সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আবহমান বঞ্চনাআবহমান বঞ্চনা

মরা পদ্মার বুকে পঞ্চাশ বছরের কান্না

একটি বাঁধ, একটি জাতির বঞ্চনা — এবং যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি

মরা পদ্মার বুকে পঞ্চাশ বছরের কান্না
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)

রাজশাহীর চরে এখন গরু চরে। যেখানে একদিন পদ্মার ঢেউ এসে ভাঙত পাড়, সেখানে এখন শুধু বালি আর বালি। জেলেরা নৌকা বেঁধে রাখেন ডাঙায় — কারণ নদীতে আর নামার মতো পানি নেই। মার্চ-এপ্রিলে পদ্মার বুক এত শুকিয়ে যায় যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে দিয়ে হাঁটা যায়।

এই ছবি ১৯৭৫ সালের আগে কেউ কল্পনাও করতে পারতেন না।

সেই বছর, ২১ এপ্রিল — মাত্র ৪১ দিনের পরীক্ষার কথা বলে ভারত একটি বাঁধের গেট খুলে দিয়েছিল। সেই ৪১ দিন আর শেষ হয়নি। পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে।

 

শুরুর গল্প — যে ধাপ্পায় বাংলাদেশ পড়েছিল

ফারাক্কা বাঁধের গল্পটা শুরু হয় আরও আগে। ১৯৫১ সালে, যখন পাকিস্তান সরকার প্রথম আপত্তি জানায় — ভারত গঙ্গার পানি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ভারত তখন বলেছিল, সব কিছু "প্রাথমিক পর্যায়ে"। আলাপ-আলোচনা চলছে।

কিন্তু যখন আলাপ চলছিল, তখনই ১৯৬১ সালে বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে গেল। কাউকে না জানিয়ে, কোনো চুক্তি ছাড়া।

১৯৬১ সালে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৬.৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে উঠল ২ হাজার ২৪০ মিটারের এক বিশাল কংক্রিটের দেয়াল। প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায়।

উদ্দেশ্য কী? কলকাতা বন্দরকে পলি থেকে রক্ষা করতে গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে ঘুরিয়ে দেওয়া।

কিন্তু এই "উদ্দেশ্য"র মাশুল কে দেবে — সেটা কেউ জিজ্ঞেস করেনি বাংলাদেশকে।

 

১৯৭৪ — যে প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই গঙ্গার পানি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট বলেন — উভয় দেশ চুক্তিতে আসার আগে ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হবে না।

প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। লেখা হয়েছিল।

তারপরও পরের বছর, ১৯৭৫ সালে, ভারত বলল — শুধু পরীক্ষামূলকভাবে ১০ দিনের জন্য বাঁধের ফিডার খাল চালু করতে দিন। বাংলাদেশ সরল বিশ্বাসে রাজি হলো।

সেই ১০ দিনের অনুমতি নিয়ে ভারত বাঁধ চালু করে দিল এবং নির্ধারিত সময়ের পরেও একতরফাভাবে গঙ্গার গতি পরিবর্তন করতে থাকল।

এর কয়েক মাস পরে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলো। দেশ পড়ল রাজনৈতিক অস্থিরতায়।শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর ভারত কোনোরকম আলোচনায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থেকে ১৯৭৬ সালের পুরো শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত গঙ্গা নদী থেকে পানি সরিয়ে হুগলিতে দিতে থাকল।

সুযোগের সদ্ব্যবহার হলো। বাংলাদেশের যেন কিছুই করার থাকলোনা।

 

মওলানা ভাসানী — ৮০ বছরের বুড়ো যখন পথে নামলেন

১৯৭৬ সালের মে মাসে একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল।

প্রায় ৮০ বছরের এক বৃদ্ধ কৃষক নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঢাকা থেকে ভারতের সীমান্তের দিকে লংমার্চ শুরু করলেন। ১৬ মে ১৯৭৬। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট হাইস্কুল মাঠে বিশাল জনসভায় তিনি দাবি জানালেন — আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পদ্মার ন্যায্য পানি চাই।

লক্ষ মানুষ সেদিন হেঁটেছিল। খালি পায়ে, রোদের মধ্যে, মাটির রাস্তায়।

সেই লংমার্চ আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি কাড়ল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিষয়টি জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনের আলোচনার তালিকায় তুললেন। ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ভারতকে বাংলাদেশের সাথে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে।

ভারত তখন বাধ্য হলো কথা বলতে। ভারতে কংগ্রেস সরকার পড়ে গিয়ে মোরারজি দেশাইয়ের সরকার আসার পর সম্পর্ক কিছুটা ভালো হয়। ১৯৭৭ সালে পাঁচ বছরের পানিবণ্টন চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম পানির নিশ্চয়তা ছিল।

এটাই ছিল সবচেয়ে ভালো চুক্তি। পরে আর এত ভালো চুক্তি হয়নি বা কেউ করতে পারেনি। 

 

হারানো কয়েক দশক — যখন কেউ লড়েনি

১৯৭৭ সালের চুক্তি শেষ হলো ১৯৮২ সালে। তারপর এলো ছোট ছোট অস্থায়ী সমঝোতা — ১৯৮২, ১৯৮৫। কিন্তু সেগুলো ছিল কাগুজে।

১৯৮৯ সালের পর শুষ্ক মৌসুমে পানি ভাগাভাগির কোনো আইনি কাঠামোই রইল না। এই সুযোগে ভারত শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি ব্যাপকভাবে একতরফা সরাতে শুরু করল।

ফলাফলটা দেখা গেল ভাটির মানুষের জীবন যাত্রায়। 

ফারাক্কা-পূর্ব সময়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে মার্চ মাসে গঙ্গার প্রবাহ ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১৯৮০ কিউসেক। ১৯৯৩ সালে সেটা কমে দাঁড়াল মাত্র ২৬১ কিউসেকে।

এটা শুধু পানির পরিমান নয় — এটা যেন হয়ে থাকলো একটা নদীর মৃত্যুর রেকর্ড।

জেনারেল এরশাদের আমলে কূটনৈতিক চাপ আরও কমে গেল। জিয়াউর রহমানের আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফারাক্কাকে তোলার সাফল্য পরে এরশাদের আমলে আপোষের মাধ্যমে দুর্বল হয়ে পড়ে।

সামরিক শাসকরা দেশের ভেতরে টিকে থাকার জন্য ভারতের সাথে সম্পর্ক মধুর রাখতে চাইলেন। পানির হিসাব সেই রাজনীতির কাছে হেরে গেল।

 

১৯৯৬ চুক্তি — "ঐতিহাসিক" না ফাঁকি?

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এল। সম্পর্ক উষ্ণ হলো। ডিসেম্বর মাসে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়ের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হলো ৩০ বছরের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি।

সরকার বলল — এটা "ঐতিহাসিক"।

কিন্তু চুক্তির ভেতরে কী ছিল?

চুক্তি অনুযায়ী, নদীতে ৭০ হাজার কিউসেক পানি থাকলে উভয় দেশ পাবে ৩৫ হাজার করে। এর বেশি থাকলে ভারত পাবে ৪০ হাজার, বাকিটা পাবে বাংলাদেশ।

শুনতে ভালো। কিন্তু আসল সমস্যা হলো — শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় কতটুকু পানি আসছে সেটা নির্ভর করে উজানের বাঁধ-ব্যারেজের উপর। ভারত শুধু ফারাক্কার তথ্য দেয়, কিন্তু উজানে যত বাঁধ ও ব্যারেজ আছে তাদের তথ্য দেয় না — যদিও ওগুলোই গঙ্গার পানি প্রবাহ কমিয়ে দেয়।

আরও বড় সমস্যা — ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে যে "গ্যারান্টি ক্লজ" ছিল, ১৯৯৬-এর চুক্তিতে সেটা নেই। চুক্তিতে বলা আছে "যদি পানি থাকে তাহলে" — এই "যদি"-র কারণে বাংলাদেশ বারবার বঞ্চিতই রয়ে হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, চুক্তির পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বাংলাদেশ চুক্তিমতো পানি পায়নি।

তাহলে চুক্তি কতটুকু কাজে লাগল?

 

যা হারিয়ে গেছে — মাটি, নদী, মানুষ

ফারাক্কার ক্ষতির হিসাব শুধু কাগুজে জিসেবে তুলে ধরা মুশকিল,পুরোটা  বোঝা যায় না। মাঠে গেলে বোঝা যায়।

পদ্মা শুকিয়ে গেছে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে পদ্মা ও মহানন্দা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। একসময়ের জীবন্ত নদীগুলো এখন মৌসুমী খাল।

মাটির নিচেও পানি নেই। গঙ্গা-নির্ভর এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩ মিটারের বেশি নেমে গেছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় পানির স্তর ৮ থেকে ১০ ফুটের জায়গায় এখন ১৫ ফুট নিচে।

খুলনায় লবণের আগ্রাসন। ফারাক্কার ফলে খুলনা অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। মিঠাপানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে লবণ ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশছে। সুন্দরবনের গাছ মরছে।

কৃষি ধ্বংস হচ্ছে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে কৃষি খাতে প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয়েছে বছরে ৫ বিলিয়ন টাকারও বেশি। পরোক্ষ ক্ষতি ছিল বছরে আরও ২৩ বিলিয়ন টাকা।

পানকূপের পানি অস্বাস্থ্যকর। মানুষ ১২০০ মিলিগ্রাম/লিটার দ্রবীভূত কঠিন পদার্থযুক্ত পানীয় জল পান করতে বাধ্য হচ্ছে — যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত সীমা মাত্র ৫০০ মিলিগ্রাম।

এবং বন্যা। শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি ধরে রাখে। বর্ষায় সব গেট খুলে দেয়। ভারতের খেয়ালখুশিমতো পানি অপসারণ ও বন্ধের ফলে শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানি সংকট আর বর্ষা মৌসুমে প্রবল বন্যার কবলে পড়ছে বাংলাদেশ।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে।

 

নতজানু রাজনীতির দাম

পঞ্চাশ বছরে কত নেতা এসেছেন, কতজন গেছেন। ফারাক্কার প্রশ্ন কতটুকু এগিয়েছে কার্যকরভাবে? 

শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখতে গিয়ে বাঁধ চালুর ১০ দিনের অনুমতি দিলেন — চুক্তি ছাড়াই। সেই ভুলের খেসারত দিয়েছে দেশ দশকের পর দশক। জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক মঞ্চে লড়াই করে ১৯৭৭ সালে একটি ভালো চুক্তি আনতে পেরেছিলেন — এটা সত্য। কিন্তু সেই লড়াই ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া হয়নি।

এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সাথে দেখা করে গঙ্গা, তিস্তাসহ প্রধান নদীগুলোর পানিবণ্টনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ার একমত হন। কিন্তু সেটা থেমে গেল সরকার বদলের সাথে।

১৯৯৬ সালে হাসিনা সরকার যে চুক্তি করল, তাতে বাংলাদেশের পানির হিস্যা ধীরে ধীরে কমেছে — পাঁচটি চুক্তির বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট। এবং চুক্তির পর যখন জানা গেল পানিপ্রবাহ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম, তখনও জোরালো কূটনৈতিক চাপ দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে — পানিবঞ্চনা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে। এই মরুভূমি রাতারাতি হয়নি। দশকের পর দশকে ধীরে ধীরে হয়েছে — আর প্রতিটি সরকারই এটা দেখেছে, মাথা নত করেছে।

ভারতের সাথে "সম্পর্ক ভালো রাখা"র নামে পানির ন্যায্য দাবি তোলা হয়নি। কূটনীতির নামে দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকাকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে।

 

২০২৬ — শেষ সুযোগের হাতছানি


২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর — ৩০ বছরের গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ভারত-বাংলাদেশের পানিকূটনীতির ইতিহাসে এটা সবচেয়ে বড় সুযোগ।

কিন্তু চাপটাও আছে বেশ। ভারত ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে — নতুন চুক্তিতে তাদের ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদার বিষয়টি রাখতে হবে। সহজ কথায়, ভারত আরও বেশি পানি চাইছে — বাংলাদেশের অংশ কমিয়ে।

বাংলাদেশ এখনও মরুকরণ, পানিসংকট, বর্ষার বন্যা, নদী ভাঙন, ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষয়, নৌচলাচলের অযোগ্যতা, এবং উপকূলীয় লবণাক্ততা — এই সব সংকটের মুখে। নতুন চুক্তিতে যদি এগুলো না ঠেকানো যায়, তাহলে পরের ৩০ বছর আরও অন্ধকার।

 

করণীয় — আর নতজানু হওয়ার সময় নেই

তাহলে কী করা উচিত?

এক — পুরনো চুক্তির মুখস্থ ফর্মুলায় নয়। নতুন চুক্তিতে শুধু পানির ভাগাভাগি নয়, পরিবেশের ক্ষতিপূরণ, উজানের সব বাঁধের তথ্য প্রদান এবং বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছাড়া নিয়ন্ত্রণ — এই সব শর্ত রাখতে হবে।

দুই — আন্তর্জাতিক আইনের পথ খোলা রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি জাতিসংঘে বিষয়টি তোলার দাবি জানাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদী আইনের আওতায় বাংলাদেশের দাবি বৈধ — এই সত্যটাকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

তিন — ভারতের ভেতরেও ফারাক্কা বিরোধী একটা কণ্ঠস্বর আছে। প্রয়োজনে তাদেরকেও পাশে নিতে হবে। ২০১৬ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার নিজেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিহার প্রদেশও ফারাক্কার কারণে বন্যায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। এই ভারতীয় কণ্ঠস্বর বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিত্র হতে পারে।

চার — জাতীয় ঐক্য চাই। ফারাক্কা প্রশ্নে আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনীতি থামাতে হবে। এটা দলীয় প্রশ্ন নয় — জাতীয় প্রশ্ন।

 

মওলানা ভাসানী বৃদ্ধ বয়সে যে মাটির রাস্তায় হেঁটেছিলেন, সেই রাস্তা আজও শেষ হয়নি

পদ্মার বুকে বালি জমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক ধার ততোটা আসেনি  — বরং আরও নমনীয় হয়েছে দিনে দিনে।

২০২৬ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ভারত চাইছে নতুন শর্তে নতুন চুক্তি — নিজের সুবিধামতো করিয়ে নিতে। বাংলাদেশকে এবার ঠিক করতে হবে — কোটি মানুষের পানির হক রক্ষা করবে, নাকি আবার নতজানু হয়ে সই করবে। ফারাক্কার পানি শুধু পানি নয়। এটা একটি জাতির বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

 

প্রতি বছর ১৬ মে ফারাক্কা দিবস পালিত হয়। মওলানা ভাসানীর সেই লংমার্চের স্মরণে। কিন্তু দিবস পালন আর দাবি আদায় এক কথা নয়।

বিষয় : ফারাক্কা দিবস ফারাক্কা বাঁধ মরণফাঁদ

মরা পদ্মার বুকে পঞ্চাশ বছরের কান্না
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


মরা পদ্মার বুকে পঞ্চাশ বছরের কান্না

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

রাজশাহীর চরে এখন গরু চরে। যেখানে একদিন পদ্মার ঢেউ এসে ভাঙত পাড়, সেখানে এখন শুধু বালি আর বালি। জেলেরা নৌকা বেঁধে রাখেন ডাঙায় — কারণ নদীতে আর নামার মতো পানি নেই। মার্চ-এপ্রিলে পদ্মার বুক এত শুকিয়ে যায় যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে দিয়ে হাঁটা যায়।

এই ছবি ১৯৭৫ সালের আগে কেউ কল্পনাও করতে পারতেন না।

সেই বছর, ২১ এপ্রিল — মাত্র ৪১ দিনের পরীক্ষার কথা বলে ভারত একটি বাঁধের গেট খুলে দিয়েছিল। সেই ৪১ দিন আর শেষ হয়নি। পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে।

 

শুরুর গল্প — যে ধাপ্পায় বাংলাদেশ পড়েছিল

ফারাক্কা বাঁধের গল্পটা শুরু হয় আরও আগে। ১৯৫১ সালে, যখন পাকিস্তান সরকার প্রথম আপত্তি জানায় — ভারত গঙ্গার পানি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ভারত তখন বলেছিল, সব কিছু "প্রাথমিক পর্যায়ে"। আলাপ-আলোচনা চলছে।

কিন্তু যখন আলাপ চলছিল, তখনই ১৯৬১ সালে বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে গেল। কাউকে না জানিয়ে, কোনো চুক্তি ছাড়া।

১৯৬১ সালে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৬.৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে উঠল ২ হাজার ২৪০ মিটারের এক বিশাল কংক্রিটের দেয়াল। প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায়।

উদ্দেশ্য কী? কলকাতা বন্দরকে পলি থেকে রক্ষা করতে গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে ঘুরিয়ে দেওয়া।

কিন্তু এই "উদ্দেশ্য"র মাশুল কে দেবে — সেটা কেউ জিজ্ঞেস করেনি বাংলাদেশকে।

 

১৯৭৪ — যে প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই গঙ্গার পানি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট বলেন — উভয় দেশ চুক্তিতে আসার আগে ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হবে না।

প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। লেখা হয়েছিল।

তারপরও পরের বছর, ১৯৭৫ সালে, ভারত বলল — শুধু পরীক্ষামূলকভাবে ১০ দিনের জন্য বাঁধের ফিডার খাল চালু করতে দিন। বাংলাদেশ সরল বিশ্বাসে রাজি হলো।

সেই ১০ দিনের অনুমতি নিয়ে ভারত বাঁধ চালু করে দিল এবং নির্ধারিত সময়ের পরেও একতরফাভাবে গঙ্গার গতি পরিবর্তন করতে থাকল।

এর কয়েক মাস পরে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলো। দেশ পড়ল রাজনৈতিক অস্থিরতায়।শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর ভারত কোনোরকম আলোচনায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থেকে ১৯৭৬ সালের পুরো শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত গঙ্গা নদী থেকে পানি সরিয়ে হুগলিতে দিতে থাকল।

সুযোগের সদ্ব্যবহার হলো। বাংলাদেশের যেন কিছুই করার থাকলোনা।

 

মওলানা ভাসানী — ৮০ বছরের বুড়ো যখন পথে নামলেন

১৯৭৬ সালের মে মাসে একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল।

প্রায় ৮০ বছরের এক বৃদ্ধ কৃষক নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঢাকা থেকে ভারতের সীমান্তের দিকে লংমার্চ শুরু করলেন। ১৬ মে ১৯৭৬। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট হাইস্কুল মাঠে বিশাল জনসভায় তিনি দাবি জানালেন — আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পদ্মার ন্যায্য পানি চাই।

লক্ষ মানুষ সেদিন হেঁটেছিল। খালি পায়ে, রোদের মধ্যে, মাটির রাস্তায়।

সেই লংমার্চ আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি কাড়ল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিষয়টি জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনের আলোচনার তালিকায় তুললেন। ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ভারতকে বাংলাদেশের সাথে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে।

ভারত তখন বাধ্য হলো কথা বলতে। ভারতে কংগ্রেস সরকার পড়ে গিয়ে মোরারজি দেশাইয়ের সরকার আসার পর সম্পর্ক কিছুটা ভালো হয়। ১৯৭৭ সালে পাঁচ বছরের পানিবণ্টন চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম পানির নিশ্চয়তা ছিল।

এটাই ছিল সবচেয়ে ভালো চুক্তি। পরে আর এত ভালো চুক্তি হয়নি বা কেউ করতে পারেনি। 

 

হারানো কয়েক দশক — যখন কেউ লড়েনি

১৯৭৭ সালের চুক্তি শেষ হলো ১৯৮২ সালে। তারপর এলো ছোট ছোট অস্থায়ী সমঝোতা — ১৯৮২, ১৯৮৫। কিন্তু সেগুলো ছিল কাগুজে।

১৯৮৯ সালের পর শুষ্ক মৌসুমে পানি ভাগাভাগির কোনো আইনি কাঠামোই রইল না। এই সুযোগে ভারত শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি ব্যাপকভাবে একতরফা সরাতে শুরু করল।

ফলাফলটা দেখা গেল ভাটির মানুষের জীবন যাত্রায়। 

ফারাক্কা-পূর্ব সময়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে মার্চ মাসে গঙ্গার প্রবাহ ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১৯৮০ কিউসেক। ১৯৯৩ সালে সেটা কমে দাঁড়াল মাত্র ২৬১ কিউসেকে।

এটা শুধু পানির পরিমান নয় — এটা যেন হয়ে থাকলো একটা নদীর মৃত্যুর রেকর্ড।

জেনারেল এরশাদের আমলে কূটনৈতিক চাপ আরও কমে গেল। জিয়াউর রহমানের আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফারাক্কাকে তোলার সাফল্য পরে এরশাদের আমলে আপোষের মাধ্যমে দুর্বল হয়ে পড়ে।

সামরিক শাসকরা দেশের ভেতরে টিকে থাকার জন্য ভারতের সাথে সম্পর্ক মধুর রাখতে চাইলেন। পানির হিসাব সেই রাজনীতির কাছে হেরে গেল।

 

১৯৯৬ চুক্তি — "ঐতিহাসিক" না ফাঁকি?

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এল। সম্পর্ক উষ্ণ হলো। ডিসেম্বর মাসে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়ের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হলো ৩০ বছরের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি।

সরকার বলল — এটা "ঐতিহাসিক"।

কিন্তু চুক্তির ভেতরে কী ছিল?

চুক্তি অনুযায়ী, নদীতে ৭০ হাজার কিউসেক পানি থাকলে উভয় দেশ পাবে ৩৫ হাজার করে। এর বেশি থাকলে ভারত পাবে ৪০ হাজার, বাকিটা পাবে বাংলাদেশ।

শুনতে ভালো। কিন্তু আসল সমস্যা হলো — শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় কতটুকু পানি আসছে সেটা নির্ভর করে উজানের বাঁধ-ব্যারেজের উপর। ভারত শুধু ফারাক্কার তথ্য দেয়, কিন্তু উজানে যত বাঁধ ও ব্যারেজ আছে তাদের তথ্য দেয় না — যদিও ওগুলোই গঙ্গার পানি প্রবাহ কমিয়ে দেয়।

আরও বড় সমস্যা — ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে যে "গ্যারান্টি ক্লজ" ছিল, ১৯৯৬-এর চুক্তিতে সেটা নেই। চুক্তিতে বলা আছে "যদি পানি থাকে তাহলে" — এই "যদি"-র কারণে বাংলাদেশ বারবার বঞ্চিতই রয়ে হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, চুক্তির পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বাংলাদেশ চুক্তিমতো পানি পায়নি।

তাহলে চুক্তি কতটুকু কাজে লাগল?

 

যা হারিয়ে গেছে — মাটি, নদী, মানুষ

ফারাক্কার ক্ষতির হিসাব শুধু কাগুজে জিসেবে তুলে ধরা মুশকিল,পুরোটা  বোঝা যায় না। মাঠে গেলে বোঝা যায়।

পদ্মা শুকিয়ে গেছে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে পদ্মা ও মহানন্দা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। একসময়ের জীবন্ত নদীগুলো এখন মৌসুমী খাল।

মাটির নিচেও পানি নেই। গঙ্গা-নির্ভর এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩ মিটারের বেশি নেমে গেছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় পানির স্তর ৮ থেকে ১০ ফুটের জায়গায় এখন ১৫ ফুট নিচে।

খুলনায় লবণের আগ্রাসন। ফারাক্কার ফলে খুলনা অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। মিঠাপানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে লবণ ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশছে। সুন্দরবনের গাছ মরছে।

কৃষি ধ্বংস হচ্ছে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে কৃষি খাতে প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয়েছে বছরে ৫ বিলিয়ন টাকারও বেশি। পরোক্ষ ক্ষতি ছিল বছরে আরও ২৩ বিলিয়ন টাকা।

পানকূপের পানি অস্বাস্থ্যকর। মানুষ ১২০০ মিলিগ্রাম/লিটার দ্রবীভূত কঠিন পদার্থযুক্ত পানীয় জল পান করতে বাধ্য হচ্ছে — যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত সীমা মাত্র ৫০০ মিলিগ্রাম।

এবং বন্যা। শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি ধরে রাখে। বর্ষায় সব গেট খুলে দেয়। ভারতের খেয়ালখুশিমতো পানি অপসারণ ও বন্ধের ফলে শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানি সংকট আর বর্ষা মৌসুমে প্রবল বন্যার কবলে পড়ছে বাংলাদেশ।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে।

 

নতজানু রাজনীতির দাম

পঞ্চাশ বছরে কত নেতা এসেছেন, কতজন গেছেন। ফারাক্কার প্রশ্ন কতটুকু এগিয়েছে কার্যকরভাবে? 

শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখতে গিয়ে বাঁধ চালুর ১০ দিনের অনুমতি দিলেন — চুক্তি ছাড়াই। সেই ভুলের খেসারত দিয়েছে দেশ দশকের পর দশক। জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক মঞ্চে লড়াই করে ১৯৭৭ সালে একটি ভালো চুক্তি আনতে পেরেছিলেন — এটা সত্য। কিন্তু সেই লড়াই ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া হয়নি।

এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সাথে দেখা করে গঙ্গা, তিস্তাসহ প্রধান নদীগুলোর পানিবণ্টনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ার একমত হন। কিন্তু সেটা থেমে গেল সরকার বদলের সাথে।

১৯৯৬ সালে হাসিনা সরকার যে চুক্তি করল, তাতে বাংলাদেশের পানির হিস্যা ধীরে ধীরে কমেছে — পাঁচটি চুক্তির বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট। এবং চুক্তির পর যখন জানা গেল পানিপ্রবাহ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম, তখনও জোরালো কূটনৈতিক চাপ দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে — পানিবঞ্চনা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে। এই মরুভূমি রাতারাতি হয়নি। দশকের পর দশকে ধীরে ধীরে হয়েছে — আর প্রতিটি সরকারই এটা দেখেছে, মাথা নত করেছে।

ভারতের সাথে "সম্পর্ক ভালো রাখা"র নামে পানির ন্যায্য দাবি তোলা হয়নি। কূটনীতির নামে দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকাকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে।

 

২০২৬ — শেষ সুযোগের হাতছানি


২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর — ৩০ বছরের গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ভারত-বাংলাদেশের পানিকূটনীতির ইতিহাসে এটা সবচেয়ে বড় সুযোগ।

কিন্তু চাপটাও আছে বেশ। ভারত ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে — নতুন চুক্তিতে তাদের ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদার বিষয়টি রাখতে হবে। সহজ কথায়, ভারত আরও বেশি পানি চাইছে — বাংলাদেশের অংশ কমিয়ে।

বাংলাদেশ এখনও মরুকরণ, পানিসংকট, বর্ষার বন্যা, নদী ভাঙন, ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষয়, নৌচলাচলের অযোগ্যতা, এবং উপকূলীয় লবণাক্ততা — এই সব সংকটের মুখে। নতুন চুক্তিতে যদি এগুলো না ঠেকানো যায়, তাহলে পরের ৩০ বছর আরও অন্ধকার।

 

করণীয় — আর নতজানু হওয়ার সময় নেই

তাহলে কী করা উচিত?

এক — পুরনো চুক্তির মুখস্থ ফর্মুলায় নয়। নতুন চুক্তিতে শুধু পানির ভাগাভাগি নয়, পরিবেশের ক্ষতিপূরণ, উজানের সব বাঁধের তথ্য প্রদান এবং বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছাড়া নিয়ন্ত্রণ — এই সব শর্ত রাখতে হবে।

দুই — আন্তর্জাতিক আইনের পথ খোলা রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি জাতিসংঘে বিষয়টি তোলার দাবি জানাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদী আইনের আওতায় বাংলাদেশের দাবি বৈধ — এই সত্যটাকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

তিন — ভারতের ভেতরেও ফারাক্কা বিরোধী একটা কণ্ঠস্বর আছে। প্রয়োজনে তাদেরকেও পাশে নিতে হবে। ২০১৬ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার নিজেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিহার প্রদেশও ফারাক্কার কারণে বন্যায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। এই ভারতীয় কণ্ঠস্বর বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিত্র হতে পারে।

চার — জাতীয় ঐক্য চাই। ফারাক্কা প্রশ্নে আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনীতি থামাতে হবে। এটা দলীয় প্রশ্ন নয় — জাতীয় প্রশ্ন।

 

মওলানা ভাসানী বৃদ্ধ বয়সে যে মাটির রাস্তায় হেঁটেছিলেন, সেই রাস্তা আজও শেষ হয়নি

পদ্মার বুকে বালি জমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক ধার ততোটা আসেনি  — বরং আরও নমনীয় হয়েছে দিনে দিনে।

২০২৬ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ভারত চাইছে নতুন শর্তে নতুন চুক্তি — নিজের সুবিধামতো করিয়ে নিতে। বাংলাদেশকে এবার ঠিক করতে হবে — কোটি মানুষের পানির হক রক্ষা করবে, নাকি আবার নতজানু হয়ে সই করবে। ফারাক্কার পানি শুধু পানি নয়। এটা একটি জাতির বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

 

প্রতি বছর ১৬ মে ফারাক্কা দিবস পালিত হয়। মওলানা ভাসানীর সেই লংমার্চের স্মরণে। কিন্তু দিবস পালন আর দাবি আদায় এক কথা নয়।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত