অর্থনীতি
বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বৈদেশিক উৎস থেকে গৃহীত অপরিকল্পিত ও বেপরোয়া ঋণের বোঝা এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। চড়া সুদে নেওয়া এসব ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হতে শুরু করায় এবং ডলারের বিনিময় হারের অস্বাভাবিক উল্লম্ফনে বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন নজিরবিহীন ঝুঁকির সম্মুখীন। বিশেষ করে, ২০২২ সাল পরবর্তী বৈশ্বিক মন্দার প্রেক্ষাপটে স্থগিত হওয়া ঋণের কিস্তিগুলো এখন অতিরিক্ত সুদ ও দণ্ড সুদসহ পরিশোধ করতে গিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি।
ঋণের পাহাড়ে দেড় দশক
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল মাত্র ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। গত ১৫ বছরে সেই ঋণের বোঝা চার গুণেরও বেশি বেড়ে ২০২৪ সালের জুনে দাঁড়িয়েছিল ১০ হাজার ৪০৭ কোটি ডলারে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর নাগাদ এই ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৩৫২ কোটি ডলারের সুউচ্চ শিখর স্পর্শ করেছে। এই বিপুল অংকের ঋণের সিংহভাগই সরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, যার একটি বড় অংশই ব্যয় হয়েছে এমন সব প্রকল্পে যেখান থেকে কোনো দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সুফল বা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা মেলেনি।
ডলার ও সুদের দ্বিমুখী চাবুক
২০২২ সালের মার্চে যখন ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ শুরু হয়, তখন প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৬ টাকা। বর্তমানে সেই হার ১২৩ টাকা ৪০ পয়সায় এসে ঠেকেছে। অর্থাৎ গত চার বছরে ডলার প্রতি অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে ৩৭ টাকা ৪০ পয়সা। বাড়তি দামে ডলার কেনার ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ সালে ঋণের সুদ পরিশোধে রাজস্ব আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যয় হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের আয়ের একটি বিশাল অংশই এখন কেবল সুদ শোধ করতেই চলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন আরও ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরেছে—বিগত ১৫ বছরে মূল ঋণের কিস্তি পরিশোধ ৬ গুণ বাড়লেও সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ১২ গুণেরও বেশি।
তলানিতে রিজার্ভ ও পরিশোধের সক্ষমতা
একসময় জিডিপির তুলনায় বৈদেশিক ঋণকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করা হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিপরীতে ঋণের অনুপাত ছিল ৫৭.১০ শতাংশ, যা বর্তমানে মাত্র ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ঋণ যে হারে বাড়ছে, রিজার্ভ সে হারে বাড়েনি। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে আমদানি ব্যয়কে আরও উসকে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর।
সুফলহীন প্রকল্প ও নতুন ঋণের চক্র
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিকা উপেক্ষা করে এমন সব প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে যেখান থেকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় না। ফলে এখন বাজার থেকে বাড়তি দামে ডলার কিনে ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। রাজস্ব আয় কম হওয়ায় পুরোনো ঋণ শোধ করতে সরকারকে এখন আবার নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। এই ‘ঋণ দিয়ে ঋণ শোধের’ চক্র অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আইএমএফ ও এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬
বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বৈদেশিক উৎস থেকে গৃহীত অপরিকল্পিত ও বেপরোয়া ঋণের বোঝা এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। চড়া সুদে নেওয়া এসব ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হতে শুরু করায় এবং ডলারের বিনিময় হারের অস্বাভাবিক উল্লম্ফনে বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন নজিরবিহীন ঝুঁকির সম্মুখীন। বিশেষ করে, ২০২২ সাল পরবর্তী বৈশ্বিক মন্দার প্রেক্ষাপটে স্থগিত হওয়া ঋণের কিস্তিগুলো এখন অতিরিক্ত সুদ ও দণ্ড সুদসহ পরিশোধ করতে গিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি।
ঋণের পাহাড়ে দেড় দশক
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল মাত্র ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। গত ১৫ বছরে সেই ঋণের বোঝা চার গুণেরও বেশি বেড়ে ২০২৪ সালের জুনে দাঁড়িয়েছিল ১০ হাজার ৪০৭ কোটি ডলারে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর নাগাদ এই ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৩৫২ কোটি ডলারের সুউচ্চ শিখর স্পর্শ করেছে। এই বিপুল অংকের ঋণের সিংহভাগই সরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, যার একটি বড় অংশই ব্যয় হয়েছে এমন সব প্রকল্পে যেখান থেকে কোনো দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সুফল বা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা মেলেনি।
ডলার ও সুদের দ্বিমুখী চাবুক
২০২২ সালের মার্চে যখন ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ শুরু হয়, তখন প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৬ টাকা। বর্তমানে সেই হার ১২৩ টাকা ৪০ পয়সায় এসে ঠেকেছে। অর্থাৎ গত চার বছরে ডলার প্রতি অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে ৩৭ টাকা ৪০ পয়সা। বাড়তি দামে ডলার কেনার ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ সালে ঋণের সুদ পরিশোধে রাজস্ব আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যয় হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের আয়ের একটি বিশাল অংশই এখন কেবল সুদ শোধ করতেই চলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন আরও ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরেছে—বিগত ১৫ বছরে মূল ঋণের কিস্তি পরিশোধ ৬ গুণ বাড়লেও সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ১২ গুণেরও বেশি।
তলানিতে রিজার্ভ ও পরিশোধের সক্ষমতা
একসময় জিডিপির তুলনায় বৈদেশিক ঋণকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করা হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিপরীতে ঋণের অনুপাত ছিল ৫৭.১০ শতাংশ, যা বর্তমানে মাত্র ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ঋণ যে হারে বাড়ছে, রিজার্ভ সে হারে বাড়েনি। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে আমদানি ব্যয়কে আরও উসকে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর।
সুফলহীন প্রকল্প ও নতুন ঋণের চক্র
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিকা উপেক্ষা করে এমন সব প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে যেখান থেকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় না। ফলে এখন বাজার থেকে বাড়তি দামে ডলার কিনে ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। রাজস্ব আয় কম হওয়ায় পুরোনো ঋণ শোধ করতে সরকারকে এখন আবার নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। এই ‘ঋণ দিয়ে ঋণ শোধের’ চক্র অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আইএমএফ ও এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
