জামায়াত ও বিরোধীদলীয় নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে ৭২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার যৌথ বিবৃতি; সংসদকে ব্যক্তিগত আক্রমণের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান।
জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামী এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাকে নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। এই বক্তব্যকে ‘অপ্রীতিকর, অসংসদীয় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধারা সংসদ সদস্যের দেওয়া তথ্য ও ভাষার কঠোর সমালোচনা করেন। পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম উদ্দিন এবং সেক্রেটারি জেনারেল বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. তাজিরুল ইসলামসহ দেশের ৭২ জন বিশিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা এই প্রতিবাদে একাত্মতা প্রকাশ করে সই করেছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ এপ্রিল, মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে। সেখানে ফজলুর রহমান জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধীদলীয় নেতাদের লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, সংসদে একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এ ধরনের বিভাজনমূলক ভাষা অনভিপ্রেত।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, "আমরা জেনারেল জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের রাজনৈতিক আদর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছেন। কেউ আওয়ামী লীগ করেছেন, কেউ বিএনপি, জাসদ বা জাতীয় পার্টিতে গিয়েছেন। এমনকি ১৯৭৯ সালে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরুর পর অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা জামায়াতে ইসলামীতেও যোগ দিয়েছেন। এটি তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার।"
ফজলুর রহমানের যুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান দাবি করেছিলেন যে, মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। এই মন্তব্যের পাল্টা জবাবে মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইতিহাস ও যুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিবৃতিতে কিশোরগঞ্জের তৎকালীন কোম্পানি কমান্ডার আইয়ুব বিন হায়দারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, "অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ট্রেনিং নিলেও কখনও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি এবং তিনি কোনো কোম্পানি কমান্ডারও ছিলেন না। বরং তিনি নিজেই অতীতে রাজনৈতিক নীতি বিসর্জন দিয়ে বারবার দলবদল করেছেন।"
সংগঠনটির মতে, যারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করে দেশ রক্ষার স্বার্থে সোচ্চার থাকে, তাদের প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন একটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, কিন্তু একে ঢালাওভাবে দেশবিরোধী আখ্যা দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
সংসদকে রক্ষা ও বিভাজন পরিহারের আহ্বান
জাতীয় সংসদকে দেশের আইন প্রণয়ন ও উন্নয়নের সর্বোচ্চ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, এই পবিত্র স্থানটি ব্যক্তিগত কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির চারণভূমি হওয়া উচিত নয়। বিবৃতিতে তারা সতর্ক করে বলেন, বিভাজনের রাজনীতি অব্যাহত থাকলে দেশ পুনরায় ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসনের দিকে ধাবিত হতে পারে।
তারা চব্বিশের জুলাই সনদের নীতির আলোকে সংবিধান সংস্কার এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিবর্গ
বিবৃতিতে সই করা ৭২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে রয়েছেন— ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম উদ্দিন, মো. তাজিরুল ইসলাম, মো. ফজলুল হক, মো. আবদুল ওয়ারেছ, ডা. আলতাফ হোসেন, মো. শাহাবুদ্দিন, মো. মতিউর রহমান, মো. শামসুদ্দিন মিয়া, মো. বোরহান উদ্দিন, আব্দুল করিম, মোকাররম হোসেন এবং কামাল উদ্দিনসহ আরও অনেকে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের এই অবস্থান সংসদীয় বিতর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ করল, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
জামায়াত ও বিরোধীদলীয় নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে ৭২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার যৌথ বিবৃতি; সংসদকে ব্যক্তিগত আক্রমণের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান।
জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামী এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাকে নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। এই বক্তব্যকে ‘অপ্রীতিকর, অসংসদীয় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধারা সংসদ সদস্যের দেওয়া তথ্য ও ভাষার কঠোর সমালোচনা করেন। পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম উদ্দিন এবং সেক্রেটারি জেনারেল বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. তাজিরুল ইসলামসহ দেশের ৭২ জন বিশিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা এই প্রতিবাদে একাত্মতা প্রকাশ করে সই করেছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ এপ্রিল, মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে। সেখানে ফজলুর রহমান জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধীদলীয় নেতাদের লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, সংসদে একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এ ধরনের বিভাজনমূলক ভাষা অনভিপ্রেত।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, "আমরা জেনারেল জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের রাজনৈতিক আদর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছেন। কেউ আওয়ামী লীগ করেছেন, কেউ বিএনপি, জাসদ বা জাতীয় পার্টিতে গিয়েছেন। এমনকি ১৯৭৯ সালে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরুর পর অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা জামায়াতে ইসলামীতেও যোগ দিয়েছেন। এটি তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার।"
ফজলুর রহমানের যুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান দাবি করেছিলেন যে, মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। এই মন্তব্যের পাল্টা জবাবে মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইতিহাস ও যুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিবৃতিতে কিশোরগঞ্জের তৎকালীন কোম্পানি কমান্ডার আইয়ুব বিন হায়দারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, "অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ট্রেনিং নিলেও কখনও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি এবং তিনি কোনো কোম্পানি কমান্ডারও ছিলেন না। বরং তিনি নিজেই অতীতে রাজনৈতিক নীতি বিসর্জন দিয়ে বারবার দলবদল করেছেন।"
সংগঠনটির মতে, যারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করে দেশ রক্ষার স্বার্থে সোচ্চার থাকে, তাদের প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন একটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, কিন্তু একে ঢালাওভাবে দেশবিরোধী আখ্যা দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
সংসদকে রক্ষা ও বিভাজন পরিহারের আহ্বান
জাতীয় সংসদকে দেশের আইন প্রণয়ন ও উন্নয়নের সর্বোচ্চ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, এই পবিত্র স্থানটি ব্যক্তিগত কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির চারণভূমি হওয়া উচিত নয়। বিবৃতিতে তারা সতর্ক করে বলেন, বিভাজনের রাজনীতি অব্যাহত থাকলে দেশ পুনরায় ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসনের দিকে ধাবিত হতে পারে।
তারা চব্বিশের জুলাই সনদের নীতির আলোকে সংবিধান সংস্কার এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিবর্গ
বিবৃতিতে সই করা ৭২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে রয়েছেন— ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম উদ্দিন, মো. তাজিরুল ইসলাম, মো. ফজলুল হক, মো. আবদুল ওয়ারেছ, ডা. আলতাফ হোসেন, মো. শাহাবুদ্দিন, মো. মতিউর রহমান, মো. শামসুদ্দিন মিয়া, মো. বোরহান উদ্দিন, আব্দুল করিম, মোকাররম হোসেন এবং কামাল উদ্দিনসহ আরও অনেকে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের এই অবস্থান সংসদীয় বিতর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ করল, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
