রাজনীতিরাজনীতি

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হবে না

রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর বিস্ফোরক মন্তব্য

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে  দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হবে না
ছবি -সংগৃহীত

 

রাজধানীতে আয়োজিত এক জাতীয় কনভেনশনে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেছেন, ক্ষমতার বলয় ভাঙতে না চাওয়ার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বারবার ভণ্ডুল হচ্ছে; জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ছাড়া উত্তরণ অসম্ভব।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের যে স্বপ্ন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছিল, তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি অভিযোগ করেছেন, দেশের প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা ‘এলিট’ শ্রেণি—যাদের মধ্যে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্তর্ভুক্ত—তারা ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ। এই মানসিকতার কারণেই রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রোববার (৩ মে) সকালে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এক জাতীয় কনভেনশনে তিনি এসব কথা বলেন। ন্যাশনালিস্ট কালচারাল পার্টি (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উদ্যোগে ‘জ্বালানি, অর্থনীতি সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক এই সম্মেলন আয়োজিত হয়। সেখানে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংস্কার প্রক্রিয়ার স্থবিরতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন।

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে ১৯৯১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, এর আগে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে সংস্কারের বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেই প্রস্তাবগুলোর একটিও বাস্তবায়ন করেনি। তিনি বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সেই সময়ের তুলনা করে বলেন, ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পরও আমরা একই ধরণের সংকটে পড়েছি।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা একটি প্রতারণামূলক রাজনৈতিক পরিবেশের মুখোমুখি। যারা শুরু থেকেই অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে (ম্যাটিকুলাসলি) পরিকল্পনা করেছে যাতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগণের স্বপ্নগুলো ভেস্তে যায়।" তাঁর মতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে থাকা প্রভাবশালীরা নিজেদের কর্তৃত্ব হারাতে চায় না বলেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করা হচ্ছে।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে অধ্যাপক চৌধুরী সরকারের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, মাত্র দুই মাস আগে নির্বাচন হলেও দেশ আবার আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। জুলাই সনদে ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে গুম, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিচার বিভাগসহ যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেগুলো একে একে বাতিল করছে।

তিনি বলেন, "একটি স্বাধীন কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেটি দেখা যাচ্ছে না।" তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই পরিবর্তনগুলো না এলে রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা আবারও কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী হয়ে উঠবেন।

রাজনৈতিক নেতৃত্বে সত্যবাদিতা এবং নৈতিকতার অভাব নিয়ে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া বক্তব্যের মতো কোনো অসত্য তথ্য যদি কানাডার মতো কোনো গণতান্ত্রিক দেশের মন্ত্রী দিতেন, তবে তাকে সেদিনই পদত্যাগ করতে হতো। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ধরণের জবাবদিহিতার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি।

 তিনি আরো বলেন বলেন, সরকারকে অবশ্যই জুলাই সনদ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী গণভোটের পথ বেছে নিতে হবে। মানুষের ভোটাধিকার এবং মতামতের প্রতিফলন না ঘটলে পরিস্থিতি ঘুরেফিরে সেই পুরনো শেখ হাসিনা সরকারের আমলের মতোই হয়ে যাবে। সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে গেলে অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

উক্ত কনভেনশনে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যারা সমস্বরে দেশের অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিষয় : জুলাই সনদ রাজনৈতিক সংকট

কাল মহাকাল

রোববার, ০৩ মে ২০২৬


জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হবে না

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image

 

রাজধানীতে আয়োজিত এক জাতীয় কনভেনশনে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেছেন, ক্ষমতার বলয় ভাঙতে না চাওয়ার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বারবার ভণ্ডুল হচ্ছে; জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ছাড়া উত্তরণ অসম্ভব।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের যে স্বপ্ন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছিল, তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি অভিযোগ করেছেন, দেশের প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা ‘এলিট’ শ্রেণি—যাদের মধ্যে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্তর্ভুক্ত—তারা ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ। এই মানসিকতার কারণেই রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রোববার (৩ মে) সকালে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এক জাতীয় কনভেনশনে তিনি এসব কথা বলেন। ন্যাশনালিস্ট কালচারাল পার্টি (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উদ্যোগে ‘জ্বালানি, অর্থনীতি সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক এই সম্মেলন আয়োজিত হয়। সেখানে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংস্কার প্রক্রিয়ার স্থবিরতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন।

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে ১৯৯১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, এর আগে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে সংস্কারের বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেই প্রস্তাবগুলোর একটিও বাস্তবায়ন করেনি। তিনি বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সেই সময়ের তুলনা করে বলেন, ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পরও আমরা একই ধরণের সংকটে পড়েছি।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা একটি প্রতারণামূলক রাজনৈতিক পরিবেশের মুখোমুখি। যারা শুরু থেকেই অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে (ম্যাটিকুলাসলি) পরিকল্পনা করেছে যাতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগণের স্বপ্নগুলো ভেস্তে যায়।" তাঁর মতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে থাকা প্রভাবশালীরা নিজেদের কর্তৃত্ব হারাতে চায় না বলেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করা হচ্ছে।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে অধ্যাপক চৌধুরী সরকারের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, মাত্র দুই মাস আগে নির্বাচন হলেও দেশ আবার আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। জুলাই সনদে ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে গুম, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিচার বিভাগসহ যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেগুলো একে একে বাতিল করছে।

তিনি বলেন, "একটি স্বাধীন কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেটি দেখা যাচ্ছে না।" তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই পরিবর্তনগুলো না এলে রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা আবারও কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী হয়ে উঠবেন।

রাজনৈতিক নেতৃত্বে সত্যবাদিতা এবং নৈতিকতার অভাব নিয়ে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া বক্তব্যের মতো কোনো অসত্য তথ্য যদি কানাডার মতো কোনো গণতান্ত্রিক দেশের মন্ত্রী দিতেন, তবে তাকে সেদিনই পদত্যাগ করতে হতো। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ধরণের জবাবদিহিতার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি।

 তিনি আরো বলেন বলেন, সরকারকে অবশ্যই জুলাই সনদ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী গণভোটের পথ বেছে নিতে হবে। মানুষের ভোটাধিকার এবং মতামতের প্রতিফলন না ঘটলে পরিস্থিতি ঘুরেফিরে সেই পুরনো শেখ হাসিনা সরকারের আমলের মতোই হয়ে যাবে। সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে গেলে অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

উক্ত কনভেনশনে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যারা সমস্বরে দেশের অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ মোঃ ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত