সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান

 জাতীয়জাতীয়

হামের মরণছোবল: টিকা সংকটে বিপন্ন শৈশব, কাঠগড়ায় নীতি ও রাজনীতি

টিকা সংগ্রহে নজিরবিহীন বিপর্যয় ও অব্যবস্থাপনায় ৪৫ হাজার শিশু আক্রান্ত; ৩১৭ প্রাণহানির পরও নির্বিকার রাজনৈতিক মহল।

হামের মরণছোবল: টিকা সংকটে বিপন্ন শৈশব, কাঠগড়ায় নীতি ও রাজনীতি
ছবি -সংগৃহীত

'হাম'মহামারি যেন অবহেলার ফসল

​বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের এক সময়ের গর্বিত অর্জন ‘হাম নির্মূল কার্যক্রম’ এখন ধ্বংসের কিনারে। এক সময়ের অত্যন্ত সফল টিকাদান কর্মসূচি (EPI) বর্তমানে মুখ থুবড়ে পড়েছে, যার করুণ পরিণতি হিসেবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে ৩১৭টি নিষ্পাপ শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপর্যয় প্রাকৃতিক নয়, বরং নীতি-নির্ধারণী ভুল এবং প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার এক নির্মম দলিল।

​সংকটের মূলে ভুল সিদ্ধান্ত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

​অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে আনা আকস্মিক পরিবর্তনই এই মহামারির অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। দীর্ঘকাল ধরে ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্যাভি’র সহায়তায় নিশ্চিত হওয়া টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্থবির হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা কেনা বন্ধ করে দিয়ে 'উন্মুক্ত দরপত্র' পদ্ধতি চালু করে।

​তৎকালীন ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এই সিদ্ধান্তের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, "খোদার দোহাই লাগে, এমনটা করবেন না।" কিন্তু সেই আর্তি আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে হারিয়ে যায়। ফলে দেশজুড়ে টিকার মজুদ ফুরিয়ে আসে এবং ২০২৫ সালে টিকাদানের হার নাটকীয়ভাবে মাত্র ৫৯ শতাংশে নেমে আসে।

​ইতিহাস ও বিবর্তনের পথ ধরে হাম

​হাম মূলত একটি উচ্চ সংক্রামক ভাইরাসঘটিত রোগ, যা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গবাদি পশুর রোগ থেকে বিবর্তিত হয়ে মানবদেহে সংক্রমিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। পারস্যের প্রথিতযশা চিকিৎসক আল-রাজি দশম শতাব্দীতে প্রথম এই রোগটিকে চিহ্নিত করেন। ১৯৬৩ সালে এর টিকা আবিষ্কৃত হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহার কমলেও, টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এখনও ৯০ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে এই টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়ে কয়েক দশক ধরে উচ্চ সাফল্য বজায় রাখলেও সাম্প্রতিক ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পুরো অর্জনকে নসাৎ করে দিয়েছে।

​রাজনীতির মহোৎসবে উপেক্ষিত লাশের মিছিল

​২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন সরকার গঠনের পর জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার ও রাজনৈতিক বাকযুদ্ধে যখন রাজপথ এবং সংসদ উত্তাল, তখন ৩১৭ শিশুর মৃত্যু নিয়ে নেই কোনো কার্যকর প্রতিবাদ। বিরোধী দল ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নারী অধিকার, ধর্ষণ কিংবা নিজেদের দলীয় কর্মসূচি নিয়ে সরব থাকলেও, এই বিশাল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেঙে পড়া নিয়ে সংসদ কিংবা রাজপথে কোনো জোরালো জবাবদিহিতা দেখা যায়নি।

​নীরব অশ্রু ও আগামীর শঙ্কা

​বর্তমানে সরকার নতুন করে টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আশা করা হচ্ছে। তবে যে কয়েকশ মা-বাবার বুক খালি হয়েছে, সেই দায়ভার নেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অপুষ্টি এবং দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে মৃত্যুর এই মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদ আর নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতার বলি হওয়া এই শিশুদের রক্তের দায় শেষ পর্যন্ত কার? এই প্রশ্নই এখন সচেতন মহলে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিষয় : হাম মহামারি টিকা

কাল মহাকাল

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬


হামের মরণছোবল: টিকা সংকটে বিপন্ন শৈশব, কাঠগড়ায় নীতি ও রাজনীতি

প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬

featured Image

'হাম'মহামারি যেন অবহেলার ফসল

​বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের এক সময়ের গর্বিত অর্জন ‘হাম নির্মূল কার্যক্রম’ এখন ধ্বংসের কিনারে। এক সময়ের অত্যন্ত সফল টিকাদান কর্মসূচি (EPI) বর্তমানে মুখ থুবড়ে পড়েছে, যার করুণ পরিণতি হিসেবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে ৩১৭টি নিষ্পাপ শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপর্যয় প্রাকৃতিক নয়, বরং নীতি-নির্ধারণী ভুল এবং প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার এক নির্মম দলিল।

​সংকটের মূলে ভুল সিদ্ধান্ত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

​অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে আনা আকস্মিক পরিবর্তনই এই মহামারির অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। দীর্ঘকাল ধরে ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্যাভি’র সহায়তায় নিশ্চিত হওয়া টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্থবির হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা কেনা বন্ধ করে দিয়ে 'উন্মুক্ত দরপত্র' পদ্ধতি চালু করে।

​তৎকালীন ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এই সিদ্ধান্তের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, "খোদার দোহাই লাগে, এমনটা করবেন না।" কিন্তু সেই আর্তি আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে হারিয়ে যায়। ফলে দেশজুড়ে টিকার মজুদ ফুরিয়ে আসে এবং ২০২৫ সালে টিকাদানের হার নাটকীয়ভাবে মাত্র ৫৯ শতাংশে নেমে আসে।

​ইতিহাস ও বিবর্তনের পথ ধরে হাম

​হাম মূলত একটি উচ্চ সংক্রামক ভাইরাসঘটিত রোগ, যা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গবাদি পশুর রোগ থেকে বিবর্তিত হয়ে মানবদেহে সংক্রমিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। পারস্যের প্রথিতযশা চিকিৎসক আল-রাজি দশম শতাব্দীতে প্রথম এই রোগটিকে চিহ্নিত করেন। ১৯৬৩ সালে এর টিকা আবিষ্কৃত হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহার কমলেও, টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এখনও ৯০ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে এই টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়ে কয়েক দশক ধরে উচ্চ সাফল্য বজায় রাখলেও সাম্প্রতিক ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পুরো অর্জনকে নসাৎ করে দিয়েছে।

​রাজনীতির মহোৎসবে উপেক্ষিত লাশের মিছিল

​২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন সরকার গঠনের পর জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার ও রাজনৈতিক বাকযুদ্ধে যখন রাজপথ এবং সংসদ উত্তাল, তখন ৩১৭ শিশুর মৃত্যু নিয়ে নেই কোনো কার্যকর প্রতিবাদ। বিরোধী দল ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নারী অধিকার, ধর্ষণ কিংবা নিজেদের দলীয় কর্মসূচি নিয়ে সরব থাকলেও, এই বিশাল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেঙে পড়া নিয়ে সংসদ কিংবা রাজপথে কোনো জোরালো জবাবদিহিতা দেখা যায়নি।

​নীরব অশ্রু ও আগামীর শঙ্কা

​বর্তমানে সরকার নতুন করে টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আশা করা হচ্ছে। তবে যে কয়েকশ মা-বাবার বুক খালি হয়েছে, সেই দায়ভার নেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অপুষ্টি এবং দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে মৃত্যুর এই মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদ আর নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতার বলি হওয়া এই শিশুদের রক্তের দায় শেষ পর্যন্ত কার? এই প্রশ্নই এখন সচেতন মহলে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।


কাল মহাকাল

সম্পাদকঃ  ফখরুল ইসলাম রাজীব 
প্রকাশকঃ এম কে আই কানন খান


কপিরাইট © ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত