সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 মহাকালের আয়নামহাকালের আয়না

সোহরাওয়ার্দীর সেই অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন ও আজকের বিপন্ন বাঙালি

বিভক্তির ট্র্যাজেডি ও বর্তমান ভারতে বাঙালির অস্তিত্ব সংকটের এক রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ

সোহরাওয়ার্দীর সেই অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন ও আজকের বিপন্ন বাঙালি
ছবি- প্রতীকী (এ আই জেনারেটেড)

১৯৪৭ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন 'স্বাধীন অখণ্ড বাংলা'র প্রস্তাব করেছিলেন, তখন অনেকেই একে কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে বোঝা যায়, সেটি কোনো নিছক কৌশল ছিল না; বরং তা ছিল বাঙালির দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্ব রক্ষার এক দূরদর্শী রক্ষাকবচ। সোহরাওয়ার্দী স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন, ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হলে এবং বাঙালি যদি ভারতের মতো এক বিশাল বৈচিত্র্যময় ফেডারেশনের অংশ হয়, তবে তার স্বাতন্ত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, একটি বৃহত্তর কাঠামোর চাপে বাঙালির ভাষা, কৃষ্টি এবং বিশেষ মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। আজ আট দশক পর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালির প্রতি ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ ও পদ্ধতিগত প্রান্তিকীকরণ সেই ঐতিহাসিক সতর্কবাণীকেই রূঢ় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

​কেন বারবার লক্ষ্যবস্তু বাঙালি?

​ভারতীয় ইউনিয়নে বাঙালির অবস্থান আজ এক অদ্ভুত দোলাচলে। একদিকে যেমন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বৌদ্ধিক বিকাশে বাঙালির অবদান অনস্বীকার্য, অন্যদিকে আধুনিক ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাঙালি পরিচয়টিই আজ সংকটের মুখে। এই সংকটের মূলে রয়েছে তিনটি প্রধান কারণ:

​১. ভাষা ও কৃষ্টির সংঘাত: 'এক দেশ, এক ভাষা'র যে কেন্দ্রীয় প্রবণতা বর্তমানে ভারতে প্রবল হচ্ছে, তার প্রথম শিকার হচ্ছে বাংলা ভাষা। হিন্দি বলয়ের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে 'বিজাতীয়' হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চলছে।

২. রাজনৈতিক ক্ষমতায়নহীনতা: দিল্লির ক্ষমতায় বাঙালির প্রভাব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বাঙালির স্বার্থ রক্ষার লোক কমে আসছে।

৩. অপরত্বারোপ : রাজনৈতিক মেরুকরণের স্বার্থে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতে বাঙালিদের 'বহিরাগত' বা 'অবৈধ' হিসেবে চিহ্নিত করার একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

​ইতিহাসের ক্ষত সেই আসাম থেকে শুরু

​সোহরাওয়ার্দীর সেই পূর্বাভাসের প্রথম নির্মম প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৬০-এর দশকে আসামের 'বঙ্গাল খেদাও' আন্দোলনে। এরপর ১৯৬১ সালে শিলচরে ভাষার জন্য ১১ জন তরুণের আত্মদান প্রমাণ করে যে, নিজ বাসভূমে ভাষার অধিকারটুকু রক্ষা করতেও বাঙালিকে রক্ত দিতে হবে।

​পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটিও খুব একটা সুখকর ছিল না। ১৯৭৯ সালের মরিচঝাঁপি হত্যাকাণ্ড বাঙালির রাজনৈতিক অসহায়ত্বের এক চরম উদাহরণ। নিজ দেশেই উদ্বাস্তু হওয়া হাজার হাজার দলিত বাঙালি যখন সুন্দরবনের দ্বীপে বসতি গড়ে তুলেছিল, তখন রাষ্ট্রের নির্দয় বুলেট ও অবরোধ তাদের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে, বাঙালির নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো না থাকলে সে যে কোনো স্থানেই উটকো আপদ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

​২০২৬-এর বাস্তবতা: এনআরসি ও ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক

​বর্তমান সময়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। আসামে এনআরসি (NRC) এবং 'ডি-ভোটার' প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে আজ রাষ্ট্রহীনতার আশঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে। নথিপত্রের সামান্য ত্রুটির কারণে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে বৃদ্ধ-বনিতাকে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি সোহরাওয়ার্দীর সেই 'মর্যাদা হারানোর' সতর্কবাণীর আধুনিক রূপ।

​শুধু উত্তর-পূর্ব ভারত নয়, আজ দিল্লি বা কর্ণাটকের মতো রাজ্যেও বাংলাভাষী শ্রমজীবী মানুষকে 'অবৈধ বাংলাদেশি' তকমা দিয়ে নিয়মিত হেনস্তা করা হচ্ছে। এই যে 'বাঙালি মানেই সন্দেহভাজন'—এই বয়ানটি সুপরিকল্পিতভাবে সমাজে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে, যা বাঙালির সামাজিক নিরাপত্তা তছনছ করে দিচ্ছে।

এ যেন যুগ যুগ ধরে চলা জাতিগত সংঘাত 

​বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা ভাষাগত গোষ্ঠীগুলো তাদের অধিকার হারিয়েছে, তখন তার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। আমরা যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রে রুশ ভাষাভাষীদের অবস্থার দিকে তাকাই, তবে দেখব যে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাবে কীভাবে তারা রাতারাতি 'সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন' হয়ে পড়েছিল। আবার কানাডার কুইবেক প্রদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা ফেডারেশনের মধ্যে থেকেও নিজেদের ফরাসি ভাষা ও কৃষ্টিকে কঠোর আইন ও স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে রক্ষা করেছে। ভারত রাষ্ট্রের কাঠামোতে বাঙালি সেই স্বায়ত্তশাসন বা বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি বলেই আজ বিহার বা ঝাড়খণ্ডে বাংলা ভাষার পঠন-পাঠন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

​উত্তরণের পথ কই?

​২০২৬ সালের এই সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংগালীকে কেবল আক্ষেপ করলে চলবে না। সোহরাওয়ার্দীর সেই ভবিষ্যদ্বাণী থেকে শিক্ষা নিয়ে বাঙালিকে নিজস্ব সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে হবে। এই লক্ষে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

​সাংস্কৃতিক কূটনীতি জোরদার: পশ্চিমবঙ্গকে বাঙালি পরিচয়টি  একটি বিশ্বজনীন শক্তিশালী পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সাংস্কৃতিক ও কুটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। 

​আইনি সুরক্ষা ও আইনি সেল গঠন: ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হয়রানির শিকার বাঙালিদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে শক্তিশালী আইনি সহায়তা সেল গঠন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে।

​ভাষাগত স্বায়ত্তশাসনের দাবি: ভারতের সংবিধানে যে ভাষাগত সংখ্যালঘু অধিকারের কথা বলা হয়েছে, তার কঠোর প্রয়োগ দাবি করতে হবে। যেসব রাজ্যে বাঙালির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য (যেমন ত্রিপুরা, আসাম, ঝাড়খণ্ড), সেখানে বাংলাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে।

​অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা: বাঙালির প্রতি বিদ্বেষের একটি বড় কারণ অর্থনৈতিক ঈর্ষা। বাঙালি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এমন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে যাতে অর্থনৈতিকভাবে বাঙালি একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়।

অখণ্ড বাংলার দর্শন ও আমাদের ভবিষ্যৎ

​হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই অখণ্ড বাংলার দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি যে খণ্ডিত বাংলার বিপদের কথা বলেছিলেন, তা আজ পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত বাঙালির দরজায় কড়া নাড়ছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক অনৈক্য এবং বিভাজনের রাজনীতি বাঙালিকে দুর্বল করে ফেলেছে।

​তবে মনে রাখতে হবে, সংকট যেমন আছে, সম্ভাবনাও তেমনি আছে। বাঙালির রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস এবং অপরাজেয় প্রাণশক্তি। সোহরাওয়ার্দীর সেই সতর্কবাণীকে পাথেয় করে যদি বাঙালি আজ ভৌগোলিকভাবে না হলেও চেতনাগতভাবে যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তবেই এই জাতিগত বিদ্বেষ ও বৈষম্যের জাল ছিন্ন করা সম্ভব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বাসভূমি নিশ্চিত করতে হলে বাঙালিকে সোচ্চার হতে হবে। অন্যথায়, ইতিহাসের পাতায় বাঙালির অস্তিত্ব কেবল একটি ট্র্যাজেডি হিসেবেই টিকে থাকবে।

কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬


সোহরাওয়ার্দীর সেই অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন ও আজকের বিপন্ন বাঙালি

প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬

featured Image


১৯৪৭ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন 'স্বাধীন অখণ্ড বাংলা'র প্রস্তাব করেছিলেন, তখন অনেকেই একে কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে বোঝা যায়, সেটি কোনো নিছক কৌশল ছিল না; বরং তা ছিল বাঙালির দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্ব রক্ষার এক দূরদর্শী রক্ষাকবচ। সোহরাওয়ার্দী স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন, ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হলে এবং বাঙালি যদি ভারতের মতো এক বিশাল বৈচিত্র্যময় ফেডারেশনের অংশ হয়, তবে তার স্বাতন্ত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, একটি বৃহত্তর কাঠামোর চাপে বাঙালির ভাষা, কৃষ্টি এবং বিশেষ মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। আজ আট দশক পর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালির প্রতি ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ ও পদ্ধতিগত প্রান্তিকীকরণ সেই ঐতিহাসিক সতর্কবাণীকেই রূঢ় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

​কেন বারবার লক্ষ্যবস্তু বাঙালি?

​ভারতীয় ইউনিয়নে বাঙালির অবস্থান আজ এক অদ্ভুত দোলাচলে। একদিকে যেমন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বৌদ্ধিক বিকাশে বাঙালির অবদান অনস্বীকার্য, অন্যদিকে আধুনিক ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাঙালি পরিচয়টিই আজ সংকটের মুখে। এই সংকটের মূলে রয়েছে তিনটি প্রধান কারণ:

​১. ভাষা ও কৃষ্টির সংঘাত: 'এক দেশ, এক ভাষা'র যে কেন্দ্রীয় প্রবণতা বর্তমানে ভারতে প্রবল হচ্ছে, তার প্রথম শিকার হচ্ছে বাংলা ভাষা। হিন্দি বলয়ের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে 'বিজাতীয়' হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চলছে।

২. রাজনৈতিক ক্ষমতায়নহীনতা: দিল্লির ক্ষমতায় বাঙালির প্রভাব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বাঙালির স্বার্থ রক্ষার লোক কমে আসছে।

৩. অপরত্বারোপ : রাজনৈতিক মেরুকরণের স্বার্থে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতে বাঙালিদের 'বহিরাগত' বা 'অবৈধ' হিসেবে চিহ্নিত করার একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

​ইতিহাসের ক্ষত সেই আসাম থেকে শুরু

​সোহরাওয়ার্দীর সেই পূর্বাভাসের প্রথম নির্মম প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৬০-এর দশকে আসামের 'বঙ্গাল খেদাও' আন্দোলনে। এরপর ১৯৬১ সালে শিলচরে ভাষার জন্য ১১ জন তরুণের আত্মদান প্রমাণ করে যে, নিজ বাসভূমে ভাষার অধিকারটুকু রক্ষা করতেও বাঙালিকে রক্ত দিতে হবে।

​পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটিও খুব একটা সুখকর ছিল না। ১৯৭৯ সালের মরিচঝাঁপি হত্যাকাণ্ড বাঙালির রাজনৈতিক অসহায়ত্বের এক চরম উদাহরণ। নিজ দেশেই উদ্বাস্তু হওয়া হাজার হাজার দলিত বাঙালি যখন সুন্দরবনের দ্বীপে বসতি গড়ে তুলেছিল, তখন রাষ্ট্রের নির্দয় বুলেট ও অবরোধ তাদের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে, বাঙালির নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো না থাকলে সে যে কোনো স্থানেই উটকো আপদ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

​২০২৬-এর বাস্তবতা: এনআরসি ও ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক

​বর্তমান সময়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। আসামে এনআরসি (NRC) এবং 'ডি-ভোটার' প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে আজ রাষ্ট্রহীনতার আশঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে। নথিপত্রের সামান্য ত্রুটির কারণে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে বৃদ্ধ-বনিতাকে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি সোহরাওয়ার্দীর সেই 'মর্যাদা হারানোর' সতর্কবাণীর আধুনিক রূপ।

​শুধু উত্তর-পূর্ব ভারত নয়, আজ দিল্লি বা কর্ণাটকের মতো রাজ্যেও বাংলাভাষী শ্রমজীবী মানুষকে 'অবৈধ বাংলাদেশি' তকমা দিয়ে নিয়মিত হেনস্তা করা হচ্ছে। এই যে 'বাঙালি মানেই সন্দেহভাজন'—এই বয়ানটি সুপরিকল্পিতভাবে সমাজে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে, যা বাঙালির সামাজিক নিরাপত্তা তছনছ করে দিচ্ছে।

এ যেন যুগ যুগ ধরে চলা জাতিগত সংঘাত 

​বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা ভাষাগত গোষ্ঠীগুলো তাদের অধিকার হারিয়েছে, তখন তার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। আমরা যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রে রুশ ভাষাভাষীদের অবস্থার দিকে তাকাই, তবে দেখব যে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাবে কীভাবে তারা রাতারাতি 'সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন' হয়ে পড়েছিল। আবার কানাডার কুইবেক প্রদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা ফেডারেশনের মধ্যে থেকেও নিজেদের ফরাসি ভাষা ও কৃষ্টিকে কঠোর আইন ও স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে রক্ষা করেছে। ভারত রাষ্ট্রের কাঠামোতে বাঙালি সেই স্বায়ত্তশাসন বা বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি বলেই আজ বিহার বা ঝাড়খণ্ডে বাংলা ভাষার পঠন-পাঠন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

​উত্তরণের পথ কই?

​২০২৬ সালের এই সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংগালীকে কেবল আক্ষেপ করলে চলবে না। সোহরাওয়ার্দীর সেই ভবিষ্যদ্বাণী থেকে শিক্ষা নিয়ে বাঙালিকে নিজস্ব সুরক্ষাবলয় তৈরি করতে হবে। এই লক্ষে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

​সাংস্কৃতিক কূটনীতি জোরদার: পশ্চিমবঙ্গকে বাঙালি পরিচয়টি  একটি বিশ্বজনীন শক্তিশালী পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সাংস্কৃতিক ও কুটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। 

​আইনি সুরক্ষা ও আইনি সেল গঠন: ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হয়রানির শিকার বাঙালিদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে শক্তিশালী আইনি সহায়তা সেল গঠন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে।

​ভাষাগত স্বায়ত্তশাসনের দাবি: ভারতের সংবিধানে যে ভাষাগত সংখ্যালঘু অধিকারের কথা বলা হয়েছে, তার কঠোর প্রয়োগ দাবি করতে হবে। যেসব রাজ্যে বাঙালির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য (যেমন ত্রিপুরা, আসাম, ঝাড়খণ্ড), সেখানে বাংলাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে।

​অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা: বাঙালির প্রতি বিদ্বেষের একটি বড় কারণ অর্থনৈতিক ঈর্ষা। বাঙালি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এমন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে যাতে অর্থনৈতিকভাবে বাঙালি একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়।

অখণ্ড বাংলার দর্শন ও আমাদের ভবিষ্যৎ

​হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই অখণ্ড বাংলার দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি যে খণ্ডিত বাংলার বিপদের কথা বলেছিলেন, তা আজ পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত বাঙালির দরজায় কড়া নাড়ছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক অনৈক্য এবং বিভাজনের রাজনীতি বাঙালিকে দুর্বল করে ফেলেছে।

​তবে মনে রাখতে হবে, সংকট যেমন আছে, সম্ভাবনাও তেমনি আছে। বাঙালির রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস এবং অপরাজেয় প্রাণশক্তি। সোহরাওয়ার্দীর সেই সতর্কবাণীকে পাথেয় করে যদি বাঙালি আজ ভৌগোলিকভাবে না হলেও চেতনাগতভাবে যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তবেই এই জাতিগত বিদ্বেষ ও বৈষম্যের জাল ছিন্ন করা সম্ভব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বাসভূমি নিশ্চিত করতে হলে বাঙালিকে সোচ্চার হতে হবে। অন্যথায়, ইতিহাসের পাতায় বাঙালির অস্তিত্ব কেবল একটি ট্র্যাজেডি হিসেবেই টিকে থাকবে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত