সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 মতামতমতামত

পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া ঝড়, দুই বাংলার কপালে চিন্তার ভাঁজ

১৫ বছরে শূন্য থেকে দেড়শ—পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় শুধু নির্বাচনী ফলাফল নয়, রাজনীতির মানচিত্রই পাল্টে দিল। মমতার হারে সীমান্তের এপার-ওপার, দুই বাংলাতেই নতুন করে ভাবনার খোরাক।

পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া ঝড়, দুই বাংলার কপালে চিন্তার ভাঁজ
ছবি -সংগৃহীত

যুদ্ধ হয়ে গেল যে নির্বাচন

পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোট আর পাঁচটা নির্বাচনের মতো ছিল না। ছিল একেবারে জীবন-মরণ লড়াই। নৌবাহিনী আর বিমানবাহিনী বাদে দিল্লির প্রায় সব সংস্থা যেন একসঙ্গে নেমে পড়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপক্ষে।

একা মমতা, সামনে পুরো যন্ত্র। এই অসম লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হিমশিম খেতে হলো বাংলার 'দিদি'কে। ২৯ এপ্রিল রাত থেকেই এক্সিট পোলের পর এক্সিট পোল বলছিল—গেরুয়া ঝড় আসছে। ৪ মে ভোট গোনা শুরু হতেই বোঝা গেল, আঁচ ভুল ছিল না।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি একটা আসনও পায়নি। আর এবার? দেড়শ ছাড়িয়ে গেল! স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির দল পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়তে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ইতিহাসে ৪ মে একটা লাল দাগ কেটে রইল।

বাঙালিত্ব কি হেরে গেল হিন্দুত্বের কাছে?

অনেকেই বলছেন, উত্তর ভারতের সামনে এবার বাঙালিত্ব মাথা নিচু করল। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে—'মেয়ে'র পাশে কেন দাঁড়াল না 'বাংলা'?

দোষ কি মমতার? নাকি বিজেপির ভোট ম্যাজিকের? এই নিয়ে তর্ক শুরু হয়ে গেছে। তবে একটা কথা পরিষ্কার—বিজেপি বাংলাভাষীদের মন জিততে কোনো পথ বাকি রাখেনি। টাকার খেলা, সোশ্যাল মিডিয়ার জাদু, মাটি-ঘেঁষা প্রচার—সব মিলিয়ে এক ঝড় তুলে দিয়েছিল তারা।

আর অমিত শাহের কথাবার্তা? সেগুলো শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশেও উদ্বেগ ছড়িয়েছে।

সীমান্তের দুই পাশে একই উৎকণ্ঠা

কাঁটাতার থাকলেও দুই বাংলার মনের টান কাটেনি। তিস্তা চুক্তিতে বাধা দিয়েও মমতার জন্য বাংলাদেশে সহানুভূতি কেন? হয়তো সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য। হয়তো এসআইআর-এর নামে লাখো মানুষের ভোট কেড়ে নেওয়ার যন্ত্রণায় সমব্যথী হয়ে।

আঞ্চলিক নেতাদের জন্য লাল সতর্কতা

ভারতে এখন ৩১টা রাজ্য আর কেন্দ্রশাসিত এলাকার ২১টাতেই বিজেপি ক্ষমতায়। লোকসভায় তাদের ২৪৫ আসন। পশ্চিমবঙ্গে হারলেও দিল্লিতে বিজেপির কিছু যেত-আসত না। কিন্তু আরএসএস পরিবার তাদের ১০০ বছর পূর্তির উৎসবটা পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে পূর্ণতা দিতে চেয়েছিল।

আর সেই স্বপ্ন পূরণও হয়ে গেল জমিয়ে!

এই জয় আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য বড় ধাক্কা। দিল্লির কেজরিওয়াল, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী, অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু—সবাই এখন নিজের পিঠ বাঁচাবে কীভাবে, সেই চিন্তায় মগ্ন।

বামেরা কি ফিরছে?

একটা সুখবর বামপন্থীদের জন্য। আসনে না হলেও ভোটের হিসাবে তারা পুরোনো জায়গায় কিছুটা ফিরে আসার লক্ষণ দেখাচ্ছে। তৃণমূলের ধ্বস আর বামদের ভোট বাড়া—দুটো মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয় শক্তি হয়তো মাথা তুলতে পারে।

তবে এখন আসল ভয় হচ্ছে, তৃণমূলের ওপর হামলার। রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ শঙ্কিত।

এসআইআর: ভোটের আগেই ফল বদলানোর ফর্মুলা?

তৃণমূল বারবার বলেছে—বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এসআইআর-এর নামে বাংলাভাষীদের ওপর খড়্গ নামিয়েছে। আর ফলাফল দেখে মনে হচ্ছে, তাদের কথায় সত্যি ছিল।

ছোটখাটো কাগজপত্রের গরমিল দেখিয়ে লাখ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে। যেসব জেলায় তৃণমূল শক্তিশালী, সেখানেই বেশি কাটছাঁট। আর বিজেপি? তারা এতে লাভবান।

ভোট পড়ার আগেই ভোটের ফল ঠিক করে ফেলা যায়—এসআইআর সেটাই প্রমাণ করল। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যপন্থী ভোটাররা কি এর প্রতিবাদ করেছেন? ব্যালট বাক্স বলছে—না। সংখ্যালঘু-বিদ্বেষের ঢেউয়ে তারাও গা ভাসিয়েছেন।

কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬


পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া ঝড়, দুই বাংলার কপালে চিন্তার ভাঁজ

প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬

featured Image

যুদ্ধ হয়ে গেল যে নির্বাচন

পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোট আর পাঁচটা নির্বাচনের মতো ছিল না। ছিল একেবারে জীবন-মরণ লড়াই। নৌবাহিনী আর বিমানবাহিনী বাদে দিল্লির প্রায় সব সংস্থা যেন একসঙ্গে নেমে পড়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপক্ষে।

একা মমতা, সামনে পুরো যন্ত্র। এই অসম লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হিমশিম খেতে হলো বাংলার 'দিদি'কে। ২৯ এপ্রিল রাত থেকেই এক্সিট পোলের পর এক্সিট পোল বলছিল—গেরুয়া ঝড় আসছে। ৪ মে ভোট গোনা শুরু হতেই বোঝা গেল, আঁচ ভুল ছিল না।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি একটা আসনও পায়নি। আর এবার? দেড়শ ছাড়িয়ে গেল! স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির দল পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়তে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ইতিহাসে ৪ মে একটা লাল দাগ কেটে রইল।

বাঙালিত্ব কি হেরে গেল হিন্দুত্বের কাছে?

অনেকেই বলছেন, উত্তর ভারতের সামনে এবার বাঙালিত্ব মাথা নিচু করল। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে—'মেয়ে'র পাশে কেন দাঁড়াল না 'বাংলা'?

দোষ কি মমতার? নাকি বিজেপির ভোট ম্যাজিকের? এই নিয়ে তর্ক শুরু হয়ে গেছে। তবে একটা কথা পরিষ্কার—বিজেপি বাংলাভাষীদের মন জিততে কোনো পথ বাকি রাখেনি। টাকার খেলা, সোশ্যাল মিডিয়ার জাদু, মাটি-ঘেঁষা প্রচার—সব মিলিয়ে এক ঝড় তুলে দিয়েছিল তারা।

আর অমিত শাহের কথাবার্তা? সেগুলো শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশেও উদ্বেগ ছড়িয়েছে।

সীমান্তের দুই পাশে একই উৎকণ্ঠা

কাঁটাতার থাকলেও দুই বাংলার মনের টান কাটেনি। তিস্তা চুক্তিতে বাধা দিয়েও মমতার জন্য বাংলাদেশে সহানুভূতি কেন? হয়তো সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য। হয়তো এসআইআর-এর নামে লাখো মানুষের ভোট কেড়ে নেওয়ার যন্ত্রণায় সমব্যথী হয়ে।

আঞ্চলিক নেতাদের জন্য লাল সতর্কতা

ভারতে এখন ৩১টা রাজ্য আর কেন্দ্রশাসিত এলাকার ২১টাতেই বিজেপি ক্ষমতায়। লোকসভায় তাদের ২৪৫ আসন। পশ্চিমবঙ্গে হারলেও দিল্লিতে বিজেপির কিছু যেত-আসত না। কিন্তু আরএসএস পরিবার তাদের ১০০ বছর পূর্তির উৎসবটা পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে পূর্ণতা দিতে চেয়েছিল।

আর সেই স্বপ্ন পূরণও হয়ে গেল জমিয়ে!

এই জয় আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য বড় ধাক্কা। দিল্লির কেজরিওয়াল, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী, অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু—সবাই এখন নিজের পিঠ বাঁচাবে কীভাবে, সেই চিন্তায় মগ্ন।

বামেরা কি ফিরছে?

একটা সুখবর বামপন্থীদের জন্য। আসনে না হলেও ভোটের হিসাবে তারা পুরোনো জায়গায় কিছুটা ফিরে আসার লক্ষণ দেখাচ্ছে। তৃণমূলের ধ্বস আর বামদের ভোট বাড়া—দুটো মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয় শক্তি হয়তো মাথা তুলতে পারে।

তবে এখন আসল ভয় হচ্ছে, তৃণমূলের ওপর হামলার। রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ শঙ্কিত।

এসআইআর: ভোটের আগেই ফল বদলানোর ফর্মুলা?

তৃণমূল বারবার বলেছে—বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এসআইআর-এর নামে বাংলাভাষীদের ওপর খড়্গ নামিয়েছে। আর ফলাফল দেখে মনে হচ্ছে, তাদের কথায় সত্যি ছিল।

ছোটখাটো কাগজপত্রের গরমিল দেখিয়ে লাখ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে। যেসব জেলায় তৃণমূল শক্তিশালী, সেখানেই বেশি কাটছাঁট। আর বিজেপি? তারা এতে লাভবান।

ভোট পড়ার আগেই ভোটের ফল ঠিক করে ফেলা যায়—এসআইআর সেটাই প্রমাণ করল। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যপন্থী ভোটাররা কি এর প্রতিবাদ করেছেন? ব্যালট বাক্স বলছে—না। সংখ্যালঘু-বিদ্বেষের ঢেউয়ে তারাও গা ভাসিয়েছেন।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত