জাতীয়
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যাগ গ্রহণ করেছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত অনুমোদনের প্রেক্ষিতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দাখিল করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এই প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ইতিমধ্যে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে।
বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার কমিশনের এক সভায় পিডিবির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবটি আমলযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পাইকারি দামের সঙ্গে সমন্বয় করে আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব রেখেছে পিডিবি।
কমিশনের প্রক্রিয়া ও শুনানির প্রস্তুতি
এ বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, পাইকারি দামের প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী পাইকারি দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়েও আনুপাতিক হারে সমন্বয় করা হয়। ইতিমধ্যে পাঁচটি বিতরণ সংস্থার মধ্যে নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দিয়েছে। বাকি বিতরণ সংস্থাগুলোর প্রস্তাবও দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমা হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কারিগরি কমিটি সব প্রস্তাব মূল্যায়ন করার পর অংশীজনদের অংশগ্রহণে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। শুনানিতে যৌক্তিকতা প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে কমিশন। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খাতের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি এবং সরকারের প্রতিশ্রুত ভর্তুকির পরিমাণ সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করা হবে।
ব্যয় ও ঘাটতির চিত্র
সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে পিডিবি তা কিছুটা কমে বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে পাইকারি মূল্যে বিক্রি করে, যার ফলে তৈরি হওয়া ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি গ্রহণ করে। সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল, যেখানে পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে ৮ শতাংশ দাম বাড়ে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের গড় দাম ৮ টাকা ৯৫ পয়সা এবং পাইকারি দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা।
পিডিবি সূত্রে উঠে এসেছে যে, তারা পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। যদি দেড় টাকা বাড়ে, তবে বছরে তাদের বাড়তি আয় হবে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, পাইকারি দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দাখিল করেছে।
ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ও বিশ্লেষকদের মত
পিডিবি অবশ্য জানিয়েছে, দেশের মোট গ্রাহকের ৬৩ শতাংশই স্বল্প ব্যবহারকারী (৭৫ ইউনিটের কম)। তাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বেশি ব্যবহারকারীদের ওপর বাড়তি দাম আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে, যার ফলে ৩৭ শতাংশ গ্রাহকের বিল বাড়বে। বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার দাম সমন্বয়ের পথ বেছে নিয়েছে।
গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার পাইকারিতে ১২ বার ও গ্রাহক পর্যায়ে ১৪ বার দাম বৃদ্ধি করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেও ভর্তুকির চাপ (গত অর্থবছরে ৫৮ হাজার কোটি টাকা) কমাতে না পেরে দাম বাড়ানোর দিকেই ঝুঁকছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে ব্যক্ত করেছেন, “ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়ানোর অজুহাত পুরোনো; মূল্যবৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০ শতাংশ বাড়তি খরচ কমানো সম্ভব হলে ভর্তুকিও কমানো যেত। না হলে আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো পার্থক্য থাকে না।”
বিষয় : বিদ্যুৎ মূল্য বৃদ্ধি

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যাগ গ্রহণ করেছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত অনুমোদনের প্রেক্ষিতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দাখিল করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এই প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ইতিমধ্যে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে।
বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার কমিশনের এক সভায় পিডিবির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবটি আমলযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পাইকারি দামের সঙ্গে সমন্বয় করে আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব রেখেছে পিডিবি।
কমিশনের প্রক্রিয়া ও শুনানির প্রস্তুতি
এ বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, পাইকারি দামের প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী পাইকারি দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়েও আনুপাতিক হারে সমন্বয় করা হয়। ইতিমধ্যে পাঁচটি বিতরণ সংস্থার মধ্যে নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দিয়েছে। বাকি বিতরণ সংস্থাগুলোর প্রস্তাবও দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমা হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কারিগরি কমিটি সব প্রস্তাব মূল্যায়ন করার পর অংশীজনদের অংশগ্রহণে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। শুনানিতে যৌক্তিকতা প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে কমিশন। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খাতের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি এবং সরকারের প্রতিশ্রুত ভর্তুকির পরিমাণ সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করা হবে।
ব্যয় ও ঘাটতির চিত্র
সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে পিডিবি তা কিছুটা কমে বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে পাইকারি মূল্যে বিক্রি করে, যার ফলে তৈরি হওয়া ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি গ্রহণ করে। সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল, যেখানে পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে ৮ শতাংশ দাম বাড়ে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের গড় দাম ৮ টাকা ৯৫ পয়সা এবং পাইকারি দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা।
পিডিবি সূত্রে উঠে এসেছে যে, তারা পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। যদি দেড় টাকা বাড়ে, তবে বছরে তাদের বাড়তি আয় হবে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, পাইকারি দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দাখিল করেছে।
ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ও বিশ্লেষকদের মত
পিডিবি অবশ্য জানিয়েছে, দেশের মোট গ্রাহকের ৬৩ শতাংশই স্বল্প ব্যবহারকারী (৭৫ ইউনিটের কম)। তাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বেশি ব্যবহারকারীদের ওপর বাড়তি দাম আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে, যার ফলে ৩৭ শতাংশ গ্রাহকের বিল বাড়বে। বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার দাম সমন্বয়ের পথ বেছে নিয়েছে।
গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার পাইকারিতে ১২ বার ও গ্রাহক পর্যায়ে ১৪ বার দাম বৃদ্ধি করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেও ভর্তুকির চাপ (গত অর্থবছরে ৫৮ হাজার কোটি টাকা) কমাতে না পেরে দাম বাড়ানোর দিকেই ঝুঁকছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে ব্যক্ত করেছেন, “ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়ানোর অজুহাত পুরোনো; মূল্যবৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪০ শতাংশ বাড়তি খরচ কমানো সম্ভব হলে ভর্তুকিও কমানো যেত। না হলে আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো পার্থক্য থাকে না।”
