শীতের সকালের
কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। রিকশায় বসে ক্লাসে যাচ্ছিলাম। সামনের দৃশ্য দেখতে দেখতে
হঠাৎ চোখ আটকে গেল রিকশাওয়ালা মামার ডান হাতে। ময়লা হয়ে যাওয়া একটা রুপালি রঙের
ব্রেসলেট। কব্জির কালো দাগওয়ালা হাতে সেই ব্রেসলেটটা একদম বেমানান লাগছিল।
কৌতূহল চেপে
রাখতে পারলাম না।
"মামা,
এই ব্রেসলেটটা কি আপনার মেয়ের?"
রিকশা চালাতে
চালাতে মামা পেছন ফিরে হাসল। কপালে বলিরেখা, চোখের কোণে ক্লান্তি, কিন্তু সেই হাসিতে
এক অদ্ভুত তৃপ্তি।
"না
রে মামা! এইটা তোমার মামির। অয় থাহে গ্রামে। এইবার ঈদে যহন বাইত গেছিলাম, তখন অয়
আমারে ঢাকা আহন এর সময় এইডা দিছে।"
কথাটা বলতে
বলতে মামার গলায় এক ধরনের নরম সুর এসে গেল। যেন হঠাৎ করে অন্য মানুষ হয়ে গেল।
"আর
কইছে, 'অয় তো আমার লগে থাহে না, এইডা পইরা ঘুরলে নাকি আমি মনে করতাম অয় আমার লগে
আছে।' অনেক ভালোবাসি তোমার মামিরে বুঝছ। এইয়া তোহ ভাগ্যের পরিস্থিতি—অর লগে থাকতে
পারি না।"
আমি আর কিছু
বললাম না। কিন্তু মনের ভেতর একটা চাপা ব্যথা এসে বসল।
রিকশায়
চলছিলো। আমি কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম। মামাকে আরও জানতে ইচ্ছে করছিল। এবার ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস
করে বসলাম, "মামা, মামি কেমন মানুষ?"
মামা এবার
একটু থেমে গেল। তারপর আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল।
" তোমার
মামির নাম রুকসানা। শাদি কইরা আনছিলাম যহন, তখন মনে হইছিল দুনিয়ার সব সুখ আমার হাতের
মুঠোয়। কিন্তু মামা, পেটের দায় তো আর সুখের আলাপ দিয়া মেটে না।"
রিকশা চালাতে
চালাতে মামা কথা বলছিল। আমি চুপ করে শুনছিলাম।
"গ্রামে
চাষাবাদ করতাম। কিন্তু দুইডা বাচ্চা হওয়ার পর আর চলে না। তাই ঢাকা আইছি হগলে মিল্লা
একসাথে থাকুম, আর যা কামাই খিয়া পইরা থাকতে পারলেই শুকুর। পরে দেহি আমি রোজগার করতে
পারি মাত্র বারো-তেরো হাজার টাকা। ঘর ভাড়া,
খাওয়া-দাওয়া ,ওষুধ পত্তর —তাতে আর বাকি থাকে না। বাচ্চাগুলার লেহা পড়ার টাইম হইল।
অগো ইশকুলে পাডামু ক্যামনে? হেল্লিগা অগোরে
শ্বশুরবাইত পাডাইয়া দিছি।"
গলাটা একটু
কেঁপে উঠল মামার।
"বছরে
একবার ঈদে যাই। সাত দিনের ছুটি। ওই সাত দিনই আমাগো বছর। বাকি তিনশো আট-পঞ্চাশ দিন?
অয় একলা, আমি একলা।"
আমি জিজ্ঞেস
করলাম, "ফোনে তো কথা বলতে পারেন?"
মামা একটু
হাসল। "কথা কই তো। কিন্তু মামা, ফোনে কি মুখ দেখা যায়? কান্দনের আওয়াজ চাইপ্পা
রাহন যায়? প্রতিবার ফোন রাখার সময় অর গলায় কাঁন্দনের ভাব। কিন্তু অয় কয় না। আমিও
কই না।"
রিকশা থামল
আমার ইউনিভার্সিটির সামনে। টাকা দিতে গিয়ে হাত থেমে গেল। মামার হাতের ব্রেসলেটটা আবার
চোখে পড়ল। রোদের আলোয় চকচক করছিল।
তারপর জিজ্ঞেস
করে জানতে পারলাম আমাদের বাসার পেছনের গলির গ্যারেজের রিক্সা এইটা। মামা ভাড়া চালায়।
তার পর সেদিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই সেই মামা
সাথে বাসার আশেপাশে দেখা হয়। ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার সময় গ্যারেজের সামনে গিয়ে মামাকে
খুঁজি।উনি থাকলে উনার রিকশায় যাই । মামা এখন
আমাকে নিয়ে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে গল্প করে। কখনো তার ছেলেমেয়ের কথা বলে, কখনো গ্রামের
কথা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বলে মামির কথা।
একদিন আমি
মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, "মামা, মামি কি কখনো অভিযোগ করে?"
মামা মাথা
নাড়ল। "না মামা। অভিযোগ করলে তো আমি বাইচ্চা যাইতাম। কিন্তু অয় তো শুধু কয়,
'তুমি সুস্থ থাইকো। ভালো থাইকো। আমি আছি।' এই তিনডা কথা হুনলে মনে হয় আমার জীবনের
সব কষ্ট মিথ্যা।"
সেদিন ক্লাসে
গিয়েও মন বসেনি। সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল এই শহরে কত মামা আছে, যারা ব্রেসলেট পরে আছে
স্মৃতির ভারে। কত মামি আছে, যারা গ্রামে একা বসে থাকে, স্বামীর ফেরার অপেক্ষায়।
ঈদের পর
মামার সাথে আবার দেখা। এবার মামাকে অন্যরকম লাগছিল। চোখে এক ধরনের উচ্ছ্বাস।
"মামা,
ভালো আছেন?"
মামা হাসল।
"হ মামা, ভালো আছি। এইবার ঈদে গিয়া অরে একটা মোবাইল কিনা দিছি।দুই বছর ধইরা টাকা
জমাইছিলাম। এখন অয় যখন ইচ্ছা আমারে ফোন দিতে পারবো। আর আমিও পারব। আগে অর ভাইয়ের বউর
মোবাইলে কল দিতাম। মন ভইরা কথা কইতে পারতাম না। "
মামার চোখ
ভিজে গেছিল কথা বলতে বলতে।
"মামা,
জানেন? ফোনটা হাতে নিয়া অয় কাইন্দা ফেলছিল। কইছিল, 'অহন আর কারো পিছে কথা কওনের জন্যে
ঘুরতে হইবো না।"
আমি তখন
ওরে জড়াইয়া ধইরা কইছিলাম, 'তুমি সবসময় আমার কাছেই থাহ । এই ব্রেসলেটটা দেখ, এইটা
রোজ আমার হাতে থাকে। রোজ তোমারে মনে করায়।'"
আমি চুপ
করে শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল এই গল্প শুধু একজন রিকশাওয়ালা আর তার স্ত্রীর নয়। এই গল্প
দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের, যারা ভালোবাসার জন্য দূরত্বকে সহ্য করে, স্বপ্নের জন্য
একাকীত্বকে মেনে নেয়।
গত কয়েকদিন
মামাকে দেখলাম না। সেই গ্যারেজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মামার সেই রিকশা এলো। কিন্তু
মামা নেই। অন্য একজন চালাচ্ছে।
"ভাই,
আগে যে মামা এই রিকশা চালাতো, সে কোথায়?"
নতুন রিকশাওয়ালা
বলল, "ও, হোসেন? ওর বউ মারা গেছে শুনছি। গ্রামে গেছে। কবে ফিরবে জানি না।"
বুকটা ধক
করে উঠল।
পরের দিনগুলো
কেটে গেল অপেক্ষায়। একদিন হঠাৎ দেখলাম মামা আবার রিকশা চালাচ্ছে। কিন্তু আগের মতো
নেই। চোখে মুখে বিষন্নতা। মুখে কথা নেই।
রিকশায়
উঠলাম। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর আস্তে করে বললাম, "মামা, আমি শুনছি..."
মামা কিছু
বলল না। শুধু হাতটা একবার দেখাল। ব্রেসলেটটা নেই।
"মামিরে
দাফনের সময় ওর হাতে পরাইয়া দিছি। কইছিলাম তো, 'এইডা পইরা ঘুরলে নাকি মনে হয় আমি
তোমার লগে আছি।' এখন অয়ই একা। "
মামার গলা
ভেঙে গেল।
"আমি
তো ফিরা আসছি মামা। কিন্তু অয়? অয় তো আর ফিরবে না। সারাজীবন অপেক্ষা করল আমার লাগি।
আর আমি... আমি শুধু বছরে একবার দেখা করতাম। এখন মনে হয়, ওরে নিয়া আসা উচিত আছিল।
যত কষ্টই হোক, একসাথে থাকা উচিত আছিল।"
সেদিন আর
কোনো কথা হয়নি।
কিন্তু সেদিন
থেকে আজ পর্যন্ত যখনই রিকশায় উঠি, মামার হাতের সেই ফাঁকা জায়গাটা চোখে পড়ে। আর মনে
হয়—ভালোবাসা মানে শুধু অপেক্ষা নয়, সান্নিধ্যও।
কারণ, সময়
কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আর হারিয়ে যাওয়ার পর শুধু অনুশোচনাই থাকে। ব্রেসলেট থাকে
না।
ভালোবাসাকে
কাল পর্যন্ত ফেলে রাখতে নেই। আজই কাছে থাকুন, কাছে রাখুন। 'পরে' নামের কোনো সময় নেই—
থাকে শুধু 'হায়, যদি...
বিষয় : গল্প
2.png)
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
শীতের সকালের
কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। রিকশায় বসে ক্লাসে যাচ্ছিলাম। সামনের দৃশ্য দেখতে দেখতে
হঠাৎ চোখ আটকে গেল রিকশাওয়ালা মামার ডান হাতে। ময়লা হয়ে যাওয়া একটা রুপালি রঙের
ব্রেসলেট। কব্জির কালো দাগওয়ালা হাতে সেই ব্রেসলেটটা একদম বেমানান লাগছিল।
কৌতূহল চেপে
রাখতে পারলাম না।
"মামা,
এই ব্রেসলেটটা কি আপনার মেয়ের?"
রিকশা চালাতে
চালাতে মামা পেছন ফিরে হাসল। কপালে বলিরেখা, চোখের কোণে ক্লান্তি, কিন্তু সেই হাসিতে
এক অদ্ভুত তৃপ্তি।
"না
রে মামা! এইটা তোমার মামির। অয় থাহে গ্রামে। এইবার ঈদে যহন বাইত গেছিলাম, তখন অয়
আমারে ঢাকা আহন এর সময় এইডা দিছে।"
কথাটা বলতে
বলতে মামার গলায় এক ধরনের নরম সুর এসে গেল। যেন হঠাৎ করে অন্য মানুষ হয়ে গেল।
"আর
কইছে, 'অয় তো আমার লগে থাহে না, এইডা পইরা ঘুরলে নাকি আমি মনে করতাম অয় আমার লগে
আছে।' অনেক ভালোবাসি তোমার মামিরে বুঝছ। এইয়া তোহ ভাগ্যের পরিস্থিতি—অর লগে থাকতে
পারি না।"
আমি আর কিছু
বললাম না। কিন্তু মনের ভেতর একটা চাপা ব্যথা এসে বসল।
রিকশায়
চলছিলো। আমি কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম। মামাকে আরও জানতে ইচ্ছে করছিল। এবার ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস
করে বসলাম, "মামা, মামি কেমন মানুষ?"
মামা এবার
একটু থেমে গেল। তারপর আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল।
" তোমার
মামির নাম রুকসানা। শাদি কইরা আনছিলাম যহন, তখন মনে হইছিল দুনিয়ার সব সুখ আমার হাতের
মুঠোয়। কিন্তু মামা, পেটের দায় তো আর সুখের আলাপ দিয়া মেটে না।"
রিকশা চালাতে
চালাতে মামা কথা বলছিল। আমি চুপ করে শুনছিলাম।
"গ্রামে
চাষাবাদ করতাম। কিন্তু দুইডা বাচ্চা হওয়ার পর আর চলে না। তাই ঢাকা আইছি হগলে মিল্লা
একসাথে থাকুম, আর যা কামাই খিয়া পইরা থাকতে পারলেই শুকুর। পরে দেহি আমি রোজগার করতে
পারি মাত্র বারো-তেরো হাজার টাকা। ঘর ভাড়া,
খাওয়া-দাওয়া ,ওষুধ পত্তর —তাতে আর বাকি থাকে না। বাচ্চাগুলার লেহা পড়ার টাইম হইল।
অগো ইশকুলে পাডামু ক্যামনে? হেল্লিগা অগোরে
শ্বশুরবাইত পাডাইয়া দিছি।"
গলাটা একটু
কেঁপে উঠল মামার।
"বছরে
একবার ঈদে যাই। সাত দিনের ছুটি। ওই সাত দিনই আমাগো বছর। বাকি তিনশো আট-পঞ্চাশ দিন?
অয় একলা, আমি একলা।"
আমি জিজ্ঞেস
করলাম, "ফোনে তো কথা বলতে পারেন?"
মামা একটু
হাসল। "কথা কই তো। কিন্তু মামা, ফোনে কি মুখ দেখা যায়? কান্দনের আওয়াজ চাইপ্পা
রাহন যায়? প্রতিবার ফোন রাখার সময় অর গলায় কাঁন্দনের ভাব। কিন্তু অয় কয় না। আমিও
কই না।"
রিকশা থামল
আমার ইউনিভার্সিটির সামনে। টাকা দিতে গিয়ে হাত থেমে গেল। মামার হাতের ব্রেসলেটটা আবার
চোখে পড়ল। রোদের আলোয় চকচক করছিল।
তারপর জিজ্ঞেস
করে জানতে পারলাম আমাদের বাসার পেছনের গলির গ্যারেজের রিক্সা এইটা। মামা ভাড়া চালায়।
তার পর সেদিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই সেই মামা
সাথে বাসার আশেপাশে দেখা হয়। ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার সময় গ্যারেজের সামনে গিয়ে মামাকে
খুঁজি।উনি থাকলে উনার রিকশায় যাই । মামা এখন
আমাকে নিয়ে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে গল্প করে। কখনো তার ছেলেমেয়ের কথা বলে, কখনো গ্রামের
কথা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বলে মামির কথা।
একদিন আমি
মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, "মামা, মামি কি কখনো অভিযোগ করে?"
মামা মাথা
নাড়ল। "না মামা। অভিযোগ করলে তো আমি বাইচ্চা যাইতাম। কিন্তু অয় তো শুধু কয়,
'তুমি সুস্থ থাইকো। ভালো থাইকো। আমি আছি।' এই তিনডা কথা হুনলে মনে হয় আমার জীবনের
সব কষ্ট মিথ্যা।"
সেদিন ক্লাসে
গিয়েও মন বসেনি। সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল এই শহরে কত মামা আছে, যারা ব্রেসলেট পরে আছে
স্মৃতির ভারে। কত মামি আছে, যারা গ্রামে একা বসে থাকে, স্বামীর ফেরার অপেক্ষায়।
ঈদের পর
মামার সাথে আবার দেখা। এবার মামাকে অন্যরকম লাগছিল। চোখে এক ধরনের উচ্ছ্বাস।
"মামা,
ভালো আছেন?"
মামা হাসল।
"হ মামা, ভালো আছি। এইবার ঈদে গিয়া অরে একটা মোবাইল কিনা দিছি।দুই বছর ধইরা টাকা
জমাইছিলাম। এখন অয় যখন ইচ্ছা আমারে ফোন দিতে পারবো। আর আমিও পারব। আগে অর ভাইয়ের বউর
মোবাইলে কল দিতাম। মন ভইরা কথা কইতে পারতাম না। "
মামার চোখ
ভিজে গেছিল কথা বলতে বলতে।
"মামা,
জানেন? ফোনটা হাতে নিয়া অয় কাইন্দা ফেলছিল। কইছিল, 'অহন আর কারো পিছে কথা কওনের জন্যে
ঘুরতে হইবো না।"
আমি তখন
ওরে জড়াইয়া ধইরা কইছিলাম, 'তুমি সবসময় আমার কাছেই থাহ । এই ব্রেসলেটটা দেখ, এইটা
রোজ আমার হাতে থাকে। রোজ তোমারে মনে করায়।'"
আমি চুপ
করে শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল এই গল্প শুধু একজন রিকশাওয়ালা আর তার স্ত্রীর নয়। এই গল্প
দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের, যারা ভালোবাসার জন্য দূরত্বকে সহ্য করে, স্বপ্নের জন্য
একাকীত্বকে মেনে নেয়।
গত কয়েকদিন
মামাকে দেখলাম না। সেই গ্যারেজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মামার সেই রিকশা এলো। কিন্তু
মামা নেই। অন্য একজন চালাচ্ছে।
"ভাই,
আগে যে মামা এই রিকশা চালাতো, সে কোথায়?"
নতুন রিকশাওয়ালা
বলল, "ও, হোসেন? ওর বউ মারা গেছে শুনছি। গ্রামে গেছে। কবে ফিরবে জানি না।"
বুকটা ধক
করে উঠল।
পরের দিনগুলো
কেটে গেল অপেক্ষায়। একদিন হঠাৎ দেখলাম মামা আবার রিকশা চালাচ্ছে। কিন্তু আগের মতো
নেই। চোখে মুখে বিষন্নতা। মুখে কথা নেই।
রিকশায়
উঠলাম। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। তারপর আস্তে করে বললাম, "মামা, আমি শুনছি..."
মামা কিছু
বলল না। শুধু হাতটা একবার দেখাল। ব্রেসলেটটা নেই।
"মামিরে
দাফনের সময় ওর হাতে পরাইয়া দিছি। কইছিলাম তো, 'এইডা পইরা ঘুরলে নাকি মনে হয় আমি
তোমার লগে আছি।' এখন অয়ই একা। "
মামার গলা
ভেঙে গেল।
"আমি
তো ফিরা আসছি মামা। কিন্তু অয়? অয় তো আর ফিরবে না। সারাজীবন অপেক্ষা করল আমার লাগি।
আর আমি... আমি শুধু বছরে একবার দেখা করতাম। এখন মনে হয়, ওরে নিয়া আসা উচিত আছিল।
যত কষ্টই হোক, একসাথে থাকা উচিত আছিল।"
সেদিন আর
কোনো কথা হয়নি।
কিন্তু সেদিন
থেকে আজ পর্যন্ত যখনই রিকশায় উঠি, মামার হাতের সেই ফাঁকা জায়গাটা চোখে পড়ে। আর মনে
হয়—ভালোবাসা মানে শুধু অপেক্ষা নয়, সান্নিধ্যও।
কারণ, সময়
কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আর হারিয়ে যাওয়ার পর শুধু অনুশোচনাই থাকে। ব্রেসলেট থাকে
না।
ভালোবাসাকে
কাল পর্যন্ত ফেলে রাখতে নেই। আজই কাছে থাকুন, কাছে রাখুন। 'পরে' নামের কোনো সময় নেই—
থাকে শুধু 'হায়, যদি...
2.png)