সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

নীলনদের পানি বন্টন নিয়ে মিশর ও ইথিওপিয়া সংঘাতের আশঙ্কা

নীলনদের পানি বণ্টনকে কেন্দ্র করে মিশর, ইথিওপিয়া ও সুদানের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য—সবকিছু মিলিয়ে এই সংকট এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

নীলনদের পানি বন্টন নিয়ে মিশর ও ইথিওপিয়া সংঘাতের আশঙ্কা
ছবি -সংগৃহীত

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নদী শুধু পানির উৎস নয়, রাষ্ট্র গঠনেরও ভিত্তি। নীলনদকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা। আজ সেই নদীকেই কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম (GERD) প্রকল্পকে ঘিরে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা এখন আফ্রিকার নিরাপত্তা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের দীর্ঘতম নদী নীলনদ প্রায় ৬,৬৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ১১টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তবে এই নদীর পানির সবচেয়ে বড় উৎস ব্লু নাইল, যার প্রায় ৮৫ শতাংশ পানি ইথিওপিয়ার উচ্চভূমি থেকে আসে। অথচ বিংশ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক যুগে সম্পাদিত ১৯২৯ এবং ১৯৫৯ সালের নীলনদ চুক্তি মূলত মিশর ও সুদানকে পানির অধিকাংশ ব্যবহারের অধিকার দেয়। ইথিওপিয়া ওই চুক্তির পক্ষ ছিল না এবং স্বাধীনতার পর থেকেই এটিকে ঔপনিবেশিক যুগের অসম ব্যবস্থা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

এই ঐতিহাসিক বিরোধ নতুন মাত্রা পায় ২০১১ সালে, যখন ইথিওপিয়া ব্লু নাইলের ওপর গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যামের নির্মাণ শুরু করে। প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম এই প্রকল্প আফ্রিকার সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পথে। ইথিওপিয়ার দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; শিল্পায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতীক।

দেশটির প্রায় ১৩ কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। সরকার মনে করে, জেরড প্রকল্প চালু হলে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদাই পূরণ হবে না, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বিদ্যুৎ রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। ফলে এটি ইথিওপিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, মিশরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির নবায়নযোগ্য মিঠা পানির প্রায় ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশই নীলনদের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি, শিল্প, নগরায়ণ এবং প্রায় ১১ কোটির বেশি মানুষের জীবনযাত্রা এই নদীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই কায়রোর আশঙ্কা, যদি দ্রুতগতিতে জলাধার পূরণ করা হয় বা দীর্ঘমেয়াদে নদীর প্রবাহ কমে যায়, তাহলে খাদ্য উৎপাদন, পানীয় জল এবং অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়তে পারে।

মিশর বারবার দাবি করেছে, বাঁধ পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ও আইনগতভাবে কার্যকর একটি চুক্তি প্রয়োজন, যাতে খরার সময় ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত থাকে। ইথিওপিয়া অবশ্য বলছে, নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সার্বভৌম অধিকার তাদের রয়েছে এবং তারা এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নেবে না, যা ভবিষ্যতে প্রকল্প পরিচালনার স্বাধীনতাকে সীমিত করে।

এই সংকটে সুদানের অবস্থান সবচেয়ে জটিল। ভৌগোলিকভাবে দুই দেশের মাঝখানে অবস্থান করায় তারা যেমন সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে, তেমনি সম্ভাব্য সুবিধাভোগীও। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁধটি সফলভাবে পরিচালিত হলে সুদানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে, কৃষি উৎপাদন বাড়তে পারে এবং তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাঁধ পরিচালনায় সমন্বয়ের অভাব দেখা দিলে সুদানের নিরাপত্তা ও জলব্যবস্থাপনাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই বিরোধ কেবল তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীন জেরড প্রকল্পের বিভিন্ন অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ বিভিন্ন সময়ে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু আফ্রিকার স্থিতিশীলতাই নয়, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালকেন্দ্রিক বৈশ্বিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নীলনদ এখন আফ্রিকার শক্তির ভারসাম্যেরও প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে মিশর ছিল নীলনদ ব্যবস্থাপনার প্রধান প্রভাবশালী রাষ্ট্র। কিন্তু দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইথিওপিয়া নিজেকে পূর্ব আফ্রিকার নতুন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ফলে এই বিরোধ শুধু পানির নয়, নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও বটে।

জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আফ্রিকায় অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করেছে, ভবিষ্যতে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো নিয়ে বিরোধ আরও বাড়তে পারে, যদি পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক নীতি গ্রহণ না করা হয়।

তবে অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা প্রকাশ করলেও অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের মতে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এখনো কোনো পক্ষের জন্য লাভজনক নয়। যুদ্ধ হলে বাঁধ, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, কৃষি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

সেজন্যই নীলনদকে ঘিরে বর্তমান সংকটকে শুধু একটি পানি-বণ্টন বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আন্তর্জাতিক আইন, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু। ভবিষ্যতে এই সংকটের পরিণতি নির্ধারণ করবে কেবল মিশর বা ইথিওপিয়ার কূটনীতি নয়, বরং আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সক্ষমতাও।

বিষয় : নীল নদ ইথিওপিয়া মিশর GERD

কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬


নীলনদের পানি বন্টন নিয়ে মিশর ও ইথিওপিয়া সংঘাতের আশঙ্কা

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬

featured Image

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নদী শুধু পানির উৎস নয়, রাষ্ট্র গঠনেরও ভিত্তি। নীলনদকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা। আজ সেই নদীকেই কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম (GERD) প্রকল্পকে ঘিরে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা এখন আফ্রিকার নিরাপত্তা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের দীর্ঘতম নদী নীলনদ প্রায় ৬,৬৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ১১টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তবে এই নদীর পানির সবচেয়ে বড় উৎস ব্লু নাইল, যার প্রায় ৮৫ শতাংশ পানি ইথিওপিয়ার উচ্চভূমি থেকে আসে। অথচ বিংশ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক যুগে সম্পাদিত ১৯২৯ এবং ১৯৫৯ সালের নীলনদ চুক্তি মূলত মিশর ও সুদানকে পানির অধিকাংশ ব্যবহারের অধিকার দেয়। ইথিওপিয়া ওই চুক্তির পক্ষ ছিল না এবং স্বাধীনতার পর থেকেই এটিকে ঔপনিবেশিক যুগের অসম ব্যবস্থা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

এই ঐতিহাসিক বিরোধ নতুন মাত্রা পায় ২০১১ সালে, যখন ইথিওপিয়া ব্লু নাইলের ওপর গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যামের নির্মাণ শুরু করে। প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম এই প্রকল্প আফ্রিকার সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পথে। ইথিওপিয়ার দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; শিল্পায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতীক।

দেশটির প্রায় ১৩ কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। সরকার মনে করে, জেরড প্রকল্প চালু হলে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদাই পূরণ হবে না, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বিদ্যুৎ রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। ফলে এটি ইথিওপিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, মিশরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির নবায়নযোগ্য মিঠা পানির প্রায় ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশই নীলনদের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি, শিল্প, নগরায়ণ এবং প্রায় ১১ কোটির বেশি মানুষের জীবনযাত্রা এই নদীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই কায়রোর আশঙ্কা, যদি দ্রুতগতিতে জলাধার পূরণ করা হয় বা দীর্ঘমেয়াদে নদীর প্রবাহ কমে যায়, তাহলে খাদ্য উৎপাদন, পানীয় জল এবং অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়তে পারে।

মিশর বারবার দাবি করেছে, বাঁধ পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ও আইনগতভাবে কার্যকর একটি চুক্তি প্রয়োজন, যাতে খরার সময় ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত থাকে। ইথিওপিয়া অবশ্য বলছে, নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সার্বভৌম অধিকার তাদের রয়েছে এবং তারা এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নেবে না, যা ভবিষ্যতে প্রকল্প পরিচালনার স্বাধীনতাকে সীমিত করে।

এই সংকটে সুদানের অবস্থান সবচেয়ে জটিল। ভৌগোলিকভাবে দুই দেশের মাঝখানে অবস্থান করায় তারা যেমন সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে, তেমনি সম্ভাব্য সুবিধাভোগীও। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁধটি সফলভাবে পরিচালিত হলে সুদানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে, কৃষি উৎপাদন বাড়তে পারে এবং তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাঁধ পরিচালনায় সমন্বয়ের অভাব দেখা দিলে সুদানের নিরাপত্তা ও জলব্যবস্থাপনাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই বিরোধ কেবল তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীন জেরড প্রকল্পের বিভিন্ন অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ বিভিন্ন সময়ে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু আফ্রিকার স্থিতিশীলতাই নয়, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালকেন্দ্রিক বৈশ্বিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নীলনদ এখন আফ্রিকার শক্তির ভারসাম্যেরও প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে মিশর ছিল নীলনদ ব্যবস্থাপনার প্রধান প্রভাবশালী রাষ্ট্র। কিন্তু দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইথিওপিয়া নিজেকে পূর্ব আফ্রিকার নতুন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ফলে এই বিরোধ শুধু পানির নয়, নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও বটে।

জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আফ্রিকায় অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করেছে, ভবিষ্যতে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো নিয়ে বিরোধ আরও বাড়তে পারে, যদি পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক নীতি গ্রহণ না করা হয়।

তবে অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা প্রকাশ করলেও অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের মতে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এখনো কোনো পক্ষের জন্য লাভজনক নয়। যুদ্ধ হলে বাঁধ, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, কৃষি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

সেজন্যই নীলনদকে ঘিরে বর্তমান সংকটকে শুধু একটি পানি-বণ্টন বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আন্তর্জাতিক আইন, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু। ভবিষ্যতে এই সংকটের পরিণতি নির্ধারণ করবে কেবল মিশর বা ইথিওপিয়ার কূটনীতি নয়, বরং আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সক্ষমতাও।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত