সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

বাংলায় গেরুয়া ঝড়: মমতার পতন, মসনদে বিজেপি

দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় মোদি-শাহর দল; নন্দীগ্রামে পরাজিত বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কাঠগড়ায় নির্বাচন কমিশন।

বাংলায় গেরুয়া ঝড়: মমতার পতন, মসনদে বিজেপি
ছবি -সংগৃহীত
After Featured Image

দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে সূচিত হলো এক নতুন অধ্যায়। জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিধন্য এই রাজ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘অধরা স্বপ্ন’ অবশেষে সাকার করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ভোট গণনার যে ধারা পরিলক্ষিত হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে নবান্নের দখল নিতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি এককভাবে ২০০-র গণ্ডি অতিক্রম করে ২০৬টি আসনে জয়ী বা এগিয়ে রয়েছে, যা রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মেরুকরণ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

Middle Post Content 1

​হেভিওয়েট লড়াই ও মমতার পরাজয়

​এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হয়ে দাঁড়িয়েছে নন্দীগ্রামের ফলাফল। তৃণমূলের প্রধান ও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, বর্তমানে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ভোটগণনা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে ক্ষুব্ধ মমতা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, "এবারের নির্বাচনে শতাধিক আসন লুট করা হয়েছে।" এই পরাজয় তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

​বিজেপির উত্থান ও তৃণমূলের দুর্গ ধস

Middle Post Content 2

​গত নির্বাচনে মাত্র ৭৭টি আসনে সীমাবদ্ধ থাকা বিজেপি এবার বিশাল লাফে দুই শতাধিক আসনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। উত্তরবঙ্গের কোচবিহার থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের পুরুলিয়া—৫৬টি আসনের একটিও তৃণমূলের ঝুলিতে যায়নি। এমনকি তৃণমূলের অভেদ্য দুর্গ বলে পরিচিত দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতেও থাবা বসিয়েছে গেরুয়া শিবির। প্রাপ্ত ভোটের হারেও বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে; বিজেপির ভোট প্রাপ্তি ৮ শতাংশ বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, বিপরীতে তৃণমূলের সমর্থন ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে।

​জয়ের নেপথ্যে তিনটি প্রধান অনুঘটক

​বিজেপির এই জাদুকরী সাফল্যের পেছনে গবেষকরা মূলত তিনটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন:

Middle Post Content 3

​১. ভোটার তালিকা সংশোধন ও এসআইআর আতঙ্ক: নির্বাচন কমিশনের নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) ফলে প্রায় এক কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারান। এই প্রক্রিয়া মুসলমান ও মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরণের নাগরিকত্ব শঙ্কা তৈরি করে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে ব্যালট বক্সে।

২. কমিশনের অভূতপূর্ব নিরাপত্তা বলয়: রাজ্য পুলিশের ওপর ভরসা না রেখে আড়াই হাজার কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং ২ লাখ সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে ভোট পরিচালনা করা হয়েছে। এতে শাসক দলের চিরাচরিত ‘ভোট চুরির’ পথ রুদ্ধ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

Middle Post Content Repeat

৩. দুর্নীতি বনাম ‘ডাবল ইঞ্জিন’ প্রতিশ্রুতি: তৃণমূল সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিপরীতে মোদি-শাহর ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অর্থ দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি নারীদের একটি বড় অংশকে বিজেপির দিকে ধাবিত করেছে।

​ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

​পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই ক্ষমতা দখল ঢাকা-দিল্লি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এতদিন তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির যে ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা’র কথা দিল্লি বলে আসত, বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সেই অজুহাত আর খাটবে না। ফলে তিস্তা চুক্তি এবং আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়নের পথ প্রশস্ত হবে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে কৌতূহল তুঙ্গে।

After Content

বিষয় : পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি

Before Related Article
কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬


বাংলায় গেরুয়া ঝড়: মমতার পতন, মসনদে বিজেপি

প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬

featured Image

দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে সূচিত হলো এক নতুন অধ্যায়। জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিধন্য এই রাজ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘অধরা স্বপ্ন’ অবশেষে সাকার করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ভোট গণনার যে ধারা পরিলক্ষিত হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে নবান্নের দখল নিতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি এককভাবে ২০০-র গণ্ডি অতিক্রম করে ২০৬টি আসনে জয়ী বা এগিয়ে রয়েছে, যা রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মেরুকরণ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

​হেভিওয়েট লড়াই ও মমতার পরাজয়

​এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হয়ে দাঁড়িয়েছে নন্দীগ্রামের ফলাফল। তৃণমূলের প্রধান ও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, বর্তমানে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ভোটগণনা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে ক্ষুব্ধ মমতা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, "এবারের নির্বাচনে শতাধিক আসন লুট করা হয়েছে।" এই পরাজয় তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

​বিজেপির উত্থান ও তৃণমূলের দুর্গ ধস

​গত নির্বাচনে মাত্র ৭৭টি আসনে সীমাবদ্ধ থাকা বিজেপি এবার বিশাল লাফে দুই শতাধিক আসনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। উত্তরবঙ্গের কোচবিহার থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের পুরুলিয়া—৫৬টি আসনের একটিও তৃণমূলের ঝুলিতে যায়নি। এমনকি তৃণমূলের অভেদ্য দুর্গ বলে পরিচিত দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতেও থাবা বসিয়েছে গেরুয়া শিবির। প্রাপ্ত ভোটের হারেও বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে; বিজেপির ভোট প্রাপ্তি ৮ শতাংশ বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, বিপরীতে তৃণমূলের সমর্থন ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে।

​জয়ের নেপথ্যে তিনটি প্রধান অনুঘটক

​বিজেপির এই জাদুকরী সাফল্যের পেছনে গবেষকরা মূলত তিনটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন:

​১. ভোটার তালিকা সংশোধন ও এসআইআর আতঙ্ক: নির্বাচন কমিশনের নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) ফলে প্রায় এক কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারান। এই প্রক্রিয়া মুসলমান ও মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরণের নাগরিকত্ব শঙ্কা তৈরি করে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে ব্যালট বক্সে।

২. কমিশনের অভূতপূর্ব নিরাপত্তা বলয়: রাজ্য পুলিশের ওপর ভরসা না রেখে আড়াই হাজার কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং ২ লাখ সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে ভোট পরিচালনা করা হয়েছে। এতে শাসক দলের চিরাচরিত ‘ভোট চুরির’ পথ রুদ্ধ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

৩. দুর্নীতি বনাম ‘ডাবল ইঞ্জিন’ প্রতিশ্রুতি: তৃণমূল সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিপরীতে মোদি-শাহর ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অর্থ দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি নারীদের একটি বড় অংশকে বিজেপির দিকে ধাবিত করেছে।

​ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

​পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই ক্ষমতা দখল ঢাকা-দিল্লি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এতদিন তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির যে ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা’র কথা দিল্লি বলে আসত, বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সেই অজুহাত আর খাটবে না। ফলে তিস্তা চুক্তি এবং আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়নের পথ প্রশস্ত হবে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে কৌতূহল তুঙ্গে।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত