সাহিত্য
একজন মানুষকে বোঝার জন্য তাঁর আত্মজীবনী বা কর্মজীবনের সাফল্যই সব সময় যথেষ্ট নয়। অনেক সময় কৈশোরের একটি খাতা, একটি চিঠি কিংবা একটি দিনলিপিই তাঁর মানসিক গঠনের সবচেয়ে অকৃত্রিম দলিল হয়ে ওঠে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘বালক পরিব্রাজকের দিনলিপি’ ঠিক তেমনই একটি বই।
সম্প্রতি প্রকাশিত এই গ্রন্থটি হাতে নিলে প্রথমেই বিস্ময় জাগে একটি তথ্য জেনে—ডায়েরিটি লেখা হয়েছিল ১৯৫৫ সালে, যখন লেখকের বয়স মাত্র ১৫ বছর। আরও বিস্ময়কর হলো, এটি কোনো কিশোরের দৈনন্দিন জীবনযাপনের নোটবই নয়; বরং কয়েকটি মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত দীর্ঘ এক শিক্ষাসফরের ধারাবাহিক বিবরণ।
১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করেন মুহাম্মদ ইউনূস। সে বছর স্কাউট সদস্য হিসেবে ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি পেয়ে পাকিস্তান সরকারের উদ্যোগে কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলিয়ে নির্বাচিত ২৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছিলেন মাত্র তিনজন।
এরপর শুরু হয় প্রায় ছয় মাসের এক দীর্ঘ ভ্রমণ। বিমান ও জাহাজে করে তাঁদের যাত্রাপথ বিস্তৃত হয় করাচি থেকে হল্যান্ড, উত্তর আমেরিকা, লন্ডন, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, গ্রিস, তুরস্ক, আলেপ্পো, দামেস্ক, ইরাক, দজলা-ফুরাত অঞ্চল, কারবালা, নাজাফ, ইস্তাম্বুল, বাহরাইন, কাতার, ইরান, বোম্বাই, কলকাতা হয়ে ঢাকায়।
এই ভ্রমণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তিনি নিয়মিত লিখে গেছেন নিজের ডায়েরিতে। বইটি পড়তে পড়তে স্পষ্ট হয়, তাঁর আগ্রহ কেবল দর্শনীয় স্থান দেখায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষকে দেখেছেন, শহরের ছন্দকে বুঝতে চেয়েছেন, সংস্কৃতির পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন, অবকাঠামো, শৃঙ্খলা, জীবনযাপন এবং সামাজিক বাস্তবতাও নিজের মতো করে নথিবদ্ধ করেছেন। বয়সের তুলনায় তাঁর পর্যবেক্ষণের গভীরতা অনেক ক্ষেত্রেই বিস্মিত করে।
এই কারণেই বইটি কেবল ভ্রমণসাহিত্য নয়। এটি একই সঙ্গে একটি সময়ের দলিল এবং একজন ভবিষ্যৎ বিশ্বনেতার মানসিক বিকাশের প্রাথমিক নথি। পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য, সামাজিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে যে বৈশ্বিক চিন্তার জন্য ড. ইউনূস পরিচিত হন, তার প্রত্যক্ষ সূত্র এই ডায়েরিতে নেই; তবে পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখার যে তীব্র কৌতূহল এবং মানুষের জীবনকে বোঝার যে প্রবণতা তাঁর মধ্যে ছিল, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে বারবার।
ডায়েরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর স্বতঃস্ফূর্ততা। এটি পরবর্তী সময়ে প্রকাশের উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি। ফলে ভাষা, অনুভূতি ও পর্যবেক্ষণে রয়েছে এক ধরনের অকৃত্রিম সততা। ইতিহাসের দূরত্ব থেকে আজ সেই লেখাগুলো পড়লে শুধু একজন কিশোরকে নয়, ১৯৫০-এর দশকের পৃথিবীরও একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।
গ্রন্থটির প্রথম ডায়েরি-এন্ট্রি ২২ জুলাই ১৯৫৫ এবং শেষটি ৩ ডিসেম্বর ১৯৫৫। প্রায় পাঁচ মাসের এই ধারাবাহিক নথি আজ শুধু একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংরক্ষিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৈশোর-দিনলিপির মর্যাদা পাওয়ার দাবিদার।
বই: বালক পরিব্রাজকের দিনলিপি
লেখক: ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রকাশনা: সুবর্ণ পাবলিকেশন
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মূল্য: ৪০০ টাকা
অর্ডার লিংকঃ ক্লিক করুণ
2.png)
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬
একজন মানুষকে বোঝার জন্য তাঁর আত্মজীবনী বা কর্মজীবনের সাফল্যই সব সময় যথেষ্ট নয়। অনেক সময় কৈশোরের একটি খাতা, একটি চিঠি কিংবা একটি দিনলিপিই তাঁর মানসিক গঠনের সবচেয়ে অকৃত্রিম দলিল হয়ে ওঠে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘বালক পরিব্রাজকের দিনলিপি’ ঠিক তেমনই একটি বই।
সম্প্রতি প্রকাশিত এই গ্রন্থটি হাতে নিলে প্রথমেই বিস্ময় জাগে একটি তথ্য জেনে—ডায়েরিটি লেখা হয়েছিল ১৯৫৫ সালে, যখন লেখকের বয়স মাত্র ১৫ বছর। আরও বিস্ময়কর হলো, এটি কোনো কিশোরের দৈনন্দিন জীবনযাপনের নোটবই নয়; বরং কয়েকটি মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত দীর্ঘ এক শিক্ষাসফরের ধারাবাহিক বিবরণ।
১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করেন মুহাম্মদ ইউনূস। সে বছর স্কাউট সদস্য হিসেবে ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি পেয়ে পাকিস্তান সরকারের উদ্যোগে কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলিয়ে নির্বাচিত ২৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছিলেন মাত্র তিনজন।
এরপর শুরু হয় প্রায় ছয় মাসের এক দীর্ঘ ভ্রমণ। বিমান ও জাহাজে করে তাঁদের যাত্রাপথ বিস্তৃত হয় করাচি থেকে হল্যান্ড, উত্তর আমেরিকা, লন্ডন, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, গ্রিস, তুরস্ক, আলেপ্পো, দামেস্ক, ইরাক, দজলা-ফুরাত অঞ্চল, কারবালা, নাজাফ, ইস্তাম্বুল, বাহরাইন, কাতার, ইরান, বোম্বাই, কলকাতা হয়ে ঢাকায়।
এই ভ্রমণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তিনি নিয়মিত লিখে গেছেন নিজের ডায়েরিতে। বইটি পড়তে পড়তে স্পষ্ট হয়, তাঁর আগ্রহ কেবল দর্শনীয় স্থান দেখায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষকে দেখেছেন, শহরের ছন্দকে বুঝতে চেয়েছেন, সংস্কৃতির পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন, অবকাঠামো, শৃঙ্খলা, জীবনযাপন এবং সামাজিক বাস্তবতাও নিজের মতো করে নথিবদ্ধ করেছেন। বয়সের তুলনায় তাঁর পর্যবেক্ষণের গভীরতা অনেক ক্ষেত্রেই বিস্মিত করে।
এই কারণেই বইটি কেবল ভ্রমণসাহিত্য নয়। এটি একই সঙ্গে একটি সময়ের দলিল এবং একজন ভবিষ্যৎ বিশ্বনেতার মানসিক বিকাশের প্রাথমিক নথি। পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য, সামাজিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে যে বৈশ্বিক চিন্তার জন্য ড. ইউনূস পরিচিত হন, তার প্রত্যক্ষ সূত্র এই ডায়েরিতে নেই; তবে পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখার যে তীব্র কৌতূহল এবং মানুষের জীবনকে বোঝার যে প্রবণতা তাঁর মধ্যে ছিল, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে বারবার।
ডায়েরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর স্বতঃস্ফূর্ততা। এটি পরবর্তী সময়ে প্রকাশের উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি। ফলে ভাষা, অনুভূতি ও পর্যবেক্ষণে রয়েছে এক ধরনের অকৃত্রিম সততা। ইতিহাসের দূরত্ব থেকে আজ সেই লেখাগুলো পড়লে শুধু একজন কিশোরকে নয়, ১৯৫০-এর দশকের পৃথিবীরও একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।
গ্রন্থটির প্রথম ডায়েরি-এন্ট্রি ২২ জুলাই ১৯৫৫ এবং শেষটি ৩ ডিসেম্বর ১৯৫৫। প্রায় পাঁচ মাসের এই ধারাবাহিক নথি আজ শুধু একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংরক্ষিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৈশোর-দিনলিপির মর্যাদা পাওয়ার দাবিদার।
বই: বালক পরিব্রাজকের দিনলিপি
লেখক: ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রকাশনা: সুবর্ণ পাবলিকেশন
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মূল্য: ৪০০ টাকা
অর্ডার লিংকঃ ক্লিক করুণ
2.png)