বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি
নীল সাগরের ঢেউয়ে ভেসে বেড়ানো বিশালকায় তিমি কিংবা শরতের নীল আকাশে ডানা মেলা চিলের উড়ান—আমাদের চেনা এই পৃথিবী যেন এক পরম নিপুণ শিল্পীর অনন্য সৃষ্টি। জীববৈচিত্র্য আর সৌন্দর্যের এই যে ডালি সাজানো, তা কি কেবল এই এক টুকরো গ্রহেই সীমাবদ্ধ? দীর্ঘকাল ধরে মহাকাশবিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে এই একটিই প্রশ্ন: মহাবিশ্বের এই অসীম শূন্যতায় আমরা কি সত্যিই বড্ড একা? পরিসংখ্যান আর সাম্প্রতিক আবিষ্কার বলছে, চিত্রটা হয়তো তেমন নয়। আমাদের মাথার উপরে জ্বলজ্বল করতে থাকা অগণিত নক্ষত্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে কোটি কোটি পৃথিবী, যা আমাদের কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক রোমাঞ্চকর অধ্যায় যুক্ত হয়েছে ৫ হাজারেরও বেশি 'এক্সোপ্ল্যানেট' বা বহিঃগ্রহ আবিষ্কারের মাধ্যমে। নাসার আর্কাইভ বলছে, এদের কেউ গ্যাসের বিশাল পিণ্ড, কেউবা জমে থাকা বরফ। তবে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর হলো সেই গ্রহগুলো, যেগুলো গড়ন আর প্রকৃতিতে আমাদের পৃথিবীরই যমজ। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, কেবল আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই অন্তত ৫ বিলিয়ন এমন গ্রহ থাকতে পারে যেখানে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকা অসম্ভব নয়। আর সেখানেই উঠে আসছে 'সেপ্টিলিয়ন' (একের পর এক ২৪টি শূন্য) সংখ্যক গ্রহের অকল্পনীয় সেই হিসেব। এতো বিশাল পরিসংখ্যানে কি কেবল একটি গ্রহেই জীবনের স্পন্দন থাকা সম্ভব? যুক্তি বলছে, বঙ্গোপসাগরে কেবল একটি মাছ থাকা যেমন অসম্ভব, এই মহাবিশ্বে আমরা একা থাকাও ঠিক ততটাই অবিশ্বাস্য।
সম্প্রতি ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধানে সবচেয়ে জোরালো সম্ভাবনাটি নিয়ে এসেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তাদের নজরে এসেছে 'কে২-১৮বি' (K2-18b) নামের একটি রহস্যময় গ্রহ। পৃথিবী থেকে প্রায় ১২৪ আলোকবর্ষ দূরের এই গ্রহটির বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এমন কিছু রাসায়নিক অণুর সন্ধান পেয়েছে, যা পৃথিবীতে কেবল জীবন্ত প্রাণের মাধ্যমেই উৎপন্ন হওয়া সম্ভব। অধ্যাপক নিক্কু মধুসূদনের নেতৃত্বে এই গবেষণা দলটি 'ডাইমিথাইল সালফাইড' নামক গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন, যা আমাদের গ্রহে সাধারণত সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বা ক্ষুদ্র প্রাণসত্তা থেকে নিঃসৃত হয়।
যদিও বিজ্ঞানীরা এই প্রাপ্তিকে এখনই চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করছেন না, তবুও তারা দারুণ আশাবাদী। তাদের মতে, আগামী দু-এক বছরের মধ্যেই হয়তো নিশ্চিত হওয়া যাবে যে মহাকাশের অতল গহ্বরে অন্য কোনো সভ্যতা বা প্রাণ আমাদের মতোই শ্বাস নিচ্ছে কি না। এই গ্রহগুলোর কোনোটিতে হয়তো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর চেয়ে দ্বিগুণ, কোথাও হয়তো আকাশচুম্বী বৃক্ষরাজির নিচে খেলা করে নাম না জানা কোনো জীব। দৃশ্যত অসম্ভব মনে হলেও মহাকাশের অসীমতা আর ক্রমবর্ধমান এই আবিষ্কারগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—আমরা হয়তো একা নই, কেবল সাক্ষাতের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। হয়তো খুব শীঘ্রই মিলিত হব সেই পড়শীদের সাথে।

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
নীল সাগরের ঢেউয়ে ভেসে বেড়ানো বিশালকায় তিমি কিংবা শরতের নীল আকাশে ডানা মেলা চিলের উড়ান—আমাদের চেনা এই পৃথিবী যেন এক পরম নিপুণ শিল্পীর অনন্য সৃষ্টি। জীববৈচিত্র্য আর সৌন্দর্যের এই যে ডালি সাজানো, তা কি কেবল এই এক টুকরো গ্রহেই সীমাবদ্ধ? দীর্ঘকাল ধরে মহাকাশবিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে এই একটিই প্রশ্ন: মহাবিশ্বের এই অসীম শূন্যতায় আমরা কি সত্যিই বড্ড একা? পরিসংখ্যান আর সাম্প্রতিক আবিষ্কার বলছে, চিত্রটা হয়তো তেমন নয়। আমাদের মাথার উপরে জ্বলজ্বল করতে থাকা অগণিত নক্ষত্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে কোটি কোটি পৃথিবী, যা আমাদের কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক রোমাঞ্চকর অধ্যায় যুক্ত হয়েছে ৫ হাজারেরও বেশি 'এক্সোপ্ল্যানেট' বা বহিঃগ্রহ আবিষ্কারের মাধ্যমে। নাসার আর্কাইভ বলছে, এদের কেউ গ্যাসের বিশাল পিণ্ড, কেউবা জমে থাকা বরফ। তবে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর হলো সেই গ্রহগুলো, যেগুলো গড়ন আর প্রকৃতিতে আমাদের পৃথিবীরই যমজ। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, কেবল আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই অন্তত ৫ বিলিয়ন এমন গ্রহ থাকতে পারে যেখানে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকা অসম্ভব নয়। আর সেখানেই উঠে আসছে 'সেপ্টিলিয়ন' (একের পর এক ২৪টি শূন্য) সংখ্যক গ্রহের অকল্পনীয় সেই হিসেব। এতো বিশাল পরিসংখ্যানে কি কেবল একটি গ্রহেই জীবনের স্পন্দন থাকা সম্ভব? যুক্তি বলছে, বঙ্গোপসাগরে কেবল একটি মাছ থাকা যেমন অসম্ভব, এই মহাবিশ্বে আমরা একা থাকাও ঠিক ততটাই অবিশ্বাস্য।
সম্প্রতি ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধানে সবচেয়ে জোরালো সম্ভাবনাটি নিয়ে এসেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তাদের নজরে এসেছে 'কে২-১৮বি' (K2-18b) নামের একটি রহস্যময় গ্রহ। পৃথিবী থেকে প্রায় ১২৪ আলোকবর্ষ দূরের এই গ্রহটির বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এমন কিছু রাসায়নিক অণুর সন্ধান পেয়েছে, যা পৃথিবীতে কেবল জীবন্ত প্রাণের মাধ্যমেই উৎপন্ন হওয়া সম্ভব। অধ্যাপক নিক্কু মধুসূদনের নেতৃত্বে এই গবেষণা দলটি 'ডাইমিথাইল সালফাইড' নামক গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন, যা আমাদের গ্রহে সাধারণত সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বা ক্ষুদ্র প্রাণসত্তা থেকে নিঃসৃত হয়।
যদিও বিজ্ঞানীরা এই প্রাপ্তিকে এখনই চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করছেন না, তবুও তারা দারুণ আশাবাদী। তাদের মতে, আগামী দু-এক বছরের মধ্যেই হয়তো নিশ্চিত হওয়া যাবে যে মহাকাশের অতল গহ্বরে অন্য কোনো সভ্যতা বা প্রাণ আমাদের মতোই শ্বাস নিচ্ছে কি না। এই গ্রহগুলোর কোনোটিতে হয়তো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর চেয়ে দ্বিগুণ, কোথাও হয়তো আকাশচুম্বী বৃক্ষরাজির নিচে খেলা করে নাম না জানা কোনো জীব। দৃশ্যত অসম্ভব মনে হলেও মহাকাশের অসীমতা আর ক্রমবর্ধমান এই আবিষ্কারগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—আমরা হয়তো একা নই, কেবল সাক্ষাতের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। হয়তো খুব শীঘ্রই মিলিত হব সেই পড়শীদের সাথে।
