বিনোদনবিনোদন

‘চা গরম’: তেতো সত্য আর মমতার যুগলবন্দি

চরকিতে শঙ্খ দাশগুপ্তের নতুন সিনেমা; চা-বাগানের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবন, আশা ও সংগ্রামের এক শৈল্পিক বয়ান।

‘চা গরম’: তেতো সত্য আর মমতার যুগলবন্দি
ছবি -সংগৃহীত

জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে এসেছে নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘চা গরম’ ।  ‘গুটি’ ও ‘প্রিয় মালতী’র মতো প্রশংসিত কাজের পর নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত এবার নিয়ে এসেছেন এই নতুন ওয়েব ফিল্ম । ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই সিনেমাটি ঘিরে দর্শকদের মনে কৌতূহল ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। চা-বাগানের জীবনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমাটি কেবল মানুষের অবিরত সংগ্রামের গল্প নয়, বরং এটি যেন এক কাপ খাঁটি চায়ের মতো—খানিক তেতো সত্যের গুঁড়া আর অনেকখানি মমতা ও আশার দুধ-চিনিতে মেশানো।

রূপালী পর্দায় চা-বাগানের যাপিত জীবন

পৌনে দুই ঘণ্টার এই সিনেমাটির শুরুতেই চা-বাগানের চা প্রক্রিয়াজাতকরণের টুকরো দৃশ্য দেখা যায়। চিত্রগ্রাহক বরকত হোসাইন পুরো সিনেমাতেই চমৎকার ক্যামেরার কাজ দেখিয়েছেন, তবে এই অংশটি বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। মূল গল্পটি ডাক্তার আইরিনের ট্রেনযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয়, যেখানে ডাক্তারদের নিত্যদিনের বিড়ম্বনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাস্তবসম্মত শিল্প নির্দেশনায় নাঈমা জামান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। চা-বাগানের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অনিচ্ছুক এক ডাক্তারের চিকিৎসাসেবা দিতে এসে জড়িয়ে পড়ার কাহিনী সাইফুল্লাহ রিয়াদের আন্তরিক চিত্রনাট্যে সাবলীলভাবে উঠে এসেছে।

মুগ্ধতা ছড়ানো অভিনয়

সহৃদয় ও সম্পন্ন ঘরের ডাক্তার আইরিনের চরিত্রে সাফা কবির দারুণ অভিনয় করেছেন। আদুরে স্বভাব ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি অতিবিগলিত অভিনয় সতর্কভাবে এড়িয়ে গেছেন। মিঠুর চরিত্রে পার্থ শেখের অভিনয়ও প্রশংসনীয়, স্বাভাবিক অভিব্যক্তিতে দর্শককে হাসানোর কঠিন কাজটি তিনি চমৎকারভাবে করেছেন। পুরোনো মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে চা-বাগানের ম্যানেজার চরিত্রে এ কে আজাদ সেতু ছিলেন যথাযথ।

তবে অভিনয়ের দিক থেকে সত্যিকারভাবে মুগ্ধ করেছেন নবাগত সারাহ জেবীন ও রেজওয়ান পারভেজ। সারাহ জেবীন কথার, চোখ আর শরীরের ভাষায় চা-বাগানের মেয়ে নন্দিনীকে জীবন্ত করে তুলেছেন। রবিন চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজও দারুণ সাবলীল, সরলতা ও গভীর দার্শনিক উপলব্ধির প্রকাশ—দুটিই তিনি ভালোভাবে সামলেছেন। এদের সবাইকে কাস্ট করার জন্য কাস্টিং ডিরেক্টর সৌরভ কর্মকার পুরো নম্বর পাবেন।

নেপথ্য কারিগরদের অনবদ্য কাজ

পোশাক পরিকল্পনায় মারিয়া হক সরকার সাফা, সারাহ ও রেজওয়ানকে দারুণ মানিয়ে দিয়েছেন। তবে ‘রিচ-কিড’ হিসেবে পার্থ শেখের পোশাক আরও দামী হতে পারত। রূপসজ্জায় আতিয়া রহমান সফল, প্রতিটি চরিত্রকে পরিবেশ ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী সাজিয়েছেন। रुসলান রেহমানের সংগীত আর শৈব তালুকদারের সাউন্ড মিক্সিং সিনেমাটিকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে গেছে। সালেহ সোবহানের সম্পাদনা ও কালারিস্ট উম্মিদ আশরাফের কাজ চা-বাগানের ঝকঝকে রোদমাখা দিন আর শিয়ালডাকা রাতের অনুভূতিকে জীবন্ত করে তুলেছে।

গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন

ডাক্তার আইরিন যখন জানতে পারেন তিনিই এই চা-বাগানে আসা প্রথম ডাক্তার—সেই দৃশ্যটি বুকের ভেতর খচখচ করে ওঠে। রবিন যখন বলেন, চা-গাছকে কেটে ছোট করে রাখা হয়—সে কথাটিও মনে গেঁথে যায়। শুধু চা-বাগানে নয়, সারা দেশেই বড় সম্ভাবনার ছোট করে রাখার মানসিকতাকে এই সংলাপটি দারুণভাবে প্রতিফলিত করে। এমন মনে ঘা-দেওয়া দৃশ্য ও সংলাপ এই সিনেমায় আরও বেশ কিছু আছে।

চরকি ও অক্সফ্যামের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সাহসী পদক্ষেপের কারণে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা সিনেমায় উঠে এসেছে। বহু ব্যক্তি ও সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগ না থাকলে বাংলাদেশের সিনেমাকেও চা-গাছের মতো ছোট হয়ে থাকতে হবে। তেত্রিশের পয়লা বৈশাখে শঙ্খ দাশগুপ্ত চমৎকার হালখাতা খুললেন, তাঁকে অভিনন্দন। ‘চা গরম’ সিনেমাটি দর্শকদের কেবল বিনোদন নয়, ভাবনার খোরাকও যোগাবে।

বিষয় : ওয়েব ফিল্ম ‘চা গরম’ সাফা কবির পার্থ শেখ সারাহ জেবীন রেজওয়ান পারভেজ শঙ্খ দাশগুপ্ত চরকি

কাল মহাকাল

সোমবার, ০৪ মে ২০২৬


‘চা গরম’: তেতো সত্য আর মমতার যুগলবন্দি

প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬

featured Image

জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে এসেছে নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘চা গরম’ ।  ‘গুটি’ ও ‘প্রিয় মালতী’র মতো প্রশংসিত কাজের পর নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত এবার নিয়ে এসেছেন এই নতুন ওয়েব ফিল্ম । ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই সিনেমাটি ঘিরে দর্শকদের মনে কৌতূহল ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। চা-বাগানের জীবনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমাটি কেবল মানুষের অবিরত সংগ্রামের গল্প নয়, বরং এটি যেন এক কাপ খাঁটি চায়ের মতো—খানিক তেতো সত্যের গুঁড়া আর অনেকখানি মমতা ও আশার দুধ-চিনিতে মেশানো।

রূপালী পর্দায় চা-বাগানের যাপিত জীবন

পৌনে দুই ঘণ্টার এই সিনেমাটির শুরুতেই চা-বাগানের চা প্রক্রিয়াজাতকরণের টুকরো দৃশ্য দেখা যায়। চিত্রগ্রাহক বরকত হোসাইন পুরো সিনেমাতেই চমৎকার ক্যামেরার কাজ দেখিয়েছেন, তবে এই অংশটি বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। মূল গল্পটি ডাক্তার আইরিনের ট্রেনযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয়, যেখানে ডাক্তারদের নিত্যদিনের বিড়ম্বনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাস্তবসম্মত শিল্প নির্দেশনায় নাঈমা জামান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। চা-বাগানের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অনিচ্ছুক এক ডাক্তারের চিকিৎসাসেবা দিতে এসে জড়িয়ে পড়ার কাহিনী সাইফুল্লাহ রিয়াদের আন্তরিক চিত্রনাট্যে সাবলীলভাবে উঠে এসেছে।

মুগ্ধতা ছড়ানো অভিনয়

সহৃদয় ও সম্পন্ন ঘরের ডাক্তার আইরিনের চরিত্রে সাফা কবির দারুণ অভিনয় করেছেন। আদুরে স্বভাব ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি অতিবিগলিত অভিনয় সতর্কভাবে এড়িয়ে গেছেন। মিঠুর চরিত্রে পার্থ শেখের অভিনয়ও প্রশংসনীয়, স্বাভাবিক অভিব্যক্তিতে দর্শককে হাসানোর কঠিন কাজটি তিনি চমৎকারভাবে করেছেন। পুরোনো মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে চা-বাগানের ম্যানেজার চরিত্রে এ কে আজাদ সেতু ছিলেন যথাযথ।

তবে অভিনয়ের দিক থেকে সত্যিকারভাবে মুগ্ধ করেছেন নবাগত সারাহ জেবীন ও রেজওয়ান পারভেজ। সারাহ জেবীন কথার, চোখ আর শরীরের ভাষায় চা-বাগানের মেয়ে নন্দিনীকে জীবন্ত করে তুলেছেন। রবিন চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজও দারুণ সাবলীল, সরলতা ও গভীর দার্শনিক উপলব্ধির প্রকাশ—দুটিই তিনি ভালোভাবে সামলেছেন। এদের সবাইকে কাস্ট করার জন্য কাস্টিং ডিরেক্টর সৌরভ কর্মকার পুরো নম্বর পাবেন।

নেপথ্য কারিগরদের অনবদ্য কাজ

পোশাক পরিকল্পনায় মারিয়া হক সরকার সাফা, সারাহ ও রেজওয়ানকে দারুণ মানিয়ে দিয়েছেন। তবে ‘রিচ-কিড’ হিসেবে পার্থ শেখের পোশাক আরও দামী হতে পারত। রূপসজ্জায় আতিয়া রহমান সফল, প্রতিটি চরিত্রকে পরিবেশ ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী সাজিয়েছেন। रुসলান রেহমানের সংগীত আর শৈব তালুকদারের সাউন্ড মিক্সিং সিনেমাটিকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে গেছে। সালেহ সোবহানের সম্পাদনা ও কালারিস্ট উম্মিদ আশরাফের কাজ চা-বাগানের ঝকঝকে রোদমাখা দিন আর শিয়ালডাকা রাতের অনুভূতিকে জীবন্ত করে তুলেছে।

গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন

ডাক্তার আইরিন যখন জানতে পারেন তিনিই এই চা-বাগানে আসা প্রথম ডাক্তার—সেই দৃশ্যটি বুকের ভেতর খচখচ করে ওঠে। রবিন যখন বলেন, চা-গাছকে কেটে ছোট করে রাখা হয়—সে কথাটিও মনে গেঁথে যায়। শুধু চা-বাগানে নয়, সারা দেশেই বড় সম্ভাবনার ছোট করে রাখার মানসিকতাকে এই সংলাপটি দারুণভাবে প্রতিফলিত করে। এমন মনে ঘা-দেওয়া দৃশ্য ও সংলাপ এই সিনেমায় আরও বেশ কিছু আছে।

চরকি ও অক্সফ্যামের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সাহসী পদক্ষেপের কারণে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা সিনেমায় উঠে এসেছে। বহু ব্যক্তি ও সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগ না থাকলে বাংলাদেশের সিনেমাকেও চা-গাছের মতো ছোট হয়ে থাকতে হবে। তেত্রিশের পয়লা বৈশাখে শঙ্খ দাশগুপ্ত চমৎকার হালখাতা খুললেন, তাঁকে অভিনন্দন। ‘চা গরম’ সিনেমাটি দর্শকদের কেবল বিনোদন নয়, ভাবনার খোরাকও যোগাবে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত