থোরিয়াম প্রযুক্তিতে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বিরল মাইলফলক স্পর্শ করল ভারত; বিপরীতে রূপপুর প্রকল্পে বাংলাদেশের ব্যয় ও পরনির্ভরশীলতা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে গত এপ্রিল মাসটি ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। একদিকে বাংলাদেশ তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোড করে বিশ্ব পরমাণু ক্লাবে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ ভারত সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এমন এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময় উপহার দিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে ভারতকে একক আধিপত্যের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিল।
তামিলনাড়ুর কালপাক্কাম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সফলভাবে প্লুটোনিয়ামকে রূপান্তর করে ‘ইউরেনিয়াম-২৩৩’ তৈরি করেছেন। বৈজ্ঞানিক মহলের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ অর্জন নয়, বরং দীর্ঘ আট দশকের এক অসাধ্য সাধনের গল্প।
হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার স্বপ্ন ও থোরিয়াম বিপ্লব
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারত যখন জ্বালানি সংকটে ধুঁকছিল, তখন বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ভারতে বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী ‘ইউরেনিয়াম-২৩৫’ এর মজুদ ছিল অত্যন্ত নগণ্য। কিন্তু ভারতের ওড়িশা ও কেরালা উপকূলে বিশ্বের বৃহত্তম ‘থোরিয়াম’ এর মজুদ রয়েছে। থোরিয়াম সরাসরি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না, তবে একে রূপান্তর করে ইউরেনিয়াম-২৩৩ তৈরি করা সম্ভব।
হোমি ভাবা একটি তিন-স্তরের মহাপরিকল্পনা করেছিলেন: ১. সহজলভ্য ইউরেনিয়াম থেকে প্লুটোনিয়াম তৈরি। ২. সেই প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করে ইউরেনিয়াম-২৩৩ উৎপাদন। ৩. সবশেষে ইউরেনিয়াম-২৩৩ দিয়ে ভারতের বিশাল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে সক্রিয় করা।
কালপাক্কামের সাম্প্রতিক সাফল্য ভারতের এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ নিশ্চিত করেছে। আগামী এক দশকের মধ্যে ভারত সম্পূর্ণভাবে থোরিয়াম নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে ২০৪০ সাল নাগাদ দেশটিকে জ্বালানি তেল বা গ্যাসের জন্য আর মধ্যপ্রাচ্য বা আমেরিকার ওপর নির্ভর করতে হবে না।
রূপপুর বনাম কালপাক্কাম: খরচের অসম পাহাড়
ভারতের এই ঐতিহাসিক অগ্রগতির বিপরীতে বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক ও কৌশলগত দিক নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ভারতের এই রেকর্ড সৃষ্টিকারী প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর (PFBR) প্রকল্পে খরচ হয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের রূপপুর প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। ঋণ, সুদ এবং মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে এর প্রকৃত ব্যয় ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদী স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করলেও, বাংলাদেশের প্রকল্পটি উচ্চ সুদের রুশ ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জানান, "রূপপুরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ২-৩ টাকা হওয়ার যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তাতে কেবল পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে। বিশাল অংকের ঋণ, সুদ এবং প্ল্যান্টের অবচয় ধরলে এই বিদ্যুৎ হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।"
দেশীয় সম্পদ ও গবেষণার অবহেলা
ভারতের মতো বাংলাদেশের কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতেও প্রচুর পরিমাণে থোরিয়াম সমৃদ্ধ খনিজ বালু রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলিক গবেষণার অভাবের কারণে বাংলাদেশ নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবনে পিছিয়ে রয়েছে। ভারতের আইআইটি (IIT) সহ অন্যান্য শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে কারিগরি জনবল তৈরি করেছে, বাংলাদেশে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না।
পরিহাসের বিষয় হলো, রূপপুরের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা পরিচালনার জন্য আমাদের এখনো বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এমনকি দেশের তৈরি পোশাক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও এখনো বিপুল সংখ্যক বিদেশি কর্মকর্তা কর্মরত।
ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
ভারতের এই সাফল্য কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশটিকে চীন, আমেরিকা ও রাশিয়ার জ্বালানি বলয় থেকে মুক্ত করবে। অথচ বাংলাদেশের রূপপুর প্রকল্প আগামী ৬০ বছরের জন্য রাশিয়ার প্রযুক্তি ও জ্বালানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং গবেষণায় অনীহার কারণে বিদেশি প্রযুক্তি কেনাই এখন একমাত্র সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরনির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে কোনো ঝুঁকির মুখে ফেলে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
2.png)
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬
থোরিয়াম প্রযুক্তিতে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বিরল মাইলফলক স্পর্শ করল ভারত; বিপরীতে রূপপুর প্রকল্পে বাংলাদেশের ব্যয় ও পরনির্ভরশীলতা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে গত এপ্রিল মাসটি ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। একদিকে বাংলাদেশ তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোড করে বিশ্ব পরমাণু ক্লাবে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ ভারত সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এমন এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময় উপহার দিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে ভারতকে একক আধিপত্যের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিল।
তামিলনাড়ুর কালপাক্কাম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সফলভাবে প্লুটোনিয়ামকে রূপান্তর করে ‘ইউরেনিয়াম-২৩৩’ তৈরি করেছেন। বৈজ্ঞানিক মহলের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ অর্জন নয়, বরং দীর্ঘ আট দশকের এক অসাধ্য সাধনের গল্প।
হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার স্বপ্ন ও থোরিয়াম বিপ্লব
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারত যখন জ্বালানি সংকটে ধুঁকছিল, তখন বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ভারতে বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী ‘ইউরেনিয়াম-২৩৫’ এর মজুদ ছিল অত্যন্ত নগণ্য। কিন্তু ভারতের ওড়িশা ও কেরালা উপকূলে বিশ্বের বৃহত্তম ‘থোরিয়াম’ এর মজুদ রয়েছে। থোরিয়াম সরাসরি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না, তবে একে রূপান্তর করে ইউরেনিয়াম-২৩৩ তৈরি করা সম্ভব।
হোমি ভাবা একটি তিন-স্তরের মহাপরিকল্পনা করেছিলেন: ১. সহজলভ্য ইউরেনিয়াম থেকে প্লুটোনিয়াম তৈরি। ২. সেই প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করে ইউরেনিয়াম-২৩৩ উৎপাদন। ৩. সবশেষে ইউরেনিয়াম-২৩৩ দিয়ে ভারতের বিশাল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে সক্রিয় করা।
কালপাক্কামের সাম্প্রতিক সাফল্য ভারতের এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ নিশ্চিত করেছে। আগামী এক দশকের মধ্যে ভারত সম্পূর্ণভাবে থোরিয়াম নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে ২০৪০ সাল নাগাদ দেশটিকে জ্বালানি তেল বা গ্যাসের জন্য আর মধ্যপ্রাচ্য বা আমেরিকার ওপর নির্ভর করতে হবে না।
রূপপুর বনাম কালপাক্কাম: খরচের অসম পাহাড়
ভারতের এই ঐতিহাসিক অগ্রগতির বিপরীতে বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক ও কৌশলগত দিক নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ভারতের এই রেকর্ড সৃষ্টিকারী প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর (PFBR) প্রকল্পে খরচ হয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের রূপপুর প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। ঋণ, সুদ এবং মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে এর প্রকৃত ব্যয় ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদী স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করলেও, বাংলাদেশের প্রকল্পটি উচ্চ সুদের রুশ ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জানান, "রূপপুরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ২-৩ টাকা হওয়ার যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তাতে কেবল পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে। বিশাল অংকের ঋণ, সুদ এবং প্ল্যান্টের অবচয় ধরলে এই বিদ্যুৎ হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।"
দেশীয় সম্পদ ও গবেষণার অবহেলা
ভারতের মতো বাংলাদেশের কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতেও প্রচুর পরিমাণে থোরিয়াম সমৃদ্ধ খনিজ বালু রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলিক গবেষণার অভাবের কারণে বাংলাদেশ নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবনে পিছিয়ে রয়েছে। ভারতের আইআইটি (IIT) সহ অন্যান্য শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে কারিগরি জনবল তৈরি করেছে, বাংলাদেশে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না।
পরিহাসের বিষয় হলো, রূপপুরের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা পরিচালনার জন্য আমাদের এখনো বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এমনকি দেশের তৈরি পোশাক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও এখনো বিপুল সংখ্যক বিদেশি কর্মকর্তা কর্মরত।
ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
ভারতের এই সাফল্য কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশটিকে চীন, আমেরিকা ও রাশিয়ার জ্বালানি বলয় থেকে মুক্ত করবে। অথচ বাংলাদেশের রূপপুর প্রকল্প আগামী ৬০ বছরের জন্য রাশিয়ার প্রযুক্তি ও জ্বালানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং গবেষণায় অনীহার কারণে বিদেশি প্রযুক্তি কেনাই এখন একমাত্র সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরনির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে কোনো ঝুঁকির মুখে ফেলে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
2.png)