আন্তর্জাতিকআন্তর্জাতিক

পৃথিবীর গতি কমিয়ে দিতে পারে চীনের নতুন মহাপ্রকল্প

থ্রি জর্জেসকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি

পৃথিবীর গতি কমিয়ে দিতে পারে চীনের নতুন মহাপ্রকল্প
ছবি- এ আই

পৃথিবীর আবর্তন এবং সময়ের দৈর্ঘ্যে প্রভাব ফেলতে পারে ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের এক দানবীয় বাঁধ
মানুষের তৈরি স্থাপনা কি আস্ত একটি গ্রহের ঘূর্ণন গতিকে বদলে দিতে পারে? শুনতে কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো মনে হলেও, চীন এবার এমনই এক অবিশ্বাস্য সাহসী এবং বিতর্কিত প্রকল্পের পথে হাঁটছে। দেশটি ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এই বাঁধটি সম্পন্ন হলে তা চীনেরই বর্তমান ‘থ্রি জর্জেস ড্যাম’কে বহুগুণ পেছনে ফেলে দেবে। তবে এই সুবিশাল স্থাপনা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ, কারণ এর ফলে পৃথিবীর আহ্নিক গতি বা নিজের অক্ষে ঘোরার সময় কিছুটা শ্লথ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 থ্রি জর্জেস থেকে শিক্ষা: যখন সময় বেড়ে গিয়েছিল

চীনের বর্তমান থ্রি জর্জেস বাঁধটি এখন পর্যন্ত বিশ্বের বৃহত্তম। কিন্তু এই বাঁধটি চালু হওয়ার পর এক অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। বিশাল এই রিজার্ভারে যখন পানি পূর্ণ করা হয়, তখন পৃথিবীর একদিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ০.০৬ মাইক্রোসেকেন্ড বেড়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, পৃথিবী তার নিজের অক্ষে আগের চেয়ে সামান্য ধীরগতিতে ঘুরতে শুরু করেছিল।

বিষয়টি আরও সহজভাবে বোঝার জন্য পদার্থবিজ্ঞানের একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরুন, একজন ব্যক্তি একটি ঘোরানো চেয়ারে বসে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে ঘুরছেন। তিনি যখন হাত দুটো গুটিয়ে শরীরের কাছে আনেন, তার ঘোরার গতি বেড়ে যায়। আবার হাত ছড়িয়ে দিলে গতি কমে যায়। ঠিক একইভাবে, যখন কোনো বাঁধের রিজার্ভারে বিপুল পরিমাণ পানি কয়েকশ ফুট উঁচুতে ধরে রাখা হয়, তখন পৃথিবীর ভরের বণ্টনে সামান্য পরিবর্তন আসে। এটিই পৃথিবীর ঘূর্ণন গতিকে খানিকটা কমিয়ে দেয়। থ্রি জর্জেস বাঁধটি প্রায় ৪০ ঘন কিলোমিটার পানি উঁচুতে ধরে রাখে, যা এই মহাজাগতিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী ছিল।

নতুন প্রকল্পের বিশালতা ও প্রভাব

চীনের নতুন এই প্রকল্পটি ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ব্যয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে। কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে থ্রি জর্জেস বাঁধের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ইয়ারলুং সাংপো নদীর তীব্র স্রোতকে কাজে লাগিয়ে এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বেইজিং।

তবে প্রকল্পের এই বিশালতাই এখন উদ্বেগের মূল কারণ। এই বাঁধের রিজার্ভারটি থ্রি জর্জেসের চেয়েও অনেক বেশি পানি ধারণ করবে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই সুবিশাল ভরের পানি যখন নির্দিষ্ট উচ্চতায় জমা হবে, তখন পৃথিবীর ভর বণ্টনে থ্রি জর্জেসের চেয়েও বড় প্রভাব পড়বে। এতে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি আরও খানিকটা কমে যেতে পারে, যা দিনের দৈর্ঘ্যকে সূক্ষ্মভাবে হলেও বাড়িয়ে দেবে। যদিও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের এই পরিবর্তন টেরই পাওয়া যাবে না, কিন্তু আধুনিক কৃত্রিম উপগ্রহ বা জিপিএস সিস্টেমের মতো সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার বিষয় হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এই প্রকল্পটিকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। অনেক পরিবেশবিদের মতে, প্রকৃতিকে এভাবে শাসন করার চেষ্টা ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। হিমালয় অঞ্চলের নাজুক বাস্তুসংস্থানের ওপর এই বাঁধের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের ফলে ভাটির দেশগুলোতে পানির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন তার ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটাতে জলবিদ্যুৎকে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিন্তু একটি একক স্থাপনার মাধ্যমে পুরো গ্রহের ঘূর্ণন গতিতে প্রভাব ফেলা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে এটি যেমন প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য বিস্ময় হতে যাচ্ছে, অন্যদিকে এটি মানুষের ‘প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের’ উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক চরম উদাহরণ হয়ে থাকবে।

এখন দেখার বিষয়, বেইজিং শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কীভাবে করে এবং এর ফলে সত্যিই আমাদের চেনা পৃথিবীর গতিতে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে কি না। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর এই বাঁধটি স্রেফ একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, বরং এটি পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় এক পরীক্ষা হতে চলেছে।

কাল মহাকাল

রোববার, ০৩ মে ২০২৬


পৃথিবীর গতি কমিয়ে দিতে পারে চীনের নতুন মহাপ্রকল্প

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image


পৃথিবীর আবর্তন এবং সময়ের দৈর্ঘ্যে প্রভাব ফেলতে পারে ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের এক দানবীয় বাঁধ
মানুষের তৈরি স্থাপনা কি আস্ত একটি গ্রহের ঘূর্ণন গতিকে বদলে দিতে পারে? শুনতে কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো মনে হলেও, চীন এবার এমনই এক অবিশ্বাস্য সাহসী এবং বিতর্কিত প্রকল্পের পথে হাঁটছে। দেশটি ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এই বাঁধটি সম্পন্ন হলে তা চীনেরই বর্তমান ‘থ্রি জর্জেস ড্যাম’কে বহুগুণ পেছনে ফেলে দেবে। তবে এই সুবিশাল স্থাপনা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ, কারণ এর ফলে পৃথিবীর আহ্নিক গতি বা নিজের অক্ষে ঘোরার সময় কিছুটা শ্লথ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 থ্রি জর্জেস থেকে শিক্ষা: যখন সময় বেড়ে গিয়েছিল

চীনের বর্তমান থ্রি জর্জেস বাঁধটি এখন পর্যন্ত বিশ্বের বৃহত্তম। কিন্তু এই বাঁধটি চালু হওয়ার পর এক অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। বিশাল এই রিজার্ভারে যখন পানি পূর্ণ করা হয়, তখন পৃথিবীর একদিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ০.০৬ মাইক্রোসেকেন্ড বেড়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, পৃথিবী তার নিজের অক্ষে আগের চেয়ে সামান্য ধীরগতিতে ঘুরতে শুরু করেছিল।

বিষয়টি আরও সহজভাবে বোঝার জন্য পদার্থবিজ্ঞানের একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরুন, একজন ব্যক্তি একটি ঘোরানো চেয়ারে বসে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে ঘুরছেন। তিনি যখন হাত দুটো গুটিয়ে শরীরের কাছে আনেন, তার ঘোরার গতি বেড়ে যায়। আবার হাত ছড়িয়ে দিলে গতি কমে যায়। ঠিক একইভাবে, যখন কোনো বাঁধের রিজার্ভারে বিপুল পরিমাণ পানি কয়েকশ ফুট উঁচুতে ধরে রাখা হয়, তখন পৃথিবীর ভরের বণ্টনে সামান্য পরিবর্তন আসে। এটিই পৃথিবীর ঘূর্ণন গতিকে খানিকটা কমিয়ে দেয়। থ্রি জর্জেস বাঁধটি প্রায় ৪০ ঘন কিলোমিটার পানি উঁচুতে ধরে রাখে, যা এই মহাজাগতিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী ছিল।

নতুন প্রকল্পের বিশালতা ও প্রভাব

চীনের নতুন এই প্রকল্পটি ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ব্যয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে। কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে থ্রি জর্জেস বাঁধের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ইয়ারলুং সাংপো নদীর তীব্র স্রোতকে কাজে লাগিয়ে এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বেইজিং।

তবে প্রকল্পের এই বিশালতাই এখন উদ্বেগের মূল কারণ। এই বাঁধের রিজার্ভারটি থ্রি জর্জেসের চেয়েও অনেক বেশি পানি ধারণ করবে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই সুবিশাল ভরের পানি যখন নির্দিষ্ট উচ্চতায় জমা হবে, তখন পৃথিবীর ভর বণ্টনে থ্রি জর্জেসের চেয়েও বড় প্রভাব পড়বে। এতে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি আরও খানিকটা কমে যেতে পারে, যা দিনের দৈর্ঘ্যকে সূক্ষ্মভাবে হলেও বাড়িয়ে দেবে। যদিও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের এই পরিবর্তন টেরই পাওয়া যাবে না, কিন্তু আধুনিক কৃত্রিম উপগ্রহ বা জিপিএস সিস্টেমের মতো সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার বিষয় হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এই প্রকল্পটিকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। অনেক পরিবেশবিদের মতে, প্রকৃতিকে এভাবে শাসন করার চেষ্টা ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। হিমালয় অঞ্চলের নাজুক বাস্তুসংস্থানের ওপর এই বাঁধের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের ফলে ভাটির দেশগুলোতে পানির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন তার ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটাতে জলবিদ্যুৎকে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিন্তু একটি একক স্থাপনার মাধ্যমে পুরো গ্রহের ঘূর্ণন গতিতে প্রভাব ফেলা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে এটি যেমন প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য বিস্ময় হতে যাচ্ছে, অন্যদিকে এটি মানুষের ‘প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের’ উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক চরম উদাহরণ হয়ে থাকবে।

এখন দেখার বিষয়, বেইজিং শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কীভাবে করে এবং এর ফলে সত্যিই আমাদের চেনা পৃথিবীর গতিতে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে কি না। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর এই বাঁধটি স্রেফ একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, বরং এটি পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় এক পরীক্ষা হতে চলেছে।



কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ মোঃ ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত