সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি

ত্রিমাত্রিক খাঁচায় বন্দী মস্তিষ্ক ও গণিতের স্বাধীনতা

আমাদের জৈবিক সীমাবদ্ধতা যেখানে অজানার দেওয়ালে থমকে দাঁড়ায়, গণিত ঠিক সেখান থেকেই খুলে দেয় উচ্চতর মহাবিশ্বের রহস্যময় জানালা।

ত্রিমাত্রিক খাঁচায় বন্দী মস্তিষ্ক ও গণিতের স্বাধীনতা
ছবি-এ আই জেনারেটেড

দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা—এই তিন স্থানাঙ্কের চেনা গণ্ডিতেই আমাদের প্রতিদিনের কারবার। একেই আমরা ত্রিমাত্রিক জগত বলি। তবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের আঙিনায় পা রাখলে বোঝা যায়, বাস্তবতা কেবল এই তিন মাত্রার সীমাবদ্ধ ছকে আটকা পড়ে নেই। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের মস্তিষ্ক কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফলে কেবল ত্রিমাত্রিক সংকেত বিশ্লেষণেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফলে চাইলেও আমরা চতুর্থ কোনো স্বতন্ত্র দিকের কথা কল্পনা করতে পারি না; আমাদের স্নায়বিক গঠন সেখানে গিয়ে এক অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খায়।

​চতুর্থ মাত্রার এই জটিল ধাঁধা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। উনবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে জার্মান গণিতবিদ বের্নহার্ড রিমান প্রথম উচ্চতর মাত্রার জ্যামিতিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তিনি গাণিতিক যুক্তিতে তুলে ধরেন যে, মহাবিশ্ব আমাদের চোখের দেখা এই তিন মাত্রার বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে। রিমানের এই দূরদর্শী চিন্তাই পরবর্তীতে আলবার্ট আইনস্টাইনকে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ভিত গড়তে সাহায্য করেছিল। তবে একটি সূক্ষ্ম বিষয় মাথায় রাখা জরুরি—আইনস্টাইন সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে দেখলেও জ্যামিতিক আলোচনায় আমরা কিন্তু দৈর্ঘ্যের মতোই একটি বাড়তি স্বতন্ত্র দিকের কথা বলি।

​আসলে আমরা কেন এই বাড়তি মাত্রাটি দেখতে পাই না, তা বোঝার জন্য এডউইন অ্যাবটের 'ফ্ল্যাটল্যান্ড' গল্পের চেয়ে ভালো উদাহরণ আর হয় না। একটু ভাবুন তো, একটি দ্বিমাত্রিক সমতলে থাকা প্রাণী যে কেবল ডানে-বামে বা সামনে-পিছে চলতে পারে, তার কাছে 'ওপর' বা 'নিচ' বলে কোনো অস্তিত্বই নেই। সেই দ্বিমাত্রিক জগতে যদি কোনো ত্রিমাত্রিক গোলক প্রবেশ করে, তবে সে বেচারা কেবল একটি ক্রমবর্ধমান বৃত্তই দেখতে পাবে, আস্ত গোলকটি নয়। আমাদের দশাও ঠিক তাই। আমরা ত্রিমাত্রিক জগতের বাসিন্দা হওয়ার কারণে চতুর্থ কোনো ডাইমেনশনের বস্তুকে সরাসরি দেখতে পাই না; আমাদের চোখে বড়জোর সেই চতুর্মাত্রিক কাঠামোর একটি ছায়া বা প্রক্ষেপণ ধরা পড়ে।

​ঠিক এখানেই গণিতের জাদুকরী শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে ওঠে। আমাদের চোখ যা দেখতে পায় না বা মস্তিষ্ক যা ভাবতে ভয় পায়, গণিত তা অনায়াসেই হিসেব করে বুঝিয়ে দেয়। গাণিতিক সমীকরণে x, y, z অক্ষের সাথে খুব সহজেই চতুর্থ একটি চলক যোগ করে দেওয়া যায়। এই স্বাধীনতার হাত ধরেই বিজ্ঞানীরা আমাদের 'টেসারেক্ট' বা হাইপারকিউবের মতো জটিল কাঠামোর হদিস দিয়েছেন। সহজ কথায়, একটি হাইপারকিউব হলো এমন এক চতুর্মাত্রিক ঘনক, যার একেকটি পাশ আসলে আমাদের চেনা একেকটি ত্রিমাত্রিক ঘনক। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চার্লস হাওয়ার্ড হিন্টনের মতো গবেষকরা আমাদের এই অসাধ্য সাধনের পথ দেখিয়েছিলেন।

​বর্তমানে স্ট্রিং থিওরির মতো আধুনিক তত্ত্বগুলো দাবি করছে, মহাবিশ্বের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যার জন্য দশ বা এগারোটি মাত্রার প্রয়োজন হতে পারে। এই বাড়তি মাত্রাগুলো হয়তো অতি-পারমাণবিক স্তরে এত ক্ষুদ্রভাবে গোটানো অবস্থায় আছে যে, আমাদের স্থূল ইন্দ্রিয় সেখানে পৌঁছাতে পারে না। সত্যি বলতে, আমরা আমাদের জৈবিক খাঁচায় বন্দী থাকতে পারি, কিন্তু মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি সেই দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। গণিত হলো সেই স্বচ্ছ লেন্স, যা দিয়ে আমরা অস্তিত্বের সেই গূঢ় সত্যগুলোকে ছুঁতে পারি, যা আমাদের চর্মচক্ষুর নাগালের বাইরেই রয়ে যাবে চিরকাল।

কাল মহাকাল

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬


ত্রিমাত্রিক খাঁচায় বন্দী মস্তিষ্ক ও গণিতের স্বাধীনতা

প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬

featured Image

দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা—এই তিন স্থানাঙ্কের চেনা গণ্ডিতেই আমাদের প্রতিদিনের কারবার। একেই আমরা ত্রিমাত্রিক জগত বলি। তবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের আঙিনায় পা রাখলে বোঝা যায়, বাস্তবতা কেবল এই তিন মাত্রার সীমাবদ্ধ ছকে আটকা পড়ে নেই। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের মস্তিষ্ক কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফলে কেবল ত্রিমাত্রিক সংকেত বিশ্লেষণেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফলে চাইলেও আমরা চতুর্থ কোনো স্বতন্ত্র দিকের কথা কল্পনা করতে পারি না; আমাদের স্নায়বিক গঠন সেখানে গিয়ে এক অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খায়।

​চতুর্থ মাত্রার এই জটিল ধাঁধা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। উনবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে জার্মান গণিতবিদ বের্নহার্ড রিমান প্রথম উচ্চতর মাত্রার জ্যামিতিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তিনি গাণিতিক যুক্তিতে তুলে ধরেন যে, মহাবিশ্ব আমাদের চোখের দেখা এই তিন মাত্রার বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে। রিমানের এই দূরদর্শী চিন্তাই পরবর্তীতে আলবার্ট আইনস্টাইনকে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ভিত গড়তে সাহায্য করেছিল। তবে একটি সূক্ষ্ম বিষয় মাথায় রাখা জরুরি—আইনস্টাইন সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে দেখলেও জ্যামিতিক আলোচনায় আমরা কিন্তু দৈর্ঘ্যের মতোই একটি বাড়তি স্বতন্ত্র দিকের কথা বলি।

​আসলে আমরা কেন এই বাড়তি মাত্রাটি দেখতে পাই না, তা বোঝার জন্য এডউইন অ্যাবটের 'ফ্ল্যাটল্যান্ড' গল্পের চেয়ে ভালো উদাহরণ আর হয় না। একটু ভাবুন তো, একটি দ্বিমাত্রিক সমতলে থাকা প্রাণী যে কেবল ডানে-বামে বা সামনে-পিছে চলতে পারে, তার কাছে 'ওপর' বা 'নিচ' বলে কোনো অস্তিত্বই নেই। সেই দ্বিমাত্রিক জগতে যদি কোনো ত্রিমাত্রিক গোলক প্রবেশ করে, তবে সে বেচারা কেবল একটি ক্রমবর্ধমান বৃত্তই দেখতে পাবে, আস্ত গোলকটি নয়। আমাদের দশাও ঠিক তাই। আমরা ত্রিমাত্রিক জগতের বাসিন্দা হওয়ার কারণে চতুর্থ কোনো ডাইমেনশনের বস্তুকে সরাসরি দেখতে পাই না; আমাদের চোখে বড়জোর সেই চতুর্মাত্রিক কাঠামোর একটি ছায়া বা প্রক্ষেপণ ধরা পড়ে।

​ঠিক এখানেই গণিতের জাদুকরী শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে ওঠে। আমাদের চোখ যা দেখতে পায় না বা মস্তিষ্ক যা ভাবতে ভয় পায়, গণিত তা অনায়াসেই হিসেব করে বুঝিয়ে দেয়। গাণিতিক সমীকরণে x, y, z অক্ষের সাথে খুব সহজেই চতুর্থ একটি চলক যোগ করে দেওয়া যায়। এই স্বাধীনতার হাত ধরেই বিজ্ঞানীরা আমাদের 'টেসারেক্ট' বা হাইপারকিউবের মতো জটিল কাঠামোর হদিস দিয়েছেন। সহজ কথায়, একটি হাইপারকিউব হলো এমন এক চতুর্মাত্রিক ঘনক, যার একেকটি পাশ আসলে আমাদের চেনা একেকটি ত্রিমাত্রিক ঘনক। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চার্লস হাওয়ার্ড হিন্টনের মতো গবেষকরা আমাদের এই অসাধ্য সাধনের পথ দেখিয়েছিলেন।

​বর্তমানে স্ট্রিং থিওরির মতো আধুনিক তত্ত্বগুলো দাবি করছে, মহাবিশ্বের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যার জন্য দশ বা এগারোটি মাত্রার প্রয়োজন হতে পারে। এই বাড়তি মাত্রাগুলো হয়তো অতি-পারমাণবিক স্তরে এত ক্ষুদ্রভাবে গোটানো অবস্থায় আছে যে, আমাদের স্থূল ইন্দ্রিয় সেখানে পৌঁছাতে পারে না। সত্যি বলতে, আমরা আমাদের জৈবিক খাঁচায় বন্দী থাকতে পারি, কিন্তু মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি সেই দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। গণিত হলো সেই স্বচ্ছ লেন্স, যা দিয়ে আমরা অস্তিত্বের সেই গূঢ় সত্যগুলোকে ছুঁতে পারি, যা আমাদের চর্মচক্ষুর নাগালের বাইরেই রয়ে যাবে চিরকাল।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত