বানিজ্য
দেশের ব্যাংকিং খাতে একসময় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রতি আমানতকারীদের যে প্রবল ঝোঁক ছিল, বর্তমানে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থা এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের আস্থার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আমানতকারীরা পুনরায় সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর দিকে ফিরতে শুরু করেছেন, যার ফলে আমানত প্রবৃদ্ধির দৌড়ে এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে পেছনে ফেলে দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় সোয়া ১৩ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাড়ে ১২ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। যদিও টাকার অঙ্কের হিসেবে এখনো সিংহভাগ আমানত বেসরকারি ব্যাংকের দখলেই রয়েছে, তবে সাম্প্রতিক এই প্রবণতা খাতের ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বেসরকারি খাতের শরিয়াহভিত্তিক বেশ কয়েকটি ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া এবং কিছু প্রচলিত ব্যাংকের সংকট আমানতকারীদের মনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন মুনাফার চেয়ে পুঁজির নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এবিবি’র চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে এবং প্রচলিত ধারার অনেক বেসরকারি ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই পরিস্থিতিই সরকারি ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করেছে।
সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও বেশ আশাব্যঞ্জক। কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মতো বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবৃদ্ধির হার পৌঁছেছে ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বেসরকারি ব্যাংক পুরোপুরি ব্যর্থ। ভালো অবস্থানে থাকা শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও আমানত বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে খাতের একটি বড় অংশের প্রতি অনাস্থা সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এছাড়া আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। গত এক বছরে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংক আমানত বেড়েছে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ, যা নির্দেশ করে সাধারণ মানুষ এখন আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। দেশের মোট আমানতের ৬৯ শতাংশ এখনো বেসরকারি ব্যাংকের হাতে থাকলেও, আমানতকারীদের এই স্থানান্তর ব্যাংকিং খাতের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যাংকগুলো এখন আমানতকারীদের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতের ব্যাংকিং খাতের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিষয় : বেসরকারি ব্যাংক
2.png)
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬
দেশের ব্যাংকিং খাতে একসময় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রতি আমানতকারীদের যে প্রবল ঝোঁক ছিল, বর্তমানে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থা এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের আস্থার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আমানতকারীরা পুনরায় সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর দিকে ফিরতে শুরু করেছেন, যার ফলে আমানত প্রবৃদ্ধির দৌড়ে এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে পেছনে ফেলে দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় সোয়া ১৩ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাড়ে ১২ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। যদিও টাকার অঙ্কের হিসেবে এখনো সিংহভাগ আমানত বেসরকারি ব্যাংকের দখলেই রয়েছে, তবে সাম্প্রতিক এই প্রবণতা খাতের ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বেসরকারি খাতের শরিয়াহভিত্তিক বেশ কয়েকটি ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া এবং কিছু প্রচলিত ব্যাংকের সংকট আমানতকারীদের মনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন মুনাফার চেয়ে পুঁজির নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এবিবি’র চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে এবং প্রচলিত ধারার অনেক বেসরকারি ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই পরিস্থিতিই সরকারি ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করেছে।
সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও বেশ আশাব্যঞ্জক। কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মতো বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবৃদ্ধির হার পৌঁছেছে ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বেসরকারি ব্যাংক পুরোপুরি ব্যর্থ। ভালো অবস্থানে থাকা শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও আমানত বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে খাতের একটি বড় অংশের প্রতি অনাস্থা সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এছাড়া আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। গত এক বছরে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংক আমানত বেড়েছে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ, যা নির্দেশ করে সাধারণ মানুষ এখন আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। দেশের মোট আমানতের ৬৯ শতাংশ এখনো বেসরকারি ব্যাংকের হাতে থাকলেও, আমানতকারীদের এই স্থানান্তর ব্যাংকিং খাতের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যাংকগুলো এখন আমানতকারীদের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতের ব্যাংকিং খাতের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
2.png)