গল্পগল্প

রূপকথার পাঁচ বন্ধু

ফইরা
ফইরা
রূপকথার পাঁচ বন্ধু
ছবি- সংকলিত

রূপকথার পাঁচ বন্ধু

শরতের বিকেলে যখন আকাশটা হালকা তামাটে রঙ ধারণ করে, শহরের লেকের ধারে একটা নির্দিষ্ট বেঞ্চে পাঁচজন বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়রা তাদের ভালোবেসে ডাকে 'পঞ্চপ্রদীপ'। এই পাঁচজন— অবিনাশ বাবু, বিমল বাবু, সুধীর বাবু, হরেন বাবু আর রঞ্জন বাবু। স্কুল জীবনের টিফিন ভাগ করে খাওয়া থেকে শুরু করে বার্ধক্যের বারান্দায় এসে পৌঁছানো পর্যন্ত, তাদের বন্ধুত্বে একবিন্দুও ধুলো জমেনি।

তারা সবাই সরকারি চাকরির পাট চুকিয়ে এখন অবসরে। বিমল আর অবিনাশের ঘরে জীবনসঙ্গিনী নেই, কয়েক বছর আগেই তারা পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। একাকীত্বের সেই শূন্যতা তারা ঢেকে রাখেন বাকি তিন বন্ধুর হাসিমুখ আর আড্ডার মিছিলে। তাদের ছেলেমেয়েরা সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত, নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত। তাই এই পাঁচ বন্ধুর এখন আর কোনো পিছুটান নেই, আছে শুধু আকাশছোঁয়া স্বাধীনতা।

চাকরি জীবনেই তারা এক বিচিত্র প্রতিজ্ঞা করেছিলেন— "নিজেদের উপার্জনের একটা বড় অংশ আমরা ভোগ বিলাসিতায় নয়, ভবিষ্যতের এক যৌথ স্বপ্নপূরণে খরচ করব।" সেই জমা টাকা দিয়েই তারা শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে একটা পুরনো ভিটে কিনে সেখানে গড়লেন এক অদ্ভুত ভবন। নিচতলায় এক বিশাল লাইব্রেরি আর বইয়ের দোকান, যেখানে পড়ুয়ারা সুলভ মূল্যে জ্ঞানের সন্ধান পায়। আর উপরের তলাগুলো ভাড়া দেওয়া হয় নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে। সেখান থেকে আসা আয় দিয়ে চলে তাদের এক বৃহৎ সেবামূলক কর্মযজ্ঞ।

তারা বিশ্বাস করেন, "মানুষ বাঁচে তার কর্মে, বয়সে নয়।" তাই প্রতি বছর নিজেদের জমানো টাকায় তারা দেশ-বিদেশের অলিগলি ঘুরে বেড়ান। কখনও সিঙ্গাপুরের আধুনিকতা, কখনও আবার মরিশাসের নীল জলরাশি। কিন্তু ভ্রমণের চেয়েও বড় ভ্রমণ তারা করেন মানুষের হৃদয়ে। এলাকার দরিদ্র মানুষদের বিপদে তারা সব সময় ঢাল হয়ে দাঁড়ান। বিশেষ করে পাড়ার গৃহবধূদের তারা শিখিয়েছেন 'সঞ্চয়ের মন্ত্র'। ছোট ছোট সঞ্চয় যে কোনো বড় বিপদে একমাত্র রক্ষাকবচ হতে পারে, তা তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন ঘরে ঘরে গিয়ে।

তাদের এই উদ্যোগের ফলেই আজ এলাকার অনেক পরিবার মহাজনের চড়া সুদের ঋণের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে। মদ্যপান কিংবা নেশার নেশা ছেড়ে অনেক পুরুষ এখন সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। রবি বাবুর একবার হঠাৎ হার্টের অসুখ হলো, পরিবারের কারো কাছে হাত না পেতে বন্ধুদের সেই নিজস্ব তহবিল থেকেই তার বাইপাস সার্জারি হলো। এমনকি বস্তির এক ছোট শিশুর ক্যানসারের চিকিৎসায় তারা যখন লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে তাকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন, তখন পুরো শহর তাদের শ্রদ্ধায় নুইয়ে পড়েছিল।

পরিকল্পনা ছিল মার্চ মাসে সবাই মিলে কন্যাকুমারী যাবেন। টিকিট, হোটেল সব ঠিক। কিন্তু হঠাৎ পৃথিবীর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলো এক মরণব্যাধি ভাইরাসের থাবায়— 'করোনা'। দেশজুড়ে জারি হলো লকডাউন। ভ্রমণে বাধা পড়ল ঠিকই, কিন্তু তাদের মন দমে গেল না। তারা ভাবলেন, "সমুদ্র তো চিরকালই থাকবে, কিন্তু অভুক্ত মানুষগুলো তো কাল থাকবে না।"

ভ্রমণের জন্য বরাদ্দ সব টাকা আর নিজেদের সঞ্চয় ভেঙে তারা গড়ে তুললেন এক 'ভ্রাম্যমাণ ভাণ্ডার'। চাল, ডাল, তেল আর ওষুধের প্যাকেট নিয়ে তারা পৌঁছে গেলেন অসহায় শ্রমিকদের দুয়ারে। যে টাকা দিয়ে তারা সমুদ্রের ঢেউ দেখতেন, সেই টাকা দিয়ে তারা হাজারো মানুষের চোখে আশার আলো দেখলেন।

আজও বিকেলে লেকের ধারে তারা বসেন। কেউ অসুস্থ হলে বাকি চারজন যেন তার প্রাণভোমরা হয়ে আগলে রাখেন। তাদের জীবন আমাদের শেখায়— বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র, আর সত্যিকারের সুখ কেবল নিজের জন্য ভোগ করায় নয়, বরং পাঁচজনের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

তৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে পঞ্চপ্রদীপ আজও জ্বলছে, আঁধারে ঘেরা এই সমাজে এক চিলতে আলোর দিশারি হয়ে। তাদের এই দীর্ঘ পথচলাকে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।

বিষয় : গল্প ছোট গল্প

কাল মহাকাল

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬


রূপকথার পাঁচ বন্ধু

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

রূপকথার পাঁচ বন্ধু

শরতের বিকেলে যখন আকাশটা হালকা তামাটে রঙ ধারণ করে, শহরের লেকের ধারে একটা নির্দিষ্ট বেঞ্চে পাঁচজন বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়রা তাদের ভালোবেসে ডাকে 'পঞ্চপ্রদীপ'। এই পাঁচজন— অবিনাশ বাবু, বিমল বাবু, সুধীর বাবু, হরেন বাবু আর রঞ্জন বাবু। স্কুল জীবনের টিফিন ভাগ করে খাওয়া থেকে শুরু করে বার্ধক্যের বারান্দায় এসে পৌঁছানো পর্যন্ত, তাদের বন্ধুত্বে একবিন্দুও ধুলো জমেনি।

তারা সবাই সরকারি চাকরির পাট চুকিয়ে এখন অবসরে। বিমল আর অবিনাশের ঘরে জীবনসঙ্গিনী নেই, কয়েক বছর আগেই তারা পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। একাকীত্বের সেই শূন্যতা তারা ঢেকে রাখেন বাকি তিন বন্ধুর হাসিমুখ আর আড্ডার মিছিলে। তাদের ছেলেমেয়েরা সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত, নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত। তাই এই পাঁচ বন্ধুর এখন আর কোনো পিছুটান নেই, আছে শুধু আকাশছোঁয়া স্বাধীনতা।

চাকরি জীবনেই তারা এক বিচিত্র প্রতিজ্ঞা করেছিলেন— "নিজেদের উপার্জনের একটা বড় অংশ আমরা ভোগ বিলাসিতায় নয়, ভবিষ্যতের এক যৌথ স্বপ্নপূরণে খরচ করব।" সেই জমা টাকা দিয়েই তারা শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে একটা পুরনো ভিটে কিনে সেখানে গড়লেন এক অদ্ভুত ভবন। নিচতলায় এক বিশাল লাইব্রেরি আর বইয়ের দোকান, যেখানে পড়ুয়ারা সুলভ মূল্যে জ্ঞানের সন্ধান পায়। আর উপরের তলাগুলো ভাড়া দেওয়া হয় নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে। সেখান থেকে আসা আয় দিয়ে চলে তাদের এক বৃহৎ সেবামূলক কর্মযজ্ঞ।

তারা বিশ্বাস করেন, "মানুষ বাঁচে তার কর্মে, বয়সে নয়।" তাই প্রতি বছর নিজেদের জমানো টাকায় তারা দেশ-বিদেশের অলিগলি ঘুরে বেড়ান। কখনও সিঙ্গাপুরের আধুনিকতা, কখনও আবার মরিশাসের নীল জলরাশি। কিন্তু ভ্রমণের চেয়েও বড় ভ্রমণ তারা করেন মানুষের হৃদয়ে। এলাকার দরিদ্র মানুষদের বিপদে তারা সব সময় ঢাল হয়ে দাঁড়ান। বিশেষ করে পাড়ার গৃহবধূদের তারা শিখিয়েছেন 'সঞ্চয়ের মন্ত্র'। ছোট ছোট সঞ্চয় যে কোনো বড় বিপদে একমাত্র রক্ষাকবচ হতে পারে, তা তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন ঘরে ঘরে গিয়ে।

তাদের এই উদ্যোগের ফলেই আজ এলাকার অনেক পরিবার মহাজনের চড়া সুদের ঋণের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে। মদ্যপান কিংবা নেশার নেশা ছেড়ে অনেক পুরুষ এখন সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। রবি বাবুর একবার হঠাৎ হার্টের অসুখ হলো, পরিবারের কারো কাছে হাত না পেতে বন্ধুদের সেই নিজস্ব তহবিল থেকেই তার বাইপাস সার্জারি হলো। এমনকি বস্তির এক ছোট শিশুর ক্যানসারের চিকিৎসায় তারা যখন লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে তাকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন, তখন পুরো শহর তাদের শ্রদ্ধায় নুইয়ে পড়েছিল।

পরিকল্পনা ছিল মার্চ মাসে সবাই মিলে কন্যাকুমারী যাবেন। টিকিট, হোটেল সব ঠিক। কিন্তু হঠাৎ পৃথিবীর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলো এক মরণব্যাধি ভাইরাসের থাবায়— 'করোনা'। দেশজুড়ে জারি হলো লকডাউন। ভ্রমণে বাধা পড়ল ঠিকই, কিন্তু তাদের মন দমে গেল না। তারা ভাবলেন, "সমুদ্র তো চিরকালই থাকবে, কিন্তু অভুক্ত মানুষগুলো তো কাল থাকবে না।"

ভ্রমণের জন্য বরাদ্দ সব টাকা আর নিজেদের সঞ্চয় ভেঙে তারা গড়ে তুললেন এক 'ভ্রাম্যমাণ ভাণ্ডার'। চাল, ডাল, তেল আর ওষুধের প্যাকেট নিয়ে তারা পৌঁছে গেলেন অসহায় শ্রমিকদের দুয়ারে। যে টাকা দিয়ে তারা সমুদ্রের ঢেউ দেখতেন, সেই টাকা দিয়ে তারা হাজারো মানুষের চোখে আশার আলো দেখলেন।

আজও বিকেলে লেকের ধারে তারা বসেন। কেউ অসুস্থ হলে বাকি চারজন যেন তার প্রাণভোমরা হয়ে আগলে রাখেন। তাদের জীবন আমাদের শেখায়— বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র, আর সত্যিকারের সুখ কেবল নিজের জন্য ভোগ করায় নয়, বরং পাঁচজনের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

তৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে পঞ্চপ্রদীপ আজও জ্বলছে, আঁধারে ঘেরা এই সমাজে এক চিলতে আলোর দিশারি হয়ে। তাদের এই দীর্ঘ পথচলাকে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।


কাল মহাকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ সম্পাদক আলী
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত