আজকের বিশ্লেষণ আজকের বিশ্লেষণ

জনআকাঙ্ক্ষা বনাম ক্ষমতার রাজনীতি

ড. শাহাবুদ্দিন লাল্টুর সতর্কবার্তা ও আগামীর সংস্কার ভাবনা

জনআকাঙ্ক্ষা বনাম ক্ষমতার রাজনীতি
ছবি -লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘সংস্কার’। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের যে অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান প্রশাসন যাত্রা শুরু করেছে, তাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ। তবে এই সংস্কারের স্থায়িত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে যে সংশয় রয়েছে, তা সম্প্রতি এক কড়া ভাষায় তুলে ধরেছেন কানাডা প্রবাসী সাবেক ছাত্রনেতা  ড. শাহাবুদ্দিন লাল্টু। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের ক্ষমতার পালাবদল ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ দেয়।

ক্ষমতার মেয়াদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

ড. লাল্টু তার বক্তব্যে বর্তমান সরকারের মেয়াদের সীমাবদ্ধতা এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি সোজাসুজি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শক্তির জোরে বা কৌশলে কোনো পক্ষই অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর কৌশলগত অবস্থান এবং ভোটের হিসাব-নিকাশ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পালাবদল ঘটাবেই। এখানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—যদি ভবিষ্যতে আবার পুরনো ধারার রাজনীতি ফিরে আসে, তবে আজ যারা সংস্কার বাস্তবায়ন করছেন না বা দেরি করছেন, তাদের পরিণতি কী হবে?

তিনি বর্তমান নীতিনির্ধারকদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ ‘বেঈমানি’ পছন্দ করে না। এটি কেবল সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে নয়, নিজ দলের কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন কোনো গোষ্ঠী ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের সাথে করা ওয়াদা ভুলে যায়, তখন নিজেদের বিশ্বস্ত ভোট ব্যাংকও হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ছবি : বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাবেক ছাত্রনেতা শাহাবুদ্দিন লাল্টু 

 ইতিহাস ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার শিক্ষা

ড. লাল্টুর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক তিক্ত বাস্তবতা। তিনি উদাহরণ হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। এক সময় যে ব্যবস্থা ছাড়া ক্ষমতায় আসা অসম্ভব ছিল, ক্ষমতার মোহে তা বাতিল করার পর দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় রাজপথে আন্দোলন করতে হয়েছে।

তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটকে সেই ইতিহাসের সাথেই তুলনা করছেন। তার মতে, আজ যারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার লোভে সংস্কার প্রস্তাবগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন, ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর তারাই আবার এই সংস্কারের জন্যই রাজপথে চোখের পানি ফেলবেন। তার ভাষায়, “নিজেদের এত চালাক ভাবতে যাবেন না। ৫ বছর ক্ষমতা ধরে রেখে যদি পরবর্তী ৫০ বছর বেকুফের মতো রাস্তায় ঘুরতে হয়, তবে তাকে চতুরতা বলা যায় না।”

 স্থায়ী সংস্কারের অনিবার্যতা

ড. লাল্টুর এই সমালোচনামূলক অবস্থান থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—রাজনৈতিক সংস্কার কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব রক্ষারও হাতিয়ার। আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তারা যদি একটি টেকসই ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা তৈরি না করেন, তবে ভবিষ্যতে অন্য কেউ ক্ষমতায় এসে একই সুযোগ গ্রহণ করবে। তখন বিচার বিভাগ, পুলিশ বা নির্বাচন কমিশনের যে স্বাধীনতা আজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা আজ যারা বাধা দিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ড. শাহাবুদ্দিন লাল্টুর এই কঠোর মন্তব্য মূলত দেশের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের প্রতি এক ধরণের ‘ওয়েক-আপ কল’। ক্ষমতার মোহ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাজনৈতিক দূরদর্শিতা একটি প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারে। নিজেরা ক্ষমতায় থাকাকালীন নিরপেক্ষ সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক নির্বাসনের যে আশঙ্কা তিনি প্রকাশ করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অস্বীকার করার উপায় নেই।

এখন প্রশ্ন হলো, নীতিনির্ধারকরা কি এই সতর্কবার্তা কানে নেবেন, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখার জন্য অপেক্ষা করবেন?

ড. লাল্টুর ফেসবুক পোস্ট 

বিষয় : বাংলাদেশ রাজনীতি সংস্কার মতামত

কাল মহাকাল

রোববার, ০৩ মে ২০২৬


জনআকাঙ্ক্ষা বনাম ক্ষমতার রাজনীতি

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘সংস্কার’। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের যে অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান প্রশাসন যাত্রা শুরু করেছে, তাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ। তবে এই সংস্কারের স্থায়িত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে যে সংশয় রয়েছে, তা সম্প্রতি এক কড়া ভাষায় তুলে ধরেছেন কানাডা প্রবাসী সাবেক ছাত্রনেতা  ড. শাহাবুদ্দিন লাল্টু। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের ক্ষমতার পালাবদল ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ দেয়।

ক্ষমতার মেয়াদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

ড. লাল্টু তার বক্তব্যে বর্তমান সরকারের মেয়াদের সীমাবদ্ধতা এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি সোজাসুজি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শক্তির জোরে বা কৌশলে কোনো পক্ষই অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর কৌশলগত অবস্থান এবং ভোটের হিসাব-নিকাশ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পালাবদল ঘটাবেই। এখানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—যদি ভবিষ্যতে আবার পুরনো ধারার রাজনীতি ফিরে আসে, তবে আজ যারা সংস্কার বাস্তবায়ন করছেন না বা দেরি করছেন, তাদের পরিণতি কী হবে?

তিনি বর্তমান নীতিনির্ধারকদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ ‘বেঈমানি’ পছন্দ করে না। এটি কেবল সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে নয়, নিজ দলের কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন কোনো গোষ্ঠী ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের সাথে করা ওয়াদা ভুলে যায়, তখন নিজেদের বিশ্বস্ত ভোট ব্যাংকও হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ছবি : বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাবেক ছাত্রনেতা শাহাবুদ্দিন লাল্টু 


 ইতিহাস ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার শিক্ষা

ড. লাল্টুর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক তিক্ত বাস্তবতা। তিনি উদাহরণ হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। এক সময় যে ব্যবস্থা ছাড়া ক্ষমতায় আসা অসম্ভব ছিল, ক্ষমতার মোহে তা বাতিল করার পর দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় রাজপথে আন্দোলন করতে হয়েছে।

তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটকে সেই ইতিহাসের সাথেই তুলনা করছেন। তার মতে, আজ যারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার লোভে সংস্কার প্রস্তাবগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন, ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর তারাই আবার এই সংস্কারের জন্যই রাজপথে চোখের পানি ফেলবেন। তার ভাষায়, “নিজেদের এত চালাক ভাবতে যাবেন না। ৫ বছর ক্ষমতা ধরে রেখে যদি পরবর্তী ৫০ বছর বেকুফের মতো রাস্তায় ঘুরতে হয়, তবে তাকে চতুরতা বলা যায় না।”

 স্থায়ী সংস্কারের অনিবার্যতা

ড. লাল্টুর এই সমালোচনামূলক অবস্থান থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—রাজনৈতিক সংস্কার কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব রক্ষারও হাতিয়ার। আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তারা যদি একটি টেকসই ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা তৈরি না করেন, তবে ভবিষ্যতে অন্য কেউ ক্ষমতায় এসে একই সুযোগ গ্রহণ করবে। তখন বিচার বিভাগ, পুলিশ বা নির্বাচন কমিশনের যে স্বাধীনতা আজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা আজ যারা বাধা দিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ড. শাহাবুদ্দিন লাল্টুর এই কঠোর মন্তব্য মূলত দেশের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের প্রতি এক ধরণের ‘ওয়েক-আপ কল’। ক্ষমতার মোহ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাজনৈতিক দূরদর্শিতা একটি প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারে। নিজেরা ক্ষমতায় থাকাকালীন নিরপেক্ষ সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক নির্বাসনের যে আশঙ্কা তিনি প্রকাশ করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অস্বীকার করার উপায় নেই।

এখন প্রশ্ন হলো, নীতিনির্ধারকরা কি এই সতর্কবার্তা কানে নেবেন, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখার জন্য অপেক্ষা করবেন?

ড. লাল্টুর ফেসবুক পোস্ট 

কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ মোঃ ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত