জাতীয়
সারা দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই রোগটি শনাক্তকরণের পরীক্ষা চরম অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। সরকারের একমাত্র নির্দিষ্ট পরীক্ষাগার, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে (IPH) প্রয়োজনীয় কিটের তীব্র স্বল্পতার কারণে নমুনা পরীক্ষা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে সারা দেশ থেকে আসা সন্দেহভাজন হাম রোগীদের কয়েক হাজার নমুনা ল্যাবরেটরিতে স্তূপীকৃত হয়ে আছে, যা জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, কিট সংকটের কারণে তারা চাইলেও পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষা করতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান উদ্ভূত পরিস্থিতি স্বীকার করে জানিয়েছেন, ‘আমরা বর্তমানে দৈনিক মাত্র এক শর মতো নমুনা পরীক্ষা করতে পারছি।’ এর বেশি মন্তব্য করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
ল্যাবরেটরি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত প্রায় পাঁচ হাজার রোগীর নমুনা বর্তমানে পরীক্ষার অপেক্ষায় জমা হয়ে আছে। কিটের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই জট কমার কোনো সম্ভাবনা নেই, উল্টো প্রতিদিন নতুন নতুন নমুনা যুক্ত হয়ে এই পাহাড় আরও বড় হচ্ছে।
দেশজুড়ে হাম ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে রোগটি শনাক্তের পরীক্ষার চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিলেই অভিভাবকরা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরীক্ষার দ্বারস্থ হচ্ছেন। চিকিৎসকরাও নিশ্চিত হতে চান যে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বা মৃত শিশুটি হামে আক্রান্ত ছিল কি না। পরীক্ষার ফলাফল পেতে বিলম্ব হওয়ায় অনেক হাসপাতালে রোগীদের অকারণে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হচ্ছে, যা হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা তুলে ধরেছেন যে, হাম শনাক্তের কিট একচেটিয়াভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সরবরাহ করে থাকে। এই ল্যাবরেটরিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত কিট ছাড়া অন্য কোনো উৎসের কিট ব্যবহার করা হয় না। একটি কিট দিয়ে ৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব এবং জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের দৈনিক ৩০০ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে।
গত মাসেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কর্মকর্তারা জানান, ১৯ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৬০টি কিট সরবরাহ করেছিল এবং ৩০ এপ্রিল বা ১ মে আরও ১০০ কিট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা তারা রক্ষা করতে পারেনি। গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই ১০০ কিট পেতে আরও দেড় থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে জরুরি ভিত্তিতে দিল্লি থেকে ৩০টি কিট এক সপ্তাহের মধ্যে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কিট সংকটের এই চরম মুহূর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং খুদে বার্তারও কোনো উত্তর দেননি।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল এই পরিস্থিতিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন,
হামের এই প্রাদুর্ভাবের সময় রোগ শনাক্তের কিট না থাকা কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা। স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা অফিস ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে এমন পরিস্থিতি হতো না। তারা এই দায় এড়াতে পারে না।
এমন পরিস্থিতি এড়াতে কিটের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করার ওপরও তিনি জোর দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ২৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪ জন হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানের মধ্যেও কিট সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকার বা উন্নয়ন সহযোগীদের আন্তরিকতার ঘাটতি আছে বলে মনে করছেন একাধিক জনস্বাস্থ্যবিদ। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান গত ৮ ফেব্রুয়ারি কিটের চাহিদা জানিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চিঠি দিলেও তা হাতে পেতে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগেছে, যা কর্তৃপক্ষের ধীরগতিরই প্রমাণ দেয়।

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
সারা দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই রোগটি শনাক্তকরণের পরীক্ষা চরম অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। সরকারের একমাত্র নির্দিষ্ট পরীক্ষাগার, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে (IPH) প্রয়োজনীয় কিটের তীব্র স্বল্পতার কারণে নমুনা পরীক্ষা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে সারা দেশ থেকে আসা সন্দেহভাজন হাম রোগীদের কয়েক হাজার নমুনা ল্যাবরেটরিতে স্তূপীকৃত হয়ে আছে, যা জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, কিট সংকটের কারণে তারা চাইলেও পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষা করতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান উদ্ভূত পরিস্থিতি স্বীকার করে জানিয়েছেন, ‘আমরা বর্তমানে দৈনিক মাত্র এক শর মতো নমুনা পরীক্ষা করতে পারছি।’ এর বেশি মন্তব্য করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
ল্যাবরেটরি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত প্রায় পাঁচ হাজার রোগীর নমুনা বর্তমানে পরীক্ষার অপেক্ষায় জমা হয়ে আছে। কিটের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই জট কমার কোনো সম্ভাবনা নেই, উল্টো প্রতিদিন নতুন নতুন নমুনা যুক্ত হয়ে এই পাহাড় আরও বড় হচ্ছে।
দেশজুড়ে হাম ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে রোগটি শনাক্তের পরীক্ষার চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিলেই অভিভাবকরা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরীক্ষার দ্বারস্থ হচ্ছেন। চিকিৎসকরাও নিশ্চিত হতে চান যে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বা মৃত শিশুটি হামে আক্রান্ত ছিল কি না। পরীক্ষার ফলাফল পেতে বিলম্ব হওয়ায় অনেক হাসপাতালে রোগীদের অকারণে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হচ্ছে, যা হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা তুলে ধরেছেন যে, হাম শনাক্তের কিট একচেটিয়াভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সরবরাহ করে থাকে। এই ল্যাবরেটরিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত কিট ছাড়া অন্য কোনো উৎসের কিট ব্যবহার করা হয় না। একটি কিট দিয়ে ৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব এবং জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের দৈনিক ৩০০ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে।
গত মাসেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কর্মকর্তারা জানান, ১৯ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৬০টি কিট সরবরাহ করেছিল এবং ৩০ এপ্রিল বা ১ মে আরও ১০০ কিট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা তারা রক্ষা করতে পারেনি। গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই ১০০ কিট পেতে আরও দেড় থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে জরুরি ভিত্তিতে দিল্লি থেকে ৩০টি কিট এক সপ্তাহের মধ্যে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কিট সংকটের এই চরম মুহূর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং খুদে বার্তারও কোনো উত্তর দেননি।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল এই পরিস্থিতিকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন,
হামের এই প্রাদুর্ভাবের সময় রোগ শনাক্তের কিট না থাকা কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা। স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা অফিস ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে এমন পরিস্থিতি হতো না। তারা এই দায় এড়াতে পারে না।
এমন পরিস্থিতি এড়াতে কিটের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করার ওপরও তিনি জোর দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ২৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪ জন হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানের মধ্যেও কিট সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকার বা উন্নয়ন সহযোগীদের আন্তরিকতার ঘাটতি আছে বলে মনে করছেন একাধিক জনস্বাস্থ্যবিদ। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান গত ৮ ফেব্রুয়ারি কিটের চাহিদা জানিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চিঠি দিলেও তা হাতে পেতে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগেছে, যা কর্তৃপক্ষের ধীরগতিরই প্রমাণ দেয়।
