সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 মতামতমতামত

মশা মারতে ফ্লোরিডা নয়, স্বপ্ন ছিল ফ্যাক্টরি স্থাপনের

ভুল তথ্যের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেল একটি টেকসই উদ্যোগ। প্রযুক্তির লড়াইয়ে হার মানল রাজনৈতিক কূটচাল, আর বলি হলেন খোদ দলেরই এক নীতিনির্ধারক।

মশা মারতে ফ্লোরিডা নয়, স্বপ্ন ছিল ফ্যাক্টরি স্থাপনের
ছবি -সংগৃহীত

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো একটি খবর যখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার সত্যতা যাচাই করার অবকাশ প্রায়ই থাকে না। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের ফ্লোরিডা সফর নিয়ে যে তোলপাড় শুরু হয়েছে, সেটি সম্ভবত সেই তালিকারই এক অনন্য উদাহরণ। সাধারণ মানুষের চোখে এটি ছিল ‘মশা মারা শেখার নামে বিদেশ ভ্রমণ’। কিন্তু পর্দার আড়ালে যে পরিকল্পনা ছিল, তা যদি সত্যিই বাস্তবায়িত হতো, তবে সেটি মশা নিধনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বড় এক টার্নিং পয়েন্ট হতে পারত।

আসলে, ঘটনাটি ছিল ‘ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস’ (Valent BioSciences) নামক এক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণ। তারা মশক নিধনের জন্য ‘VectoBac’ বা জৈবিক লার্ভিসাইড তৈরিতে বিশ্বে সেরা। তাদের প্রযুক্তি ‘WALS’ বা ওয়াইড এরিয়া লার্ভিসাইড স্প্রে, যা এডিস মশার লার্ভাকে একেবারে নিধনের জন্য পরিচিত। ২০১৬ সালে জিকা ভাইরাসের দাপট যখন আমেরিকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, তখন এই কোম্পানির প্রযুক্তিই মায়ামি-ডেড এলাকার সংক্রমণ রুখে দিয়েছিল।

ডা. শাহাদাত হোসেনের এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল কেবল দেখা নয়, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর। তিনি চেয়েছিলেন এই কোম্পানিকে উদ্বুদ্ধ করতে যাতে তারা চট্টগ্রামে তাদের নিজস্ব ফ্যাক্টরি স্থাপন করে। তাতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হতো, অন্যদিকে অনেক কম খরচে মশা মারার আধুনিক প্রযুক্তি হাতের নাগালে পেত চট্টগ্রামবাসী। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই সফরটির খরচও বহন করার কথা ছিল স্বয়ং ওই কোম্পানিটির—সরকারি কোষাগারের কোনো পয়সা এখানে খরচ হওয়ার সুযোগ ছিল না।

এখানেই আসল বিষয়টি চোখে পড়ে। একজন চিকিৎসক হিসেবে ডা. শাহাদাত জানতেন, সন্ধ্যার পর ফগিং করে মশা মারাটা কতটা সেকেলে আর পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বরং লার্ভা ধ্বংস করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পক্ষে কাজ করছিলেন। চট্টগ্রামের মানুষ হয়তো এর সুফল পেতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগটি যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাল, তখন সেটি আর ‘প্রকল্প’ রইল না, হয়ে গেল ‘অপপ্রচার’।

তবে মূল প্রশ্ন হলো, দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে এই ভুল ব্রিফিংটা গেল কীভাবে? যারা দায়িত্বশীল জায়গায় বসে তথ্য সরবরাহ করেন, তারা কি মাঠ পর্যায়ের এই সুক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক বিষয়টি জানতেন না? নাকি উদ্দেশ্যমূলকভাবেই দলের একজন দক্ষ কর্মীকে হেয় করার জন্য একটি ‘ডিসাস্টার’ তৈরি করা হলো?

আমাদের রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক বড় বড় সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। ডা. শাহাদাত হোসেনকে অপছন্দ করার অধিকার যে কারো থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিগত উদ্যোগকে এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়াটা কেবল ওই ব্যক্তির ক্ষতি নয়, এটি পুরো শহরের জন্য এক বড় ধাক্কা।

নিজের দলের লোকদের প্রতি এই অবিশ্বাসের সংস্কৃতি যদি চলতে থাকে, তবে নীতিনির্ধারকরা একদিন দেখবেন—পাশে দাঁড়ানোর মতো দক্ষ মানুষ আর কেউ নেই। ভুলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা সিদ্ধান্ত একদিন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। প্রশ্ন হলো, ফ্লোরিডা ভ্রমণের এই ভুল আখ্যানের দায়টা কি শেষে ওই ব্রিফিং দেওয়া লোকগুলো নেবে, নাকি আবারও বলি হবে দলেরই কোনো নিবেদিতপ্রাণ কর্মী?

বিষয় : ফ্লোরিডা সফর ডা. শাহাদাৎ মশা নিধন বিতর্ক

মশা মারতে ফ্লোরিডা নয়, স্বপ্ন ছিল ফ্যাক্টরি স্থাপনের
0:00 0:00
1.0x
কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬


মশা মারতে ফ্লোরিডা নয়, স্বপ্ন ছিল ফ্যাক্টরি স্থাপনের

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো একটি খবর যখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার সত্যতা যাচাই করার অবকাশ প্রায়ই থাকে না। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের ফ্লোরিডা সফর নিয়ে যে তোলপাড় শুরু হয়েছে, সেটি সম্ভবত সেই তালিকারই এক অনন্য উদাহরণ। সাধারণ মানুষের চোখে এটি ছিল ‘মশা মারা শেখার নামে বিদেশ ভ্রমণ’। কিন্তু পর্দার আড়ালে যে পরিকল্পনা ছিল, তা যদি সত্যিই বাস্তবায়িত হতো, তবে সেটি মশা নিধনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বড় এক টার্নিং পয়েন্ট হতে পারত।

আসলে, ঘটনাটি ছিল ‘ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস’ (Valent BioSciences) নামক এক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণ। তারা মশক নিধনের জন্য ‘VectoBac’ বা জৈবিক লার্ভিসাইড তৈরিতে বিশ্বে সেরা। তাদের প্রযুক্তি ‘WALS’ বা ওয়াইড এরিয়া লার্ভিসাইড স্প্রে, যা এডিস মশার লার্ভাকে একেবারে নিধনের জন্য পরিচিত। ২০১৬ সালে জিকা ভাইরাসের দাপট যখন আমেরিকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, তখন এই কোম্পানির প্রযুক্তিই মায়ামি-ডেড এলাকার সংক্রমণ রুখে দিয়েছিল।

ডা. শাহাদাত হোসেনের এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল কেবল দেখা নয়, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর। তিনি চেয়েছিলেন এই কোম্পানিকে উদ্বুদ্ধ করতে যাতে তারা চট্টগ্রামে তাদের নিজস্ব ফ্যাক্টরি স্থাপন করে। তাতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হতো, অন্যদিকে অনেক কম খরচে মশা মারার আধুনিক প্রযুক্তি হাতের নাগালে পেত চট্টগ্রামবাসী। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই সফরটির খরচও বহন করার কথা ছিল স্বয়ং ওই কোম্পানিটির—সরকারি কোষাগারের কোনো পয়সা এখানে খরচ হওয়ার সুযোগ ছিল না।

এখানেই আসল বিষয়টি চোখে পড়ে। একজন চিকিৎসক হিসেবে ডা. শাহাদাত জানতেন, সন্ধ্যার পর ফগিং করে মশা মারাটা কতটা সেকেলে আর পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বরং লার্ভা ধ্বংস করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পক্ষে কাজ করছিলেন। চট্টগ্রামের মানুষ হয়তো এর সুফল পেতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগটি যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাল, তখন সেটি আর ‘প্রকল্প’ রইল না, হয়ে গেল ‘অপপ্রচার’।

তবে মূল প্রশ্ন হলো, দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে এই ভুল ব্রিফিংটা গেল কীভাবে? যারা দায়িত্বশীল জায়গায় বসে তথ্য সরবরাহ করেন, তারা কি মাঠ পর্যায়ের এই সুক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক বিষয়টি জানতেন না? নাকি উদ্দেশ্যমূলকভাবেই দলের একজন দক্ষ কর্মীকে হেয় করার জন্য একটি ‘ডিসাস্টার’ তৈরি করা হলো?

আমাদের রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক বড় বড় সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। ডা. শাহাদাত হোসেনকে অপছন্দ করার অধিকার যে কারো থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিগত উদ্যোগকে এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়াটা কেবল ওই ব্যক্তির ক্ষতি নয়, এটি পুরো শহরের জন্য এক বড় ধাক্কা।

নিজের দলের লোকদের প্রতি এই অবিশ্বাসের সংস্কৃতি যদি চলতে থাকে, তবে নীতিনির্ধারকরা একদিন দেখবেন—পাশে দাঁড়ানোর মতো দক্ষ মানুষ আর কেউ নেই। ভুলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা সিদ্ধান্ত একদিন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। প্রশ্ন হলো, ফ্লোরিডা ভ্রমণের এই ভুল আখ্যানের দায়টা কি শেষে ওই ব্রিফিং দেওয়া লোকগুলো নেবে, নাকি আবারও বলি হবে দলেরই কোনো নিবেদিতপ্রাণ কর্মী?



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত