সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 সাহিত্যসাহিত্য

বাবার শেষ হিসেব

বাবার শেষ হিসেব
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)

  

রাত দুইটার সময় ফোনটা বাজলে মানুষের বুকে যে ধরনের ভয় জন্মায়, সেই ভয়টা রফিকের বুকেও জন্মাল।

ফোনের স্ক্রিনে দেখল: "শান্তিনীড় বৃদ্ধাশ্রম।"

রফিক এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর কাঁপা হাতে ধরল ফোন।

"আপনি কি হাতেম আলী সাহেবের ছেলে?"

"হ্যাঁ।"

"আপনার বাবার বুকে ব্যথা উঠেছে। ডাক্তার এসেছেন। গুরুতর কিছু না, তবে স্বজনরা কাছে থাকলে ভালো হতো।"

লাইনটা কেটে গেল।

রফিক দীর্ঘ সময় বসে রইল। তার পাশে ঘুমাচ্ছে তার স্ত্রী মেঘনা। বাইরে ঢাকার রাত, গাড়ির একটানা আওয়াজ, দূর থেকে কোথাও কুকুরের ডাক।

সে উঠল।

গাড়িতে বসে স্টার্ট দিতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করল—হাত কাঁপছে।

কতদিন হলো বাবার কাছে যায়নি? দুই বছর? তিন বছর?

না, আসলে ঠিক মনে নেই।

সেটাই ভয়ংকর।

.

রফিক মনে করতে পারে, তার বাবা হাতেম আলী কোনোদিন মিথ্যা বলেননি।

সরকারি অফিসের চাপরাশি ছিলেন। মাস শেষে যা পেতেন, তার অর্ধেকটা রাখতেন রফিকের পড়াশোনার জন্য। নিজের জন্য রাখতেন বাকি অর্ধেক—কিন্তু সেটাও আসলে সংসারের।

রফিকের মনে আছে, একবার ক্লাস ফাইভে থাকতে সে বলেছিল, "বাবা, আমার বন্ধু রাকিবের বাই-সাইকেল আছে। আমাকেও কিনে দেবে?"

বাবা বলেছিলেন, "দেবো। কিন্তু এই মাসে না।"

পরের মাসেও হয়নি। তার পরের মাসেও না। রফিক ভুলেই গিয়েছিল।

কিন্তু তিন মাস পরে একদিন সন্ধ্যাবেলা বাবা একটা পুরনো সাইকেল নিয়ে এলেন। লাল রঙের, একটু মরচে পড়া। বললেন, "পাড়ার নান্টুর বাবার ছিল, চারশো টাকায় পাইলাম।"

রফিক সেই সাইকেল চালিয়ে বের হওয়ার সময় একবার পেছনে তাকিয়েছিল।

বাবা বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছেন। তাঁর মুখে এমন একটা হাসি ছিল—রফিক সেই হাসির কথা আজও ভুলতে পারেনি।

সেই হাসির জন্য চারশো টাকা বাবা কোথা থেকে জোগাড় করেছিলেন, তা জানা হয়নি কোনোদিন।

.

গাড়ি মিরপুর পার হচ্ছে।

রফিক ভাবছে, কোথায় হারিয়ে গেল সব?

বাবা যখন বলতেন, "রফিক, বড় হইলে ইঞ্জিনিয়ার হইস"—তখন সেটা স্বপ্ন ছিল না, ছিল প্রার্থনা।

বুয়েটে চান্স পাওয়ার পর বাবা অফিসের সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছিলেন। নিজে সেদিন দুপুরে ভাত খাননি। বলেছিলেন খিদে নেই। পরে রফিক জেনেছিল, মিষ্টির টাকা যোগাড় করতে সেদিনের বাজারের টাকাটা দিয়ে দিয়েছিলেন।

পাস করার পর চাকরি হলো। ভালো কোম্পানি, ভালো বেতন।

তারপর মেঘনার সঙ্গে বিয়ে। মেঘনার বাবা বড় ব্যবসায়ী। ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট। শ্বশুরের সহায়তায় আরেকটু ভালো জায়গায় উঠে গেল রফিক।

এখানে এসেই হয়তো অজান্তে একটা দেওয়াল তৈরি হলো।

মেঘনা খারাপ মানুষ নয়। কিন্তু মেঘনার পরিবার যে দুনিয়ায় বড় হয়েছে, সেখানে হাতেম আলীর মতো মানুষের কথা বলার ভঙ্গি, তাঁর অভ্যাস, তাঁর সরলতা—সব কিছু কোথাও একটু বেমানান ঠেকত।

শুরুতে রফিক লক্ষ্য করেনি।

তারপর অবশ্য নজরে এলো, কিন্তু এড়িয়ে গেল।

তারপর এড়িয়ে যাওয়াটাই অভ্যাস হয়ে গেল।

মায়ের মৃত্যুর পর বড্ড একা হয়ে পরলেন বাবা।তাই গ্রাম থেকে একবারে চলে এসেছিলেন থাকতে। মেঘনাও বুঝতে পেরেছিলো, কিছু বলেনি মুখে, কিন্তু রফিক টের পেয়েছিল।

আরো কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর বাবা-ই একদিন ডেকে বললেন, "রফিক, আমার মনে হয় এখানে না থাকাই ভাল।  বৃদ্ধাশ্রমে না হলেও একটা ছোট মেস বা হোস্টেলে।  তোমাদের সংসার ছোট।"

রফিক বলেছিল, "না বাবা, থাকো।"

কিন্তু খুব জোর দিয়ে বলেনি।

বাবা বুঝেছিলেন।

তিন মাস পরে হাতেম আলী নিজেই শান্তিনীড়ে চলে এসেছিলেন। নিজের ব্যাগ নিজে গুছিয়ে। কাউকে আগে বলেননি।

রফিক পরে জেনেছিল। তখন কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু সেই কষ্ট কার সঙ্গে ভাগ করবে?

মেঘনার সঙ্গে পারেনি।

নিজের মনেই রেখেছিল।

আর ধীরে ধীরে ব্যস্ততার আড়ালে ডুবে গিয়েছিল।

এভাবেই ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে জন্মান্তরের সম্পর্কগুলো এড়িয়ে গিয়ে নির্ঝঞ্জাট থাকতে চাওয়ার কৌশল আজ অনেকেই আয়ত্ব করে নিয়েছে। এই ব্যস্ততার দোহাই যেন মৌখিক অস্বীকৃতিরই শিক্ষিত সংস্করণ, আধুনিক পাপাচার।   

.

শান্তিনীড়ের গেটে গাড়ি থামাল রফিক।

রাত তখন সাড়ে তিনটা।

ডিউটিতে থাকা নার্স এগিয়ে এলেন। বললেন, "আপনি হাতেম সাহেবের ছেলে? উনি এখন কিছুটা ভালো আছেন। ডাক্তার বলেছেন গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা, হার্টের কিছু না।"

রফিক বললেন, "ঘুমাচ্ছেন নিশ্চয়? এসেছি যখন একটু দেখতে চাই।"

করিডোর দিয়ে হেঁটে গেলেন রফিক।

সাদা দেওয়াল। সিলিং ফ্যানের একটানা শব্দ। দু-একটা ঘর থেকে নাক ডাকার শব্দ।

ছয় নম্বর রুমে থাকেন হাতেম সাহেব।

দরজা ঠেলে ঢুকলেন।

ছোট ঘর। একটা সিঙ্গেল খাট। টেবিলে একটা ছোট্ট চুলের চিরুনি, একটা কোরআন শরীফ, একটা পানির বোতল।

খাটের নিচে একটা পুরনো টিনের বাক্স।

হাতেম আলী শুয়ে আছেন। চোখ বন্ধ। মুখে বয়সের গভীর রেখা, কিন্তু চেহারায় শান্তি।

রফিক চেয়ারটা টেনে পাশে বসল।

বাবার মুখের দিকে তাকাল।

বাবা কখন এত বুড়ো হলেন? রফিক ঠিক খেয়াল করেনি।

হঠাৎ হাতেম আলীর চোখ খুলল।

প্রথমে বুঝলেন না কে। তারপর সরাসরি রফিকের দিকে তাকালেন।

কয়েক সেকেন্ড পুরো চুপ।

তারপর বললেন—

"রোজা হয়েছে?"

রফিক থ।

সাড়ে তিনটা রাত। বাবা হাসপাতালের মতো একটা ছোট ঘরে অসুস্থ শুয়ে আছেন। দুই বছরেরও বেশি ছেলের মুখ দেখেননি। আর প্রথম কথাটা হলো—রোজা হয়েছে?

রফিক কথা বলতে পারল না।

গলা ধরে এলো।

"বাবা—"

"বাইরে থেকে এসেছ, নিশ্চয়ই কিছু খাওনি। নার্সকে বলো এক কাপ চা দিতে। এখানে রাতেও চা পাওয়া যায়।"

হাতেম আলী উঠে বসতে চাইলেন।

রফিক হাত ধরে থামাল, "না বাবা, শুয়ে থাকো।"

"শুয়ে থেকে কি কথা বলা যায়?"

বসলেন হাতেম আলী।

তারপর রফিকের মুখের দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ।

"শুকিয়ে গেছিস। কাজের চাপ বেশি?"

রফিক কী বলবে বুঝতে পারল না।

"বউ কেমন আছে? আমার দাদু ভাইরা? ওরা কি অনেক বর হয়ে গেছে? "  

"ভালো আছে।"

"ছোটটা—রিয়ান? এখন কত ক্লাসে?"

"ক্লাস থ্রিতে।"

"পড়াশোনা কেমন করে?"

রফিকের চোখ ভিজে এলো।

বাবা তার নাতির পড়াশোনার খোঁজ রাখছেন। রফিক গত দুই বছর বাবার কাছে আসেনি, কিন্তু বাবার মাথায় ঘুরছে রিয়ানের ক্লাস।

"ভালো করে।"

"ভালো।" হাতেম আলী মাথা নাড়লেন। "আমার মতো না হলেই হলো। আমি পড়াশোনায় কোনো কালেই ভালো ছিলাম না।"

রফিক বলল, "বাবা, তুমি না থাকলে আমি কোনো কালেই পড়তে পারতাম না।"

হাতেম আলী হাসলেন।

সেই হাসিটা—রফিক আগে দেখেছে। সেই একই হাসি, যেদিন পুরনো লাল সাইকেলটা কিনে দিয়েছিলেন।

.

রফিক বলল, "বাবা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"

"কর।"

"তুমি কি রাগ করেছো আমার উপর?"

হাতেম আলী একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "একবার করেছিলাম।"

"কখন?"

"যখন বুঝলাম তুই আসবি না। প্রথম প্রথম অপেক্ষা করতাম। ভাবতাম, শুক্রবারে আসবে। তারপর ভাবতাম, ঈদে আসবে। তারপর ভাবতাম, জন্মদিনে—"

কথাটা শেষ করলেন না।

রফিক মাথা নিচু করে রইল।

"কিন্তু," হাতেম আলী আবার বললেন, "রাগটা বেশিদিন রাখতে পারিনি।"

"কেন?"

"কারণ তোকে দেখলে আমার রাগ থাকে না।"

এই একটা বাক্যে রফিকের বুকের ভেতরে কী যেন ভেঙে গেল।

সে মাথা নামিয়ে নিল। কাঁদছে। নিঃশব্দে।

হাতেম আলী ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।

"কাঁদিস না। তোর বাবা এখনো বেঁচে আছে।"

বাবারা সারা জীবন গায়ের ঘাম,শরীরের রক্ত আর চোখের পানি ঝরাতে পারে, কিন্তু সন্তানের চোখের পানি সহ্য করতে পারেনা।

.

অনেকক্ষণ পর রফিক মাথা তুলল।

"বাবা, চলো আমার সঙ্গে। বাড়িতে চলো।"

হাতেম আলী একটু ইতস্তত করলেন।

"বউ—"

"মেঘনার সাথে আমি কথা বলব। তুমি চিন্তা করো না।"

হাতেম আলী হাসলেন। কিন্তু সেই হাসিতে একটু বিষণ্নতা ছিল।

"রফিক, তোকে একটা জিনিস দেখাই আগে।"

খাটের নিচ থেকে পুরনো টিনের বাক্সটা বের করলেন।

বাক্সটা খুললেন।

ভেতরে কিছু কাগজপত্র, কিছু পুরনো ছবি, আর একটা জীর্ণ ডায়েরি।

ডায়েরিটা রফিকের হাতে দিলেন।

"খোল।"

রফিক খুলল।

প্রথম পাতায় তারিখ লেখা: জানুয়ারি, ১৯৮৭।

বাবার হাতের লেখা। সেই চেনা আঁকাবাঁকা অক্ষর।

"আজ রফিককে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করলাম। ভর্তি ফি: ৫০ টাকা। নতুন ব্যাগ: ৩৫ টাকা। মনে হলো জীবনের সেরা বিনিয়োগ করলাম।"

রফিক পাতা উল্টাল।

প্রতিটা পাতায় তারিখ। প্রতিটা পাতায় কোনো না কোনো খরচের হিসাব।

"ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার ফর্ম: ১৫ টাকা। রফিক বৃত্তি পেয়েছে। আজকের দিনটা মনে রাখব।"

"প্রাইভেট টিউটর মাসিক: ৩০০ টাকা। কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু ছেলে পড়াশোনায় এগোচ্ছে।"

"বুয়েটে ভর্তির খরচ: ২,৫০০ টাকা। আজকে অফিসে সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালাম। খরচ হলো ৪৫০ টাকা। মোট সঞ্চয় ভেঙেছি: ২,৯৫০ টাকা। কোনো আক্ষেপ নেই।"

রফিক পড়তে পারছে না ঠিকমতো। চোখে জল ঝাপসা করে দিচ্ছে সব।

শেষ পাতায় এলো।

তারিখ নেই। কিন্তু হাতেম আলীর পরিচিত হাতের লেখা।

"রফিক, এই ডায়েরিটা আমি তোকে দেব না। তোর ছেলে রিয়ানকে দেব। যেদিন সে বড় হবে।

তাকে বলব: তোমার দাদা সারাজীবন একটা ভুল করেছে। নিজের জন্য কিছু রাখেনি। ভেবেছিল সন্তানের সাফল্যই বার্ধক্যের ভরসা।

সে ভুল।

সন্তানকে ভালোবাসো। তার জন্য করো। কিন্তু নিজের জন্যও রেখো। একটু সম্মান, একটু স্বাধীনতা, একটু সঞ্চয়—এগুলো বিলাসিতা নয়, এগুলো তোমার অধিকার।

কারণ শেষ বয়সে সন্তান যদি পাশে না-ও থাকে, তুমি যেন নিজে টিকে থাকতে পারো।

তোমার দাদা ভালো আছে। সত্যিই ভালো আছে। কারণ আমার ছেলে ভালো মানুষ। সে ভুল করেছে, কিন্তু খারাপ নয়। আর আমি জানি, একদিন সে আসবে।

আজকেই হয়তো।"

.

রফিক ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।

কাঁদছে। আর থামতে পারছে না।

হাতেম আলী হাত বাড়িয়ে ছেলের পিঠে হাত রাখলেন।

বললেন না কিছু।

কিছু কিছু মুহূর্তে কথা লাগে না।

বাইরে ফজরের আজান শুরু হলো।

রফিক মাথা তুলল।

বলল, "বাবা, আমাকে মাফ করে দাও।"

হাতেম আলী বললেন, "আরে পাগল। তুই আমার ছেলে। তোকে মাফ করার কী আছে?"

"আমি—"

"তুই এসেছিস। এইটুকুই যথেষ্ট।"

.

সকাল হল, রফিক মেঘনাকে ফোন করল।

মেঘনা ঘুম ঘুম গলায় ধরল।

রফিক বলল, "মেঘনা, বাবাকে নিয়ে আসতে চাই বাড়িতে।"

ওপাশে একটু চুপ।

তারপর মেঘনা বলল—

"নিয়ে এসো।"

শুধু এইটুকুই।

রফিক কিছু বলল না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোনো কোনো দীর্ঘশ্বাস মুক্তির মতো।

.

ঘরে ফেরার পথে গাড়িতে হাতেম আলী জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

ঢাকার সকালবেলা। রাস্তায় মানুষ। রিকশা। স্কুলের ছেলেমেয়ে।

তিনি বললেন, "রফিক।"

"বলো বাবা।"

"একটা কথা বলব?"

"বলো।"

"তুই যখন বাবা হইছিস, তখন বুঝছিস আমি কী অনুভব করতাম।"

রফিক কিছু বলল না।

"সন্তানের মুখের দিকে তাকাইলে সব ভুলে যায়। সব কষ্ট। সব রাগ। সব দুঃখ।"

একটু থামলেন।

"এইটাই হলো ফাঁদ।"

"কোনটা?"

"এই ভালোবাসা।" বললেন হাতেম আলী। তাঁর গলায় হাসি। "এই ভালোবাসার জন্যই মানুষ সব দিয়ে দেয়। নিজের কথা ভুলে যায়। আর শেষে—"

কথাটা শেষ করলেন না।

জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

রফিক বলল, "বাবা, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—"

"না।"

"মানে?"

"প্রতিশ্রুতি দিস না। প্রতিশ্রুতি মানুষ ভাঙে।" হাতেম আলী মাথা ঘোরালেন। ছেলের দিকে তাকালেন। "শুধু কথা রাখিস।"

.

বিকেলবেলা রিয়ান স্কুল থেকে ফিরে দেখল দাদা বসে আছেন।

সে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল।

"দাদা!"

হাতেম আলী নাতিকে কোলে তুলে নিলেন।

রফিক দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল।

মেঘনা এসে পাশে দাঁড়াল।

কিছু বলল না। শুধু রফিকের হাতটা ধরল।

তিনজন তাকিয়ে রইল—একজন বৃদ্ধ মানুষ আর একটা ছোট্ট ছেলে।

রিয়ান বলছে, "দাদা, তুমি কতদিন থাকবে?"

হাতেম আলী বললেন, "অনেকদিন।"

"কত অনেকদিন?"

"তুই যতদিন থাকতে বলবি।"

রিয়ান একটু ভাবল। তারপর বলল, "তাহলে সারাজীবন থাকো।"

হাতেম আলী হাসলেন।

সেই হাসিটা।

রফিক সেই হাসিটা চেনে।

ছেলেবেলায় পুরনো লাল সাইকেলের দিনে যেই হাসি ছিল—ঠিক সেই একই হাসি।

.

 এই গল্পটা শুধু একজন হাতেম আলীর নয়।

এই গল্পটা হাজারো বাবার, হাজারো মায়ের—যারা সারাজীবন দিয়ে গেছেন, কিন্তু নিজের জন্য রাখেননি কিছু।

এবং এই গল্পটা হাজারো রফিকের—যারা ভুল করেছে, কিন্তু একেবারে হারিয়ে যায়নি।

হাতেম আলী ডায়েরিতে লিখেছিলেন সত্যি কথা। সন্তানের জন্য সব দেওয়া মানে ভালোবাসা, কিন্তু নিজের বার্ধক্যের কথা না ভাবা—এটা প্রজ্ঞা নয়।

কারণ শেষ বয়সে যখন শরীর কথা শোনে না, যখন মানুষ একটু ভরসার জায়গা খোঁজে—তখন যদি না থাকে সঞ্চয়, না থাকে স্বাধীনতা, শুধু থাকে অপেক্ষা—

তাহলে সেই অপেক্ষার ওজন অনেক ভারী।

তাই সন্তানকে ভালোবাসুন। তার মৌলিক চাহিদা পূরণ করুন। তার স্বপ্নের পাশে থাকুন। কিন্তু নিজের জন্যও বাঁচুন।

কারণ আপনি যদি ভালো থাকেন, আপনার সন্তানও ভালো থাকবে।

আর যদি কোনো রাতে শান্তিনীড়ের মতো কোনো ঘরে একা শুয়ে থাকতে হয়—

তাহলে অন্তত সেই একাকীত্বটুকু যেন নিজের পছন্দের হয়। অপেক্ষার নয়।

 

বিষয় : বৃদ্ধাশ্রম

বাবার শেষ হিসেব
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬


বাবার শেষ হিসেব

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image

  

রাত দুইটার সময় ফোনটা বাজলে মানুষের বুকে যে ধরনের ভয় জন্মায়, সেই ভয়টা রফিকের বুকেও জন্মাল।

ফোনের স্ক্রিনে দেখল: "শান্তিনীড় বৃদ্ধাশ্রম।"

রফিক এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর কাঁপা হাতে ধরল ফোন।

"আপনি কি হাতেম আলী সাহেবের ছেলে?"

"হ্যাঁ।"

"আপনার বাবার বুকে ব্যথা উঠেছে। ডাক্তার এসেছেন। গুরুতর কিছু না, তবে স্বজনরা কাছে থাকলে ভালো হতো।"

লাইনটা কেটে গেল।

রফিক দীর্ঘ সময় বসে রইল। তার পাশে ঘুমাচ্ছে তার স্ত্রী মেঘনা। বাইরে ঢাকার রাত, গাড়ির একটানা আওয়াজ, দূর থেকে কোথাও কুকুরের ডাক।

সে উঠল।

গাড়িতে বসে স্টার্ট দিতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করল—হাত কাঁপছে।

কতদিন হলো বাবার কাছে যায়নি? দুই বছর? তিন বছর?

না, আসলে ঠিক মনে নেই।

সেটাই ভয়ংকর।

.

রফিক মনে করতে পারে, তার বাবা হাতেম আলী কোনোদিন মিথ্যা বলেননি।

সরকারি অফিসের চাপরাশি ছিলেন। মাস শেষে যা পেতেন, তার অর্ধেকটা রাখতেন রফিকের পড়াশোনার জন্য। নিজের জন্য রাখতেন বাকি অর্ধেক—কিন্তু সেটাও আসলে সংসারের।

রফিকের মনে আছে, একবার ক্লাস ফাইভে থাকতে সে বলেছিল, "বাবা, আমার বন্ধু রাকিবের বাই-সাইকেল আছে। আমাকেও কিনে দেবে?"

বাবা বলেছিলেন, "দেবো। কিন্তু এই মাসে না।"

পরের মাসেও হয়নি। তার পরের মাসেও না। রফিক ভুলেই গিয়েছিল।

কিন্তু তিন মাস পরে একদিন সন্ধ্যাবেলা বাবা একটা পুরনো সাইকেল নিয়ে এলেন। লাল রঙের, একটু মরচে পড়া। বললেন, "পাড়ার নান্টুর বাবার ছিল, চারশো টাকায় পাইলাম।"

রফিক সেই সাইকেল চালিয়ে বের হওয়ার সময় একবার পেছনে তাকিয়েছিল।

বাবা বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছেন। তাঁর মুখে এমন একটা হাসি ছিল—রফিক সেই হাসির কথা আজও ভুলতে পারেনি।

সেই হাসির জন্য চারশো টাকা বাবা কোথা থেকে জোগাড় করেছিলেন, তা জানা হয়নি কোনোদিন।

.

গাড়ি মিরপুর পার হচ্ছে।

রফিক ভাবছে, কোথায় হারিয়ে গেল সব?

বাবা যখন বলতেন, "রফিক, বড় হইলে ইঞ্জিনিয়ার হইস"—তখন সেটা স্বপ্ন ছিল না, ছিল প্রার্থনা।

বুয়েটে চান্স পাওয়ার পর বাবা অফিসের সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছিলেন। নিজে সেদিন দুপুরে ভাত খাননি। বলেছিলেন খিদে নেই। পরে রফিক জেনেছিল, মিষ্টির টাকা যোগাড় করতে সেদিনের বাজারের টাকাটা দিয়ে দিয়েছিলেন।

পাস করার পর চাকরি হলো। ভালো কোম্পানি, ভালো বেতন।

তারপর মেঘনার সঙ্গে বিয়ে। মেঘনার বাবা বড় ব্যবসায়ী। ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট। শ্বশুরের সহায়তায় আরেকটু ভালো জায়গায় উঠে গেল রফিক।

এখানে এসেই হয়তো অজান্তে একটা দেওয়াল তৈরি হলো।

মেঘনা খারাপ মানুষ নয়। কিন্তু মেঘনার পরিবার যে দুনিয়ায় বড় হয়েছে, সেখানে হাতেম আলীর মতো মানুষের কথা বলার ভঙ্গি, তাঁর অভ্যাস, তাঁর সরলতা—সব কিছু কোথাও একটু বেমানান ঠেকত।

শুরুতে রফিক লক্ষ্য করেনি।

তারপর অবশ্য নজরে এলো, কিন্তু এড়িয়ে গেল।

তারপর এড়িয়ে যাওয়াটাই অভ্যাস হয়ে গেল।

মায়ের মৃত্যুর পর বড্ড একা হয়ে পরলেন বাবা।তাই গ্রাম থেকে একবারে চলে এসেছিলেন থাকতে। মেঘনাও বুঝতে পেরেছিলো, কিছু বলেনি মুখে, কিন্তু রফিক টের পেয়েছিল।

আরো কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর বাবা-ই একদিন ডেকে বললেন, "রফিক, আমার মনে হয় এখানে না থাকাই ভাল।  বৃদ্ধাশ্রমে না হলেও একটা ছোট মেস বা হোস্টেলে।  তোমাদের সংসার ছোট।"

রফিক বলেছিল, "না বাবা, থাকো।"

কিন্তু খুব জোর দিয়ে বলেনি।

বাবা বুঝেছিলেন।

তিন মাস পরে হাতেম আলী নিজেই শান্তিনীড়ে চলে এসেছিলেন। নিজের ব্যাগ নিজে গুছিয়ে। কাউকে আগে বলেননি।

রফিক পরে জেনেছিল। তখন কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু সেই কষ্ট কার সঙ্গে ভাগ করবে?

মেঘনার সঙ্গে পারেনি।

নিজের মনেই রেখেছিল।

আর ধীরে ধীরে ব্যস্ততার আড়ালে ডুবে গিয়েছিল।

এভাবেই ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে জন্মান্তরের সম্পর্কগুলো এড়িয়ে গিয়ে নির্ঝঞ্জাট থাকতে চাওয়ার কৌশল আজ অনেকেই আয়ত্ব করে নিয়েছে। এই ব্যস্ততার দোহাই যেন মৌখিক অস্বীকৃতিরই শিক্ষিত সংস্করণ, আধুনিক পাপাচার।   

.

শান্তিনীড়ের গেটে গাড়ি থামাল রফিক।

রাত তখন সাড়ে তিনটা।

ডিউটিতে থাকা নার্স এগিয়ে এলেন। বললেন, "আপনি হাতেম সাহেবের ছেলে? উনি এখন কিছুটা ভালো আছেন। ডাক্তার বলেছেন গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা, হার্টের কিছু না।"

রফিক বললেন, "ঘুমাচ্ছেন নিশ্চয়? এসেছি যখন একটু দেখতে চাই।"

করিডোর দিয়ে হেঁটে গেলেন রফিক।

সাদা দেওয়াল। সিলিং ফ্যানের একটানা শব্দ। দু-একটা ঘর থেকে নাক ডাকার শব্দ।

ছয় নম্বর রুমে থাকেন হাতেম সাহেব।

দরজা ঠেলে ঢুকলেন।

ছোট ঘর। একটা সিঙ্গেল খাট। টেবিলে একটা ছোট্ট চুলের চিরুনি, একটা কোরআন শরীফ, একটা পানির বোতল।

খাটের নিচে একটা পুরনো টিনের বাক্স।

হাতেম আলী শুয়ে আছেন। চোখ বন্ধ। মুখে বয়সের গভীর রেখা, কিন্তু চেহারায় শান্তি।

রফিক চেয়ারটা টেনে পাশে বসল।

বাবার মুখের দিকে তাকাল।

বাবা কখন এত বুড়ো হলেন? রফিক ঠিক খেয়াল করেনি।

হঠাৎ হাতেম আলীর চোখ খুলল।

প্রথমে বুঝলেন না কে। তারপর সরাসরি রফিকের দিকে তাকালেন।

কয়েক সেকেন্ড পুরো চুপ।

তারপর বললেন—

"রোজা হয়েছে?"

রফিক থ।

সাড়ে তিনটা রাত। বাবা হাসপাতালের মতো একটা ছোট ঘরে অসুস্থ শুয়ে আছেন। দুই বছরেরও বেশি ছেলের মুখ দেখেননি। আর প্রথম কথাটা হলো—রোজা হয়েছে?

রফিক কথা বলতে পারল না।

গলা ধরে এলো।

"বাবা—"

"বাইরে থেকে এসেছ, নিশ্চয়ই কিছু খাওনি। নার্সকে বলো এক কাপ চা দিতে। এখানে রাতেও চা পাওয়া যায়।"

হাতেম আলী উঠে বসতে চাইলেন।

রফিক হাত ধরে থামাল, "না বাবা, শুয়ে থাকো।"

"শুয়ে থেকে কি কথা বলা যায়?"

বসলেন হাতেম আলী।

তারপর রফিকের মুখের দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ।

"শুকিয়ে গেছিস। কাজের চাপ বেশি?"

রফিক কী বলবে বুঝতে পারল না।

"বউ কেমন আছে? আমার দাদু ভাইরা? ওরা কি অনেক বর হয়ে গেছে? "  

"ভালো আছে।"

"ছোটটা—রিয়ান? এখন কত ক্লাসে?"

"ক্লাস থ্রিতে।"

"পড়াশোনা কেমন করে?"

রফিকের চোখ ভিজে এলো।

বাবা তার নাতির পড়াশোনার খোঁজ রাখছেন। রফিক গত দুই বছর বাবার কাছে আসেনি, কিন্তু বাবার মাথায় ঘুরছে রিয়ানের ক্লাস।

"ভালো করে।"

"ভালো।" হাতেম আলী মাথা নাড়লেন। "আমার মতো না হলেই হলো। আমি পড়াশোনায় কোনো কালেই ভালো ছিলাম না।"

রফিক বলল, "বাবা, তুমি না থাকলে আমি কোনো কালেই পড়তে পারতাম না।"

হাতেম আলী হাসলেন।

সেই হাসিটা—রফিক আগে দেখেছে। সেই একই হাসি, যেদিন পুরনো লাল সাইকেলটা কিনে দিয়েছিলেন।

.

রফিক বলল, "বাবা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"

"কর।"

"তুমি কি রাগ করেছো আমার উপর?"

হাতেম আলী একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "একবার করেছিলাম।"

"কখন?"

"যখন বুঝলাম তুই আসবি না। প্রথম প্রথম অপেক্ষা করতাম। ভাবতাম, শুক্রবারে আসবে। তারপর ভাবতাম, ঈদে আসবে। তারপর ভাবতাম, জন্মদিনে—"

কথাটা শেষ করলেন না।

রফিক মাথা নিচু করে রইল।

"কিন্তু," হাতেম আলী আবার বললেন, "রাগটা বেশিদিন রাখতে পারিনি।"

"কেন?"

"কারণ তোকে দেখলে আমার রাগ থাকে না।"

এই একটা বাক্যে রফিকের বুকের ভেতরে কী যেন ভেঙে গেল।

সে মাথা নামিয়ে নিল। কাঁদছে। নিঃশব্দে।

হাতেম আলী ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।

"কাঁদিস না। তোর বাবা এখনো বেঁচে আছে।"

বাবারা সারা জীবন গায়ের ঘাম,শরীরের রক্ত আর চোখের পানি ঝরাতে পারে, কিন্তু সন্তানের চোখের পানি সহ্য করতে পারেনা।

.

অনেকক্ষণ পর রফিক মাথা তুলল।

"বাবা, চলো আমার সঙ্গে। বাড়িতে চলো।"

হাতেম আলী একটু ইতস্তত করলেন।

"বউ—"

"মেঘনার সাথে আমি কথা বলব। তুমি চিন্তা করো না।"

হাতেম আলী হাসলেন। কিন্তু সেই হাসিতে একটু বিষণ্নতা ছিল।

"রফিক, তোকে একটা জিনিস দেখাই আগে।"

খাটের নিচ থেকে পুরনো টিনের বাক্সটা বের করলেন।

বাক্সটা খুললেন।

ভেতরে কিছু কাগজপত্র, কিছু পুরনো ছবি, আর একটা জীর্ণ ডায়েরি।

ডায়েরিটা রফিকের হাতে দিলেন।

"খোল।"

রফিক খুলল।

প্রথম পাতায় তারিখ লেখা: জানুয়ারি, ১৯৮৭।

বাবার হাতের লেখা। সেই চেনা আঁকাবাঁকা অক্ষর।

"আজ রফিককে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করলাম। ভর্তি ফি: ৫০ টাকা। নতুন ব্যাগ: ৩৫ টাকা। মনে হলো জীবনের সেরা বিনিয়োগ করলাম।"

রফিক পাতা উল্টাল।

প্রতিটা পাতায় তারিখ। প্রতিটা পাতায় কোনো না কোনো খরচের হিসাব।

"ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার ফর্ম: ১৫ টাকা। রফিক বৃত্তি পেয়েছে। আজকের দিনটা মনে রাখব।"

"প্রাইভেট টিউটর মাসিক: ৩০০ টাকা। কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু ছেলে পড়াশোনায় এগোচ্ছে।"

"বুয়েটে ভর্তির খরচ: ২,৫০০ টাকা। আজকে অফিসে সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালাম। খরচ হলো ৪৫০ টাকা। মোট সঞ্চয় ভেঙেছি: ২,৯৫০ টাকা। কোনো আক্ষেপ নেই।"

রফিক পড়তে পারছে না ঠিকমতো। চোখে জল ঝাপসা করে দিচ্ছে সব।

শেষ পাতায় এলো।

তারিখ নেই। কিন্তু হাতেম আলীর পরিচিত হাতের লেখা।

"রফিক, এই ডায়েরিটা আমি তোকে দেব না। তোর ছেলে রিয়ানকে দেব। যেদিন সে বড় হবে।

তাকে বলব: তোমার দাদা সারাজীবন একটা ভুল করেছে। নিজের জন্য কিছু রাখেনি। ভেবেছিল সন্তানের সাফল্যই বার্ধক্যের ভরসা।

সে ভুল।

সন্তানকে ভালোবাসো। তার জন্য করো। কিন্তু নিজের জন্যও রেখো। একটু সম্মান, একটু স্বাধীনতা, একটু সঞ্চয়—এগুলো বিলাসিতা নয়, এগুলো তোমার অধিকার।

কারণ শেষ বয়সে সন্তান যদি পাশে না-ও থাকে, তুমি যেন নিজে টিকে থাকতে পারো।

তোমার দাদা ভালো আছে। সত্যিই ভালো আছে। কারণ আমার ছেলে ভালো মানুষ। সে ভুল করেছে, কিন্তু খারাপ নয়। আর আমি জানি, একদিন সে আসবে।

আজকেই হয়তো।"

.

রফিক ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।

কাঁদছে। আর থামতে পারছে না।

হাতেম আলী হাত বাড়িয়ে ছেলের পিঠে হাত রাখলেন।

বললেন না কিছু।

কিছু কিছু মুহূর্তে কথা লাগে না।

বাইরে ফজরের আজান শুরু হলো।

রফিক মাথা তুলল।

বলল, "বাবা, আমাকে মাফ করে দাও।"

হাতেম আলী বললেন, "আরে পাগল। তুই আমার ছেলে। তোকে মাফ করার কী আছে?"

"আমি—"

"তুই এসেছিস। এইটুকুই যথেষ্ট।"

.

সকাল হল, রফিক মেঘনাকে ফোন করল।

মেঘনা ঘুম ঘুম গলায় ধরল।

রফিক বলল, "মেঘনা, বাবাকে নিয়ে আসতে চাই বাড়িতে।"

ওপাশে একটু চুপ।

তারপর মেঘনা বলল—

"নিয়ে এসো।"

শুধু এইটুকুই।

রফিক কিছু বলল না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোনো কোনো দীর্ঘশ্বাস মুক্তির মতো।

.

ঘরে ফেরার পথে গাড়িতে হাতেম আলী জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

ঢাকার সকালবেলা। রাস্তায় মানুষ। রিকশা। স্কুলের ছেলেমেয়ে।

তিনি বললেন, "রফিক।"

"বলো বাবা।"

"একটা কথা বলব?"

"বলো।"

"তুই যখন বাবা হইছিস, তখন বুঝছিস আমি কী অনুভব করতাম।"

রফিক কিছু বলল না।

"সন্তানের মুখের দিকে তাকাইলে সব ভুলে যায়। সব কষ্ট। সব রাগ। সব দুঃখ।"

একটু থামলেন।

"এইটাই হলো ফাঁদ।"

"কোনটা?"

"এই ভালোবাসা।" বললেন হাতেম আলী। তাঁর গলায় হাসি। "এই ভালোবাসার জন্যই মানুষ সব দিয়ে দেয়। নিজের কথা ভুলে যায়। আর শেষে—"

কথাটা শেষ করলেন না।

জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

রফিক বলল, "বাবা, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—"

"না।"

"মানে?"

"প্রতিশ্রুতি দিস না। প্রতিশ্রুতি মানুষ ভাঙে।" হাতেম আলী মাথা ঘোরালেন। ছেলের দিকে তাকালেন। "শুধু কথা রাখিস।"

.

বিকেলবেলা রিয়ান স্কুল থেকে ফিরে দেখল দাদা বসে আছেন।

সে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল।

"দাদা!"

হাতেম আলী নাতিকে কোলে তুলে নিলেন।

রফিক দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল।

মেঘনা এসে পাশে দাঁড়াল।

কিছু বলল না। শুধু রফিকের হাতটা ধরল।

তিনজন তাকিয়ে রইল—একজন বৃদ্ধ মানুষ আর একটা ছোট্ট ছেলে।

রিয়ান বলছে, "দাদা, তুমি কতদিন থাকবে?"

হাতেম আলী বললেন, "অনেকদিন।"

"কত অনেকদিন?"

"তুই যতদিন থাকতে বলবি।"

রিয়ান একটু ভাবল। তারপর বলল, "তাহলে সারাজীবন থাকো।"

হাতেম আলী হাসলেন।

সেই হাসিটা।

রফিক সেই হাসিটা চেনে।

ছেলেবেলায় পুরনো লাল সাইকেলের দিনে যেই হাসি ছিল—ঠিক সেই একই হাসি।

.

 এই গল্পটা শুধু একজন হাতেম আলীর নয়।

এই গল্পটা হাজারো বাবার, হাজারো মায়ের—যারা সারাজীবন দিয়ে গেছেন, কিন্তু নিজের জন্য রাখেননি কিছু।

এবং এই গল্পটা হাজারো রফিকের—যারা ভুল করেছে, কিন্তু একেবারে হারিয়ে যায়নি।

হাতেম আলী ডায়েরিতে লিখেছিলেন সত্যি কথা। সন্তানের জন্য সব দেওয়া মানে ভালোবাসা, কিন্তু নিজের বার্ধক্যের কথা না ভাবা—এটা প্রজ্ঞা নয়।

কারণ শেষ বয়সে যখন শরীর কথা শোনে না, যখন মানুষ একটু ভরসার জায়গা খোঁজে—তখন যদি না থাকে সঞ্চয়, না থাকে স্বাধীনতা, শুধু থাকে অপেক্ষা—

তাহলে সেই অপেক্ষার ওজন অনেক ভারী।

তাই সন্তানকে ভালোবাসুন। তার মৌলিক চাহিদা পূরণ করুন। তার স্বপ্নের পাশে থাকুন। কিন্তু নিজের জন্যও বাঁচুন।

কারণ আপনি যদি ভালো থাকেন, আপনার সন্তানও ভালো থাকবে।

আর যদি কোনো রাতে শান্তিনীড়ের মতো কোনো ঘরে একা শুয়ে থাকতে হয়—

তাহলে অন্তত সেই একাকীত্বটুকু যেন নিজের পছন্দের হয়। অপেক্ষার নয়।

 


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত