


বিষয় : ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সীমান্ত সমস্যা বিএসএফ পুশইন বাংলাদেশ-ভারত পররাষ্ট্রনীতি পুশইন বিতর্ক

সীমান্তে ‘পুশইন’ ও ভারতের দ্বিচারিতা: প্রশ্নের মুখে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

রোববার, ০৭ জুন ২০২৬


সীমান্তে ‘পুশইন’ ও ভারতের দ্বিচারিতা: প্রশ্নের মুখে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬

featured Image

ভারতের ‘দ্বিচারি’ আচরণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের চিরাচরিত সমীকরণ নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলা হলেও, বাস্তবে সীমান্তে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অবৈধ অভিবাসীর অজুহাতে প্রতিদিনই বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশি নাগরিকদের পুশইন করার অপচেষ্টা ও সীমান্তে বাংলাদেশিদের প্রাণহানি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছে। সম্প্রতি বিজিবি সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর অবস্থানে যাওয়ায় বিভিন্ন পয়েন্টে মুখোমুখি পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, যা জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

এই অস্থিরতার পেছনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ভারতের ‘মিশ্র বার্তার’ ইঙ্গিত পাচ্ছেন। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, ভারত একদিকে যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিএসএফের পুশইন প্রচেষ্টা সেই বার্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সীমান্তে যখন বিজিবির সঙ্গে সাধারণ জনগণও সম্পৃক্ত হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো সীমান্ত এলাকায় জনগণের আবেগ উত্তাল হয়ে উঠলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আবেগ বা উত্তেজনার পথ পরিহার করে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করা জরুরি।

ভারতের এই আচরণের পেছনে স্বার্থান্বেষী এজেন্ডা দেখছেন রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল এইচআরএম রোকন উদ্দিন (অব.)। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরেই সমতার চেয়ে স্বার্থের ওপর বেশি দাঁড়িয়ে আছে। গঙ্গা বা তিস্তার পানি বণ্টনের মতো দীর্ঘদিনের ইস্যুগুলোতে ভারতের গড়িমসি তার প্রমাণ। তিনি বলেন, ভারত মুখে বন্ধুত্বের কথা বললেও নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নেই তারা বেশি তৎপর। বাংলাদেশ এতদিন আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সৌজন্যের কারণে জোরালো প্রতিবাদ না করায় ভারত সীমান্তে বলপ্রয়োগে অনেকটা সাহসী হয়ে উঠেছিল। এখন সময় এসেছে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক কাঠামোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার।

সীমান্তে পুশইনের এই অমানবিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিষয়টি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত সরকার যদি অবৈধ অভিবাসীদের ফেরানোর বিষয়ে এতই সোচ্চার হয়, তবে ভারতে পালিয়ে থাকা বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে তাদের নীরবতা বড় ধরনের বৈপরীত্যের ইঙ্গিত দেয়। এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহর স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, পুশইনের শিকার হচ্ছে মূলত হতদরিদ্র মানুষ, আর প্রভাবশালী রাজনৈতিকরা পাচ্ছেন বিশেষ সুবিধা। যারা রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন তারা হয়তো বিজেপির ‘মেহমান’, কিন্তু হতদরিদ্র সাধারণ মানুষই এখন সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে অমানবিক জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।

অবশ্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দাবি করছেন, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে আগ্রহী। কিন্তু সীমান্তে বিএসএফের অব্যাহত অপেশাদার কর্মকাণ্ড ও পুশইনের ঘটনা সেই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতাকে ম্লান করে দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার যেকোনো অবৈধ পুশব্যাকের বিরোধী এবং সীমান্ত রক্ষায় বিজিবি এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে, ভারত যদি সত্যিই বন্ধুত্বের সম্পর্ক রক্ষা করতে চায়, তবে মুখের কথার চেয়ে সীমান্তে অমানবিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করাই হবে প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত